পথের এই বাঁকে
বলতে ভুলে গেছি, পয়সা রোজগারের আরও একটা উপায় ছিল আমার। শুধু আমার কেন আমাদের অনেকের।
আগেই বলেছিলাম, কালির কারখানায় একটা লাল রঙের কালি ছিল। ওটায় সুগন্ধি মেশানো হত। গোলাপের সেন্ট, যা দিয়ে দাদু নস্যিকে সুগন্ধযুক্ত করতেন। এই ট্যাবলেট, জলে হালকা করে চুবিয়ে ঠোঁটে ঘষত দক্ষিণ-পূর্ব ভারত এবং বার্মা মুলুকের আদিবাসী মেয়েরা। এই বড়ির জন্য ছিল, আলাদা প্যাকিং ব্যবস্থা। দুটো করে বড়ি, একটা ছোট টিনের কৌটে ভরে, বাক্সর মধ্যে দুটো লেয়ারে সাজানো হত; প্রতিটি লেয়ারে ৩৬টা করে। মাঝখানে একখণ্ড কাগজ দেওয়া থাকত। যখন লাল কালির খুব বেশি রকম চাহিদা শুরু হল, কারখানার শ্রমিকদের দিয়ে হচ্ছিল না। তখন এই কাজটা ‘আউটসোর্সিং’ করে দেওয়া হল। এবং সেটাও আমাদের মধ্যেই। আমার বড় পিসেমশাইকে দেওয়া হল। উনি আবার আমাদের বললেন, বাক্স ভরলে পয়সা পাবি। আমরা ভাই-বোনেরা, কখনও বস্তির দু’চারজন বালক-বালিকা ওই বাক্স ভরার পার্ট টাইম কাজে ঢুকে গেলাম। ঘণ্টা দু’য়েক কাজ করলেই, দুটো শিঙাড়া বা দু’প্লেট ঘুগনির পয়সা উঠে যেত।
একদিন পিসেমশাই আমাকে ডাকলেন, বললেন— তোর হাতখরচা দরকার, তাই তো? উনি কি কিছু বুঝেছিলেন? আমি মাথা নীচু করে স্থির, চুপ। বাবা, মাসে ১৫ টাকা দেন। স্কুলের মাইনে সাত টাকা, আর টিফিন-ফি আড়াই টাকা। স্কুলে টিফিন দিত। এই বিষয় পরে কথা হবে। স্কুলে আমার মাইনে লাগত না, ফ্রি। ভাল ছেলে হিসেবে নয়, সম্ভবত শিক্ষকের সন্তান হিসেবে। সেই সঙ্গে বোধ হয়, আর্থিক অবস্থাটাও বিবেচ্য ছিল। মাইনে না লাগলেও, টিফিন-ফি আড়াই টাকা দিতে হত। ফোর্থ পিরিয়ডে ক্লাসে টিফিন আসত; একটা করে বাক্স, অল্প কিছু খাবার। ট্রাম ভাড়া, খাতা-কলম এসব ওই টাকার মধ্যেই হয়ে যায়— বাবা হয়তো এরকমই ভেবেছিলেন। পিসেমশাই বললেন, মাঝে-মাঝে যা দরকার বলিস। মেজ পিসেমশাইয়ের কথা বলে শেষ হয় না। কিন্তু এই পর্বটা এবার শেষ করতে হবে; একটা ঘটনা বলি।
রাঙাদা বিদেশে, নববিবাহিতা বউদির বাড়িতে বাজত, ‘মনে কী দ্বিধা রেখে গেলে চলে!’
