এখন সব অলীক
চঞ্চলদা ছিল আমার হিরো। আমাদের পাড়ার চঞ্চলদা। সকলের হিরো ছিল কি না, জানি না, আমার অন্তত ছিল। কেন, সেইটে বলতেই এই লেখা।
চঞ্চলদা তখন যৌবনের মাঝামাঝি, আমি স্কুলের গন্ডি পেরোইনি। পথচলতি যাতায়াতে চঞ্চলদাকে রোজ দু’বেলা দেখতাম, মাঝেমধ্যে বড় দাদাদের ক্রিকেট ম্যাচেও দেখেছি মনে হয়। বেশ গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। যেচে কোনওদিন আলাপ করার কথা ভাবিনি। ছোট মধ্যবিত্ত পাড়া, সকলে সকলের নাম জানে, কে কোথায় থাকে তাও জানে, ওই অবধি আমিও জানতাম চঞ্চলদাদের বাড়ি হচ্ছে পাড়ার কৈলাস বিদ্যাপীঠের গলিতে। চঞ্চলদাও জানত, আমরা পিন্টু-বুয়াদের একতলায় ভাড়া থাকি। এর বেশি কিছু না। কিন্তু এর বেশি আলাপ একদিন করতেই হল। সেটাই গল্প।
সেটা ছিল এক রোববার বিকেল। আমার স্কুল নেই, বাবা’র অফ ডে। মা একটু আগে গানের ক্লাস সেরে উঠেছে। একতলা বাড়ির খোলা জানলায় দেখি চঞ্চলদা দাঁড়িয়ে, পিছনে আর এক-দু’জন যুবক। তাদের মুখ চিনি না।
‘কাকিমা, আমি চঞ্চল। একটু কথা বলা যাবে?’
সম্পূর্ণ আলাপহীন কাউকে ‘কাকিমা’ ডেকে কথা বলতে চাওয়াটা সেসব দিনে আলোবাতাসের মতো স্বাভাবিক একটা বিষয় ছিল। তাই এতে বিস্মিত হলাম না। কিন্তু চঞ্চলদা-র মতো চুপচাপ মানুষ হঠাৎ আমাদের জানলায় কেন? সঙ্গের আর দু’জনের ভূমিকাই বা কী?
টিভি সারাইয়ের কারখানা ও ভিডিও-র জাদুঘর!
পড়ুন পর্ব ৫২…
মা-কে ভেতর-ঘর থেকে তড়িঘড়ি ডেকে আনলাম। বাবাও এল পাশে-পাশে। তারপর একটা ছোট্ট কথোপকথন, অনেকটা এইরকম।
—কাকিমা, আমি চঞ্চল। এই কৈলাস বিদ্যাপীঠের পরেই আমার বাড়ি।
—ওহ আচ্ছা। তা কী ব্যাপার?
—আসলে, আমরা পাড়ায় Cable TV আনছি। অনেকেই নিচ্ছে। তাই ভাবলাম, আপনারা যদি নেন।
—টিভি তো আমাদের আছে একটা (বাবা বলল)।
—হ্যাঁ, মানে টিভি না। Cable আনছি।
—সেটা কী জিনিস?
আমি জানতাম, Cable মানে তার। কিন্তু টেলিভিশনের সঙ্গেই তো তার লাগানো থাকে, সেটা প্লাগ পয়েন্টে ঢুকিয়ে সুইচ টিপলে তবে টিভি অন করা যায়। তার পরেও কোন তার আনার কথা বলছে চঞ্চলদা? মা-র প্রশ্নের উত্তরে সে বলল,
—এটা নতুন জিনিস কাকিমা। এখন সব পাড়ায় আসছে। বোসপাড়ায় আমরা আনছি। একটা cable connection। সেটা আমরাই চালাব, প্রতিদিন নতুন-নতুন সিনেমা দেখতে পাবেন টিভিতে, আরও নানা অনুষ্ঠানের ভাল-ভাল ভিডিও। আমরাই দেখাব। আপনাদের শুধু connection-টা নিতে হবে, আর মাসে-মাসে একটা টাকা।

জানলার পাশে দাঁড়িয়ে কথাটা শুনে আমার অবিশ্বাস্য লাগল। রোজ একটা করে নতুন সিনেমা? এরা চালাবে? আর আমরা দেখতে পাব? এও কি সম্ভব?
