ডিসটোপিয়া : ৫
দুর্গাপুজো নিয়ে কিঞ্চিৎ চিন্তায় আছি! কিছু শব্দ কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে— এই যেমন ‘আচ্ছে দিন’ না ‘বুরে দিন’, ইউটোপিয়া না ডিসটোপিয়া? দুর্গাপুজোর মতো উৎসব তো সবার ‘আচ্ছে দিন’ হওয়ার কথা। বচ্ছরকার ওই পাঁচটা উজ্জ্বল দিন আর ঝলমলে রাত তো সবার জন্য— যে যার মতো করে পালন করে, আনন্দ করে, মেতে ওঠে। অবাধে। না, ভুল বললাম, অবাধে নয়, অবাধে বললে সেটা ইউটোপিয়া গোছের শোনায়। বিধিনিষেধ, মানে পারিবারিক চোখরাঙানি ও সামাজিক ভ্রুকুটি চিরকালই ছিল, বাড়ির অবস্থার ফারাক ছিল— সেগুলো মেনে নিয়েই পুজোর দিনগুলো দিব্যি আনন্দের ছিল, ‘আচ্ছে’ ছিল। নতুন পোশাক, রাত জেগে প্যান্ডেলে আড্ডা, দল বেঁধে ঠাকুর দেখা, চুপিসাড়ে দলছুট হওয়া, ভোগ প্রাসাদ দিয়ে শুরু করে ফুচকা-বিরিয়ানি- ষচিকেন রোল- আইসক্রিম— সব মিলিয়েই তো পুজো ।
কিন্তু কবে থেকে যেন সময়টা পাল্টে গেল— কিছু ‘বুরা আদমি’-র ‘আচ্ছা’ লাগার ঠেলায় মেয়েদের ‘আচ্ছে দিন’ পাল্টে গেল ‘বুরে দিন’-এ! ইভটিজিং হয়ে উঠল পুজোর নতুন পাসটাইম! সশব্দ বাইকবাহিনী, অভব্য আচরণ, অশ্রাব্য ভাষার লাইসেন্স! তবে অবাক কাণ্ড, এদের কিন্তু শাস্তি হয় না, শাস্তি যত মেয়েদের! পুজোয় (এবং যে কোনও উৎসবের অছিলায়) উপচে ওঠা যৌবনজলতরঙ্গ রোধ করার দায়িত্ব বর্তায় মেয়েদের ওপরেই। সমাজের মাথারা অনায়াসে নিদান হাঁকেন— রাত অবধি অত বাইরে থাকা কীসের তোমার, হ্যাঁ মেয়ে? দিনের আলো নিভলেই গোয়ালে এসে সেঁধোবে, অন্ধকারে হিংস্র জন্তু বেরয়, জানোনা? পোশাক পরবে আব্রু রেখে, লোভ দেখাবে না কাউকে, বুঝলে? তারপর ছিঁড়ে খেলে কিন্তু তোমার দোষ! অতএব পুজোয় কারফিউ! শুধু পুজো কেন, কারফিউ পুরো মেয়েবেলা জুড়েই।

আরও পড়ুন: সেই সত্য যা রচিবে তুমি! লিখছেন যশোধরা রায়চৌধুরী…
মেয়েদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা কিছু শব্দও খুব এলোমেলো ঠেকছে আজকাল। শিক্ষা-যোগ্যতা-ক্ষমতা-সম্মান -অধিকার-পরস্পর সংযুক্ত একগুচ্ছ শব্দ— প্রথমটি ছাড়া সবকটিই অর্জন করতে হয়, গ্রহণ নয়। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। এখন দেখি নারীকে অধিকার ‘দেওয়া’ হচ্ছে, সুরক্ষাও। আর সুরক্ষার অছিলায় সংরক্ষণ; যোগ্যতার পরিবর্তে লিঙ্গের ভিত্তিতে মেয়েদের অনেক কিছু ‘পাইয়ে দেওয়ার’ প্রবণতা। সুরক্ষার নাম করে তার আসন সংরক্ষণ হচ্ছে সর্বত্র— ট্রামে-বাসে, পার্লামেন্টে, এমনকী, রান্নাঘরের জ্বালানির বিলি-বন্টনেও! অথচ মেয়েদের প্রতিদিনের যাপনে, ঘরে-বাইরে যথেচ্ছ যৌন হেনস্থা, মানসিক নির্যাতন, নজরদারি, অধিকার লঙ্ঘন আজ এতটাই স্বাভাবিক, যে এসব খবর আর আলাদা করে নজর কাড়ে না। একাধারে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য ও অনুগ্রহের এই স্বাভাবিকীকরণ কী বিপর্যয় নয়? আমাদের এই সময়, এই মানসিকতা, ডিসটোপিক নয়? ডিসটোপিয়ার মজাটা বোধকরি এইখানেই— ভবিষ্যতে না পৌঁছলে বোঝা যায় না যে বর্তমান আসলে ডিসটোপিক!
