গণতন্ত্রে ব্রাত্য

সিকিম থেকে মণিপুরের দূরত্ব প্রায় সাড়ে ছ’শো মাইল। ভারী হাওয়া, উড়তে থাকা ছাই আর পোড়া গন্ধ তাই স্পর্শ করে না উপত্যকাকে। দিব্যি ফুটবল ফ্রেন্ডলি চলে সবুজ ঘাসে। সঙ্গে দেদার ছবি আর বালখিল্যপনা। নিঃশব্দে চলে মণিপুরে নিযুক্ত সেন্ট্রাল আর্মড পুলিশ ফোর্সের ২৭২ কোম্পানিতে কাটছাঁট। ৮৮ কোম্পানি উড়ে যায় বাংলায় নির্বাচনী উৎসব পালনে। ধিকিধিকি আগুনে হাত সেঁকে লুটোপুটি খায় গণতন্ত্রের শীর্ণ কঙ্কাল। উত্তর-পূর্বের এই ভূখণ্ডে লোকসভা আসন মাত্র দুই, তাই ভাবনার অবকাশ নিতান্তই কম। বলিউড আমাদের শিখিয়েছে, এত বড় দেশে এমন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয় গায়ে মাখতে নেই। কিন্তু তিন বছর পেরিয়েও যখন মৌনব্রত ভাঙে না রাষ্ট্র, খানিক গা-ঝাড়া দিতে হয় বৈকি।

৭ এপ্রিল আবারও রক্ত ঝরে মণিপুরে। রাতের অন্ধকারে মিসাইল হামলায় মৃত্যু হয় দুই শিশুর। তারপর থেকে ক্রমাগত বেড়ে চলা হিংসায় মৃত্যু হয়েছে সাত জনেরও বেশি সহ-নাগরিকের। হ্যাঁ সহ-নাগরিক। যাদের মৃত্যুতে আর বিচলিত হই না আমরা, নির্লজ্জ নির্লিপ্ততা গ্রাস করে আসমুদ্রহিমাচলকে। তিন বছরে মণিপুর জুড়ে চলা এই রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে মৃতের সংখ্যা ২৫০ ছাড়িয়েছে। সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান এখনও নীরব! দীর্ঘদিন ধরে চলা মেইতেই ও কুকি সম্প্রদায়ের যুদ্ধে লাল হচ্ছে উত্তর-পূর্বের মাটি। এবার সেই আখ্যানে নাম জুড়েছে নাগা জনগোষ্ঠীরও। দুই সম্প্রদায়ের পুরনো সংঘাতে না জড়িয়ে বহুকাল যাবৎ সুরক্ষিত দূরত্ব রেখে চলছিল এই জনগোষ্ঠী। কিন্তু এবার কুকি সম্প্রদায়ের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াল তারাও। ডাবল ইঞ্জিন সরকারের দু’টি ইঞ্জিনই ব্যর্থ যাবতীয় অরাজকতা মোকাবিলায়। তিন বছরে মোদি সরকার নিজেদের দোষ স্বীকার ছাড়া বাদবাকি যথাসাধ্য প্রয়াস করেছে। প্রায় একবছর সময়কাল ধরে জারি ছিল রাষ্ট্রপতি শাসন। এই বছর নতুন মুখ্যমন্ত্রী ও দু’জন নব্য উপ-মুখ্যমন্ত্রীকে সামনে আনা হয়েছে। কিন্তু ফলাফল শূন্য। গত ৭ তারিখ একটি ভয়ংকর মিসাইল হামলায় মেইতেই-অধ্যুষিত ট্রঙ্গলাওবিতে মৃত্যু হয়েছে পাঁচ বছরের এক শিশুর। সঙ্গে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা পাঁচ মাসের একরত্তিও চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছে। পুলিশের অনুমান, লক্ষ্য ছিল, বিষ্ণুপুরের একটি বিএসএফ জওয়ানের বাড়ি। কুকি গোষ্ঠীর মিলিট্যান্ট গ্রুপকেই হামলার নেপথ্যে মূল ষড়যন্ত্রী মনে করা হচ্ছে। যদিও এই অভিযোগ তারা অস্বীকার করেছে। বিষ্ণুপুর কুকি-অধ্যুষিত চুরাচাঁদপুরের নিকটবর্তী সীমান্ত অঞ্চল। সংঘাতের আবহে নিরাপত্তারক্ষী বাহিনীর দৃঢ় অবস্থান বহুকাল যাবৎ। তবুও এহেন মর্মান্তিক ঘটনা। এর চেয়েও অপ্রত্যাশিত বিষয়, প্রাথমিক তদন্তে অনুমান এই মিসাইল মাত্র ১০০ মিটার ব্যবধানের নিকটবর্তী কোনও অঞ্চল থেকে চার্জ করা হয়েছিল। অর্থাৎ, এত পরিমাণ কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতেও এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়নি।

