স্মৃতি, শব্দ, গন্ধ
পিসেমশাইরা ভদ্রলোকেদর পাড়ায় চলে গেলেন। কারখানায় আগের নিয়মেই আসতেন। কারখানার একেবারে সামনে একটা ঘর ছিল, বলা হত অফিস ঘর। ওখানে পিসেমশাইয়ের একটা চেয়ার-টেবিল ছিল। পাশে আর-একটা চেয়ার-টেবিল, ওখানে বসতেন, পিসেমশাইয়ের প্রয়াত দাদার এক ছেলে, নাম নাড়ুদা। উনি চিঠিপত্র টাইপ করতেন। আর-একটা টেবিল ছিল অন্যপাশে। ওখানে একটা কাচ বসানো কাউন্টার ছিল। একজন অ্যাকাউনট্যান্ট বসতেন, লম্বা মতো, টাক মাথা। বেশি কথা বলতেন না। কারখানার একজন শ্রমিক ঘনাদা, রোজ অফিসঘরটা ঝাড়ু দিত। হাতে ঝাঁটা নেওয়ার আগে ওই কাউন্টারটায় মাথা ঠেকাত, প্রণাম করত। কারণ ওখান থেকেই তো মাইনেটা হত। মাসে দু’বার করে মাইনে হত। একবার হলে অল্পদিনেই টাকা উড়িয়ে দিত বলে মাইনের টাকাটা দু’ভাগ করে দু’বার দেওয়া হত। চিত্তবাবু নামে একজন ভদ্রলোক আসতেন সপ্তাহে একদিন করে। খুব ভাল নাকি ইংরেজি জানতেন। নানা রকম আইনি বা সমস্যামূলক চিঠিপত্র ইংরিজিতে খসড়া করে দিতেন। ওঁকে আমরা ইংলিশ কাকু বলে ডাকতাম। কফি খেতে ভালবাসতেন। তাই উপর থেকে কফি যেত। পিসেমশাই করে দিতেন। পিসিমারা মুখার্জি পাড়ায় চলে যাওয়ার পর, আমার মা কফি বানিয়ে দিতেন। পিসিমা কফি বানানোর কায়দা শিখিয়ে দিয়েছিলেন মাকে। কফির কৌটো পিসেমশাই পাঠিয়ে দিতেন। আমি চুরি করে একটু খেয়েছিলাম। এমা! কী বিচ্ছিরি! তেঁতো!
অনেক রবিবারেই ও-বাড়িতে চলে যেতাম আমি। দুপুরে খেতাম, বিকেলে খেলতাম ও-পাড়ায়। ওদের বাড়ির উল্টোদিকের একটা বাড়ির একতলায় একটা ক্লাবঘর ছিল। ক্লাবের নাম বলাকা সংঘ। হই-হই করে সরস্বতী পুজো হত। আমাদের হাতে একটা চাঁদা তোলার বই ধরিয়ে দেওয়া হত। কার কাছ থেকে নেব চাঁদা?
