ধর্ম, ঔদার্য, দর্শন

‘উইলসনের হোটেলে দুই বাঙ্গালী বাবু’ একদিন খেতে গেছেন। তাঁদের একজন গোমাংসের বড্ড ভক্ত। বেয়ারার কাছে একে-একে চাইতে থাকেন ‘বীল’, ‘বীফস্টিক’, ‘অকসটং’, ‘কফেস ফুটজেলি’। কিন্তু উত্তরে ফাটা রেকর্ডের মতো শোনেন একটাই কথা— ‘নহি হ‍্যায় খোদাওন্দ’। বাবুটি যারপরনাই বিরক্ত হন। কিন্তু তাঁর এই গোমাংসপ্রীতির ঠেলায় আরও বেশি বিরক্ত হন তাঁর সঙ্গী ভদ্রলোক। বেয়ারাকে সটান নির্দেশ দেন, ‘বাবুর জন‍্য গোরুর আর কিছু না থাকে তো খানিকটা গোবোর এনে দে না?’

বাঙালির বিলিতি অনুকরণপ্রিয়তা সম্পর্কে বলতে গিয়ে এমন মজার এক গল্প তাঁর ‘সেকাল আর একাল’ শীর্ষক বিখ‍্যাত রচনায় জানান রাজনারায়ণ বসু। ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় সভায় পঠিত সেই বক্তৃতা এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল, যে, খোদ রাজনারায়ণ একবার তাঁর এক বন্ধুর বাড়ির দোতলায় বসে সেই বন্ধুর নাবালক পুত্রকে নিচে বলতে শোনেন, ‘উপরে কে এয়েছে জানিস? সেকাল একাল এয়েছে।’ ঔপনিবেশিক ‘আলোকপ্রাপ্ত’ বাঙালির যে টানাপোড়েন, ‘সেকাল আর একাল’-কে বলা চলে তারই এক প্রতিচ্ছবি, হয়তো বা তা থেকে উত্তরণের দিশা খোঁজার একটি চেষ্টাও। আর এর লেখকের দ্বিশতবর্ষের জন্মদিন আজ।

আরও পড়ুন: ‘ধর্ম’ আর ‘রিলিজিয়ন’-এর পার্থক্য করতে চেয়েছিলেন বিমলকৃষ্ণ মতিলাল! লিখছেন জয়ন্ত ভট্টাচার্য…

‘গ্র‍্যাণ্ডফাদার অব ইণ্ডিয়ান ন‍্যাশনালিজম্’ অভিধা যাঁর নামের সঙ্গে একাত্ম, সেই রাজনারায়ণ বসুর লেখাপত্রে আজীবন ঘুরেফিরে এসেছে ‘স্বদেশানুরাগ’ প্রসঙ্গ। ‘মহাহিন্দু সমিতি’ গঠনের ভাবনা কিংবা হিন্দুমেলা আয়োজনে ‘ন‍্যাশনাল’ নবগোপাল মিত্রর অনুপ্রেরণা, ভারতীয় জাতীয়তাবাদের এই পিতামহ আজকের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিরও পুরোধা ছিলেন কি? হিন্দু কলেজে পড়ার সময় আর পাঁচজনের মতো ‘নিষিদ্ধ মাংস’ ভক্ষণে তিনিও বেশ উৎসাহীই ছিলেন। তাঁর ‘আত্মচরিত’ পড়লেই জানা যাবে সেই গল্প। ডিরোজিওর প্রত‍্যক্ষ ছাত্র না হলেও, পূর্বসূরি ইয়ং বেঙ্গলদের আদর্শে অনুপ্রাণিত— মাইকেল মধুসূদন দত্তের এই সহপাঠী, সমমনস্ক ইয়ারদোস্তদের সঙ্গে গোলদীঘিতে কাবাব সহযোগে ‘জলস্পর্শশূন‍্য ব্র‍্যাণ্ডি খাওয়া’-র অভ‍্যেসকে ‘সভ‍্যতা ও সমাজ-সংস্কারের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শক কার্য’ বলেই মনে করতেন ছাত্রবয়সে। কিন্তু পরিণত বয়সে তিনি মনে করলেন, আমাদের এই নাতিশীতোষ্ণ দেশে ‘উষ্ণবীর্য’ গরুর মাংস খাওয়া শুধু যে শরীরের জন‍্য ক্ষতিকর, তাই নয়, মুষ্টিমেয় বাঙালির সঙ্গে ইংরেজ রাজপুরুষগণ ও মুসলমানেরা ‘গরু খাইয়া উজাড় করিয়া ফেলিলেন, এই জন‍্য দুগ্ধ মহার্ঘ‍্য হইয়া উঠিতেছে।’

১৮৮২ সালে, জীবনের উপান্তে তিনি লিখলেন ‘আশ্চর্য‍্য স্বপ্ন’ নামে ছোট্ট একটি লেখা। সেই স্বপ্নে দেখা গেল, ‘বঙ্গদেশ স্বাধীন হইয়াছে ও ইংরাজেরা তথা হইতে চলিয়া গিয়াছেন।’ ইংল‍্যান্ডের দখল নিয়েছে বাঙালি, আর-একজন বাঙালি ভাইসরয়ের অধীনে রয়েছেন আপামর বিলেতবাসী। সুসভ‍্য বাঙালির অনুকরণে সে-দেশে গোহত‍্যা রীতিমতো কড়া আইন করে বন্ধ করা হয়েছে। চল হয়েছে কেবল মাছ ও পাঁঠার মাংস খাওয়ার। ভারতে না-হয় গোমাংস আবহাওয়ার কারণে হজম হয় না, কিন্তু ইংল‍্যান্ডে জলহাওয়ায় তো তেমন ঝামেলা নেই। ফলে, গোমাংস বন্ধের এই স্বপ্ন নেহাত গরুর দুধের আকাল বা শারীরিক চিন্তাজনিতই যে কেবল নয়, এর সঙ্গে বিলক্ষণ জড়িয়ে রাজনারায়ণের ধর্মচিন্তাও, সে কি আর বলার অপেক্ষা রাখে!