সংজ্ঞা অনুযায়ী ডিসটোপিয়া সম্ভব (possible) কিন্তু সম্ভাব্য (probable) নয়, আর ইউটোপিয়া শুধুই ভবিষ্যৎ, ‘কেবলই সুখের আশ’! ডিসটোপিয়ান আখ্যান একধরনের রাজনৈতিক সতর্কীকরণ; ভুল সিদ্ধান্ত, ভুল প্রশাসন বা ভুল পরিচালনার মাশুল গোনার কাল্পনিক গল্প, যা সাধারণত শেষ হয় কোনও ভয়ংকর বিপর্যয় ও ধ্বংসে, চলতি ভাষায় ক্যাটাস্ট্রফি। সমাজবিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যায় সাধারণত ক্যাটাস্ট্রফি শুরু হয়, যখন সমাজের যে-কোনও একটি উপাদান অল্প-অল্প করে বদলাতে থাকে, আপাতদৃষ্টিতে সে বদল ধরা পড়ে না, অথচ তার চাপ সৃষ্টি হতে থাকে সবার অলক্ষে। তারপর একদিন হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে গোটা কাঠামোটাই। শুরুটা হয় কিন্তু এইভাবেই, কুশীলবদের অজ্ঞাতসারে, একটু-একটু করে অন্যায় করে, অন্যায় সহ্য করে,অন্যায় প্রশ্রয় দিয়ে। এই সব জোর করে চাপিয়ে দেওয়া শর্ত, নিয়ম, বাধা-বাঁধন; বা আরেকটু গভীরে গেলে লিঙ্গ নির্ধারণ, কন্যাভ্রুণহত্যা, শিশুকন্যা হত্যা; অথবা স্রেফ মেয়েদের প্রতি অযত্ন, অবহেলা কিন্তু অল্প অল্প করে সমাজের কাঠামোটাতে ঘুণ ধরিয়ে দিয়েছে, দিয়ে চলেছে । আমরা সব জেনেও চোখ-কান বন্ধ করে থাকি, আর বিপর্যয়ের অপেক্ষা করি।

সংকট ও বিপর্যয় নিয়ে ভাবতে গিয়ে বেশ কয়েক বছর আগে দেখা একটা সিনেমার কথা মনে হচ্ছে— ২০০৩ সালে মুক্তি পেয়েছিল এই হিন্দি ছবিটি: ‘মাত্রুভূমি— এ নেশন উইদাউট উইমেন’। নারীবর্জিত এক জাতির দেশমাতৃকা! পরিচালক মনীশ ঝা। অনামী তরুণ পরিচালকের প্রথম ছবি, অখ্যাত অভিনেতা-অভিনেত্রী, যৌন আবেদনহীন একের পর এক ধর্ষণদৃশ্য, এবং চূড়ান্ত ডিস্টোপিক। যথারীতি ছবিটা চলেনি (মনে রাখতে হবে সময়টা প্রাক ওটিটি জমানা, হলে গিয়ে হিন্দি ছবি দেখার দর্শক তখনও সুড়সুড়িবিহীন আনসেন্সরড সেক্সে অভ্যস্ত নয়)। চলেনি ঠিকই, তবে যারা দেখেছিল, তাদের নাড়িয়ে দিয়েছিল এই ছবি ।
এরও বছরদশেক আগে অমর্ত্য সেন অসম লিঙ্গ অনুপাত নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে আমাদের পরিচয় করিয়েছেন ‘মিসিং উইমেন’-দের সঙ্গে; এশিয়া ও আফ্রিকার সেই হারিয়ে যাওয়া মেয়েরা, লিঙ্গবৈষম্যের কারণে অযত্নে, অসুস্থতায় যাদের আর বেঁচে থাকাই হয় না। মনীশের ছবি যেন তার সিকুয়েল— সেখানে হারাতে হারাতে মেয়েরা স্রেফ ‘নেই’ হয়ে গেছে, তাদের আর জন্মই হয় না, মানে জন্মাতে দেওয়া হয় না! তার সঙ্গে এসেছে জাতিভেদ নামক সামাজিক ব্যাধি। এই দুই সংকটকে অসাধারণভাবে মিলিয়ে দেন মনীশ। মনীশের অস্ত্র তাঁর তীব্র, তীক্ষ্ণ বিদ্রুপ, শ্লেষ, ও অসাধারণ দৃশ্যকল্প।

