হলিউডে খুনির তাড়া
স্বাধীনতা দিবস নিয়ে আবেগ, দেশপ্রেমের অ্যাড্রিনালিন রাশ সব জাতিরই আছে। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস ৪ জুলাই ঘিরে ঠিক কী ধরনের উন্মাদনা হয়, সেটা বেশ কয়েক বছর সেদেশের কোনও-না-কোনও শহরে সেই দিনে উপস্থিত থাকার দৌলতে টের পেয়েছি। চোখধাঁধানো বাজির প্রদর্শনী, নায়াগ্রা জলপ্রপাতে আলোর খেলায় জাতীয় পতাকা বা সপ্তাহভর ছুটির মেজাজে রাস্তাঘাট, শপিং মল, ট্যুরিস্ট স্পটে থিকথিকে ভিড়— এসব কিছুই না তার কাছে, যদি কারো সুযোগ হয় ফোর্থ অফ জুলাই লাস ভেগাসে কাটানোর।
আমার সে-সৌভাগ্য হয়েছিল এবং বিস্ময়ে আমি বাক্রুদ্ধ ছিলাম। ভেগাস স্ট্রিপে দিনভর লোক চলতেই থাকে। চারপাশে এত দোকান, রেস্তরাঁ, বার, পাব, ক্যাসিনো, গেমিং জোন যে সেসব দেখাটাই বড় টাইম পাস। আর একটা মজার ব্যাপার হল, শপিং মল ভেবে যেখানে ঢুকলেন, দোকানপাট পেরিয়ে পৌঁছে গেলেন সুইমিং পুলে, সেখান থেকে অ্যাকোয়ারিয়ামে, অনেকক্ষণ পর মালুম হল, ও হরি! এটা আসলে একটা নাম করা হোটেল। ভেগাস স্ট্রিপের এক প্রান্তে এরকম একটা রোমান থিমের হোটেল আছে— সিজারস প্যালেস। সেই চৌঠা জুলাই দুপুরে আমাদের হোটেল থেকে বেরিয়ে চক্ষু চড়কগাছ। পথে পা রাখা যাচ্ছে না। দলে-দলে মানুষ ছুটছে সিজারস প্যালেসের দিকে। কী না, বিকেল পড়তেই ওখান থেকে বাজি ছাড়া হবে এবং সেটা সবচেয়ে ভাল দেখা যাবে ওই হোটেল-সংলগ্ন স্কাইওয়াক থেকে। আমিও উত্তেজনার বশে জনস্রোতে গা ভাসালাম। একটু এগিয়েই কিন্তু বুঝলাম, কত বড় ভুল করেছি। উল্টোস্রোতে ফেরার চেষ্টা বৃথা। অগত্যা এগোতে লাগলাম।
আরও পড়ুন: ৫০ লক্ষ বছরের প্রাচীন পাথর নিয়ে কীভাবে নিয়ে আসা সম্ভব হল কলকাতায়?
