উনহনে হি দদ্দা
মাসাধিককাল আমরা চম্বলে কাটিয়েছিলাম। মধ্যপ্রদেশ-উত্তরপ্রদেশ ও রাজস্থান— এই তিন রাজ্যের সীমান্তে চম্বলনদীর কিনারে রছেড় গ্রামটি কেন্দ্র করে বেহড়ে, বেহড়ে ঘুরে, অম্বা, মুরেনা, ভিন্দ, আগ্রা, জালাউন, ঢোলপুর— এসব শহর ঢুঁড়ে এবার আমাদের ফেরার সময় এগিয়ে আসছিল। ফুলন দেবীর সঙ্গে দেখা হওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম, কিন্তু মালখান সিংয়ের সঙ্গে একঝলক মোলাকাত হয়ে যাবে, এমনটি মনে হয়েছিল। কারণ মালখান সিংয়ের আত্মসমর্পণের জোর চেষ্টা চালাচ্ছিলেন সর্বোদয়ীরা এবং প্রশাসন। মালখান সিংয়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার ব্যাপারে সর্বোদয়ী নেতা তহশিলদার সিং আমাকে বলেছিলেন, মিল জায়েগা। রছেড় গ্রামে আমাদের সেই খিদিরপুরের ব্যাবসায়ী বন্ধুর (রণবীরের বাবা) ছোট ভাইটি ছিল মালখানের দলের সদস্য। আমার মনে হত, রণবীরের ওই কাকা মাঝেমধ্যে গ্রামীণ মানুষের মতো হাভেলিতে ফিরতেন, বৃদ্ধা জননীকে দেখতে। শীতে নীচের বারান্দায় রোদ পোয়াতে বসা সেই বুড়ি মাইজির খাটিয়ার ধারে বসা ধূলিধূসর হাসিখুশি এক মাঝবয়সি যুবককে দু’একবার দেখেছি।
আমরা যে ফিরে যাব এবার— এই কথাটিও গ্রামে রটে গিয়েছিল। এই সময়েই একদিন রাতে কাঠকুটোয় আগুন জ্বেলে আড্ডায় বসে বিড়ি ফুঁকতে-ফুঁকতে রণবীরের খুড়তুতো ভাই সুঘর সিং আমাকে বলে, তোমরা যে কলকাত্তা ফিরে যাবে, আমরা তোমাদের কী স্মারক দেব? আচ্ছা, আচ্ছা তোমরা একটা ময়ূর ছানা, আর একটা স্টেনগান নিয়ে যেও। শুনে সকলেই হেসে ফেলি। তবে কিনা সফরের শেষ দিকটায় আমার মনে হতে থাকে বাগি দলগুলির দলপতি ও জাঁদরেল সদস্যরা বেহড়ে-বেহড়ে লুকিয়ে থাকলেও, সাধারণ সদস্যরা চুপচাপ সময়ে গ্রামেই থাকেন, তাঁরা খেতিকিসান। বেহড়ে ঘুরতে-ঘুরতে একদিন চাচা মোহর সিংকে আমার এই বোধদয়ের কথা জানাতে চমকপ্রদ এক কাণ্ড ঘটিয়ে দেন মোহরচাচা, পরণের ধুতির বাঁপায়ের দিকটা উঁচু করে ধরে উরুর ক্ষতস্থান দেখিয়ে দেন তিনি, পুলিশের বুলেট বিঁধেছিল। যখন যুবক ছিলেন, তখনকার ঘটনা। মালখান সিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের সম্ভাবনা নিয়ে মোহর সিং চাচাও বলেছিলেন, জরুর মিল যায়গা। সফরের শেষদিকটায় যেন চোখ খুলে গিয়েছিল আমার, গ্রামে-গ্রামে ঘোরার সময়ে, অবরে-সবরে এমনও সশস্ত্র গ্রামবাসী দেখেছি তো, যার কাঁধে ঝোলা আগ্নেয়াস্ত্রটি লাইসেন্স-করা একনলা, দোনলা বন্দুক, রাইফেল নয়। অন্য কিছু!
