সংবাদ মূলত কাব‍্য: পর্ব ৪৪

আলো, আগুন, অশ্রু

প্রাক্তন মুখ‍্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেনের কথা আগের পর্বে বলেছি, এবার আরেক প্রাক্তন মুখ‍্যমন্ত্রীর শেষজীবনের একটি ঘটনার কথা বলি। এ-ঘটনার খবর আমি লিখিনি বা এ-ঘটনায় আমি কোনওভাবে জড়িত ছিলাম না। তবু আমি যখন সাংবাদিকতা করেছি, তখনকার খবর। সব সংবাদপত্রে এ-খবর বের হয়েছিল, আমাদের ‘যুগান্তর’-এও। যাঁরা সে-খবর পড়েছেন বা খবরটি স্মরণে আছে, তাঁদের পুনর্বার মনে পড়বে; আর যারা পরের প্রজন্মের, তাদের জানাতেই ওই ঘটনার উল্লেখ করছি।

১৯৮৬ সালের গোড়ার দিকের ঘটনা। পার্ক স্ট্রিট দিয়ে যাওয়ার সময়ে এক পুলিশ অফিসার দেখলেন, বন্ধ একটি দোকানঘরের সিঁড়িতে এক বৃদ্ধ বসে আছেন। ময়লা পোশাক-আশাকে উদাস দৃষ্টিতে যানবাহন চলাচল দেখছেন। বৃদ্ধের মুখটি দেখে ওই পুলিশ অফিসার গাড়ি থামিয়ে দিলেন। ঠিক চিনেছেন পুলিশ অফিসারটি। ওই বৃদ্ধ অজয় মুখোপাধ‍্যায়, পশ্চিমবঙ্গের চতুর্থ মুখ‍্যমন্ত্রী। ১৯৬৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনের মুখে কংগ্রস ভেঙে বাংলা কংগ্রেস গড়েছিলেন। ভোটে জিতে বামপন্থীদের সঙ্গে জোট গড়ে যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ‍্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। পতন ঘটেছিল প্রফুল্লচন্দ্র সেনের কংগ্রেস সরকারের।

আরও পড়ুন: বৃদ্ধ প্রফুল্ল সেনকে দেখে ছেলেবেলার জমা রাগ উধাও হয়ে গেছিল!
‘সংবাদ মূলত কাব‍্য: পর্ব ৪৩’…

‘স‍্যার আপনি!’ স্যালুট ঠুকে বললেন ওই পুলিশ অফিসার। ফ‍্যাল ফ‍্যাল করে তাকিয়ে দেখলেন প্রাক্তন মুখ‍্যমন্ত্রী। তারপর মুখ ঘুরিয়ে ফের যানবাহন দেখতে লাগলেন ঘোলাটে চোখে। স্মৃতিভ্রংশ রোগে (ডিমেনশিয়া) ভুগছিলেন তিনি তখন। পুলিশ অফিসার তাঁকে গাড়িতে তুলে লালবাজার নিয়ে গেলেন। হইহই পড়ে গেল। মুখ‍্যমন্ত্রী জ‍্যোতি বসুকে জানানো হল। সিপিআই-এর নেতা বিশ্বনাথ মুখোপাধ‍্যায়, গীতা মুখোপাধ‍্যায় ছুটে এলেন। তাঁরা অজয়বাবুর ভাই ও ভ্রাতৃবধু। সব সংবাদপত্রেই লালবাজার সূত্রে পাওয়া খবরটি বের হয়েছিল। এবং কয়েক মাস পর, ওই বছরই, ১৯৮৬ সালের ২৭ মে কলকাতার এক হাসপাতালে মারা গেলেন অজয় মুখোপাধ‍্যায়।

‘৪২’ নামে একটি বাংলা চলচ্চিত্র ছিল। আমাদের বালক-কিশোরবেলায় এই ‘৪২’, ‘ক্ষুদিরাম’— এইসব ছায়াছবিগুলি সিনেমাহলগুলিতে ঘুরে-ঘুরে আসত। কোনও-কোনও ছবি একাধিকবার দেখেছি। ‘৪২’ নামের চলচ্চিত্রটিতে ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলন, মেদিনীপুরের আন্দোলনে মাতঙ্গিনী হাজরার আত্মবলিদান, সতীশ সামন্তের নেতৃত্বে স্বাধীন তাম্রলিপ্ত সরকার গঠন— এসব বিষয় ছিল। অজয় মুখোপাধ‍্যায় এই স্বাধীন তাম্রলিপ্ত সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। ব্রিটিশ পুলিশ সেনাদের প্রতিরোধে তিনি বিদ‍্যুৎবাহিনী গঠন করে ওই বাহিনীর দায়িত্ব দিয়েছিলেন তরুণ সুশীল ধাড়াকে। বিদ‍্যুৎবাহিনীর একটি নরী বাহিনীও ছিল। চোরাগোপ্তা আক্রমণে, গেরিলাযুদ্ধে ব্রিটিশ সেনা-পুলিশকে নাস্তানাবুদ করেছিল বিদ‍্যুৎবাহিনী।

