‘পরস্তাব’ থেকে ‘প্রস্তাব’
চাঁদপাড়ার দিদিমার সঙ্গে কত গল্প হত আমার! আমার নিজের ঠাকুরমার সঙ্গে খুব একটা গল্প হত না, কারণ আমার ঠাকুরমা পুত্রশোকে কাতর এবং পাথর। হাসতে দেখেছি কম। ঠাকুরমার নানা রকম বোনেদের কথা বলেছি, ওরা এলে হাসিমুখ দেখতাম ক্ষণেক ঝলকে। আর আমার নিজের মায়ের মা ছিল না, আগেই বলেছি। যে ‘সৎ মা’ ছিল, তাকে তো আমরা বিশেষ পাইনি।
আমার দিদিমা বলতে দু’জন। চিৎপুরের দিদিমা এবং চাঁদপাড়ার দিদিমা। দু’জনেই সম্পর্কে বাবার মাসিমা। চিৎপুরের দিদিমা খুব একটা গল্পগাছা করত না। চাঁদপাড়ার দিদিমা করত; গল্পকে বলত ‘পরস্তাব’। মানে, ‘প্রস্তাব’। অনেক পরে দেখেছি, প্রাচীন বাংলায় গল্পের পরিবর্তে প্রস্তাব কথাটাই ব্যবহার করা হত। মথি লিখিত ‘সুসমাচার’-এও তাই আছে। দিদিমা অনেক ‘পরস্তাব’ বলতেন। জাঁতায় ডাল ভাঙতে-ভাঙতে, কিম্বা কচুরলতির খোসা ওঠাতে-ওঠাতে… এক ব্যাডার আছিল তিন বউ। তিন সতীনে কেবল কাইজ্যা করে, আর কত্তা ব্যাডার কানের পোক বাইর হয়। কাইজ্যার লাই এড্ডু ঘুমাইতেও পারে না। কত্তা তিন বউরে কয় তোরা আইজ সারাদিন চুপ মাইরা রইবি। কেউ একখান কথাও কইলেই ব্যাত দিয়া মারুম। তারপর… কী হইছে… কথা না কইয়া তিনজনেরই দম বন্ধ হওনের উপক্রম। একজন বরই গাছের (কুল গাছ) দিকে চাইয়া দেখে কত পাখি কথা কয়। ছোট বউ নিজের মনে-মনেই কয়, ‘বরই গাছে চড়ই পাখি করই-মরই করে।’ মেজ বউ চোপা দিয়া কয়— তোরে না লো কইয়া গেছে, কথা কইতে না। বড় বউ বলে, তোরা তোরা ক কথা মুইতো মাতি না। তিনজনই কথা বলে ফেলল! আর কী! আর একটা ‘পরস্তাব’। ছেলে যাচ্ছে শ্বশুরবাড়ি। ছেলের মা বলে দিয়েছে, হুর ঘরে, মানে শ্বশুরঘরে জামাইয়ের সম্মান আছে। উঁচু জায়গায় বসবি আর মিডা-মিডা মিষ্টি-মিষ্টি কথা কইবি। ছেলে মায়ের খুব বাধ্য। ছেলে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে ওদের ঘরের চালের উপরে বসে কোকিলের মতো কুহু-কুহু করতে লাগল… আর একটা পরস্তাবের শুরুটা এ-রকম, এক আছিল ছৈয়াল। তার ভাঙা ঘর আর এক আছিল কবিরাজ, তার নিত্য জ্বর। ছৈয়াল মানে, যারা ঘরের ছাউনি দেয় ঘর বানায়। এই দু’জনের খুব ভাব, তারপর কীভাবে তাদের অবস্থা ফিরে গেল— এটা এখন আর মনে পড়ে না। দিদিমা মাঝেমধ্যে গানও শুনিয়েছে, একটা মনে পড়ল— ‘শুন গো শুন গো সখী মনের কথা কই লো,/ আমরা হইলাম দুঃখী কইন্যা হতভাগী মোয়লো/ বাপে কেমন বিয়া দিল বুড়া জামাই চাইয়া লো/ কথা কয়না বার্তা কয় না বইয়া বইয়া থাকে লো…’ আরেকটা মজার গান ছিল এ-রকম—
