রাজপুত্রের স্খলন
‘মাঠের বাইরের খেলা’য় হারলেন মারাদোনা! বিপ্লবী-ফুটবলারের ট্র্যাজিক পরিণতি! যখন তিনি খেললেন, নায়কের মতো বিচরণ করে জিতলেন। খেলার পর যখন তাঁকে পেচ্ছাপ করাতে নিয়ে গেলেন কিছু পরীক্ষক, তখন তিনি হেরে গেলেন!
নাইজেরিয়া-বক্সের কিছুটা বাইরে বাঁ-দিক ঘেঁষে বল বসাচ্ছেন মারাদোনা। আর-একটা ফ্রিকিক নেওয়ার জন্য। চোখ তুলে দেখে নিলেন, নাইজেরিয়ান ডিফেন্ডাররা নিজেদের জায়গায় নেই, ফাঁকায় দাঁড়িয়ে ক্লদিও ক্যানিজিয়া তাঁর মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রয়েছেন। চকিতে ইশারায় ক্যানিজিয়াকে স্প্রিন্ট শুরু করতে বলে, বাঁ-পায়ে বলটি পুশ করে দিলেন ফুটবলের রাজপুত্র, যেমন অবলীলায় তিনি থ্রু বাড়াতেন সতীর্থদের! নাইজেরিয়া-ডিফেন্স যখন বিষয়টা বুঝল, তখন বক্সের মধ্যে বলের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছেন ক্যানিজিয়া। আর দু’পা এগিয়ে চলতি বলেই ডান পায়ের কোণাকুণি শটে নাইজেরিয়ার গোলকিপার পিটার রুফাইকে পরাস্ত করে, বল জালে জড়িয়ে দিলেন আর্জেন্তেনীয় ফরোয়ার্ড।
শুরুতে স্যামসন সিয়াসিয়ার গোলে পিছিয়ে পড়েও, ২৮ মিনিটে ক্যানিজিয়ার জোড়া গোলের সৌজন্যে— ২-১-এ এগিয়ে গেল আর্জেন্টিনা। এর ঠিক সাত মিনিট আগেই, বক্সের বাইরে আর-একটি ফ্রিকিক থেকে, মারাদোনার হিল করে ঠেলে দেওয়া বলে, গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার জোরালো শট, রুফাই কোনওক্রমে সেভ করার পর, রিবাউন্ডে জাল কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন ক্যানিজিয়া। তাই মারাদোনাকে আবার ফ্রিকিক নিতে দেখে, কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিলেন নাইজেরিয়ানরা। সেই সুযোগটাই কাজে লাগালেন আর্জেন্টিনার ক্যাপ্টেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজিত সেই বিশ্বকাপে, নাইজেরিয়া ছিল আফ্রিকার সেরা বাজি। কিন্তু আক্রমণে মারাদোনা-ক্যা নিজিয়া-বাতিস্তুতার ত্রহ্যস্পর্শ— প্রবল চাপে রাখল আফ্রিকানদের। বাকি খেলায় আর গোল হল না। পরপর দুটো ম্যাচ জিতে, গ্রুপ-চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দিকে এক ধাপ এগিয়ে গেলেন ক্যানিজিয়ারা। আর্জেন্টিনাকে নিয়ে আবার নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হতে শুরু হল বিশ্বকাপের মঞ্চে; যার কেন্দ্রবিন্দু অবশ্যই মারাদোনা।

২৫ জুন, ১৯৯৪। ম্যাসাচুসেট্সের ফক্সবোরো স্টেডিয়ামে যখন শেষ বাঁশি বাজল, তখন উচ্ছ্বাস দেখা গেল আর্জেন্টিনা শিবিরে। তখনও ক্যানিজিয়া-বাতিস্তুতারা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেননি যে, তাঁদের অবিসংবাদিত নেতা বিশ্বকাপে তাঁর শেষ ম্যাচ খেলে ফেলেছেন! স্বয়ং মারাদোনাও কি সেই পরিণতির সামান্যতম আভাস পেয়েছিলেন?
আগেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ঘোষণা! পরাজিত হয়ে কাঁদতে হয়েছিল ব্রাজিলকে!
পড়ুন: বিতর্কিত একাদশ পর্ব ৬…
প্রথম ম্যাচে গ্রিসের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড শট জালে আশ্রয় নেওয়ার পর, কর্ণার ফ্ল্যাগের কাছে গিয়ে ক্যামেরার সামনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করার সময়ে চিৎকার করে কিছু বলতে শোনা গিয়েছিল মারাদোনাকে। ‘আমার সমস্ত রাগ-যন্ত্রণা-জ্বালা— যে যা বলেছিল, সব অপমান উগড়ে দিয়েছিলাম।’ এই সেলিব্রেশনের ছবি তখন সমগ্র বিশ্বের ঘরে-ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। মারাদোনার সঙ্গে বিশ্বকাপের মঞ্চে থাকতে পারার জন্য, গ্রিক-ফুটবলারদের দেখা গেল শ্রদ্ধায় আপ্লুত হয়ে মাঠের মধ্যেই তাঁর সঙ্গে করমর্দন করতে।

মারাদোনার ফর্ম দেখে তখন জাগছেন আর্জেন্টিনার সমর্থকরা, স্বপ্নের জাল বুনতে শুরু করেছেন সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা সমর্থকরা। এই সেলিব্রশনের ভঙ্গিমাই কি অনেকের গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনার অন্তিম মুহূর্ত ডেকে এনেছিল?