যে-সময়ের কথা বলছি, তখন হপ্তায় দুটো সিনেমা দেখানো হত টিভিতে। শনিবার সন্ধেয় হিন্দি, রোববার বাংলা। কী ছবি দেখানো হবে সেটা আগের হপ্তাতেই জানিয়ে দেওয়া হত। সেসব ছবির বেশিরভাগই বেশ পুরনো, মাঝেমধ্যে মা-বাবা দেখলেও আমার কোনওদিন বিশেষ মন লাগেনি। তখন চারপাশে দুর্দান্ত সব সিনেমা রিলিজ করছে, কিন্তু টিভিতে দেখায় না। বাবা-মা-কে যে বলব, ‘মহুয়া’ বা ‘পদ্মশ্রী’-তে নিয়ে গিয়ে সিনেমা দেখাতে, সে-সাহসও নেই। মা একবার ‘লালু ভুলু’ দেখাতে নিয়ে গেছিল, তাও সে বহু বছর আগে। বাবা-র সঙ্গে শেষ দেখেছি ‘Twenty thousand leagues under the sea’। কিন্তু রোজ নতুন সিনেমা? এ তো একেবারে আজব কথা!
—রোজ কী করে সিনেমা দেখাবে?
আমার মুখ থেকে দুম করে বেরিয়ে গেল প্রশ্নটা। বাবা-মা তখন মাসে কত টাকা দিতে হবে এইসব জানতে চাইছে, চঞ্চলদাও সে-কথা বলছে। বাকি দু’জনের সঙ্গেও নাম বলে আলাপ করিয়ে দিয়েছে, ওরাই সবার ঘরে-ঘরে গিয়ে টিভি’র সঙ্গে তার জুড়ে দেবে। এই সময় আমার এই প্রশ্ন। চঞ্চলদা একটু থেমে আমার দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসে বলল,
—আমাদের বাড়িতেই অফিস। সেখানে ভিসিপি থেকে ক্যাসেটে সিনেমা চালানো হবে। রোজ রাত আটটায়। যাদের বাড়িতে কানেকশন, তারা সবাই একসঙ্গে সেই সিনেমা দেখতে পারবে।
এরপর বাবা-মা-র সঙ্গে যা কথা হবার হল, কিন্তু ততক্ষণে চঞ্চলদা আমার চোখে হিরো হয়ে গেছে। শিল্পবিপ্লবের নায়ক যেন, যে তার অভিনব ভাবনা আর উদ্যমে গোটা পাড়াকে নির্জীব থেকে জ্বলজ্যান্ত করে তুলতে পারে। আমি কেবল তখন মনে-মনে চাইছি, মা-বাবা যেন কানকশনটা নিতে রাজি হয়ে যায়। জানি, স্বচ্ছল একেবারেই নই আমরা। কিন্তু রোজ নতুন সিনেমা-র জন্য না-হয় অন্য বায়না কমিয়ে দেব। টারজানের বই দু’মাস না-পড়লে আমার এমন কিছু ক্ষতি হয়ে যাবে না।
প্রার্থনা কবুল হল, বাড়িতে কানেকশন নেওয়া হবে। আমি আড়ালে একবার আনন্দ করে নিলাম দু’পাক। জানি না, রোজ-রোজ সিনেমা আমাকে দেখতে দেওয়া হবে কি না, বা ক্লাস সেভেনে সব সিনেমা তো দেখার কথাও নয়। কিন্তু রোজ রাত আটটায় টিভি খুললেই সিনেমা, এমন পৃথিবীতে ঢুকতে পারছি যে, এই তো অনেক।
পরের দিনই সদ্য-পরিচিত সেই দুই সহকারী যুবা এসে বাড়ির ঘুলঘুলি দিয়ে একটা তার ঢুকিয়ে টিভির সঙ্গে আটকে দিয়ে গেল। তার পরের হপ্তা থেকে শুরু হল সিনেমা দেখানো। আগে থেকে জানা নেই আজ কী সিনেমা হবে, তাই একটা অদম্য আগ্রহ আর উৎকণ্ঠা তো আছেই, সেইসঙ্গে তুলনামূলকভাবে নতুন সব সিনেমা দেখতে পাওয়ার আনন্দ, সেও আছে। রাত আটটা বাজলেই অনেক বাড়ির জানলায় রঙিন চলমান ছবি আর সংলাপ ফুটে উঠতে লাগল। চঞ্চলদা-র হাত ধরে পাড়ার সন্ধেগুলো বদলে গেল চিরকালের মতো।