জামাইয়ের জাঁক দেখিয়া পরান জলে
শ্বশুরবাড়ি জামাই এইলে
ঘৃত বিনা ভাত দেয় না মুখে লো
শুইতে লাগে চিকন পাটি
আম দিলে খায় না আঁটি
বিকালে চাই নাইরকোল টাটি—
বড় খন্ডা মাছের পেটি
পাতের ধারে গন্ডা বাটি
কেমনে পাইরা উঠি লো…।
এটা কোনও জামায়ের প্রতি শাশুড়ির খেদ। আমি জিজ্ঞাসা করতাম, দাদু শ্বশুরবাড়ি গেলে কি এমন করত? দিদিমা জিভ বের করে বলত, তোর দাদু মাটির মানুষ। এক তরকারিতেই খাইত।
চাঁদপাড়া দিয়ে যেতে দেখেছি সবুজ রঙের পাকিস্তান মেল! পড়ুন: ‘উল্টো দূরবিন’ পর্ব ২৭…
দিদিমাকে দেখতাম বাড়ির গরুদের সঙ্গে কথা বলছেন, নোয়াখালি ভাষায় না, যতটা সম্ভব এদিকের ভাষায়। গরুগুলো এদিকের কিনা, তাই ওদিকের কথা বুঝবে না। তাই, ‘কী রে বুধি, কী হয়েছে? মশায় কামড়াইছে বুঝি? গা চুলকায়? এই তো আমি চুলকাইয়া দিচ্ছি। আরাম লাগে তো!’ ‘ওরে ধবলি এই দিকে চেয়ে আছোস? হিংসা হয়! তোকেও চুলকাইয়া দিব। কিন্তু এখন এত সময় নাই… বিকালে, কেমন?’ আর দাদু একটা প্রাথমিক স্কুলে পড়াত। তখনও সম্ভবত সরকারি অনুমোদন পায়নি, ফলে খুব সামান্য বেতন পেতেন। সুযোগ পেলে পুরোহিতগিরিও করতেন।
পুরোহিতরা গামছা-শাড়ি ইত্যাদি পেয়ে থাকত। দিদিমা ওই পুজোয় পাওয়া লাল পাড়ের মোটা কাপড়ই পরতেন। আর প্রণামির গামছাগুলোকে সূচ-সুতোয় সেলাই করে মশারিও বানাতেন। নানা গামছায় জোড়া মশারি। মশারি কেনার মতো টাকাও ছিল না, তা সত্ত্বেও আমরা দিনের-পর-দিন থাকতাম। দুখের ভাত সুখ করে খেতাম। ভাতের আগে যে একটা দীর্ঘ বৃত্তান্ত থাকে, সেটা চাঁদপাড়া না গেলে বুঝতাম না।
বর্ষা এলে প্রথমে কিছুটা জমি কাদা করতে হয়। সেই কাদার ভিতরে বীজ পুঁততে হয়। এটাকে বলে বীজতলা। এখানে চারা গজালে, একটু বড় হলে, মূল জমিতে পুঁতে দিতে হয়। গাছ বড় হয় ধানে দুধ হয়, সেই দুধ জমে চাল হয়। ধানখেতের রং পালটাতে থাকে, সবুজ ক্রমে হলুদ হয়, শিষের ভারে ধান গাছ নুয়ে যায়। ধান কাটা হয়, উঠোন জুড়ে ধান আর খড়। বাঁশের তৈরি একটা ছোট কাঠামোর উপরে ধান ঝাড়া হয়। ধান ঝাড়ার সময়ে মজুরেরা কখনও গান করে— ‘ধুর কলা-ছলা কলা- কতই জল-ভুলুর বাপ-প্যাটে চাপ।’ যখন আছাড়টা মারে, তখনই এই ছন্দটার সঙ্গে যায়। আছাড় মারতে-মারতে ধান নীচে পড়ে, ঝুড়িতে ভরা হয়।