নাইজেরিয়া ম্যাচের হাফ-টাইমেই কিন্তু তাঁকে ‘র্যান্ডম ডোপ টেস্ট’-এর জন্য চিহ্নিত করা হয়েছিল। সংগ্রহ করা হয় তাঁর মূত্রের নমুনা। এরপর ম্যাচের শেষে সংগ্রহ করা হয় দ্বিতীয় নমুনা। ২৮ জুন প্রথম নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট, পজিটিভ এল। ‘আন্তর্জাতিক অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন’ ও ‘ফিফা’র নিষিদ্ধ এফিড্রিন-সহ পাঁচটি পদার্থ পাওয়া যাওয়ার উল্লেখ ছিল তাঁর মূত্রের প্রথম নমুনা পরীক্ষার রিপোর্টে। অর্থাৎ, নিশ্চিত শাস্তির মুখে আর্জেন্টিনার সর্বকালের সেরা ফুটবলার!
২৯ জুন, আর্জেন্টিনা কর্তৃপক্ষ বিশ্বকাপ থেকে মারাদোনাকে সরিয়ে নেয়, ‘ফিফা’ কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই। ‘ফিফা’র তরফ থেকে সেপ ব্লাটারও জানান যে, মারাদোনা ডোপ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ার খবর সত্যি। এর জন্যে ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপ’-এ তাঁকে আর নাও দেখা যেতে পারে। সমগ্র বিশ্বে খবর ছড়িয়ে পড়ে আলোর গতিতে। ১ জুলাই সরকারিভাবে ‘ফিফা’ ঘোষণা করে দেয় যে, মারাদোনা বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। পরে ২৪ অগাস্ট এক শুনানির পর, ‘ফিফা’ মারাদোনাকে ১৫ মাসের জন্য ফুটবল থেকে নিলম্বিত করে।

‘ওরা আমার দুটো পা কেটে নিল’
ব্রাজিলীয় ঝুয়াঁও আভিলাঁঝি তখন ‘ফিফা’ সভাপতি। সেপ ব্লাটার তার অধীনস্থ এক ‘ফিফা’ আমলা। ৩৪ ছুঁই-ছুঁই মারাদোনার মুকুটে তখন একটি বিশ্বকাপ, আর একটি বিশ্বকাপ ফাইনালিস্ট হওয়ার পালক। এ-ছাড়া, ইতালীয় ক্লাব ফুটবলে উপেক্ষিত, ‘ছোট দল’ দক্ষিণ ইতালির ন্যাপোলিকে তিনি জিতিয়েছেন ঘরোয়া লিগ-সহ একাধিক ট্রফি, ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ। ন্যাপোলির জার্সিতে তার প্রতিটা গোল ছিল মিলান, তুরিন, রোম-সহ ধনী উত্তর ইতালীয়দের বা ইউরোপের প্রতিষ্ঠিত ফুটবল শক্তিগুলোর ক্ষমতাবিন্যাস ধ্বংসের বারুদে ঠাসা, ইতিহাসের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ।
’৯০-এর ইতালি বিশ্বকাপে, নেপলসে ইতালিকে হারিয়ে আর্জেন্টিনার ফাইনালে যাওয়াও ছিল সেই বারুদের এক বিস্ফোরণ। রোমে ফাইনালে আর্জেন্টিনার জাতীয় সংগীতের সময়ে বা মারাদোনার কাছে বল গেলেই, দর্শকাসন থেকে ভেসে আসছিল ব্যঙ্গাত্মক শিস্। আর্জেন্টিনা হেরে যাওয়ায় প্রকাশ্যে কেঁদেছিলেন দিয়েগো। তবে নেপলসের সেমিফাইনালের জের সেখানেই শেষ হয়নি। পরের মরসুমেই মার্চ মাসে ইতালি ছাড়তে বাধ্য হলেন নেপলস তথা ন্যাপোলির আরাধ্য দেবতা। কোকেন সেবনের জন্য, ডোপ পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়ে তিনি দেশে ফিরে যান। পরে বুয়েনোস আইরেস থেকে গ্রেফতার করা হল তাঁকে; এবং পাকাপাকিভাবে ইতালি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন মারাদোনা, ফুটবল থেকে ১৫ মাসের বিশ্বব্যাপি নির্বাসনের দণ্ড মাথায় নিয়ে!