তা কেমন ছিল সেই ধর্মচিন্তা? দুশো বছরের জন্মদিনে আসুন একবার ফিরে দেখা যাক।

রাজনারায়ণ বসু

‘হিন্দু কলেজে পড়িবার সময় আমার ধর্ম্মমতে পর পর কতকগুলি পরিবর্ত্তন হয়, কিন্তু উনিশ বৎসরের সময় পরম শ্রদ্ধাস্পদ শ্রীযুক্ত বাবু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের সঙ্গে আলাপ হইলে যে আদি ব্রাহ্মসমাজের ব্রাহ্ম হই, তাহা এখনও আছি।’

নিজের ‘আত্মচরিত’-এ ‘শৈশব ও তাৎকালিক শিক্ষা’ অধ‍্যায়ে ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণের এই সাক্ষ‍্য দিয়েছেন খোদ রাজনারায়ণ বসু। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের অত‍্যন্ত স্নেহের পাত্র রাজনারায়ণের ব্রাহ্ম হয়ে ওঠার পথে ‘ধর্ম্মমতে পর পর কতকগুলি পরিবর্ত্তন’ আদতে কীরকম? উত্তর মিলবে তাঁরই জবানিতে।

তিনি যখন হেয়ার স্কুলের ছাত্র, তখন ‘Cyrus’s Travels by Chevalier Ramsay’ পড়ে ‘প্রচলিত হিন্দুধর্ম্মে’ তাঁর ‘বিশ্বাস বিচলিত হয়’। “তৎপরে রামমোহন রায়ের ‘Appeal to the Christian public in favour of the Precepts of Jesus’ এবং চ‍্যানিঙ্গের গ্রন্থ পাঠ করিয়া ইউনিটেরিয়ান খ্রিস্টীয়ান হই, তৎপরে ঈষৎ মুসলমান হই, পরিশেষে কলেজ ছাড়িবার অব‍্যবহিত পূর্ব্বে হিউম পড়িয়া সংশয়বাদী হই।’ এহেন বিচিত্র ধর্মবোধ সম্ভবত গোটা ব্রাহ্মধর্মের ইতিহাসেই বেশ অভিনব। তিনি ‘বেদান্তধর্ম্মাবলম্বী’ পিতার সন্তান। হিন্দু কলেজে ‘হিউম পড়িয়া সংশয়বাদী’; অকৃত্রিম অনুরাগী রাজা রামমোহন রায়ের, এতটাই— যে ছাত্রবয়েসেই, রামমোহনের ওপর বই লেখার কাজে, প‍্যারীচাঁদ মিত্রের ভাই কিশোরীচাঁদ মিত্রকে প্রভূত সাহায‍্য করেছেন।

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের প্রভাবে আমৃত‍্যু ‘ব্রহ্মতত্ত্বাচার্য’ রাজনারায়ণ, যিনি কিনা আবার জীবনের প্রায় সিংহভাগ জুড়ে তৎপর ছিলেন ‘হিন্দুধর্ম্মের শ্রেষ্ঠতা’ প্রমাণের কাজে— তাঁর ‘ঈষৎ মুসলমান’ হওয়ার বিষয়টি কেমন? রাজনারায়ণের সহপাঠী, পরবর্তীতে জাঁদরেল ব‍্যারিস্টার জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুরের ছিল ‘Trinitarian Christianity’-র প্রতি ঝোঁক। ব‍্যাপারটা রাজনারায়ণের কাছে ‘বিষদৃষ্টির বিষয় ছিল’। জ্ঞানেন্দ্রমোহন তাঁর ধর্মভাবনার কথা বন্ধুমহলে আলোচনা করলেই রাজনারায়ণ ইসলামের সাক্ষ‍্য হাজির করে তার জবাব দিতেন। ইসলাম ধর্মের প্রতি ব‍্যক্ত করতেন একধরনের ছদ্ম-অনুরাগ। এভাবে চলতে-চলতে একদিন রীতিমতো হাতে লেখা প্রচারপত্র বিলি করে এমনটাও ঘোষণা করা হয় যে, কলেজ স্ট্রিটের মসজিদে রাজনারায়ণ নাকি অমুক দিন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করবেন। হিন্দু কলেজের ছাত্ররা শুরুতে বেশ মেতে উঠেছিল। ক্রমে তারা টের পায়, পুরোটাই আসলে নির্ভেজাল একটি মজা, ফলে মসজিদে লোকসমাগম আর হয়নি। ‘আত্মচরিত’-এ রাজনারায়ণ কিন্তু নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন, ‘ধর্ম্ম লইয়া এরূপ উপহাস’ একেবারেই সমর্থনযোগ‍্য নয়। কিন্তু এই চক্করে রাজনারায়ণ সেইসময় বেশ কিছু ইসলামি ধর্মগ্রন্থ পড়েন। ইংরেজির পাশাপাশি তাঁর ফার্সির জ্ঞানও এ-ব‍্যাপারে সহায় হয়। এবং, ‘আত্মচরিত’-এ তিনি এও জানান যে, ‘এই করিতে করিতে যথার্থই মুসলমান ধর্ম্মের প্রতি আমার একটু শ্রদ্ধা জন্মিয়াছিল।’