১৯৬৭-র বিধানসভা ভোটের আগে কংগ্রস ভেঙে বাংলা কংগ্রেস গড়েছিলন অজয় মুখোপাধ‍্যায়। তাঁর সঙ্গী ছিলেন সুশীল ধাড়া, নলিনাক্ষ সান‍্যাল। অজয় মুখোপাধ‍্যায় যুক্তফ্রন্ট সরকারের প্রথমবার মুখ‍্যমন্ত্রী হয়েছিলেন ১৯৬৭ সালের ২৫ মার্চ। ভারতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেসের একাধিপত‍্য অবসানের সেই সূচনা। জাতীয় দলের পরিবর্তে একাধিক দল মিলে (কোনও-কোনও আঞ্চলিক দলও) জোট বেঁধে ক্ষমতাসীন হওয়ার শুরু‌ও তখন।  উল্লেখ করা যেতে পারে, পশ্চিমবঙ্গে বাংলা কংগ্রেসকে নিয়ে জোট বেঁধে বামপন্থীদের ক্ষমতায় আসার আগে কেরলে বামপন্থীরা ক্ষমতাসীন হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে অজয় মুখোপাধ‍্যায়ের যুক্তফ্রন্ট সরকারে উপ-মুখ‍্যমন্ত্রী ছিলেন সিপিআই(এম) নেতা জ‍্যোতি বসু। ওই প্রথম যুক্তফ্রন্টের সময়েই জ্বলে উঠেছিল লাল তরাই। তরুণ মনে ছড়িয়ে গিয়েছিল সমাজবদলের স্বপ্ন। ১৯৬২-’৬৩-র ভাঙনের পর আবার ভাঙনে টুকরো হয়ে গিয়েছিল সিপিআই(এম)। গঠিত হয়েছিল নকশালপন্থী রাজনীতির মার্কসবাদী-লেনিনবাদী দল সিপিআই(এমএল)। যে-দলটি ছিল সংসদীয় রাজনীতির বাইরে এক আত্মগোপনকারী দল। আমি, আমরা, ওই আলো-আগুন-অশ্রু ও ভস্মের ভিতর দিয়ে হেঁটে আসা প্রজন্ম। যে-প্রজন্মটিকে রণজিৎ দাশ আখ‍্যা দিয়েছেন ‘আহত প্রজন্ম’। দীপক রায় ও সুজিত সরকারের সুসম্পাদনায় আমাদের সত্তর দশকীয় কবিদের যে-সংকলনটি কিছুকাল আগে বের হয়েছে, সেই কবিতা সংকলনটির নাম, ‘বাংলা কবিতার: অবিনশ্বর সাতের দশক’।

১৯৬৭ সালের মার্চে ক্ষমতায় বসলেও অজয় মুখোপাধ‍্যায়ের যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ভেঙে দেওয়া হয়। রাজ‍্যপাল ধর্মবীরের অনৈতিক কাজের বিরুদ্ধে ব‍্যপক আন্দোলন হয়। অনেক ধরপাকড়। আমার মনে আছে, সংবাদপত্রে কবি সুভাষ মুখোপাধ‍্যায়ের গ্রেপ্তারবরণের ছবি দেখেছিলাম। টেনেহিঁচড়ে তাঁকে পুলিশের গাড়িতে তোলা হচ্ছে। মনে হয়েছিল সিংহের কেশরের মতো তাঁর চুল উড়ছে। সে-সময়ে কবিতা লিখেছিলেন তিনি: ‘ঘোড়াগুলি এখন বাঘের মতো খেলছে’।

১৯৬৭ সালে সরকার ভেঙে দেওয়ার পর অজয় মুখোপাধ‍্যায় আবার মুখ‍্যমন্ত্রী পদে বসেন ১৯৬৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। দ্বিতীয়বারের এই যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় ছিল ১৯৭০-এর ১৯ মার্চ পর্যন্ত। এ সবই আমার কিশোরবেলার কথা। উভয়বঙ্গে সময় তখন নাচছিল। এপারে সমাজবদলের স্বপ্ন, ওপারে মুক্তিযুদ্ধ।