ছবিটি শুরু হয় অন্ধকার এক আঁতুড়ঘরে, প্রসববেদনা ওঠে, শব্দহীন কিছু নারীমুখ ভিড় করে থাকে, বাইরে উদ্বিগ্ন পুরুষের দল, এবারেও কি তবে…? অভিজ্ঞ ধাই ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসে, মেয়ে হয়েছে। আবারও। গুঞ্জন থেমে যায়, মুখগুলো আরও কর্কশ, আরও কঠোর, আরও ভীত।
পরের দৃশ্যে ক্যামেরা ধীর লয়ে স্নিগ্ধ সবুজ পল্লিপ্রকৃতিকে ছুঁয়ে স্থির হয় দুধ ওথলানো এক বিশাল কড়াইয়ের ওপর, সদ্যোজাত কন্যাশিশুটিকে ডুবিয়ে মারা হয় টগবগ করে ফুটে চলা দুধে। উপচে পড়া দুধ, অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ, দম বন্ধ হয়ে মৃত শিশু পরপর ধরা পড়ে পর্দায়। এই ছবির পৃথিবী স্পষ্টতই দুই ভাগে বিভক্ত— মেয়েরা শিশুর জন্ম দেয়, পুরুষ তার ভাগ্য নির্ধারণ করে।
এরপর আমরা পৌঁছে যাই এক অস্পষ্ট ভবিষ্যতে— যেখানে নারী-পুরুষের বিভাজনের প্রয়োজন ফুরিয়েছে, কারণ আলাদা করার মতো কোনও নারীর অস্তিত্বই আর নেই। কাহিনির প্রেক্ষাপট পূর্ব অথবা মধ্য ভারতের গো বলয়ের এক নামহীন গ্রাম। গ্রামে যা যা থাকার সবই আছে— ঊর্বর চাষের জমি, গোলা-ভরা শস্য, গোয়ালে বাঁধা গরু, বর্ধিষ্ণু জমিদার, পঞ্চায়েত, মোসাহেব, মাস্টার, জাতপাত, জল-চলের রাজনীতি, মায় ভিডিও পার্লার পর্যন্ত। নেই শুধু কোনও ঊর্বর নারী, যে জন্ম দেবে নতুন প্রজন্মের।

ছবিটির আখ্যান আরম্ভ হয় । পাঁচ ভাই ও তাদের প্রৌঢ় পিতার শ্রীহীন সংসার— সেখানে খোঁজ চলে একটি নারীর— যে তাদের রেঁধেবেড়ে খাওয়াবে, ঘর সামলাবে, যৌনসুখ দেবে, এবং যাকে মেরে হাতের সুখ হবে অনায়াসে। তাদের গ্রামে, বা আশেপাশের কোনও গ্রামেই বিবাহযোগ্য কোনও মেয়ে নেই; তারা হন্যে হয়ে খোঁজে। এদিকে স্বাভাবিকভাবেই নারীবর্জিত গ্রামে যৌনবিকৃতি চলে যথেচ্ছ— অশ্লীল ভিডিও শো, লন্ডা নাচ, পায়ুকাম, পশুকাম …। অঞ্চলের স্বাভাবিক নিয়মেই জাতপাতের নামে চলে অত্যাচার। একটু-একটু করে কয়েকটা সামাজিক বিকৃতি ঘটে, সকলে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়।
ইতিমধ্যে গ্রামের পূজারীর নজরে পড়ে যায় দূরের এক গ্রামের এক সুন্দরী কন্যা কল্কি; তার বাবা তাকে বহু সাবধানে, সকলের চোখের আড়ালে পালন করছিলেন এতদিন। পূজারী নাছোড়বান্দা, পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ভাইটির জন্য কল্কিকে তাঁর চাই। দরদাম চলতে থাকে, নারীশরীরের দাম ওঠে নগদ এক লাখ টাকা। অবশেষে কল্কির