১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে বই হয়ে বেরয় রাজনারায়ণের বিখ‍্যাত বক্তৃতা ‘হিন্দুধর্ম্মের শ্রেষ্ঠতা’। ব্রাহ্ম নেতা রাজনারায়ণ সেখানে স্পষ্ট জানান, ‘হিন্দুধর্ম্ম ক্রমে ক্রমে উন্নত হইয়া ব্রাহ্মধর্ম্মে পরিণত হইয়াছে।… এমন এক আকার ধারণ করিয়াছে যাহা সম্পূর্ণ রূপে বিশ্বজনীন।’ এই বক্তৃতার প্রতিক্রিয়ায় ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকা মন্তব‍্য করে, ‘হিন্দুধর্ম্ম ডুবিতেছিল, রাজনারায়ণবাবু তাহা রক্ষা করিলেন।’ প্রখ‍্যাত হিন্দু-তাত্ত্বিক, হিন্দু কলেজে রাজনারায়ণের সহপাঠী ভূদেব মুখোপাধ‍্যায় নিজেকে ‘রাজনারায়ণের গোঁড়া’ অনুরাগী ঘোষণা করলেন। কলকাতার সনাতন ধর্মরক্ষিণী সভা ও সিমলা পাহাড়ের এক সাকারবাদী বাঙালি সভা একযোগে রাজনারায়ণকে ‘হিন্দুকুলচূড়ামণি’ আখ‍্যা দিয়ে আয়োজন করলো তাঁর সংবর্ধনা সভা। অসমের ব্রাহ্ম ধর্ম প্রচারক পদ্মহাস গোস্বামী ‘কলির ব‍্যাসদেব’ অভিধায় ভূষিত করলেন তাঁকে। এমনকী, এক বঙ্গদেশীয় সাকারবাদী হিন্দু সংগঠনের নেতা শিবচন্দ্র গুহ তাঁর আবক্ষ মূর্তি অবধি বসাতে উদ‍্যত হলেন। কিন্তু বিচক্ষণ রাজনারায়ণ এইসব অনুরোধ সবিনয়ে এড়িয়ে গেলেন। ‘অপৌত্তলিক ও নিরাকার হিন্দুধর্ম্মের’ প্রচারক হয়ে তিনি কীভাবেই বা এইসব আয়োজনে সায় দিতেন! এর প্রায় দু’দশক বাদেও, ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে রমেশচন্দ্র দত্তকে এক চিঠিতে তিনি দ্ব‍্যর্থহীন ভাষায় ব্রাহ্মধর্মকে ‘the highest developed form of Hinduism’ হিসেবে অভিহিত করেন।

ব্রাহ্মসমাজের অন্দরে আবার এই নিয়ে ছিল মিশ্র প্রতিক্রিয়া। স্বভাবতই ‘খৃষ্টবাদী ব্রাহ্মধর্মের প্রচারক’ ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজের তরফে ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র সেন ও আচার্য শিবনাথ শাস্ত্রী রাজনারায়ণের এই অবস্থান মেনে নেননি। আবার, সেই সময়ের তরুণ তুর্কি ব্রাহ্ম নেতা দ্বারকানাথ গাঙ্গুলির সোচ্চার সমর্থন লাভ করেন তিনি। বাঙালি খ্রিস্টানদের মধ‍্যে রেভারেন্ড লালবিহারী দে রাজনারায়ণের বিরোধিতা করলেও, রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন দে তাঁর ভাবনার সঙ্গে অনেকাংশে সহমত পোষণ করেন। এই পক্ষ-বিপক্ষের মতামত একটু খতিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, পূর্বোক্ত ওই ‘আলোকপ্রাপ্ত’ উনিশ শতকীয় দোলাচলের এ এক চমৎকার নজির।