বিশ্ব ফুটবল পরিচালনায় ‘ফিফা’ কর্তাদের প্রবল আধিপত্য ও দম্ভের বিরুদ্ধেও ফুটবলের পক্ষ থেকে একমাত্র সোচ্চার কন্ঠ ছিল আর্জেন্তেনীয় জিনিয়াসেরই। ছোটখাট চেহারার মারাদোনার এক-একটা প্রশ্ন ছিল একেকটা ‘আপারকাটের’ মতো! ’৮৬ ও ’৯৪তে, ফুটবলে টেলিভিশনের একানায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়া নিয়েও সরব হন তিনি। যে-টেলিভিশন স্বত্ব থেকে মোটা টাকা রোজগার করতেন ‘ফিফা’ ও ‘উয়েফা’ কর্তারা, মারাদোনার মতে সেই টেলিভিশন সম্প্রচার, ফুটবলারদের সূর্যের প্রখর তাপে হাড়ভাঙা শ্রম করিয়ে নিংড়ে নিচ্ছে! হাতে, থাইতে চে-গেভারা ও ফিদেল কাস্ত্রোর ট্যাটু-সহ মারাদোনার বন্ধু ছিলেন কিউবার কাস্ত্রো, ভেনেজুয়েলার হুগো শাভেজ ও বলিভিয়ার ইভো মোরালেস। তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, ফুটবল-ব্যবস্থা ‘আন্তর্জাতিক শ্রম আইন’ অনুযায়ী পরিচালনা করা হোক। একজন ফুটবলার যদি তাঁর মাঠের উপার্জন জানাতে বাধ্য থাকে, তাহলে ফুটবলের বহুজাতিক সংস্থাদের আয়ের ব্যাপারে ফুটবলারদের জানার কেন অধিকার থাকবে না? এইভাবে মারাদোনা একাধিকবার মৌচাকে ঢিল মারেন।

খেলার মধ্যেে তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করা যেমন ছিল বিপক্ষের অসাধ্যে, মাঠের বাইরে তিনি মুখ খুললেও, তা নিয়ন্ত্রণে রাখা কোনও সংস্থার আয়ত্ত্বের বাইরে ছিল। যে-রিপোর্টাররা মাইক্রোফোন নিয়ে তাঁর পেছন-পেছন সর্বক্ষণ ঘুরতেন প্রতিক্রিয়া পাওয়ার জন্য, তাঁরাই তাঁর সমালোচনা করতেন অতিরিক্ত কথা বলার জন্য!
বন্ধু ফিদেলকে সই করা জার্সি উপহার দিচ্ছেন ফুটবলের রাজপুত্র, এই ছবি সারা বিশ্বের সংবাদমাধ্যম মারফত ছড়িয়ে পড়ে সে-সময়ে। মারাদোনাকে বলতে শোনা যায়, ‘ফিদেলের জন্যত আমি প্রাণও দিতে পারি। ’৮৭-তে প্রথম যখন ওকে দেখি, মনে হয়েছিল ও এক শক্তিশালী পশুর মতো নিজের সীমানা রক্ষা করে চলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাত থেকে। ওর বুকের পাটা আছে!’

খেলা আর রাজনীতির পরিসর আলাদা বলে বিশ্বাস করেন বহু মানুষ। কিন্তু মারাদোনার জগতে, তাঁর বিচরণে, তার মন্তব্যে খেলার মাঠের সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতার যোগসাজশ ও তার আধিপত্যের তত্ত্ব উঠে এসেছে বারবার। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, খেলার মাঠ খেলার সামান্যই, অধিকটাই দখল করে আছে রাজনীতি। এসব দেখে ‘ফিফা’ সভাপতি ঝুয়াঁও আভিলাঁঝি মুখে কুলুপ এঁটেছিলেন। ব্লাটার, যিনি জীবনে ফুটবলে পা স্পর্শ না করেও, ‘ফিফা’ আমলা হয়ে একটি ২৫ ফুট লিমুজিন গাড়িতে ঘুরতেন এক কৃষ্ণাঙ্গ চালক নিয়ে, বলেছিলেন, ‘আর্জেন্টিনার শেষ ফুটবল নক্ষত্র আলফ্রেডো ডি স্টেফানো।’
’৯৪-তে মারাদোনা ফুটবল-আকাশের নিছক একজন নক্ষত্র ছিলেন না, বিবর্তিত হয়ে তিনি নিজেই হয়ে গিয়েছিলেন ফুটবলের ইউনিভার্স (ব্রহ্মাণ্ড)। লিওনেল মেসি ও নেইমার জুনিয়রের জীবনী লিখেছেন যিনি, সেই বিশিষ্ট ফুটবল লেখক ও সাংবাদিক লুকা কাইওলির মতে, ‘মারাদোনা একক দক্ষতায় ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারতেন। পেলে, যোহান ক্রুয়েফদের কথা মাথায় রেখেও বলা যায়, মারাদোনার মতো বিপক্ষকে ধ্বংস করতে আর কেউই পারেননি ফুটবল মাঠে। তাই দিয়েগোই সর্বকালের সেরা!’