বাবা অবশ্য এক দারুণ দাঁও মারেন— এক ভাই কেন, তিনি পাঁচ ভাইয়ের হাতেই কল্কিকে তুলে দিতে রাজি, পাঁচ লাখের বিনিময়ে। হাতবদল হয় মেয়ে, তবে পাঁচ জনের নয়, ছয় জনের সঙ্গে ক্রমান্বয়ে রাত কাটাতে হয় তাকে— শ্বশুরের দাবি সর্বাগ্রে, তিনি সকলের জন্মদাতা ও প্রতিপালক, অতএব প্রথম রাতটি তাঁর। রাতের পর রাত ধর্ষিতা হতে থাকে কল্কি, তবু এরই মধ্যে সে সহানুভূতি ও ভালবাসা পায় সবার ছোট ভাই সুরজের কাছে। অচিরেই অন্য ভাইদের হাতে খুন হয় সুরজ। ভীত, সন্ত্রস্ত কল্কি বাড়ির চাকর রঘুর সাহায্যে বাড়ি থেকে পালায়। তারা ধরা পড়ে, এবং নিচু জাতের ছেলে রঘুকে স্বাভাবিকভাবেই গুলি করে মারে উঁচু জাতের সদস্যরা। পারিবারিক কলহ এবার সামাজিক গোষ্ঠী বিবাদের রূপ নেয়, কিছু মানুষ খুন হয়, এবং সব হিংসা, সব মৃত্যুর জন্য দায়ী হয় কল্কি!

অসহায় জন্তুর মতো গোয়ালে শিকল দিয়ে বাঁধা থাকে কল্কি, শাস্তিস্বরূপ গ্রামের সব পুরুষ— ধনী, দরিদ্র, ব্রাহ্মণ, দলিত নির্বিশেষে সব জাতের, সব শ্রেণির পুরুষ— ক্রমাগত ধর্ষণ করে যায় তাকে। কল্কি সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়ে, এবং সব ধর্ষকই তার সন্তানের পিতৃত্ব দাবি করে। আবার বিবাদ ও হিংসায় মেতে ওঠে সারা গ্রাম, এদিকে গোয়ালের এককোনে, গোময় ও গোমূত্রে মাখামাখি হয়ে পড়ে থাকে কল্কি। যথাসময়ে সন্তানের জন্ম দেয় কল্কি। কন্যাসন্তান। এবার তার সাহায্যকারী বাড়ির নতুন চাকর সুখা। গ্রাম এবার প্রায় পুরুষশূন্য হয়ে পড়ে।
ভারতীয় তথা পিতৃতান্ত্রিক সমাজের বৈশিষ্ট এই নারী-পুরুষ ভেদাভেদ ও ভারসাম্যহীনতার সংকট নিয়ে বেশ কিছু ছবি হয়েছে, বর্ণ বা জাতিভিত্তিক সমস্যা নিয়েও হয়েছে, মনীশ প্রথম বা শেষ নন কোনওমতেই। কিন্তু মনীশের ছবির আখ্যান পৌঁছে যায় সংকট থেকে বিপর্যয়ে, দর্শককে টেনে নিয়ে যায় ধ্বংসের মুখোমুখি। যে বিপদসংকেতগুলো আমরা দেখেও না দেখার ভান করি, যে সংকটগুলি উপেক্ষা করি স্বাভাবিক বলে, সেগুলি যে একটু-একটু করে সমাজের মূলে গিয়ে আঘাত করে চলেছে, মনীশের ছবি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে তা দেখিয়ে দেয়। আখ্যানের নেপথ্যে চালচিত্রের মতো উঁকি মারে বীরগাথা মহাভারতের কাহিনি— যুগ-যুগ ধরে যে মহাকাব্য আমাদের বীরত্বের সংজ্ঞা, নারীর মূল্যায়ন, ও বৈষম্যের ও বিভেদের রাজনীতির পাঠ দিয়ে এসেছে, তাকে অসাধারণ ব্যবহার করেছেন মনীশ। সম্পূর্ণ নারীবর্জিত সমাজের ডিসটোপিয়া ‘মাত্রুভূমি’— মা দুর্গার আগমনের কালে মনে পড়ার মতো ছবিই বটে।