কোড অফ কনডাক্ট, ভোট ও ভণ্ডামি!
পড়ুন ‘চোখ-কান খোলা’ পর্ব ২৭…

তারপরেই জনরোষ বাড়তে থাকে। আবারও উত্তপ্ত হয় মণিপুর। সিআরপিএফের গাড়িতে আগুন লাগানো হয়, থানাগুলি ঘিরে ফেলা হয়। পরিস্থিতি ক্রমে আরও খারাপ হতে থাকে। সিআরপিএফও পাল্টা গুলি চালায়, যাতে তিনজনের মৃত্যু হয়। আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে মানুষ। হাজারো আন্দোলনকারী রাস্তায় নামে। ইম্ফল-সহ বহু জায়গায় বিক্ষুব্ধ জনরোষ দেখতে পাওয়া যায়। তারপরেই সরকার ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। রাষ্ট্র যেমনটা বহুবার আগেও করেছে মণিপুরে, কখনও কাশ্মীরে, কখনও বা এনআরসি-সিএএ আন্দোলনের সময়। রাষ্ট্র মনে করে এতে, ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। বেড়ি পরানো যায় ‘দেশদ্রোহী’-দের পায়ে। বা বেড়ি পরিহিত হয় সত্যের কণ্ঠে। যেভাবে দীর্ঘ দু’মাস ইন্টারনেট বন্ধের পর ভারতের সামনে এসেছিল মণিপুরের ভয়ংকর আলেখ্য। দুই কুকি মহিলাকে নগ্ন করে রাস্তায় হাঁটানো হয়। ভারতের ইতিহাসের দীর্ঘতম ইন্টারনেট লকডাউনের স্বাক্ষী ছিল মণিপুর। তার পরবর্তী উদ্ঘাটিত সত্য আমরা গ্রহণ করতে পারিনি। চোখ ফিরিয়েছি নগ্নতার সম্মুখে। কিন্তু সত্য বদলায়নি। কয়েকদিন আলোচনার পর মুখ ফিরিয়েছি উত্তর-পূর্ব থেকে। মণিপুর ভোলেনি। বারবার রক্ত ঝরেছে। একাধিক রাতে কারফিউ নেমেছে শহরে। জাতীয় সড়ক অবরোধ হয়েছে বিক্ষোভে-বিদ্রোহে। মহিলারা মশাল হাতে দখল নিয়েছে রাস্তার। আওয়াজ পৌঁছয়নি মূল ভূখণ্ড অবধি।

১৪ এপ্রিল স্থানীয় জনগণ আটকে দেয় নিরাপত্তারক্ষীদের গাড়ি। তারা মনে করছিল, কুকি সংঘর্ষকারীদের সুরক্ষা দিচ্ছে রাষ্ট্র। ২০ জনেরও বেশি মানুষ গুরুতর জখম হয় এই সংঘর্ষে। ১৯ তারিখ, যখন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বঙ্গজয়ের লক্ষ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন দার্জিলিং টু দিনহাটা, মেইতেই মহিলা দল সাতদিনের বন্ধ ডাকে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয় যে, কিছু আন্দোলনকারী মুখ্যমন্ত্রী ক্ষেমচাঁদ সিংয়ের একটি অনুষ্ঠানেও বলপূর্বক প্রবেশে সচেষ্ট হয়। পুলিশ গুলি চালায়। ইম্ফল-পূর্ব ও পশ্চিমের আটটি এলাকা থেকে হাজারো মানুষ রাস্তায় নামে। অগ্রসর হতে শুরু করে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের উদ্দেশ্যে। পুলিশি হস্তক্ষেপকে অগ্রাহ্য করে ব্যারিকেড ভাঙে উন্মত্ত জনতা। ছোড়া হয় কাঁদানে গ্যাস, চলে গুলিবর্ষণ।

মণিপুরে প্রায় একবছর-ব্যাপী চলতে থাকা রাষ্ট্রপতি শাসনের অবসান ঘটে গত ৪ ফেব্রুয়ারি। বিজেপি ইয়ামনাম ক্ষেমচাঁদ সিংকে মুখ্যমন্ত্রিত্বে বসায়। দু’জন উপ-মুখ্যমন্ত্রীকেও নিজ-নিজ পদে আসীন করা হয়। মুখ্যমন্ত্রী মেইতেই সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। দুই উপ-মুখ্যমন্ত্রী যথাক্রমে কুকি ও নাগা সম্প্রদায়ের। বিজেপি ভেবেছিল, এইভাবে হয়তো কিছুটা সমাধান ঘটবে দীর্ঘকালীন সমস্যার। কিন্তু এহেন বহিঃসজ্জা বিন্দুমাত্র ফলপ্রসূ হয়নি বাস্তবের মাটিতে। বরং কুকি ও মেইতেই সংঘাত থেকে দূরত্ব বজায় রাখা নাগা জনগোষ্ঠীও বিগত দু’মাসে বারে-বারে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন বিদ্বেষ বাড়ছে মানুষের মননে-মগজে-মস্তিষ্কে। পাশাপাশি থেকেও প্রতিটা সম্প্রদায় পরস্পরকে দেখছে সন্দেহের দৃষ্টিতে। তারা ভরসা হারিয়েছে প্রশাসনের ওপর, নিরাপত্তাবাহিনীর ওপর, সরকারের ওপর। এমনকী, নাগা সম্প্রদায় এমন অভিযোগও এনেছে, যে, সরকার কুকি সম্প্রদায়ের চরমপন্থীদের নিরাপদ আশ্রয় পর্যন্ত দিচ্ছে। সরকার চুপ। বর্তমানে মেইতেইদের একটি সংগঠন সরাসরি বয়কটের ডাক দিয়েছে বিজেপি দলটিকে। সাধারণ মানুষ বিজেপি-র দলীয় কর্মসূচি থেকে দূরত্ব বাড়িয়েছে। বারবার হামলা হয়েছে নিরাপত্তারক্ষী বাহিনীর উপস্থিতি সত্ত্বেও। তাই মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়।