সাড়ে পাঁচফুট উচ্চতার মারাদোনার গতি আহামরি ছিল না, কিন্তু পায়ে বল পড়লে, তিনি কাব্যিক মায়াজাল বুনন করতে পারতেন, তাঁর অবিশ্বাস্য বল-কন্ট্রোল আর ড্রিবলিংয়ের জাদুস্পর্শে। এবং মাঠের যে-কোনও প্রান্তে বাড়াতে পারতেন নিখুঁত পাস। তাঁর সারা শরীরেই চোখ ছিল। বল-সহ এগনোর সময়ে, কঠিন ট্যাকেল করে তাঁকে আটকানো যেত না, ডাবল বা ট্রিপল কভারিং-এ তাঁকে রোখা যেত না। তাই তিনি যখন স্বকীয় স্টাইলে খেলতেন, তখন মাঠে মহাকাব্য রচনা হত।
এ-হেন মারাদোনার ভাবমূর্তিতে একটি প্রবল আঘাত হানার প্রয়োজন মনে করছিল ক্ষমতাবানদের শাসনযন্ত্র। তাই শপথ নিয়েই অপেক্ষায় ছিলেন আন্তর্জাতিক ফুটবলের বড় কর্তারা। আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম বিশ্বকাপ সফলভাবে আয়োজন করার জন্য, বিজ্ঞাপনের পোস্টারে প্রয়োজন ছিল দিয়েগোর মুখেরও!
এই দ্যোতনার মধ্যে বিশ্বকাপকে পাখির চোখ করে, মারাদোনা শুরু করেছিলেন ফিরে আসার লড়াই। প্রস্তুতিপর্বে চলে অমানুষিক শ্রম, নিজের শরীরের গঠন ফিরে পেতে, ফিটনেস ফিরে পেতে। যোগ্যতা অর্জনকারী পর্বে কলম্বিয়ার কাছে ঘরের মাঠে পাঁচ গোল খেয়ে, চাপে পড়ে যাওয়া আর্জেন্টিনাকে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে প্লে-অফে জিতিয়ে, মূল পর্বে তোলার ক্ষেত্রেও বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন মারাদোনাই। দিয়েছিলেন ফর্মে ফেরার ইঙ্গিতও। এবং নিজের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচে, নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে মাঝমাঠ থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন তিনিই। পুরোদস্তুর ছন্দে ফিরে পাওয়ার পরই নেমে এল বহিষ্কারের খাঁড়া।
খেলা আর রাজনীতির পরিসর আলাদা বলে বিশ্বাস করেন বহু মানুষ। কিন্তু মারাদোনার জগতে, তাঁর বিচরণে, তার মন্তব্যে খেলার মাঠের সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতার যোগসাজশ ও তার আধিপত্যের তত্ত্ব উঠে এসেছে বারবার। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, খেলার মাঠ খেলার সামান্যই, অধিকটাই দখল করে আছে রাজনীতি।
বুয়েনোস আইরেস সংলগ্ন শ্রমিক মহল্লা, ভিল্লা ফিওরিতো থেকে উত্তরণের পর, ফুটবল মাঠে ও মাঠের বাইরে বহু আঘাত পেতে হয়েছিল দিয়েগোকে। ’৮২তে সামরিক শাসনের আওতায় থাকা আর্জেন্টিনার ক্লাবগুলো দেউলিয়া হয়ে যাওয়ায়, ‘বোকা জুনিয়ার্স’ ছেড়ে বিরাট অর্থের বিনিময়ে স্পেনের বার্সিলোনায় পাড়ি দেন তিনি। তার আগে, ‘বোকা জুনিয়ার্স’-এ অনেক কম টাকায় খেলতেন তিনি, তাঁর বাবার প্রিয় ক্লাব বলে।
আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করার স্বপ্ন নিয়ে, সে-বিষয়ে পেলের মতোই বাবাকে কথাও দিয়েছিলেন তিনি। এমনই ভিন্নধর্মী চরিত্র ছিলেন মারাদোনা। আর্থিক বৈভব দিয়ে যে-জাগতিক সাফল্যের পরিমাপ করা হয়, সেই চাহিদা তাঁর বিশেষ ছিল না!