তারপরও অনেক কিছু। বিরাট কড়াইতে ওই ধান সিদ্ধ করতে হয়। কতক্ষণ সিদ্ধ করতে হয়, সেটা গেরস্থ জানে। তখন একটা গন্ধ আসে, ধান সেদ্ধ করার গন্ধ, চাষিবাড়ির গন্ধ। আমার ওই দাদুদের কয়েক বিঘা ধানের জমি ছিল। ভাগে দেওয়া ছিল। ভাগচাষি, ধানের শিষ সমেত খড়ের আঁটি পৌঁছে দিত বাড়ির উঠানে। মজুরেরাই ঝাড়াই-মারাই করে ধান সেদ্ধ করে উঠানে বিছিয়ে দেওয়া অব্দি করত। আর দাদু, দিদিমা, শৈলা— শুকনো ধান বস্তায় ভরে, ঘরের ভিতরে একটা মাচায় রাখত। আমি থাকলে আমিও হাতে লাগিয়েছি। এরপরেও ভাত পর্যন্ত আসতে অনেক বাকি। ওই ধান ঢেঁকিতে কুটতে হবে, কুলোয় ঝাড়তে হবে। তুষ আলাদা করতে হবে, খুদ আলাদা করতে হবে।

আতপ চালের ক্ষেত্রে সেদ্ধ করতে হয় না, জমির ধান ভাল করে শুকিয়ে নিয়ে ঢেঁকিতে কুটে নিলেই হয়। তবে যে-ধানের চাষ হত, তার আতপ হয় না, আর বাঙালি সেদ্ধ চালই খায়। আমরা খুদের ভাত খেতাম। খুদ মানে তো বলেছি, ভাঙা চাল, যে-চাল বেশি ছোট। কুলো চালার কায়দায় এক জায়গায় জড়ো হত। ওগুলোই খুদ। এই কুলো চালার কায়দাটাই ক্রমশ ভুলে যাচ্ছে সবাই। বড় হয়ে জেনেছি, দুটো ফোর্স— সেন্টিফিউগাল এবং সেন্টিপিটাল ফোর্সকে কাজ করাতে হয়। দূরে ঠেলে দেওয়ার বল এবং কাছে টেনে নেওয়ার বল। দিদিমারা এসব গৃহস্থালি জানত। আমার মা-কে কুলোর ব্যবহার করতে হত, খই থেকে ধান আলাদা করার জন্য। প্রচুর কাঁকর থাকত। কাঁকর বাছার আগে, কুলোয় কিছুটা কাঁকর আলাদা করে নিত। মেশিন-চালুনি দিয়ে আজকাল এইসব হয়। এখন কেনা চালে খুদ থাকে না। মেশিন-চালুনিতে রক্ত থেকে প্লাজমা, এমনকী রক্তরস এবং অণুচক্রিকাগুলো আলাদা করে নেওয়া হচ্ছে। এখন মধ্যবিত্ত ঘরে কুলোর ব্যবহার হয় শুধু জামাই বা নববধূ বরণ করার সময়ে। খুদের ফেনা ভাত শুধু নুন দিয়েই মেরে দিতাম। একটু আলুসেদ্ধ হলে তো কথাই নেই! শীতকালে খেজুর রসের মধ্যে খুদ ঢেলে সিদ্ধ করলে, রসে সেদ্ধ খুদের আবার আলাদা গন্ধ, আলাদা-আলাদা স্বাদ। কবেকার স্মৃতি! ছয় দশক আগেকার স্মৃতি নষ্ট হয়ে যাওয়াই তো মৃত্যু! যতদিন স্মৃতি থাকে, জীবন ততদিনের।
সুখময়কাকুর বিয়ের কথা মনে পড়ল। চাঁদপাড়ার দাদুর বড় ছেলে। বলেছিলাম, উড়িষ্যার পাথর খাদানে কাজ করত, পরে ব্যবসা। সুখময়কাকুর যখন বিয়ে হয়, তখন আমি ক্লাস টেনে পড়ি। ততদিনে ওদের বাড়িটা পাকা হয়ে গেছে। তিনটে ঘর এবং আমার চাঁদপাড়া যাওয়াটাও কমে গেছে। গেলেও দু’এক রাতের বেশি থাকা হয় না। পড়াশোনার চাপ। তো, সুখময়কাকুর বিয়ে ঠিক