লিখছেন তপশ্রী গুপ্ত…
অনেকেরই হাতে ফ্ল্যাগ, গালে পতাকা আঁকা, টি-শার্টে দেশপ্রেমের স্লোগান লেখা। এদের সবাইকে ছাপিয়ে গেল একদল তরুণী। তাদের অনাবৃত ঊর্ধাঙ্গে আঁকা জাতীয় পতাকা। সোনালি চুল উড়িয়ে তারা ছুটছে সামনের দিকে। সাহেব-মেমের দল ফিরেও তাকাচ্ছে না, কিন্তু প্রাচ্যের চোখে শুধু বিস্ময় নয়, প্রশ্নও— একে কি জাতীয় পতাকার অবমাননা বলা উচিত? আমাদের দেশে জাতীয় পতাকার এরকম ব্যবহার তো দূরস্থান, যদি কেউ তেরঙ্গা রাখতে চায় পোশাকে, অনেক বিধিনিষেধ, অনেক নিয়মকানুন মাথায় রাখতে হবে। এ-ব্যাপারে শেষ কথা প্রিভেনশন অফ ইনসাল্টস টু ন্যাশনাল অনার্স অ্যাক্ট, ১৯৭১। এমনকী সচিন তেন্ডুলকরকেও সমস্যায় পড়তে হয়েছিল ক্রিকেট হেলমেটে জাতীয় পতাকা আঁকা থাকায়। বলা বাহুলা, সে-কেস ধোপে টেকেনি। তাও সচিনের মতো মানুষকেও কৈফিয়ত দিতে হয়েছিল— আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের গর্বিত প্রতিনিধিত্ব ছাড়া তার আর কোনও উদ্দেশ্য নেই।

লাস ভেগাস থেকে লস এঞ্জেলস— বাসে ঘণ্টা পাঁচেক। পথে লাঞ্চ, চাইনিজ কম্বো। খোপকাটা প্লেটে একটু নুডলস, একটু ফ্রায়েড রাইস, দু-পিস সুইট অ্যান্ড সাওয়ার প্রন অথবা চিলি চিকেন। সস্তায় পুষ্টিকর। এল এ, আদর করে এই নামেই ডাকা হয় গ্ল্যামারের স্বর্গ হলিউডকে পেটের ভেতর ধারণ করে রাখা লস এঞ্জেলসকে। সেখানে আমাদের ঠিকানা মোটেল সিক্স— ওই সস্তায় পুষ্টিকর ফরমুলা। তবে নামে মোটেল হলেও এটা কিন্তু জাতে হোটেল। আমেরিকার পশ্চিম উপকূলের খুব জনপ্রিয় হোটেল চেন। সস্তা বলেই ট্যুরিস্টদের কাছে এত চাহিদা। কলকাতার মতো এল এ-রও একটা চরিত্র আছে; জীবন্ত, যেন হৃৎপিণ্ডের লাবডুবটা স্পষ্ট শোনা যায়। প্রথমবারে নয়, দ্বিতীয়বার গিয়ে এটা টের পেয়েছিলাম। এই শহরে যেমন আছে সানসেট ব্যুলেভার্ডের মতো অতি অভিজাত বাণিজ্যিক এলাকা, তেমনি আছে কৃষ্ণাঙ্গদের ঘেটো ওয়াটস; যেমন আছে পর্যটকের ভিড়ে গমগমে সান্টা মনিকা বিচ, তেমনি আছে তারকাদের পাড়া বেভারলি হিলস বা মালিবু— নাক-উঁচু নির্জন।

আর আছে স্বপ্নের হলিউড। লস এঞ্জেলসের গায়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে। ওই যে পাহাড়ের মাথায় লেখা হলিউড, ফুটপাথ জুড়ে তারকাখচিত ওয়াক অফ ফেম, অস্কারের ভ্যেনু ডলবি থিয়েটার, টি সি এল চাইনিজ থিয়েটার এবং একমেবাদ্বিতীয়ম ইউনিভার্সাল স্টুডিও, সবটাই হলিউড। এমনকী যে-এলেবেলে লোকটা মুখে রং মেখে ড্রাকুলা সেজে ঘুরছে রাস্তায়, দু-ডলারের বিনিময়ে আপনার গলায় কামড় দেওয়ার ভঙ্গিতে দারুণ একটা ফটো অপরচুনিটি দিল, সেও এই রুপোলি দুনিয়ারই একটা অংশ। স্যুভেনির শপ থেকে এই যে সাত ডলার দিয়ে একটা অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড রেপ্লিকা কিনে কায়দা মেরে দাঁড়ালেন ডলবি থিয়েটারের রেড-কার্পেট-মোড়া সিঁড়িতে, ট্রোল্ড হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে, ভাবলেন ফেসবুকে পোস্ট দেবেন— প্রথম বাঙালি যে অকুস্থলে হাজির থেকে অস্কার পুরস্কার নিয়েছে (অসুস্থ সত্যজিৎ রায়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল কলকাতার হাসপাতালে), সেও তো এই অলীক মায়ার মোহেই। ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয় এখনও, আমার এক আপাত-নিরীহ সফরসঙ্গীর এই দুঃসাহসিক অর্বাচীন ফেসবুক-উচ্ছ্বাস শেষ-পর্যন্ত রুখে দিতে পেরেছিলাম।

বেভারলি হিলসে ঢুকে মনে হল যেন ঘুমন্ত নগরী। চওড়া রাস্তার দু-ধারে তাকলাগানো সব প্রাসাদ, রাজকীয় গেটের ওপাশে বিশাল বাগান পেরিয়ে চোখ কোথাও পৌঁছবে না। যদি গেটের পাশে ফলকে লেখা থাকে সেলেব্রিটির নাম, তাহলে একটা সেলফি নাহয় নিলেন জাস্টিন বিবার বা টেলর সুইফটের সম্মানে। নইলে বাঙালির মান থাকে না। তবে আমাদের মুম্বইতে যেমন জলসা-মন্নত-গ্যালাক্সির সামনে সারাক্ষণ ছবি তোলার ভিড়, এখানে তা নয়। মাইকেল জ্যাকসনের প্রাসাদের সামনে কোথাও লেখা নেই এটা ছিল তাঁর শেষ আশ্রয়, এখানেই ২০০৯ সালে কোটি অনুরাগীর বুক ভেঙে দিয়ে সত্যিই নেভারল্যান্ডে পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। তবু এক মুহূর্তে চিনে নেবেন এটা কার বাড়ি, বন্ধ গেটের সামনে আজও অজস্র ফুল, হাতে লেখা কবিতা, ছবি, উপহার— সারা পৃথিবীর ভক্তের চোখের জলে ভেজা। এই জুন মাসেই বেভারলি হিলসের ভাড়া বাড়িতে মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যু হয়েছিল মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সে, ড্রাগ ওভারডোজে। এখানে নিরিবিলিতে রিহার্সাল করছিলেন তারকা, মাত্র ক-দিন পরেই লন্ডনে ছিল তাঁর কামব্যাক কনসার্ট ‘দিস ইজ ইট’। তিন ছেলেমেয়ে প্রিন্স, প্যারিস আর বিগি ছিল তাঁর সঙ্গে। অনিচ্ছাকৃত খুনের অপরাধে জ্যাকসনের ব্যক্তিগত চিকিৎসকের মাত্র দু-বছর জেল হয়েছিল। এখন এই ম্যানসনের মালিক কোনও এক বিলিয়নেয়ার, তাই ঢোকা বারণ। এ-পাড়ায় রোজকার মধ্যবিত্ত কোলাহল নেই, আমরা ক-জনও অনেকক্ষণ ধরেই চুপ। তবু মনে হল, এই অস্বস্তিকর নীরবতা আসলে নীরব নয়, বাতাসে ভাসছে এম জে-র গান, ‘হোল্ড মাই হ্যান্ড/ বেবি, আই প্রমিস দ্যাট আই উইল ডু অল আই ক্যান’। হাত ধরার মানুষ পাওয়া বড় কঠিন, তাই অর্থ-কীর্তি-সচ্ছলতার বাইরে এক বিপন্ন বিস্ময় তাড়া করে ফেরে ভালবাসার কাঙালদের। আজীবন।