‘হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠতা’ বিচারে রাজনারায়ণের অবস্থানও এই দোলাচলের বাইরে তো আদতে নয়। ‘বৈদিক ধর্ম্মের ন‍্যায় পুরাতন ধর্ম্ম’ যে ‘আর কোন দেশে আর কোন জাতিতে নাই’— এমন দাবি বেশ জোর গলায় করলেও, ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে ‘তত্ত্ববোধিনী’-র পাতায় ‘ভারতের প্রাচীন কীর্ত্তি’ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে যখন তিনি বলেন, ‘ভারতবর্ষের প্রাচীন মহিমা আলোচনা করিতে বিলক্ষণ সুখ আছে বটে, কিন্তু কোন্ কালে আমরা ঘৃত ভক্ষণ করিয়াছি, এক্ষণে সর্ব্বদা হস্ত আঘ্রাণ করিলে কি হইবে? এক্ষণে কাজ চাই।’— তখন বুঝতে পারি, নেহাত অতীতচারী গৌরবগাথার কল্পলোকের বাসিন্দা তো তিনি ছিলেন না। উপরন্তু, আজকের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সাম্প্রতিক পূর্বজদের সঙ্গে তাঁর মূলগত একটি ফারাক হল, তিনি ইসলাম বিদ্বেষকে, কথায় ও কাজে, খুব একটা প্রশ্রয় দেননি। বরং তাঁর ভাবনায় দেখা মেলে একধরনের ইনক্লুসিভনেসের। ‘একদেশবাসী’ ও ‘এক রাজার অধীন’ মুসলিমদের ‘সহিত অন‍্য ঐক‍্য না হউক রাজনৈতিক ঐক‍্য অবশ‍্য সাধিত হইতে পারে।’— এমনটা তাঁর মত ছিল। এমনকী, আরও একটু এগিয়ে হিন্দুদের সঙ্গে ‘মুসলিম ভ্রাতাদিগের ধর্ম্ম বিষয়েও একপ্রকার ঐক‍্য’সাধনে আগ্রহী ছিলেন রাজনারায়ণ। রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের ‘কারাগার গমন উপলক্ষ‍ে জজ্ নারিস কর্ত্তৃক শালগ্রাম শিলার অবমাননা লইয়া যে মহা আন্দোলন উপস্থিত হয় তাহাতে উক্ত অবমাননার কার্য‍্য দ্বারা এতদ্দেশীয় লোকের ধর্ম্মসম্বন্ধীয় স্বত্ব ও অধিকার আক্রমণ করা হইয়াছে মনে করিয়া তাহার প্রতিবাদার্থ মুসলমানেরা হিন্দুদের সহিত এক হইয়াছিলেন।’— এই উদাহরণ তিনি হাজির করলেন ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে ‘নবজীবন’-এর পাতায় ‘মহাহিন্দু সমিতি’-র প্রস্তাব পেশ করার সময়।

এর প্রায় বছর কুড়ি আগে, ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে রাজনারায়ণ মেদিনীপুরে স্থাপন করেন ‘জাতীয় গৌরবসম্পাদনী সভা’। ‘নব‍্য-সম্প্রদায় প্রাচীন রীতি-পদ্ধতিতে বীতরাগ হইয়া’ সমাজসংস্কারের যে ধুয়ো তুলেছিলেন, তাতে বাঙালি ‘পূর্ব্বপুরুষদিগের নিকট হইতে যে সকল সুরীতি ও সুনীতি লাভ করিয়াছি’ তাও পাছে এই পরিবর্তনের স্রোতে ভেসে গিয়ে ‘ভয়ঙ্কর অমঙ্গল’ না ডেকে আনে, রাজনারায়ণের এমন আশঙ্কাই এই উদ‍্যোগের নেপথ্যে কার্যকর ছিল। এই সভার কার্যবিবরণ থেকেই তৈরি হয় তাঁর অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ, ‘বামাবোধিনী’ সম্পাদক উমেশচন্দ্র দত্তের অনুবাদে যার শিরোনাম ‘শিক্ষিত বঙ্গবাসীগণের মধ‍্যে জাতীয় গৌরবেচ্ছা সঞ্চারিণী সভা সংস্থাপনের প্রস্তাব’। এই প্রস্তাব অনুসারে, গৌরবেচ্ছা সঞ্চারিণী সভা বাংলার বিভিন্ন স্থানে ব‍্যায়ামাগার নির্মাণে উদ‍্যোগী হবে। এছাড়া, ‘হিন্দু তৌর্য‍্যাত্রিক বিদ‍্যাশিক্ষার্থ একটি আদর্শ বিদ‍্যালয় সংস্থাপন’ করে দেশীয় ও ইউরোপীয় সংগীতশিক্ষার বন্দোবস্তও করবে। ‘ভারতবর্ষের পুরাবৃত্ত বিষয়ে ইউরোপীয় সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতদিগের অনুসন্ধানলব্ধ সত‍্যসকল বাঙ্গালা ভাষায়’ প্রচার করার পাশাপাশি ‘বঙ্গদেশীয় আসিয়াটিক সোসাইটী’-র সহযোগিতায় যত দূর সম্ভব সংস্কৃত শিক্ষা প্রসারেও উৎসাহ দেবে এই সভা। একইসঙ্গে, ‘একটি হিন্দু চিকিৎসা বিদ‍্যালয়’-ও স্থাপন করবে, যেখানে মূলত ‘ভারতবর্ষ জাত ভৈষজ‍্য দ্রব‍্যের গুণ ও ভেষজ প্রস্তুতকরণ বিদ‍্যা অধীত হইবে।’

এবার, এমন ‘ঈষৎ মুসলমান’, ‘হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠতা’ প্রমাণে চিরতৎপর ‘বৃদ্ধ হিন্দু’-কে আমরা একরৈখিকভাবে আজকের হিন্দুত্ববাদীদের অগ্রদূত বলতে পারি কি? বীর সাভারকর থেকে মোহন ভাগবতের হিন্দুত্ববাদী ভাবনা কিংবা কার্যপ্রণালীর সঙ্গে মিলিয়ে কালের বিচারে একটি উল্টো রেখা টানলেই যে তা সোজা রাজনারায়ণে গিয়ে উপনীত হবে, এমনটা কোনওভাবেই না। ‘মহাহিন্দু সমিতি’-র প্রস্তাবে তিনি ধর্মস্থান নির্মাণ কিংবা ভিনধর্মীর ধর্মাচারের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের কথা বলেননি, রেখেছেন বিদ‍্যালয় ও চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপনের সদর্থক উদ‍্যোগের প্রস্তাব। এমন খাপছাড়া ব্রাহ্ম-হিন্দু সমাজ-সংস্কারককে হজম করতে পারবেন তো আজকের হিন্দুত্ববাদীরা?