হল চাঁদপাড়াতেই। সেই যে মোহিনী ঠাকুরমশায়ের কথা বলেছিলাম, চাঁদপাড়ার ধানকুনি গ্রামে নতুন করে ঠাকুরবাড়ি তৈরি করেছেন, সেই ঠাকুরবাড়ির মেয়ে। মোহিনী ঠাকুরমশাইয়ের ছোট ভাইয়ের মেয়ে। আমরা আগেই দেখেছি অন্য আত্মীয়দের বাড়ি। খুবই সুন্দরী। নোয়াখালি জেলায় যখন ওঁরা থাকতেন, ওই জেলার মধ্যেই সাধারণত আত্মীয়-সম্পর্ক পাতানো হত। ভাষা, খাওয়া-দাওয়া ইত্যাদি একইরকম হয়। আমার এইসব পূর্বপুরুষেরা বহুত্ববাদী ছিলেন না। ‘নানারকম’ পছন্দ করতেন না। বাস্তুচ্যুত হয়েই এ-ধারে আসার পরও ওই সংসার বা অভ্যাস ছাড়তে সময় লেগেছে। জেলার বাইরে সম্বন্ধ পাতাতেন না। ঢাকা জেলাও ওঁদের কাছে ছিল বিদেশ। সুখময়কাকু পাত্র হিসেবে তেমন ভাল নয়, ম্যাট্রিক পাস— যা এ-সময়ের মাধ্যমিকের সমান। জমিজমাও তেমন কিছু নয়। ব্যবসাটা কোনওরকম। এদিকে পাত্রীও বোধ হয় ম্যাট্রিক ফেল ছিল এবং খুবই সুন্দরী। আরও ধনাঢ্য ঘরে মেয়ে দিতেই পারত। কিন্তু ওই যে দেশের ঘর আর উচ্চকুল! তাছাড়া কাছাকাছি গ্রামের মধ্যে বিয়ে হলে, বাপ-মা মেয়েকে ঘন-ঘন দেখতে পাবে। এটাও একটা ব্যাপার ছিল। প্রসঙ্গত বলি, তখন কারও শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে কথা উঠলে শুনতাম, বিএ ফেল বা আইএ ফেল। বিএ ফেল হলেও কিন্তু ফেলনা নয়। বিএ পরীক্ষাটা তো দিয়েছিল!
সুখময়কাকুর বিয়ে, আমরা বরযাত্রী। কলকাতা থেকেও ১০-১২ জন এসে গেছে। বৈশাখ মাস। আমি আমার বাবা, ঠাকুরমা, আমার ছোটকাকু আগের দিনই এসেছি। ঠাকুরমা তো ‘নায়রী’। যেসব মহিলারা উৎসবের আগেভাগে চলে আসে, তারা হল ‘নায়রী’। নাও বা নৌকাতে আসত কিনা! পূর্ববঙ্গে জলপথটাই ছিল প্রধান পথ। দুপুরে মাছের ঝোল, মাছের তেলের বড়া, মুড়িঘণ্ট এসব দিয়ে ভোজন হল। বিকেল থেকেই মেঘ। আকাশ জুড়ে মেঘ। কালো মেঘ। কিন্তু যেতে তো হবেই! লগ্ন নাকি সূর্য ডোবার পরই। গোধূলি লগ্ন, যেটা নাকি অতি শুভ। আকাশের উপরে কালো মেঘ। গুরুগম্ভীর শঙ্খনাদ হচ্ছে মেঘের ভিতর থেকে।
পুরোহিতরা গামছা-শাড়ি ইত্যাদি পেয়ে থাকত। দিদিমা ওই পুজোয় পাওয়া লাল পাড়ের মোটা কাপড়ই পরতেন। আর প্রণামির গামছাগুলোকে সূচ-সুতোয় সেলাই করে মশারিও বানাতেন। নানা গামছায় জোড়া মশারি। মশারি কেনার মতো টাকাও ছিল না, তা সত্ত্বেও আমরা দিনের-পর-দিন থাকতাম। দুখের ভাত সুখ করে খেতাম।