আমাদের হোটেলের সামনেই শুরু হয়েছে সেই সোনালি তারা-আঁকা ফুটপাথ— হলিউড ওয়াক অফ ফেম। এক-এক তারায় এক-এক তারকার নাম খোদাই করা। শুনলাম, সিনেমা, টিভি, থিয়েটার, গান, খেলার জগতের মোট নাকি ২৮০০ তারকার নাম আছে। চার্লি চ্যাপলিন থেকে মেরিলিন মনরো, মাইকেল জ্যাকসন থেকে স্টিভেন স্পিলবার্গ, ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা থেকে আলফ্রেড হিচকক। আমাদের হঠাৎ মনে হল, ওয়েবসাইটে পুরো তালিকাটা খুঁজে দেখি তো সত্যজিৎ রায়ের নাম আছে কি না! হতাশ হলাম, নেই। ভাবলাম, ভালই হয়েছে, পদধূলিতে ধন্য হওয়ার এই কালচার ঠিক ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে যায় না। মহম্মদ আলি নাকি সেই তারকা, যিনি এই কারণে আপত্তি তুলে নিজের নাম খোদাই আটকে দিয়েছিলেন ওয়াক অফ ফেমে। বরং চাইনিজ থিয়েটারের তারকা-উঠোনের কনসেপ্ট বেশ ভাল। প্রায় দুশো বিখ্যাত মানুষের সই আর হাতের ছাপ ধরা আছে কংক্রিটের ব্লকে।

ইউনিভার্সাল স্টুডিওজ সত্যিই এক মায়ার খেলা। সিনেমা তৈরির নেপথ্যের মজাদার দুনিয়া। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন বাস্তবের কাছাকাছি যে আঁতকে উঠতে হয়। হ্যারি পটারের মাধ্যাকর্ষণহীন জাদুঘরে ঝাঁটায় চেপে শূন্যে ভাসা খুব একটা পছন্দ না হলেও জুরাসিক ওয়ার্ল্ডের ডাইনোসর যেভাবে তেড়ে এসে মুখে থুতু দিল, তাতে বেজায় ভয় পেয়েছিলাম। আর ষাটের দশকের থ্রিলার ‘মার্ডার ইন দ্য মোটেল’-এর দৃশ্যের পুনর্নির্মাণ তো অসাধারণ। একটু দূরে দাঁড়াল আমাদের বাস। দেখছি, মোটেল থেকে বেরোল খুনি প্রেমিক, বান্ধবীর দেহ পাঁজাকোলা করে। সতর্কভাবে তাকাল এদিক-ওদিক। তারপর অস্টিন গাড়ির ডিকি খুলে শুইয়ে দিল দেহ। এই রে, আমাদের দেখে ফেলেছে। প্রমাণ লোপাটের জন্য ছুটে আসছে আমাদের দিকে, হাতে ঝকঝক করছে খোলা ছুরি। কী বিপদ! কোনওমতে প্রাণ নিয়ে পালানো গেল ড্রাইভারের দয়ায়। একটু পরে আবার বিপর্যয়। কিছুর মধ্যে কিছু নেই, প্রবল জলস্রোত ধেয়ে আসছে, দোতলা সমান ঢেউয়ে তো ভেসে যাবে আমাদের পলকা বাস! না, সেসব কিছুই হল না। শেষ মুহূর্তে টিকিট কেটে ভয়-পেতে-আসা ট্যুরিস্টদের আশ্বস্ত করে নিখুঁত যান্ত্রিক হিসেব মেনে ফিরে গেল জলের মিনার, ঠিক যেমন একটু আগে দু-ফুট দূর থেকে ফিরে গেছিল আততায়ী। ভরদুপুরে পথের মধ্যে যখন-তখন আমেরিকান গুন্ডাদের গুলি চালানো আর মলোটভ ককটেল ছোড়া আমার অসহ্য লাগছিল। এমন হাবভাব, যেন এতগুলো বাচ্চা-বুড়োকে দেখতেই পাচ্ছে না। আরে বাবা, গুলি-বোমা নাহয় নকল, ভায়োলেন্সের অভিনয়টা তো দুর্ধর্ষ! বুক কাঁপবে না? খবরে তো হরদম শুনি, স্কুলে, রেস্তরাঁয়, শপিং মলে ঢুকে এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়ে একরাশ লোক মেরে ফেলার খবর। বন্দুকবাজ ধরা পড়লেই বলা হয় সে নাকি মানসিক রোগী। বড়লোকের দেশটার সর্বস্তরে এত সাইকো থাকলে, রিহ্যাব কি কম পড়িয়াছে?
ছবি সৌজন্যে: লেখক