‘আমার প্রকৃত ধর্ম্মজীবন ইং ১৮৬০ সাল হইতে মদ‍্যপান পরিত‍্যাগের সহিত আরম্ভ হয়।’— ‘আত্মচরিত’-এর শুরুতেই জানিয়েছেন রাজনারায়ণ। সংস্কৃত কলেজ থেকে বদলি হয়ে তখন তিনি মেদিনীপুরে জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে জনসাধারণের মধ‍্যে মদ‍্যপানের প্রতি আসক্তি এই সময় প্রায় এক মহামারীর আকার নিয়েছিল। ছাত্রবয়স থেকে রাজনারায়ণও শামিল ছিলেন সেই প্রবণতায়, সে-কথা আগেই বলেছি। এরই পরিণামে এক ‘উৎকট পীড়া’-য় আক্রান্ত হয়ে মাঝপথেই হিন্দু কলেজের পাঠ চুকোতে হয় তাঁকে। কিন্তু সেই অসুস্থতাও তাঁর মদ‍্যপানের অভ‍্যেসে লাগাম টানতে পারেনি। মেদিনীপুরে প্রায় এক দশক হেডমাস্টারের দায়িত্ব পালনের পর পরিপার্শ্ব ও নিজের অভিজ্ঞতার সূত্রেই তিনি উঠে-পড়ে লাগেন সুরাপান নিবারণের সামাজিক দায়িত্ব পালনে। দীনবন্ধু মিত্র ‘সধবার একাদশী’-তে লিখেছিলেন নিমচাঁদের কথা। মহানট গিরিশ ঘোষের অভিনয়ে অমর সেই চরিত্রও ছিলেন হিন্দু কলেজের কৃতী ছাত্র, মদের নেশা যার সমস্ত সম্ভাবনা নষ্ট করে দেয়। নাটকের একস্থলে আত্মবিলাপের ঢঙে তাঁকে বলতে শুনি, ‘তুমি হিন্দু কলেজ থেকে বেরোলে একজন ভগবান, তারপর হয়েছ এক ভূত।’ এই পরিস্থিতিতে ১৮৬১-তে রাজনারায়ণের ‘সুরাপান নিবারিণী সভা’ প্রতিষ্ঠা যে কতটা তাৎপর্যপূর্ণ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ইংরেজি ফার্স্টবুক রচয়িতা— তাঁর সহাধ‍্যায়ী— প‍্যারীচরণ সরকারের প্রসিদ্ধ ‘বঙ্গীয় মাদকনিবারিণী সমাজ’ প্রতিষ্ঠারও বছর দুই-তিন আগে মূলত শহরতলিকেন্দ্রিক এই উদ‍্যোগকে রাজনারায়ণ ‘বঙ্গদেশে প্রথম সংস্থাপিত সুরাপান নিবারিণী সভা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তাঁর ‘আত্মচরিত’-এ। সেই সময় মেদিনীপুর-সহ কয়েকটি জেলার স্কুল ইনস্পেক্টর ছিলেন এইচ এল হ্যারিসন। এহেন উদ‍্যোগে বিরক্ত আশপাশের মাতালরা, এর বিহিত চেয়ে, তাঁকে রীতিমতো একটি চিঠি লিখে ‘Fanatic’ রাজনারায়ণের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। যদিও মাতালদের ধার করা ইংরেজি-জ্ঞান আর নেশার আতিশয‍্যে চিঠিতে ‘Fanatic’ হয়ে যায় ‘Frantic’। হ‍্যারিসন সাহেব এই চিঠিকে বিশেষ পাত্তা দেননি, কিন্তু রাজনারায়ণকে নিরন্তর হুমকি আর অসহযোগিতা সহ‍্য করতে হয়েছিল। আর তা পরিমাণে এতটাই, যে প্রৌঢ় রাজনারায়ণ স্বীকার করেছেন, এই সভা পরিচালনা করতে গিয়ে যত বাধার সম্মুখীন তাঁকে হতে হয়েছিল, ব্রাহ্ম ধর্ম প্রচারের জন‍্যও তা সইতে হয়নি।

