ডিসটোপিয়া: ২
প্রথমবার পাবলিকে পুজোতেই নেচেছি। তখন কত আর বয়স! ছ’-সাত বছর হবে। ঠাকুরভাসানে নিয়ে যাওয়ার আগে প্যান্ডেলেই বিষাক্ত ড্রাম বিট এবং শরীরে একটা তীব্র আর্তনাদ। স্নায়ুরন্ধ্র, রোমকূপ শিহরিত— রক্ত নাচছে তালে-তালে। সে তাল সামলানো মুশকিল। আমি তো পারিনি। অজান্তেই নেচে উঠেছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা দোদুল্যমান ঝিংকুচিকু মানবসমষ্টি একসঙ্গে দুলছে, নড়ছে, চড়ছে।
এ কী অনাবিল আনন্দ? ভাষায় বোঝানো যায় না। শরীরই বোঝে। সেদিনকার কথা আবছা মনে থাকলেও, পরে আরও ভালভাবে বুঝেছি— সব মানুষই নাচতে চায়। কিন্তু হয়ে ওঠে না। কোনও এক অদ্ভুত কারণে আমাদের এদিককার মানুষরা প্রাকৃতিকভাবে, স্বেচ্ছাচারীর মতো, দিকবিদিকশূন্য হয়ে মনের আনন্দে নেচে উঠতে পারেন না। এর অনেক কারণ রয়েছে। মূল কারণ বোধহয় জাতিবাদ— এবং আমাদের সমাজের মূলে যে অসাম্য, তারই প্রতিচ্ছবি।
নাচ, হাসি বা যে-কোনও ধরনের প্রগতিশীল শিল্পই সমাজব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে থাকে। এই চ্যালেঞ্জটা আমার দেশে একেবারেই ভাল চোখে দেখেন না লোকজন। নাচ তো একটা পবিত্র ব্যাপার। এবার, পবিত্রতারও অনেক রকম স্তর আছে।
আরও পড়ুন: পুজোসন্ধে ৬:০০-৭:৫০! লিখছেন চন্দ্রিল ভট্টাচার্য…
মেনস্ট্রিম পবিত্র হচ্ছে সহজবোধ্য, ধুতি-টুতি পরা। মাপকাঠি, মানদণ্ড ইত্যাদিই এঁদের প্রধান সম্বল। অন্যদিকে, সূক্ষ্ম পবিত্র। যেখানে মানুষকে মানুষ করে তোলার উপাদানগুলো একেবারেই শারীরিক— নৈতিক-অনৈতিকের বিচারবিভাগের বাইরে। শরীরের নিজস্ব একটা সত্য আছে। তার আনন্দ আছে, তার স্পন্দন আছে, তার আদিম অভিব্যক্তি আছে। সেখানে সমাজের মাপকাঠি চলে না, মানদণ্ড চলে না। শরীর জানে, কখন সে নাচতে চায়।
বারোইয়ারি পুজো ব্যাপারটাই মূলত উৎসবকেন্দ্রিক। অনেক বন্ধু একসঙ্গে একটা কার্নিভাল করবে। বছরে একবার মজা করার ছাড়পত্র পাবে। বড় হওয়ার কায়দাকানুন বুঝতে পারবে। সামাজিক চেতনা জাগবে। আমাদের এরকমই বলা হয়েছিল।

স্বতঃস্ফূর্তভাবে শিব নেচেছিলেন। পৃথিবী-কাঁপানো নাচ।
শিব যে বড় নর্তক, আর্টিস্ট সত্তা, সেটা সবাই জানতেন। কিন্তু এই প্রদর্শন কেউ আগে দেখেননি। তাই দেবগণ স্তম্ভিত।
কয়েকদিন কেটে গেছে। সিরিয়াস আবহাওয়াটাও একটুখানি থিতু হয়েছে। বিষ্ণু জানতে চাইলেন, কোরিওগ্রাফিটা ঠিক কীরকম ছিল।
কেউ বলতে পারছেন না।