একদিন নহরে (জলাশয়, সেচের বড় খাল) চান করছি যখন, আমার পাশে সাঁতার কাটতে-কাটতে রণবীর আমাকে বলল, বিকেলে কোনও কাজ আছে তোমার? কোথাও যাচ্ছো না তো? আমি বললাম, না। রণবীর বলল, এক জায়গায় নিয়ে যাব তোমাকে।
বিকেলবেলা যখন রণবীর এল, সৌগত ঘুমোচ্ছিল। স্বাস্থ্যবান ছেলে, ঘুমকাতুরে। রণবীর বলল, ও ঘুমোক। তুমি একা চলো। হাইওয়ে এসে আমরা বাসে চড়ে অম্বার দিকে খানিকটা এলাম। তারপর এক গ্রামে ঢুকে বেহড়ে নেমে এলাম। আসার পথে রণবীর দু’একজনের সঙ্গে কথাও বলল। মনে হল পরিচিতজন। বেহড়ে নামলাম যখন, শীতের অপরাহ্ন দ্রুত ফুরোচ্ছে, পশ্চিমে বেহড়ের দিকটা মারকাটারি লাল হয়ে যাচ্ছে, বেহড়ের টিলায়, ফাটলে, গহ্বরে আবিরের গুঁড়ো ছড়িয়ে পড়ছিল।
বেহড়ের আঁকাবাঁকা পথ ধরে হাঁটতে-হাঁটতে এইবার রণবীর বলতে লাগল, পুলিশের কাছে মালখান সিংয়ের কোনও ছবি নেই তো, তাই সৌগতকে নিয়ে যাওয়া গেল না। ওরা বারণ করল। তুম স্রিফ যাও, বাতচিত করকে আও। আঙুল তুলে দূরে একটি টিলার দিকে দেখাল রণবীর। সূর্য ডোবা আলোয় দেখলাম ওই টিলায় কারা যেন নড়াচড়া করছে, ছয়-সাতটি লোক। একটা পাথরের ওপর বসে রণবীর বলল, যাও তুম যাও। সন্ধে নামছে তখন। বেহড়ে সন্ধের পর বিড়ি সিগারেট ধরানো নিষেধ। কারণ দূরে কোথাও ওঁৎ পেতে থাকা পুলিশ দেশলাই জ্বালার আগুন দেখলেই গুলি চালিয়ে দেবে, সে ব্যাপারে আমাকে সতর্ক করে দিল রণবীর। আমি টিলার দিকে হাঁটতে লাগলাম। বেশ টগবগ লাগছিল আমার। বুঝলাম, ওই হল মালখানদের এইমুহূর্তের অস্থায়ী ডেরা!
আইয়ে-আইয়ে সাব— বেশ খাতির করে ওই ৬/৭ জন সশস্ত্র ব্যক্তি আমাকে স্বাগত জানালেন। বসতে দিলেন একটা পাথরে রুমাল পেতে। সবার ওপর নজর চালিয়ে শুধোলাম, আপনাদের ভেতর মালখানজি কে? হেসে একজন বললেন, আভি আয়া নহি সাব। জলদি আ যায়গা। আমি টুকটাক কথা চালাতে লাগলাম। কী নাম, কোথায় বাড়ি। দেখলাম, নাম পরিচয় দিতে কারও-কারও অস্বস্তি রয়েছে। কথা না বাড়িয়ে কলকাতা সম্পর্কে ওদের কৌতূহলের জবাব দিতে লাগলাম। তখনই জানলাম, মালখান সিংকে ওরা দদ্দা বলে ডাকেন। দদ্দা মানে বড়ভাই।
সূর্য ডোবা আলোয় দেখলাম ওই টিলায় কারা যেন নড়াচড়া করছে, ছয়-সাতটি লোক। একটা পাথরের ওপর বসে রণবীর বলল, যাও তুম যাও। সন্ধে নামছে তখন। বেহড়ে সন্ধের পর বিড়ি সিগারেট ধরানো নিষেধ। কারণ দূরে কোথাও ওঁৎ পেতে থাকা পুলিশ দেশলাই জ্বালার আগুন দেখলেই গুলি চালিয়ে দেবে, সে ব্যাপারে আমাকে সতর্ক করে দিল রণবীর।
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। সন্ধ্যার ছায়াপড়া ঈষৎ আলোয় দেখা গেল ভারী চাদরে মুখমাথা ঢাকা এক দীর্ঘকায় ব্যক্তি, টানটান চেহারা টিলার দিকে উঠে আসছেন, পিছু-পিছু বলবান একটি লোক। নীচের ঝোপঝাড় ভেদ করে। দু’জনের কাঁধেই আগ্নেয়াস্ত্র ঝুলছে। ওঁরা ওপরে উঠতেই, বসে ছিল যারা তাঁরা দাঁড়িয়ে গেল। আপ হি দদ্দা?