সভা-সমিতির প্রসঙ্গই যখন এল, তখন আরেকটি সভার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। ‘হা ম্ চূ পা মূ হা ফ’। এমন বিচিত্র নাম আদতে সেই সভার নিজস্ব সাংকেতিক ভাষায় লেখা, যার মর্মোদ্ধার করলে দাঁড়ায় সঞ্জীবনী সভা। ম‍্যাৎসিনীর কার্বোনারি গুপ্ত সমিতির আদলে তৈরি এই ‘হামচূপামূহাফ’ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘স্বাদেশিকের সভা’। ‘জীবনস্মৃতি’-তে এটির অনবদ‍্য বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। উত্তর কলকাতার ঠনঠনিয়া অঞ্চলের কোনও এক পোড়ো বাড়িতে এই সভার গোপন অধিবেশন বসত। আদ‍্যন্ত মন্ত্রগুপ্তি আর রহস‍্যে ভরা এর কাজকর্মের মধ‍্যে, ‘ঐ গোপনীয়তাটাই একমাত্র ভয়ঙ্কর ছিল।… দ্বার আমাদের রুদ্ধ, ঘর আমাদের অন্ধকার, দীক্ষা আমাদের ঋকমন্ত্রে, কথা আমাদের চুপিচুপি— ইহাতেই সকলের রোমহর্ষণ হইত, আর বেশি কিছুই প্রয়োজন ছিল না।’ এই সভার কার্যবিবরণীও লেখা হত গোপন ও দুর্বোধ‍্য এক অক্ষরবিধিতে। দেশীয় দেশলাই বাক্স থেকে শুরু করে স্বদেশি গামছা ও সাবান তৈরির একাধিক ব‍্যর্থ প্রচেষ্টার মধ‍্যে এই সভার একটি উল্লেখযোগ‍্য আয়োজন ছিল জাতিবর্ণ নির্বিশেষে ‘একত্র পংক্তিভোজন’। সঞ্জীবনী সভার সভাপতির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন রাজনারায়ণ। যদিও এর উপযোগিতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের স্মিত মূল‍্যায়ন, এর মাধ‍্যমে ‘ফোর্ট উইলিয়মের একটি ইষ্টকও খসে নাই’, কিন্তু আক্ষরিক অর্থেই হাঁটুর বয়সিদের এই উদ‍্যোগে পোড় খাওয়া সভাপতির নিরলস উৎসাহ ছিল দেখার মতো।

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর

সভার মুখ‍্য উদ‍্যোক্তা জ‍্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের বর্ণনা থেকে এই সভার দীক্ষানুষ্ঠানের গা-ছমছমে ভাবগাম্ভীর্য সম্পর্কে জানা যায়। লাল পট্টবস্ত্র পরিহিত বৃদ্ধ রাজনারায়ণের সামনে বেদমন্ত্র উচ্চারণ করে বেদ ছুঁয়ে দেশসেবার প্রতিজ্ঞা করতেন কোনও যুবক। টেবিলের দু’পাশে রাখা ‘মড়ার খুলি’ ছিল মুমূর্ষু দেশের প্রতীক, আর তার চোখের কোটরে বসানো জ্বলন্ত মোমবাতির সংকেতে ছিল উত্তরণের বার্তা।

এই ‘খুলি’ প্রসঙ্গেই একটি বিশেষ প্রসঙ্গ মনে পড়ে। রবীন্দ্রনাথের জ‍্যোতিদাদার আবার ছিল ফ্রেনলজিচর্চার শখ। তাঁর নিজের তৈরি পরিভাষায়, শিরোমিতি-বিদ‍্যা। সহজ কথায়, মানুষের মাথার খুলি ও সংলগ্ন মুখমণ্ডলের গড়ন বিচার করে তাঁর চরিত্রবৈশিষ্ট‍্য সম্পর্কে ধারণা করার চেষ্টা। ঠাকুরবাড়ির সদস‍্যদের পাশাপাশি নামী-অনামী অজস্র মানুষের মাথার গঠন বিশ্লেষণ করেছিলেন তিনি। আর, সেই তালিকাতেও যথারীতি উপস্থিত রাজনারায়ণ। ১৮৮৬ সাল নাগাদ ‘বালক’ পত্রিকায় ‘মুখ-চেনা’ নামে এই সংক্রান্ত একটি প্রবন্ধে রাজনারায়ণের কেস স্টাডিতে জ‍্যোতিরিন্দ্রনাথ লেখেন, ‘রাজনারায়ণ বাবুর উপরিভাগের কপাল নিম্নভাগের কপাল অপেক্ষা বেশি ভরাট। এই জন‍্য বিজ্ঞান অপেক্ষা তত্ত্বজ্ঞানের দিকে রাজনারায়ণ বাবুর বেশি ঝোঁক।’ তাঁর ‘দার্শনিক গ্রন্থ ধর্ম্মতত্ত্বদীপিকা’— জ‍্যোতি ঠাকুরের মতে, এরই ফল। ‘মধ‍্য-কপালও ভরাভরা’ হবার দরুণই নাকি অসামান‍্য তাঁর স্মৃতিশক্তি। কিন্তু ওপর ও নিচের দিককার কপালের গড়নে খানিক অসংগতি থাকায় ‘তাঁহার নানাপ্রকার মৎলব (Plan) মাথায় আইসে’, কিন্তু ‘এক এক সময় সে সব মৎলব অনেকটা আসমান-বিলাসী ও সৃষ্টিছাড়া হইয়া পড়ে।’