’৮৩-তে ‘ন্যু ক্যাম্প’-এ ‘লা লিগা’র ম্যাচে ‘অ্যাথলেটিক বিলবাও’-এর স্টপার এনদোনে গয়কোচিয়া, পেছন থেকে বেপরোয়া লাথি চালিয়ে, তার বাঁ-গোড়ালি ভেঙে দেন। মাঠে গয়কোচিয়ার ডাকনাম ছিল ‘বিলবাও-এর কসাই’। মাস তিনেক বাদে মাঠে ফিরলেও, এই চোট মারাদোনাকে দীর্ঘদিন ভুগিয়েছিল।

শুরু হল, ব্যথানাশক কর্টেসন ইনজেকশন নেওয়ার অভ্যেস। এর আগে স্পেনেই ’৮২ বিশ্বকপে, কোয়ার্টার ফাইনাল রাউন্ডের ম্যাচে, মারাদোনাকে নিষ্প্রভ করতে ২৩ বার তাঁকে ফাউল করেছিলেন ইতালির ক্লদিও জেন্টিলে।
স্পেনে থাকার সময় থেকেই, যন্ত্রণা ভুলতে কোকেন নেওয়া শুরু করেছিলেন ফুটবলের রাজপুত্র। পরে তাঁর জীবন নিয়ে নির্মিত সার্বিয়ার পরিচালক এমির কুস্তুরিসার তথ্যচিত্রে, এই কোকেন নেওয়ার কথা অকপটে স্বীকার করেছিলেন তিনি। ‘কোকেন না নিলে, আমি আরও বড় প্লেয়ার হতে পারতাম। কোকেনের জন্যই আমার দুই মেয়ে দালমা আর জিয়ানিনার সঙ্গে আমার দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়। ওরা যখন বড় হয়ে উঠছে, হয় আমি তখন পুলিশ হেফাজতে, না হয় রিহ্যাব সেন্টারে।’ মারাদোনার অকপট স্বীকারোক্তি, ‘আমি জানি এক্ষেত্রে আমি দোষী, কিন্তু আমার কিছু করার নেই আর।’ ইতালিতে যখন কোকেন নেওয়ার জন্য ডোপ টেস্টে অনুত্তীর্ণ হলেন, তখন আকাশ থেকে তাঁকে রুক্ষ মাটিতে আছড়ে ভাঙতে চেয়েছিল মিডিয়ার একাংশ। আর্জেন্টিনার টিভি লাইভ কভারেজ করল এই পুরো অধ্যয়ের। কিন্তু ঈশ্বরের ভাবমূর্তি নির্মাণ করতে যতটা সময় লাগে, তা ধ্বংস করতে লাগে তার একটু বেশি। মারাদোনা এই ‘ঈশ্বর’ ভাবমূর্তির বোঝা দীর্ঘদিন বহন করেছেন। তার শরীর ঝুঁকে পড়েছে সেই ওজনের ভারে, পায়ে অসহ্য যন্ত্রণা হয়েছে, নিতে হয়েছে ব্যথানাশক, তবুও ফ্যানদের দাবি নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেননি। ‘ওদের প্রয়োজনই আমাকে প্রয়োজনীয় করে রেখেছে।’

সেই ধ্বংস করার প্রয়াস ও সময়ের মধ্যেই মারাদোনা প্রবলভাবে ফিরে এলেন। ট্রেডমিলে ঘণ্টায় ১৬ কিলোমিটার গতিতে দৌড়লেন ওজন কমানোর জন্য। এই সময়ে তাঁর শারীরিক প্রশিক্ষক হয়ে এলেন দানিয়েল সেরিনি। তাঁর পরামর্শ মেনে ট্রেনিং করছিলেন মারাদোনা। সেরিনির পরামর্শেই কিছু এনার্জি-ড্রিঙ্ক নিয়মিত খেতেন তিনি। তার থেকেই কী বিপদের সূত্রপাত? সে-সময়ে নিষিদ্ধ পদার্থ থেকে উদ্ভুত যৌগ (ডেরিভেটিভ) ও তার সম্পূরকগুলো নিয়ে ‘ফিফা’ বা ‘আইওসি’র কোনও নির্দিষ্ট নির্দেশিকা ছিল না, বর্তমানে যা রয়েছে। তাই সেরিনির পরামর্শে মারাদোনা একটি বিশেষ এনার্জি-ড্রিঙ্ক খেতেন, কিছু ওষুধপত্রও খেতেন। লক্ষ্য ছিল দ্রুত ওজন কমিয়ে ম্যাচ-ফিট হয়ে ওঠা।
কিন্তু ’৯৪ বিশ্বকাপের এফিড্রিন? মারাদোনা শেষ পর্যন্ত অস্বীকার করে গিয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে কোকেন সেবনের যতই অভিযোগ থাক, মারাদোনা কোনওদিন ডোপ করে বা কোনও উদ্দীপক নিয়ে মাঠে নেমেছেন, এমন অভিযোগ স্পেন বা ইতালি— তাঁর ক্লাব-ফুটবল জীবনে ওঠেনি।
মারাদোনার দীর্ঘদিনের শারীরিক প্রশিক্ষক ফার্নান্দো সিনোরিনির এ-প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা, ‘ওই সময়ে দিয়েগো, সেরিনির ওপর খুবই নির্ভরশীল ছিল। সেরিনিকে আমরা কেউ চিনতামই না, যতক্ষণ না তাঁকে মারাদোনার সঙ্গে ট্রেনিংয়ের সময়ে মাঠে ঘুরতে দেখা যায় ওঁকে।’ ‘আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসাসিয়েশন’-এর ডাক্তার রবার্তো পিদ্রোও একই কথা বলেন সেরিনি সম্পর্কে। সিনোরিনি মনে করেন, মারাদোনা ইচ্ছাকৃতভাবে এফিড্রিন নেননি। ‘সেরিনি ওকে একটি এনার্জি-ড্রিঙ্ক দিত, ওজন কমানোর জন্য। আমেরিকায় বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার পর, বস্টনে দলের মূল শিবিরে কিছুদিন পর দেখা যায় সেই স্টক ফুরিয়ে গেছে। সেরিনির কথায়, মারাদোনা নতুন স্টক আনানোর নির্দেশ দেন। স্থানীয় বাজার থেকে আনানো এই চিনা পণ্যে এফিড্রিন ছিল। কেউ তা খেয়াল করেনি।’ সিনোরিনি মনে করিয়ে দেন, মারাদোনা ওই টিমের নিছক একজন অধিনায়ক ছিলেন না, দলে তার প্রভাব ছিল অপরিসীম; কোচ আলফে বাসিলের থেকেও বহুগুণ। তাই তিনি কিছু করলে, স্বাভাবিকভাবেই তা নিয়ে কেউ প্রশ্ন করত না। অপরিচিত সেরিনিকেও কোচ-সহ সবাই তাই মেনে নিয়েছিলেন।
মারাদোনাও বারবার বলে গিয়েছেন, জ্ঞানত তিনি এফিড্রিন বা কোনও পারফরমেন্স বর্ধক নিষিদ্ধ পদার্থ নেননি। ডোপ টেস্টের রিপোর্ট বের হওয়ার পর, পিদ্রো-সহ টিমের ডাক্তাররা হোটেলের ঘরে সেরিনিকে কলার চেপে দেওয়ালে ঠেসে ধরে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি ওকে কী খাইয়ে গেছ?’ সেরিনি কোনও উত্তর দিতে পারেননি। তড়িঘড়ি তাঁকে শিবির থেকে সরিয়ে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কৃত হয়ে গিয়েছেন দিয়েগো মারাদোনা।
‘ডোপ টেস্ট, রিপোর্ট, পজিটিভ! আমাদের কাছে এসব অর্থহীন ছিল। আমরা শুধু আমাদের নেতাকে হারিয়েছিলাম। দিয়েগো না থাকায়, আমাদের বিশ্বাসটাই হারিয়ে যায়।’ মারাদোনার বহিষ্কার সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া বাতিস্তুতার। তবে অনিচ্ছাকৃত ভুলের তত্ত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ে, যখন পরীক্ষার রিপোর্টে পাঁচটি পদার্থের সন্ধান পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। আবার মারাদোনার ব্যক্তিত্ব, বিশ্বকাপে স্বমহিমায় তাঁর ফিরে আসা ও ফর্ম— এসব নিয়ে ‘ফিফা’ কর্তারা যে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেন, এটাও সত্যি। ‘কোনও ব্যক্তিই আইনের ঊর্ধ্বে নয়, যেই হোন-না-কেন। পজিটিভ রিপোর্ট মানে পজিটিভ রিপোর্ট!’ ‘ফিফা’ সভাপতি আভিলাঁঝি-র কন্ঠস্বর ছিল রূঢ়। ‘দিয়েগোর কি মাঠে কখনও কারুর বা কোনওকিছুর সাহায্য লাগত?’ অধিনায়ক ও বন্ধুর পাশে দাঁড়িয়ে পাল্টা প্রশ্ন তুলেছিলেন ক্যানিজিয়া।
নেতাহীন আর্জেন্টিনা, গ্রুপের শেষ ম্যাচে, হ্রিস্টো স্তইচকভের বুলগেরিয়ার কাছে হেরে যায়। সে-দিন শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা দলকে মনে হয়েছিল বিধ্বস্ত, দিশাহীন। এরপর দ্বিতীয় রাউন্ডে রোমানিয়ার সঙ্গে দ্বিতীয়ার্ধে কিছুটা লড়াইতে ফিরলেও, শেষ পর্যন্ত ২-৩-এ হেরে বিশ্বকাপ অভিযান শেষ করল আর্জেন্টিনা।
মারাদোনা গ্যালারি থেকে দলকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মাঠে দলকে পরিচালনা করার মতো একজন নেতার অভাব প্রতি পদে অনুভূত হয়। শেষ পর্যন্ত ওই বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ‘ফিফা’ সভাপতির দেশ ব্রাজিল। ২৪ বছরের খরা কাটিয়ে। প্রতিযোগিতার সেরা খেলোয়াড় হয়ে সোনার বল পেয়েছিলেন ব্রাজিলের রোমারিও। এ-প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য, এই রোমারিও ছিলেন মারাদোনা-জঁরের ফুটবলার। মনে যা থাকত তা বলে ফেলতেন, কী বলছেন তা না ভেবেই। কাকতালীয় হলেও সত্যিই যে, মারাদোনার মতো রোমারিওর-ও এটা ছিল শেষ বিশ্বকাপ। পরের দুটো বিশ্বকাপে ফিট থাকলেও, ব্রাজিল দলে তাকে আর দেখা যায়নি। মার্কিন সেনা যখন আফগানিস্তান আক্রমণ করে, তখন এক পানশালায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ও তার সরকারের আগ্রাসন নীতিকে অশ্রাব্য ভাষায় তুলোধনা করেন তিনি। ২০০২ বিশ্বকাপ ব্রাজিল জিতলেও, দলে জায়গা হয়নি রোমারিওর মতো ফুটবলারের!