নাচের তেজে, শিবের প্রতাপে দেব, যক্ষ, মানুষ— সবাই অভিভূত, আতঙ্কিত এবং অজ্ঞান হতে ব্যস্ত। শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল এক মুনিকে। শিবের বিরাট ভক্ত। এতটাই যে, দক্ষ ফ্যানের মতো তিনি নিজের নোটবইতে একেবারে লিস্ট বানিয়ে শিবের বিভিন্ন শৈলী, বিভিন্ন ভঙ্গিমা নিখুঁতভাবে ডকুমেন্ট করে রেখেছেন।
তাহলে তণ্ডুমুনি কি প্রথম ডকুমেন্টারি ফিল্মমেকার? সে এক অন্য ভাবনার বিষয়।
মজার ব্যাপারটা হল, শিব কিন্তু তাণ্ডব নাচেননি। শিব নেচেছিলেন, শুধুমাত্র।

তাণ্ডব হচ্ছে তণ্ডুমুনির সেই বই, যেখানে এই নাচের পরিপূর্ণ বর্ণনা দেওয়া আছে। যাতে পরবর্তী সময়ে আমরা কোরিওগ্রাফিটাকে আত্মস্থ করে রিল বানাতে পারি।
বাংলায় ঠাকুরকে বিরাট কোনও উচ্চাসনে বসানো হয়নি। অনেকটা মানুষের মতো করেই, একটা পারিবারিক অ্যাঙ্গেল দিয়ে তাদেরকে আমাদের কাছে নিয়ে আসা হয়েছে। আমার তো মনে হয়, বেশিরভাগ মানুষই— থুড়ি, বাঙালি— ঠাকুরকে তুমি বলেই ডাকে।
সময় বদলাচ্ছিল। সমাজ বদলাচ্ছিল। নাচের ব্যাপারটা এলেই বাড়ির লোকজনের মুখচোখ গোমড়া হয়ে যাচ্ছিল।বিভেদ কীভাবে যেন বেড়েই যাচ্ছিল।
তাই দড়ি টেনে দেওয়া হল। আলাদা করে দেওয়া হল মানুষকে, শ্রেণিকে, সংস্কৃতিকে। নাচের মাত্রা অসংযত হলেই বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে লাগল। শরীরের স্বতঃস্ফূর্ততা হয়ে উঠল নিয়ন্ত্রণের বিষয়। আনন্দেরও একটা নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়া হল।
বিভিন্ন পাড়ার পুজোর কম্পিটিশন এককালে মজার ছিল। তারপরে সেটা সম্মানের ব্যাপার হয়ে গেল। কখন যে গোটা ব্যাপারটা একটা সিরিয়াস বাণিজ্যিক ইভেন্টে পরিণত হল, বুঝতেই পারা গেল না।
এবং সবাই জানে ডিসটোপিয়ান সোসাইটিতে কী হয়ে থাকে? বিভাজন।
তাই দড়ি টেনে দেওয়া হল। আলাদা করে দেওয়া হল মানুষকে, শ্রেণিকে, সংস্কৃতিকে। নাচের মাত্রা অসংযত হলেই বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে লাগল। শরীরের স্বতঃস্ফূর্ততা হয়ে উঠল নিয়ন্ত্রণের বিষয়। আনন্দেরও একটা নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়া হল।
ফলে শেষ পর্যন্ত এল সেই দিন। বাঙালিকে অন্তত সেই একটা দিন নাচতে দেওয়া হত!
কিন্তু সেদিনের নাচটাও কেমন যেন একটা রিলের মতো মনে হতে লাগল। আনন্দের মুহূর্তটাও যেন আগে থেকে তৈরি করে রাখা কোনও কনটেন্ট। শরীর নাচছে, অথচ কোথাও একটা ক্যামেরা চালু আছে।
নিজের অজান্তেই মানুষ নিজেকে দেখছে, অন্যকে দেখাচ্ছে।