কিন্তু এত কিছুর পরও বঞ্চিত থেকেছে মণিপুর। ভারত সরকারের কৃপাদৃষ্টি পড়েনি উত্তর-পূর্বে। বরং যখন গোটা মণিপুর জুড়ে চোখ রাঙাচ্ছিল লেলিহান অগ্নিশিখা, ৩০ শতাংশ সশস্ত্র নিরাপত্তাবাহিনী তুলে নেওয়া হয়। পাঠানো হয় বাংলায়। ভোট বিষম বালাই! বঙ্গ নির্বাচনের পালা মিটতে-মিটতে যদি গোটা মণিপুর ধ্বংসাবশেষেও পরিণত হয়, তা নিয়ে বিন্দুমাত্র বিচলিত হন না প্রধানমন্ত্রী। অজ্ঞ ভারতবাসী, মূর্খ ভারতবাসী খবর পায় না ১০,০০০ পরিবারের, যাদের বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে বিগত কয়েক বছরে। ১৭০টিরও বেশি রিলিফ ক্যাম্প চলছে গোটা মণিপুর জুড়ে। জেনেভার আন্তর্জাতিক স্থানচ্যুতি (ডিসপ্লেসমেন্ট) পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৩ সালে দক্ষিণ এশিয়ার ৯৭ শতাংশ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে শুধুমাত্র ভারতে। তাও আবার শুধু একটিমাত্র রাজ্য মণিপুরে। বিভিন্ন সম্প্রদায় অস্ত্র তুলে নিচ্ছে পরস্পরের বিরুদ্ধে। সরকার ক্রমাগত অস্বীকার করছে, অস্ত্রের বিপুল ভাণ্ডারের কথা। হাজারো মহিলা রাস্তায় নামছে, সরকার ছুড়ে দিচ্ছে শুষ্ক অবজ্ঞা। রাষ্ট্রের ‘বেটি বাঁচাও’ বিজ্ঞাপনের পর অবসরটুকু নেই সেই আর্তনাদ শোনার। বধির রাষ্ট্র নীরবে ভোট পরিচালনা করে। যখনতখন মণিপুরবাসীর ওপর লাগু হচ্ছে ইউএপিএ। বিনা বিচারে গ্রেফতার হচ্ছেন নাগরিকরা। ন্যূনতম সন্দেহই রাষ্ট্রের জন্য যথেষ্ট, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির অজুহাত মাত্র। হিংসা-পরবর্তী সময়ে ১১,০০০টিরও বেশি এফআইআর নথিভুক্ত হয়েছে গোটা মণিপুরে। কিন্তু কোনও মামলাতেই চার্জশিট গঠন হয়নি।

বিগত তিন বছরে মাত্র একবার মণিপুর গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। দাবি করেছেন, মহিলারাই অর্থনীতির ভিত। সেই হাজারো মহিলা রাতের রাস্তায় ইনসাফের দাবিতে মশাল জ্বেলেছে আর প্রধানমন্ত্রী ব্যস্ত গঙ্গাবক্ষে ভ্রমণ উপভোগে। তিল-তিল করে মানচিত্র জুড়ে গড়ে ওঠা এই দৈন্য-সহ একটি ভূখণ্ড প্রত্যাখ্যাত প্রধানমন্ত্রীর দেড়লাখি চশমায়। ব্রাত্য চরম দুর্দশায় থাকা মানুষ। রচিত হচ্ছে এক নতুন দেশের সংজ্ঞা। যে গল্পে মূল চরিত্র হিন্দু-হিন্দি আর হিন্দুস্তান। যে অলীক অভিধানে রাষ্ট্র আর দেশ অভিন্ন আখ্যা পায়। ক্ষুধাপেটে ভোট দিতে আসা মানুষ, এসআইআরে নাম বাদ যাওয়া মানুষ, কেওনঝড়ে বোনের দেহ আগলানো জিতু মুন্ডা কিংবা মণিপুরের সঙ্গে যে অজানা দেশের দূরত্ব বহু যোজনের।