রওনা হলাম। যারা কলকাতা থেকে সকালে এসেছে, বৈশাখী রোদ্দুরের কারণে দু’তিনজন ছাতা এনেছিল, আর শৈলাদের ঘরে একটাই ছাতা, মুর্শিদের কাছে থেকে দু-একটা পাওয়া গেল। বর ধুতি-পাঞ্জাবি পরেছে। আমিও পাঞ্জাবি পরেছি পায়জামার সঙ্গে। মহিলাদের দু’জন পাড়ার বউদি বরযাত্রী। খুব সেজেছে। সবাই তো হেঁটেই যাচ্ছি। পুরোহিত মশাই সবার আগে। মেঘ ডাকছে, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, ইতোমধ্যে আমরা স্টেশন পার হয়ে গেছি। সেগুনবাগানের ভিতর দিয়ে যাচ্ছি, এমন সময়ে উঠল ঠান্ডা বাতাসের ঝলকা আর বিদ্যুতের ঝলক। একটু পরেই ডানদিকে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি, ঝড়কে সাথি পেয়েছি। দু’পাশে হু-হু মাঠ। মাঠ দাপিয়ে হাওয়া। এবার নামল বৃষ্টি, শুধু বৃষ্টি না, সঙ্গে শিল। সুখময়কাকুর মাথায় ছাতা ধরেছিল কে যেন, ছাতাটা হাত থেকে উড়তে লাগল। উড়ছে আর নাচছে। দুরন্ত উত্তাল নৃত্য। আর অন্য যারা ছাতা খুলে ছিল, তাদের সবার ছাতাই উলটে গেছে। ঝোড়ো বাতাসের মধ্যে উলটে-যাওয়া ছাতা, সোজা করে বগলের তলায় গুঁজে রাখাটা অনেক কসরতের ব্যাপার।

ছত্রবান বরযাত্রীদের এখন বগলে ছাতা, বউদি দু’জনের গায়ে লেপটে গেছে শাড়ি। ওরা ইচ্ছে করেই সবার পেছনে এখন। বৃষ্টি তো আছেই, সঙ্গে ছিল অল্প শিল। দু’হাত মাথায়। ওপর থেকে পড়া শিল মাথায় পড়লে বেশ ব্যথা লাগে। ভাগ্যিস শিলগুলো বড় ছিল না, বেশি ছিল না এবং বেশিক্ষণ ছিল না! কিন্তু বৃষ্টিটা কমছিল না। দু’পাশে খোলা মাঠ। বৃষ্টির হইহই খেলা। রাস্তাটা কাদাময় হয়ে গেল। পায়ের জুতো-চটি এবার হাতে। এইভাবে বরযাত্রীদল শেষ অবধি শুভলগ্নে পৌঁছে গেল। বৃষ্টি তখনও ফোঁটা-ফোঁটা। বরবাবাজির ধুতি-পাঞ্জাবি পুরো ভেজা, একজন বরযাত্রী তো তার আগেই বরের কাদাপায়ে জুতো পরিয়ে দিয়েছে। ভেজা পাম্প শু। বরের শোলার মুকুটখানি তখন তার মাথায় দেবার মতো অবস্থায় নেই। মুকুটটিকে রক্ষা করার অদম্য চেষ্টায় ওটা চেপটে গেছে। মুকুটহীন বরবাবাজিকে উলুধ্বনি সহযোগে বরণ করা হল গোয়ালঘরের সামনে। কিন্তু প্রদীপ নিভে যাচ্ছে তাই গোয়ালঘরেই ঢোকানো হল। এখানে কুলোয় প্রদীপ জ্বলল। আবার উলুধ্বনি, শঙ্খধ্বনি। গরুদুটোও হাম্বা ধরল। বরকে এবার অন্য একটি ঘরে ঢোকানো হল। নতুন ধুতি পরাবার জন্য। বরের সঙ্গে বন্ধু এবং আমার ছোটকাকু। পাঞ্জাবির দরকার নেই। উত্তরীয়, মানে গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে বিবাহ করাটাই নাকি বিধি। কিন্তু মুকুট? মুকুট যে নেই!