চিরকালীন বলে যে প্রায় কিছুই হয় না, সে অবশ্য তখন বুঝিনি। মাঝেমধ্যে চঞ্চলদা-র বাড়ি চলে গেছি, ব্যক্তিগত আবদার নিয়ে। একই বছরে রিলিজ করল ‘সাজন’ আর ‘100 Days’। দুটোই নাকি দুর্দান্ত হয়েছে। না দেখে থাকা যায়? বিশেষত যখন চঞ্চলদা-র মতো মসিহা পাড়াতেই আছে। সাহস আর সংকোচকে সঙ্গী করে কৈলাস বিদ্যাপীঠের গলিতে চঞ্চলদা-র বাড়ির গ্রিলের গেটে বেল বাজাতাম মাঝেমধ্যে। বেরিয়ে এলে বলতাম, ‘চঞ্চলদা, 100 Days দেখাবে?’ হয়তো উত্তর আসত, ‘ওটার ক্যাসেট এখন পাওয়াই যাচ্ছে না, খুব ডিমান্ড। আচ্ছা দেখছি।’ এরপর আর কিছু বলার সাহস নেই আমারও। হয়তো হপ্তাদেড়েক পর একদিন আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে ফেরার সময় বাগানে ঢুকে বলে গেল, ‘কাকিমা, আজ সন্ধেয় 100 Days দেখাচ্ছি’। ব্যাস, বার্তা যার কাছে পৌঁছনোর, পৌঁছে গেল।


আজ যখন ফোনের স্ক্রিনে বা টিভির রিমোটে একটা বোতামের চাপে অগণন সিনেমা-সিরিজের হাতছানি আমাদের সামনে লহমায় খুলে যায় আর অজস্র সেই চলচ্ছবির সারি থেকে পছন্দের একটা কিছু বেছে নিতে নেহাত অপারগ হয়ে পড়ি, তখন সেই অপেক্ষা আর উৎকণ্ঠার সন্ধেগুলোকে বড় অলীক বলে মনে হয়। অনেক বেশি পাওয়া হয়ে গেলে তা আর প্রাপ্তি থাকে না, অপ্রাপ্তিরই শামিল হয়ে ওঠে। অপেক্ষার মাধুর্য যেখানে ফুরিয়ে যায়, সেখানে জীবনকে পরিপূর্ণ বলতে বাধে।
পাড়ায় আমরা নেই তো বহু বছর। কারও-কারও সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও, চঞ্চলদা-র সঙ্গে ছিল না। তাদের সেই ব্যবসাও কিছু বছর পর অবসর নিতে বাধ্য হয়। চঞ্চলদাকেও আর বিশেষ দেখিনি। আমরা চলে এলেও, আমার ভোট এখনও সেই পুরনো পাড়াতেই আছে। আর কৈলাস বিদ্যাপীঠই প্রত্যেকবারের মতো এবারেও বুথ। নিয়মমাফিক লাইনে দাঁড়িয়েছি, পাড়ার পুরনো লোকজনদের সঙ্গে গালগল্প হচ্ছে দিব্যি। হঠাৎ দেখি, একই লাইনে কয়েকজনের আগে দাঁড়িয়ে আছে চঞ্চলদা। স্বাভাবিকভাবেই যুবক নেই সে আর। চুল ফিকে হয়ে এসেছে, পাক ধরেছে তাতে। কিন্তু চেহারা আর ভঙ্গি দেখে চিনে নিতে অসুবিধে হল না মোটেই। এই সেই আমার ছোটবেলার শিল্পবিপ্লবের নায়ক? রোজ রাত আটটার রঙিন জাদুকর? বিশ্বাস হচ্ছিল না।
একবার ভাবলাম, এগিয়ে যাই। ডেকে কথা বলি। তারপর ভাবলাম, আমাকে চিনতে পারবে না হয়তো। চেহারা তো আমূল বদলে গেছেই, তাছাড়া আমাকে মনে রাখারও তো কোনও কারণ নেই। তাও হয়তো এগিয়ে যেতাম, কিন্তু ভাবলাম, চঞ্চলদাকে ডেকে এখন কী কথা বলব আমি? আমার আর কোনও সিনেমা দেখার অপেক্ষা বা আবদার নেই। আমার রোজ সন্ধের রাত আটটার মালিক এখন আমি নিজেই। আজ আর কোনও জাদুবলে তাকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা চঞ্চলদা-র নেই। জাদুর রং ফুরনো এই সব-পেয়েছির-দেশে চঞ্চলদা-র সামনে খালি হাত পেতে দাঁড়ানোর সাহস কি এই পৃথিবী আমাকে দেবে আর?