— দীর্ঘকায় ব্যক্তিটিকে আমি শুধোলাম। নহি-নহি— হেসে, যেন কৌতুক করছেন এই ভঙ্গিতে বললেন, হম উনকো তরফ সে আয়া। মুঝে ভেজ দিয়া। বোলো বাঙ্গালিবাবু, ক্যা জাননা চাহতে হ্যায়? দীর্ঘকায় মানুষটি, দুঃখপ্রকাশ করে বললেন, একটা জরুরি কাজে মালখান আটকে গিয়েছেন। মনে হল, মালখানের সাকরেদরা মুখ টিপে হাসছে। দীর্ঘকায় লোকটি আমার সঙ্গে কথা চালিয়ে গেলেন। বললেন, খুব শিগগিরই দলবল নিয়ে মালখান সিং সারেন্ডার করবেন। তবে সারেন্ডারের আগে পুলিশ ধরে ফেললে ভারী-ভারী মামলা দিয়ে দেবে, কঠোর শাস্তি হবে। খুনখারাপির জন্য ফাঁসিও হতে পারে। ওই দীঘল মানুষটি বললেন, তাই মালখান সিং এখন প্রকাশ্যে আসছেন না। আনজান লোকের সামনে আসতে অসুবিধা। হেসে লোকটি বললেন, তব আপলোগ মেহমান। বঙ্গাল মুলুকসে আয়া আপলোগ…সঙ্গে আসা লোকটি ঝুলি থেকে গুচ্ছ-গুচ্ছ আঙুর বিছিয়ে দিল। আঙুর খেতে-খেতে কথা হল আমাদের আধঘণ্টা খানেক। লম্বা মানুষটি বললেন, মালখান সিং চেষ্টা করছেন ফুলন যাতে আত্মসমর্পণ করতে রাজি হন। বুঝিয়ে-সুজিয়ে ফুলনকে রাজি করানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। এসব কথা বলতে-বলতে তিনি বললেন, ফুলন সারেন্ডারে এখনও রাজি হচ্ছে না বলেই, মালখান সিংয়ের সারেন্ডারে দেরি হচ্ছে।
চম্বলে নানা মহলেই এসব কথা শুনেছি। ফুলনের নাকি প্রতিহিংসা এখনও শেষ হয়নি, তাই সারেন্ডার করতে পারছে না। দীর্ঘকায় মানুষটির সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হল, সর্বোদয়ীরা তো বটেই, প্রশাসনও এভাবে মালখান সিংকে কাজে লাগাতে চাইছে ফুলনকে আত্মসমর্পণ করানোর জন্য। লোকটি এবার বললেন, আমাদের এবার এখান থেকে চলে যেতে হবে। মুরেনার মেলায় এসে জেলাশাসকও আমাকে বলেছিলেন, মালখান সিংয়ের সঙ্গে প্রশাসন যোগাযোগের চেষ্টা চালাচ্ছে।
আমি এইবার দীর্ঘকায়টিকে জিজ্ঞেস করলাম, দোস্ত, মালখানজিকে কেমন দেখতে, বলিয়ে না, দেখতে কেমন? মুখমাথায় কম্বল জড়ানো ঢাকনা আগেই সরে গিয়েছিল, মাথা ভরা একরাশ চুল ঝাঁকিয়ে দীর্ঘকায় সুঠাম মানুষটি হেসে বললেন, হমারি তরাহ লম্বি, আদত হামারি তরাহ, মোচ ভি হামারি তরাহ। মহিষের শিংয়ের মতো পাকানো তাঁর গোঁফ! হো-হো হাসি হাসতে লাগল মালখানের দলবল। করমর্দন করলেন লম্বা মানুষটি। তাঁর সঙ্গে আসা বলশালী লোকটি আমাকে টিলার নীচে রণবীরের কাছে পৌঁছে দিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। বেহড় ছেড়ে গ্রামে ঢুকে সিগারেট ধরিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে রণবীরকে এসব বললাম যখন, হো হো করে হাসল সেও।
চম্বল থেকে ফেরার পর, বছর ঘুরতে ১৯৮২-র ১৭ জুন মধ্যপ্রদেশের ভিন্দে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অর্জুন সিংয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করেন দলবলসহ মালখান সিং। ৩০ হাজার গ্রামবাসীর ভীড় হয়েছিল চম্বল কিনারে।
পরদিন সংবাদপত্রে পয়লা পৃষ্ঠায় ওই আত্মসমর্পণের বড়সড় ছবি— ঝাকড়া চুল আর মস্ত গোঁফের দীর্ঘকায় লোকটি!
চমকে উঠিনি। অন্ধকারে টিলা থেকে রণবীরের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল যে পালোয়ানটি, সে-ই আমাকে বলে দিয়েছিল, উনহনে হি দদ্দা!