মোহিনী ঠাকুর একটু-আধটু কংগ্রেস করতেন। গান্ধীটুপি ছিল। মোহিনী ঠাকুরের ছোট ছেলে জিজ্ঞাসা করল, গান্ধীটুপি মাথায় দিলে কি হবে? পুরোহিত মহা ফাঁপরে। কে একজন বললেন, মুকুট হইল গিয়া লোকাচার। মুকুট পরিধান তো শাস্ত্রে নাই! আমরা গামছা পরা অবস্থায় দেখলাম মুকুটহীন বিয়ে। হ্যাঁ, আমাদের, মানে বরযাত্রীদের গোয়ালঘরেই ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ভেজা জামাকাপড় ছাড়বার জন্য। ছেড়ে কী পরব? ঠাকুরবাড়ি, এখানে সব সদ্ব্রাহ্মণ। লুঙ্গি পরা হয় না। কয়েকটা ধুতি ওরা দিতে পারল। ছোটরা তো বটেই, বড়দের অনেকেও গামছাই। বউদি দু’জনকে বাড়ির ভিতর নিয়ে যাওয়া হল। ওখানে ওদের শাড়ির ব্যবস্থা করা হল, সঙ্গে গঞ্জনা। আধুনিক হইছে এরা! আধুনিক! বরযাত্রীর দলে লেডিজ আইনছে।
তখন বরযাত্রীদের মধ্যে মহিলারা যেতেন না। শামিয়ানার তলায় বিয়ে হল। ভোজও খেলাম। ভেজা জামাকাপড়েই ফিরতে হল। এই বিয়েটা কথা কখনওই ভুলব না।
এই চাঁদপাড়ার দাদুর সঙ্গে আমার অনেক প্রাণের কথা হত। এই দাদু আমাকে চিঠি লিখতে বলেছিলেন। বলেছিলেন, ‘মনের কথা চিঠিতে লিখবা।’ যখন ফিরতাম, দিদিমা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। চোখে জল আসত, কাপড়ের আঁচলে চোখ মুছতেও দেখেছি। আর স্টেশনে গিয়ে ট্রেনে উঠতাম। পায়ে-চলা রাস্তায় মাঠের মাঝখান দিয়ে কিছুটা হেঁটে এলে রেললাইন। দিদিমা রেললাইনের কাছাকাছি চলে আসতেন। ট্রেনের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়তেন। আমি জানলায়, ছুটন্ত ট্রেনে, দিদিমার ভালবাসার হাত ছোঁয়ালে, বাতাস সবার মুখে ঝাপটা মারত। মনে পড়ে তখন ক্লাস ফাইভ। চাঁদপাড়ার দাদুকে একটা পোস্টকার্ডে কবিতা লিখেছিলাম। কবিতাই তো, মিল ছিল, প্রতি লাইনের শেষদিকে। কী লিখেছিলাম ঠিক মনে নেই, তবে এরকম কিছু ছিল —
মনে পড়ে দাদু, কাঁঠাল পেয়ারা গাছ
রাত্রে তাহারা আসে স্বপ্নের মাঝ
দিদিমার হাত নাড়া মনে পড়ে যায়
বলে আয়, আবার চাঁদপাড়া আয়।
এইভাবেই তো লেখালেখি শুরু! অবশ্য তারও অনেক আগে কালো বারান্দায় চক দিয়ে, সদ্য-অক্ষর-পাওয়া আমি মায়ের দুঃখকথা লিখেছিলাম, সেসব আগেই বলেছি।