ফুটবল-বিপ্লবী
‘ফিফা’ আমাকে ক্ষমা করেনি। আমি অনেক কিছু বলেছিলাম ওদের বিরুদ্ধে। ওদের তা ভাল লাগার কথা নয়। যখন ওরা সুযোগ পেল, তখন আমার পা থেকে থেকে ফুটবল কেড়ে নিল।’ ’৯৪-এর ডোপ বিতর্ক নিয়ে মন্তব্য মারাদোনার। মাঠের মধ্যে তার সম্মোহনী ফুটবল-শিল্পের আভা ছড়িয়ে পড়েছিল দূ্রপ্রান্তে। মারাদোনা-প্রেমীরা বলে থাকেন, বিশ্বে এমন কিছু প্রান্তিক জায়গায় এমন সব জনগোষ্ঠীর মানুষ আছেন, যাঁরা যীশু খ্রিস্টের নামও শোনেননি, কিন্তু মারাদোনার নাম শুনলে আনন্দে নেচে ওঠেন! যদিও এই দাবির সত্যতা যাচাই করা হয়নি কখনও। মাঠের এ-হেন জিনিয়াসের স্ফূরণ দেখা গিয়েছে বারবার, আবার মাঠের বাইরে করেছেন নানা ‘ভুলও’। কোকেন নেওয়ার ভুল, ক্ষমতার বিরুদ্ধে বারবার আঙুল তোলার ‘ভুল’। আশেপাশের মানুষকে বিশ্বাস করার ‘ভুল। সেরিনিকে বিশ্বাস করে সেই ভুলই করেছিলেন মারাদোনা। এইসব ‘ভুল’ সত্ত্বেও বুয়েনোস আইরেস থেকে নেপলস, সমর্থকদের হৃদয় দিয়েগো আমৃত্যু রয়ে গিয়েছেন, ‘দিওস’ (ঈশ্বর) রূপে!

এমির কুস্তুরিসার তথ্যচিত্রে তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছিল, ‘স্বয়ং যীশুর পা হড়কাতে পারে, আর আমি পারি না?’ এই ফিল্মের ফরাসি শিল্পী মাহনু চাও-এর একটি গান ছিল। শহরের রাস্তায় এক বন্ধ দোকানের সামনে হাতে গিটার ও পাশে এক সঙ্গীকে নিয়ে শিল্পী গাইছেন, ‘লে ভিদা এস উনা তম্বোলা, দে নোচে দে দিয়া/….সি ইউ ফুয়েরা মারাদোনা, ভিভিরা কোমো এই।’ যার মানে, ‘জীবন একটা লটারির ভাগ্যচক্রের মতো ঘোরে।… আমি যদি মারাদোনা হতাম, তো তার মতো করেই বাঁচতাম। গান চলার সময়ে হঠাৎ শিল্পীর সামনে সানগ্লাস পড়ে পর্দায় আবির্ভাব হয় স্বয়ং মারাদোনার। গানের আর-একটি লাইন খুবই আক্রমণাত্মক। “আমি যদি মারাদোনা হতাম, তাহলে গ্লোবাল টিভিতে এসে চিৎকার করে বলতাম, ‘ফিফা’ কর্তারা চোর!” পুরো গানটির কথায় ও সুরে ধরা পড়েছে মারাদোনার জীবন-দর্শন।

তবে শত নির্বাসনেও এই ‘ভুল’গুলো থেকে মুক্ত করা যায়নি মারাদোনাকে। ফুটবল মাঠের শ্রেষ্ঠ শিল্পীর অন্তর ছিল বিপ্লবীর। তিনি যুবরাজ চার্লসের সঙ্গে হাত মেলাতে অস্বীকার করেন, কারণ তাঁর হাতে মালভিনাস যুদ্ধের (ফকল্যান্ড) শহীদদের রক্ত লেগে আছে। জর্জ বুশের সরকার তাঁকে একটি পুরস্কার দিতে চাইলে, তিনি তা সবিনয়ে প্রত্যাখ্যাতন করেন, বুশকে যুদ্ধাপরাধী ভেবে নয়। বরং, ফিদেল কাস্ত্রোর কিউবা তাঁকে, সে-দেশের একটি জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত করার জন্য নির্বাচিত করেছিল বলে, এ-সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। চে গেভারার লেখা পড়া ও সমাজতান্ত্রিক কিউবায় থাকা তাঁকে অনুপ্রেরণা জোগাত। পোপকে তিনি প্রকাশ্যে ‘হিজে দে পুতা’ (স্প্যানিশে অশ্রাব্য গালি) বলে বিষোদগার করেছিলেন। অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত ‘এশিয়া কাপ’-এর জন্য, ২০১৪-এ একের-পর-এক গণহত্যািয় বিপর্যস্ত প্যালেস্টাইনের জাতীয় দলের কোচ হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন মারাদোনা। ইজরায়েলি বোমা ও গুলিতে তখন গাজায় নিহত হয়েছেন বহু অ্যাথলিট ও ফুটবলার। যদিও কোচ হওয়া বাস্তবায়িত হয়নি। কিন্তু ‘হৃদয়ে থেকে আমি ফিলিস্তিনি’, ‘আমি ফিলিস্তিনের মানুষের ভক্ত’, যুদ্ববিদ্ধস্ত দেশের পাশে দাঁড়িয়ে বলতে শোনা গিয়েছে, বিশ্ব ফুটবলের সবথেকে আকর্ষক চরিত্রকে।