তা ‘আসমান-বিলাসী ও সৃষ্টিছাড়া’ তো তিনি ছিলেনই। নইলে কেনই বা সিপাহী বিদ্রোহের বছরে পরিবার ও প্রতিবেশীদের তুমুল বিরোধিতা ও কার্যত প্রাণসংশয় উপেক্ষা করে জাঠতুতো ভাই দুর্গানারায়ণ ও সহোদর মদনমোহনের সঙ্গে দু’জন বিধবার বিয়ে সম্পন্ন করবেন! কেনই বা একদা কর্মস্থল মেদিনীপুরে শ্রমজীবী বিদ‍্যালয় স্থাপনের পাশাপাশি একাধিক স্ত্রী-শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপনের উদ‍্যোগ নিয়ে সওয়াল করবেন ‘বৈধ স্ত্রী স্বাধীনতা’-র পক্ষে? ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে তাঁর কন‍্যা লীলাবতীর সঙ্গে বিপ্লবী কৃষ্ণকমল মিত্রের ‘অসবর্ণ’ বিবাহে তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। এই বিবাহ উপলক্ষে গান বেঁধেছিলেন তরুণ রবীন্দ্রনাথ, আসরে উপস্থিত থেকে গান শুনিয়েছিলেন সিমলেপাড়ার নরেন দত্ত। কিন্তু দেবেন্দ্র-অনুরাগী রাজনারায়ণ যে অসবর্ণ বিবাহ-সংক্রান্ত আইনকে কেন্দ্র করে হিন্দু রীতির নিজস্ব পরিসরে বিলিতি হস্তক্ষেপ মেনে নিতে পারেননি। তিনি কীভাবেই বা সেই বিয়েতে অংশ নেন, হলই বা তা তাঁর নিজ কন‍্যার বিবাহবাসর।

জাতীয় একতার আমৃত‍্যু অনুসন্ধানী রাজনারায়ণের চিন্তার অন‍্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ছিল ‘স্বদেশানুরাগ’। আর এই স্বদেশানুরাগেরই অন‍্যতম জরুরি দিক ‘স্বদেশীয় ভাষানুশীলন’ প্রসঙ্গে তাঁর অবস্থান। তাঁর খেদ ছিল যে, ‘আমাদিগের দেশের অনেক স্বদেশানুরাগী ব‍্যক্তি সামান‍্য পত্র ইংরাজীতে লিখেন এবং বাঙ্গালীর সভাতে ইংরেজী ভাষায় বক্তৃতা করেন।’

হিন্দু কলেজের ইংরেজি সাহিত‍্যের প্রবাদপ্রতিম শিক্ষক ক‍্যাপ্টেন রিচার্ডসনের প্রত‍্যক্ষ ছাত্র ছিলেন রাজনারায়ণ। ইংরেজি ভাষায় তাঁর দখল দেখে স্বয়ং মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর আদর করে তাঁকে ডাকতেন ‘ইংরেজী খাঁ’। এহেন ‘রাজনারায়ণ বাবুর বাঙ্গালা সাহিত‍্যের প্রতি অনুরাগ’, রবীন্দ্রনাথের কাছে, ‘অতি আশ্চর্য‍্যের বিষয়’ ছিল। কারণ তিনি ‘ইংরেজী ভাষায় সুপণ্ডিত, ঐ ভাষাতেই চিরদিন ভাবপ্রকাশে অভ‍্যস্ত। অথচ তিনি বাঙ্গালা সাহিত‍্যের সেবায় আত্মশক্তি নিয়োগ করেন।’ বাংলা সাহিত‍্যের উন্নতিবিধান যে আদতে বাঙালি জাতিরই উন্নতির পথে একটি জরুরি পদক্ষেপ, এ-কথা রাজনারায়ণ বুঝেছিলেন বলেই রবীন্দ্রনাথের অনুমান। পূর্বোক্ত ‘জাতীয় গৌরবসম্পাদনী সভা’-র অন‍্যতম লক্ষ‍্য ছিল, ইংরেজি-বাংলার মিশ্র-খিচুড়ি রূপের পরিবর্তে বিশুদ্ধ বাংলা ব‍্যবহার। গুড নাইট-এর পরিবর্তে ‘সুরজনী’-র মতো মিষ্টি পরিভাষার প্রচলন চেয়েছিলেন তিনি। ইচ্ছাকৃত বা অসাবধানতাবশত, যাই-ই হোক না কেন, বাংলা বলতে গিয়ে ইংরেজি শব্দ ব‍্যবহার করলে ওই সভার সদস‍্যদের রীতিমতো জরিমানা দিতে হত। যদিও ‘বাঙ্গালা ভাষার শব্দের অনটন’ বিষয়ে ওয়াকিবহাল ছিলেন তিনি, আর তাই যেসব ফার্সি বা ইংরেজি শব্দ বাংলার দৈনন্দিন শব্দভাণ্ডারের সঙ্গে ওতপ্রোত হয়ে গিয়েছে, তাদের ব‍্যবহারে কোনও ছুঁৎমার্গ রাখতে চাননি। ‘The Bengal Academy of Literature’-এর প্রাথমিক বঙ্গীকরণ রাজনারায়ণের হাতেই হয়েছিল ‘বঙ্গ সাহিত‍্য পরিষৎ’, বাঙালির সারস্বত চর্চার অন‍্যতম স্তম্ভ হিসেবে আজ আমরা যাকে ‘বঙ্গীয় সাহিত‍্য পরিষৎ’ হিসেবে চিনি।