অজয় মুখোপাধ‍্যায়কে বালক আমি, কিশোর আমি, দু’বার দূর থেকে দেখেছি। জনসভায়। কিন্তু চমকপ্রদভাবে সুশীল ধাড়াকে দেখেছি, দু’টি-একটি কথাও হয়েছে। ওই দুয়েক কথাও চমকপ্রদ। কিশোরকাল থেকে তাহলে ঝাঁপ দেওয়া যাক আমার কর্মরত সময়টিতে, ২০০৯-’১০ সালে। ওই সময়ে ‘আজকাল’ সংবাদপত্রটিতে কাজ করতাম আমি। মেদিনীপুরের অনুজ কবিতাপ্রয়াসী হরপ্রসাদ সাহু মহিষাদল থেকে একটি লিটিল ম‍্যাগাজিন প্রকাশ করত। আমি অনেক বছর ধরে কবিতা লেখার চেষ্টা করছি বলে হরপ্রসাদ আমাকে উৎসাহদানের এক পরিকল্পনা করে। আমার কবিতা নিয়ে বলতে কলকাতা থেকে যান কবি অমিতাভ গুপ্ত। আমি ওই অনুষ্ঠানে মহিষাদল যাই। আমি জানতাম, শতবর্ষ ছুঁই-ছুঁই বয়সে মহিষাদলেই তখন রয়েছেন তাম্রলিপ্ত সরকারের সামরিক মন্ত্রী, বিদ‍্যুৎবাহিনীর সর্বাধিনায়ক সুশীল ধাড়া।

সুশীল ধাড়া

অনুষ্ঠানশেষে হরপ্রসাদ ও তার কয়েকজন বন্ধু আমাকে সুশীল ধাড়ার বাসভবনটিতে নিয়ে যায়। মফস্‌সলের পুরনো দোতলা বাড়ি। সূর্যাস্তবেলায় বিছানায় শায়িত ছিলেন তিনি। জানালা দিয়ে অস্তসূর্যের টুকটুকে রোদ-ছড়ানো ঘরটিতে আমাদের ঢুকতে দেখে শায়িত অবস্থাতেই সুশীল ধাড়া ছটফট করতে থাকেন। হরপ্রসাদ ও তার বন্ধুরা আমাকে বলতে থাকে, অচেনা মানুষ দেখলেই উনি শত্রু ভাবেন। ভাবেন ব্রিটিশের পুলিশ তাঁকে ধরতে এসেছে! আমি তাঁকে প্রণাম করি। তারপর বার বার পরিচয় দিতে থাকি। দু’একবার বলেও ছিলাম মনে পড়ে, ‘ব্রিটিশরা আর নেই, দেশ তো স্বাধীন হয়ে গেছে! আপনিও তো যুক্তফ্রন্টে মন্ত্রী ছিলেন।’ ধীরে-ধীরে মনে হতে থাকে, আশ্বস্ত হচ্ছেন সুশীল ধাড়া। ছেলেপিলের দলই বলতে থাকে, বিদ‍্যুৎবাহিনী একশোর বেশি ব্রিটিশ পুলিশকে খতম করেছিল। শতবর্ষ ছুঁই-ছুঁই সুশীল ধাড়া শুধরে দিয়ে বলেন, ‘১১৬। মামলা দিয়েছিল।’ আমি চমকে উঠে বলি, ‘১১৬!’ সুশীল ধাড়া বলেন, ‘তারা কেউ ভালো লোক ছিল না।’ চম্বলের খুঁখার বাগী মান সিং-এর বড় ভাই নবাব সিং-ও আমাকে বলেছিলেন, যে-শতাধিক মানুষকে তিনি হত‍্যা করেছেন, ‘তারা কেউ ভাল মানুষ ছিল না।’ এরপর ২০১১ সালের মার্চে যেদিন মারা গেলেন সুশীল ধাড়া, শতবর্ষ ছুঁতে মাত্র এক মাস ক’দিন বাকি!

মহিষাদল রাজবাড়িটিও দেখেছিলাম দূর থেকে, ভেতরে ঢুকিনি। এই রাজবাড়িতেই জন্মেছিলেন কবি নিরালা, বিশিষ্ট হিন্দি কবি সূর্যকান্ত ত্রিপাঠী নিরালা। তাঁর বাবা ছিলেন মহিষাদলের রাজার সেনাপতি। মহিষাদল রাজ কলেজে পদার্থবিদ‍্যা পড়াতেন কবি সুব্রত চক্রবর্তী, পরে তিনি যান বর্ধমান কলেজে পড়াতে। ভাস্করদা, ভাস্কর চক্রবর্তীর খুব বন্ধু ছিলেন। দুজনেই অকালপ্রয়াত। ১৯৮০-তে সুব্রতদা প্রয়াত হয়েছেন, ভাস্করদাও ২০০৫-এ মারা গেছেন। মনে পড়ছে সুব্রতদার কবিতার পংক্তি— ‘আকাশ যে নীল নয়, ঘুড়ি জানে, পাখি জানে, বালক জানে না।’

হরপ্রসাদ আমকে একটি গাছের চারা দিয়েছিল, এইটুকুন ছোট্ট। সদরদরজার পাশে মাটিতে পুঁতেছিলাম। হুগলি জেলার মাটি, চর চর করে বেড়েছে। নীল-নীল ফুলে সে-গাছ ঝলমল করে।