২০১৮-তে মস্কোয় প্যালেস্টাইনের রাষ্ট্রপতি, মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে হাত মেলান তিনি, ও গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি তোলেন। শুধু কুস্তুরিসা বা মাহনু চাওই নন, মারাদোনা চরিত্র, তার বিদ্রোহী সত্তা, শিল্পের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল— সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বহু শিল্পীর মননকে। পাশ্চাত্যের ইন্ধনে গৃহযুদ্ধ বিধ্বস্ত সিরিয়ার শিল্পী আজিজ এসমার, ২০২০তে মারাদোনার অকাল প্রয়াণের পর শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে, ইদলিব শহরের ধ্বংসস্তুপের ওপর গ্রাফিতি করে এঁকেছিলেন ফুটবল-ঈশ্বরের পোর্ট্রেট। দারিদ্র ও মাফিয়া পিড়ীত নেপলস শহরে এক সময়ে তিনি পা রেখেছিলেন এক পরিত্রাতা হয়। তারপর ইতিহাস। যতই কোকেন কাণ্ডে অভিযুক্ত হন, নেপলসবাসীর কাছে মারাদোনা ছিলেন এক ‘বাউল-সন্ন্যাসী’। আজও শহরের পাড়ায়-পাড়ায়, গ্রাফিতিতে, স্থাপত্যে ধরা পড়ে দিয়েগোর আত্মা। কারণ আর পাঁচজন ফুটবলারের মতো মারাদোনার খেলা শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তিনি আমৃত্যু খেলেছিলেন ক্ষমতার বিন্যাসের বিরুদ্ধে। মাঠে এবং মাঠের বাইরেও।

তাই-ই হয়তো মারাদোনাকে বহিষ্কৃত হতে হয়েছিল বিশ্বকাপ থেকে। কী প্রমাণ হয়েছিল, তার থেকেও বড়, যে-প্রশ্নগুলোর আজও উত্তর পাওয়া যায়নি— ওটা কি ইচ্ছাকৃত ছিল? ওটা কি চক্রান্ত ছিল? ওটা কি অজ্ঞতাবশত হয়েছিল? এই জরুরি উত্তরগুলো আজও খোঁজেন বহু ফুটবলপ্রেমী। হয়তো এই পজিটিভ রিপোর্ট সে-যুগে নিষিদ্ধপদার্থ ও তার সম্পূরক সংক্রান্ত স্পষ্ট নির্দেশিকা না থাকার পরিনামও হতে পারে।

‘ফিফা’ বা মারাদোনা, কারও পক্ষেই যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই বিতর্কটা রয়েই গিয়েছে। কারণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ওটা শুধু একটি ডোপ টেস্ট অনুত্তীর্ণ হওয়ার বিষয় ছিল না, একজন জিনিয়াসের উত্তরণের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফুটবল ইতিহাসবিদ এদুয়ার্দো গ্যালিয়ানো ‘খেলা শেষ’ সম্পর্কে বলেছেন, সঙ্গমের পর যে একাকিত্ব গ্রাস করে, একটি ভাল খেলার অন্তিম বাঁশি বাজলে, ঠিক সেই অনুভূতি হয় দর্শকদের। দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনার বিশ্বকাপের অন্তিম মুহূর্তেও একইরকম একাকিত্ব আর শূন্যতায় ডুবে গিয়েছিলেন অগণিত ফুটবলপ্রেমী। মারাদোনা নিজেও!