রাজনারায়ণের সাহিত‍্যবোধের প্রতি অগাধ আস্থা ছিল সহপাঠী মাইকেল মধুসূদন দত্তের। ‘ইন্ডিয়ান ফিল্ড’-এর পাতায় রাজনারায়ণের করা ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব‍্য’-র সমালোচনা পড়ে আপ্লুত হয়েছিলেন মাইকেল। ‘মেঘনাদবধ কাব‍্য’ প্রায় প্রতিটি সর্গ শেষ করেই পাঠিয়ে দিতেন ‘Old Gentleman’ রাজনারায়ণকে, সাগ্রহে অপেক্ষা করতেন তাঁর মতামতের। দুই বন্ধুর পরস্পরকে লেখা অজস্র চিঠির মূল আলোচ‍্য ছিল দেশ-বিদেশের সাহিত‍্য; এই পত্রসম্ভার মাইকেলের পরিক্রমা বুঝতে অপরিহার্য। বস্তুত, বাঙালির বৌদ্ধিক ইতিহাসেরই অত‍্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রাজনারায়ণের পত্রাবলি, সাংস্কৃতিক শিকড়সঞ্চারী জাতীয়তাবাদ থেকে রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদের পথে যাত্রার একটি জরুরি সূত্র যার অভাবে অজ্ঞাত থেকে যেতে পারে। ‘মেঘনাদবধ…’-এর সমালোচনায় তিনি কিন্তু বিন্দুমাত্র রেয়াত করেননি নিজের কবি বন্ধুকে। এই প্রসঙ্গে তাঁর মূল অভিযোগ, মাইকেল তাঁর রচনাকে ‘হিন্দু পরিচ্ছদ’ পরালেও, সেসবের ‘নিম্ন হইতে কোট পান্টলুন’ দেখা যায়। অর্থাৎ, এক্ষেত্রেও তাঁর মূল হাতিয়ার ছিল এই মহাকাব‍্যে ‘বিজাতীয় ভাবের’ আধিক‍্য। এর বিবিধ দোষের মধ‍্যে তিনি দেখেছিলেন ‘ভাবের অনৈক‍্য’, ‘বর্ণনার অতি দীর্ঘতা’ কিংবা ‘নীতিগর্ভ মহাবাক‍্যের অভাব’। ভাষার প্রাঞ্জলতা কিংবা ছন্দের অসামান‍্যতার প্রশংসায় তিনি যেমন অকুণ্ঠ, তেমনই ‘হিন্দু জাতির শ্রদ্ধাস্পদ বীর লক্ষ্মণকে নিতান্ত কাপুরুষের ন‍্যায় আচরণ করানো’-কে তিনি ভাল চোখে দেখেননি।

অথচ, এতখানি বিরুদ্ধতা সত্ত্বেও রাজনারায়ণ ‘মেঘনাদবধ কাব‍্য’ ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন। সমালোচক হিসেবে তাঁর কঠোরতা বাংলা ভাষার চিরসম্পদ এই কাব‍্যের স্বাদ অন‍্য ভাষাভাষীদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি। আজকের পরিসরে এই ঔদার্য‍্য শিক্ষণীয়। কবিকঙ্কণ মুকুন্দকে সর্বাপেক্ষা ‘জাতীয় ভাবসম্পন্ন’ বলে মনে করেছিলেন ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে প্রদত্ত তাঁর ‘বাঙ্গালা ভাষা ও সাহিত‍্য বিষয়ক বক্তৃতা’-য়। ‘প্রচলিত বাঙ্গালা ভাষা ব‍্যতীত’ আরও দুই প্রকার বাংলার কথা তিনি এতে উল্লেখ করেন— ‘খৃষ্টানী বাঙ্গালা ও মুসলমানী বাঙ্গালা’। ‘গোলেবকোয়ালি’ উদ্ধৃত করে ‘মুসলমানী’ বাংলার দৃষ্টান্ত দেন তিনি, আর বাংলা ভাষা-সাহিত‍্যের উন্নতিতে খ্রিস্টানদের ভূমিকা সম্পর্কে তো রীতিমতো উচ্ছ্বসিত শোনায় তাঁকে। অত‍্যন্ত জরুরি এই বক্তৃতাটি আজ আমরা ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ‍্যায়, কাশীপ্রসাদ ঘোষ কিংবা রঙ্গলাল বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের বঙ্গসাহিত‍্যের ইতিহাস সংক্রান্ত আলোচনার আদিপর্বের বিচ্ছিন্ন প্রয়াসগুলির সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে পারি।

‘উদার ও বিশ্বজনীন’ ব্রাহ্ম ধর্মকে তিনি ‘সংকীর্ণ হিন্দু-গণ্ডী’-র মধ‍্যে আবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন, এমন অভিযোগ সংগত কারণেই রাজনারায়ণের বিরুদ্ধে ওঠে। বঙ্কিমচন্দ্র কিংবা বিবেকানন্দ যেভাবে অহরহ এবং একরৈখিকভাবে আত্তীকৃত (Appropriate) হয়ে চলেছেন আজকের হিন্দুত্ববাদীদের মাধ‍্যমে, সেই সম্ভাবনা রাজনারায়ণের ক্ষেত্রেও প্রবলভাবে রয়েছে। কিন্তু আশার কথা, এমত সম্ভাবনার প্রতিরোধের উপায়ও হাজির তাঁরই লেখাপত্রে। হিন্দু জাতীয়তাবাদের সূত্রগুলি তাঁর রচনায় আমাদের নির্মোহভাবে সন্ধান করে যেতে হবে, বুঝে নিতে হবে সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ থেকে ক্রমে রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদে বিবর্তনের ঐতিহাসিক যাত্রাপথ। উগ্র ও সংকীর্ণ, অসহিষ্ণু মতাদর্শের ক্রমে গাঢ়তর হয়ে ওঠার এই দিনে ‘জাতীয়তাবাদের পিতামহ’ আমাদের উত্তরণ প্রয়াসে সহায় হোন, দ্বি-শতবর্ষে সেটাই হবে তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধার্ঘ।