পড়ুন: উল্টো দূরবিন পর্ব ১৫…
১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমার বিয়ে হয়। তখন আমি কটকের দূরদর্শনে বদলি হয়েছি। আমি একটা মেসে থাকি; ওখানে কিছু দক্ষিণ ভারতীয় ছিল, ওদের সঙ্গেই থাকতাম, মার্চ মাসে পিসেমশাই-পিসিমা পুরি বেড়াতে আসেন, সঙ্গে নিয়ে এলেন আমার নতুন বিয়ে করা বউকে, আমাকে আগেই জানিয়েছিলেন, রবিবারের পর আরও দিন তিনেকের ছুটি নিয়ে রাখতে। ওঁরা উঠলেন ভিক্টোরিয়া হোটেলে, আমাদের জন্য সাগরিকা হোটেলে একটা ঘর বুক করে রাখলেন। আমাদের হানিমুন করিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের পিসেমশাই।
বাগবাজার
গঙ্গা এখানে একটু বেঁকেছে। অর্ধচন্দ্রাকৃতির মতো। বাগবাজারের ঘাট বেশ চওড়া, এখানে বাজার বসত, ‘বাঁক-বাজার’। তাই থেকে ‘বাগবাজার’ বলে অনেকেই। অন্য একটা মতও আছে। এখন যেখানে সর্বজনীন দুর্গাপুজো হয়, ওখানে বেশ বড় একটা বাগান ছিল। পেরিন সাহেবের বাগান। তখন ফারসি শব্দের বেশ চল ছিল; ওই বাগানের কাছাকাছি বাজার বসত, তাই বাগবাজার।
এসব তথ্য তো অনেক পরের ব্যাপার, আমার শৈশবে তো এসব জানার কথা নয়, আমি দেখেছি খাল বরাবর রাস্তা, রাস্তা দিয়ে গঙ্গার ধারে হেঁটে যাওয়া যায়, ফুটপাথের ওপর চাপাকল, ওখান থেকে গঙ্গার জল বের হয়। ভোরবেলা কেউ একজন চাপাকলে পাইপ ঢুকিয়ে দিলে, পাইপে জল ঢুকে গেল। রাস্তাটা ধুইয়ে দেওয়া হল। কলকাতার অনেক রাস্তাতেই এরকম চাপাকল ছিল এবং এই জলের উৎস থেকে রাস্তা ধোয়ানো হত। ব্রিটিশ আমলেই এই ব্যবস্থা করা হয়েছিল, চাপাকল ব্যাপারটাই এখন উঠে গেছে। নেই, তবে গঙ্গার জল সরবরাহের ভূগর্ভের পাইপ-লাইনের অস্তিত্ব এখনও দেখা যায়। মহাজতি সদনের পিছনের গলিগুলোতে, কারবালা ট্যাঙ্ক লেনে, মানিকতলা অঞ্চলে চোখে পড়েছে। এমনকী যখন ঘোড়ায় টানা ট্রাম চলত, ঘোড়াকে জল খাওয়াবার জন্য যে লোহার বিরাট জলপাত্র ছিল, তারও অস্তিত্ব চোখে পড়েছিল বছরকুড়ি আগেও।
বাগবাজারের ঘাট বেশ চওড়া, এখানে বাজার বসত, ‘বাঁক-বাজার’। তাই থেকে ‘বাগবাজার’ বলে অনেকেই। অন্য একটা মতও আছে। এখন যেখানে সর্বজনীন দুর্গাপুজো হয়, ওখানে বেশ বড় একটা বাগান ছিল। পেরিন সাহেবের বাগান। তখন ফারসি শব্দের বেশ চল ছিল; ওই বাগানের কাছাকাছি বাজার বসত, তাই বাগবাজার।
গ্যালিফ স্ট্রিট বরাবর হেঁটে গেলে, বাঁ-দিকে ছিল পরপর কয়েকটি ছোট কারখানা, তারপর দু’টি বড়-বড় গুদাম, তারপর টিন এবং খোলার চালার বস্তি, একটা সুন্দর বাগানওয়ালা দোতলা বাড়ি। পরে জেনেছি ওটা নাট্যকার ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের বাড়ি এরপর ব্যোমকালীতলা। তারপর কয়েকটি গুদাম। এইসব গুদামের পিছন দিক দিয়ে, চিৎপুর যাবার ট্রাম ঘোরে। আরেকটু সামনে গেলেই গঙ্গা, গঙ্গা থেকে বের করা হয়েছে একটা খাল, পরে জেনেছি এর নাম মারহাট্টা ডিচ ক্যানাল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই খালটি বর্গী-হানা থেকে কলকাতাকে বাঁচাবার জন্য খুলেছিল। গ্যালিফ স্ট্রিটের পেছনেই একটা রাস্তা আছে, মারাঠা ডিচ লেন। এই খাল দিয়ে বিদ্যাধরী নদী পর্যন্ত চলে যাওয়া যায় এখনও। তবে এখন এই খাল মরে গেছে। বিদ্যাধরী আমি ছোটবেলায় দেখেছি, এই খাল দিয়ে স্টিমার চলাচল করে। এইসব স্টিমারে নাকি গোসাবা-বাসন্তী পর্যন্ত চলে যাওয়া যেত।