কলেজে বক্তৃতা দিতে গিয়ে চলে গিয়েছিল তোতলামি! পড়ুন ‘উল্টো দূরবিন’ পর্ব ১০
আমার ভাড়াওয়ালা মামার কাছে চাইতাম চার আনা, কালির কারখানার ইংলিশকাকু ওয়ান রুপি, খ্যাঁদাদা, বিজয়দা ঘনাদাদের কাছেও চাইতাম, ওরা আমাকে না বলতে পারত না। চার আনা করে দিয়ে দিত। সরস্বতী পুজো পিসেমশাইদেরও হত। যখন ওরা মুখার্জি পাড়ায় যায়নি, গ্যালিফ স্ট্রিট-এর বাড়িতেই, তখন এ-বাড়ির লাল সিমেন্টের অংশে ঠাকুর বসানো হত। ঠাকুর কিনতে যাওয়া হত কুমারটুলিতে। সে একটা অ্যাডভেঞ্চার।
রাঙাদা, আমি, কিম্বা পিসেমশাইদের ভাগ্নে বাদলদা এবং আমি, কখনও ছোটকাকু এবং আমি ঠাকুর কিনতে গিয়েছি। যখন কাকামণি বেঁচে ছিলেন, কাকামণি আর রাঙাদা ঠাকুর কিনতে যেত। আমার পিসেমশাই এই ভারটা আমাদের হাতেই তুলে দিয়েছিলেন। কুমারটুলি থেকে একটা হাতে টানা রিক্সায় ঠাকুর উঠিয়ে বাড়ি নিয়ে আসা হত পুজোর দু’দিন আগে। এরপর চলত ঠাকুর সাজানো। দেওয়াল ছিল রংচটা। এজন্য একটা চাদর টাঙিয়ে দেওয়ালটাকে ঢেকে দিতে হত। রেঙ্গুন থেকে একটা খুব ভাল জাপানি চাদর এনেছিলেন পিসেমশাই, ওটাই ব্যবহার করা হয়েছে বহুবছর। বর্মি ছাতাও ছিল। ছাতা খুলে দু’পাশে ঝুলিয়ে দেওয়া হত। ছাতাগুলোর শিক ছিল বাঁশের, এবং কাপড়গুলি ছিল রঙিন। আমরা ভাইবোনরা সবাই মিলে ঠাকুর সাজাতাম। ছোটকাকু, রাঙাদা আমরা ভাইবোনরা পিসেমশাইয়ের ভাগ্নেরা সবাই আসত। রঙিন কাগজ কেটে কালি বানিয়ে তার উপর গোল করে আঠা দিয়ে জুড়ে শিকল করা হত। সেই শিকল টাঙানো হত। রঙিন কাগজের ফুলও তৈরি করা হত। ঠাকুর সাজানোর জন্য যে যতটা পারে প্রতিভার বিকাশ ঘটাত। পাউডার কৌটোর ভেতরে বাল্ব ফিট করে ফোকাস, সরস্বতীর মাথার পেছনে লাল কাগজে মোড়া বল ঝোলানো, টবের পাতাবাহার গাছ জোগাড় করে সামনে রাখা এরকম কত। সরস্বতী পুজোর আগে কুল খাওয়া নিষেধ ছিল। কুল খেয়ে নিলেই বিদ্যে হবে না। পুজোয় অঞ্জলি তো দিতেই হত, আর পুজোর ফুলের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল গাঁদা ফুল। ফুলগুলো বইয়ের ভেতরে দিতাম। ইংরিজি আর অংক বইয়ের ভেতরেই বেশি-বেশি করে। মা, হারমোনিয়ামের উপর। সরস্বতী ঠাকুরের একপাশে আমাদের সবার বইপত্র রাখা হত। পুরোহিত মশাই সেই সব বইয়ের উপর মন্ত্রপড়া ফুল ছেটাতেন।

সরস্বতী পুজোর ভোগ রান্না করত সবাই মিলে। পিসিমা, ঠাকুর্মা, মা— সবাই। এই সরস্বতী পুজোটার খরচ পুরোটাই পিসেমশাইয়ের। সন্ধেবেলায় আরতি হত। আমার ছোটকাকু আর অন্য-এক কাকু আরতিতে অনেক কেরামতি দেখাত। আরতি করার জন্য দু’হাতে দুটো ধুনুচি আর এক হাতে একটা ধুনুচি দাঁতে কামড়ে আরতি করত। কেউ ঘণ্টা বাজাত, কেউ কাঁসর বাজাত ঠং-ঠঙা-ঠং। এটা ছিল যখন গ্যালিফ স্ট্রিটের বাড়িতে পিসেমশাইরা। যখন মুখার্জিপাড়ায় চলে গেল, তখন এতটা হৈ-হৈ হত না, কারণ ওই বাড়িতে এমন কালোবারান্দা-লাল বারান্দা ছিল না। সে-বারান্দায় আন্ডার-হ্যান্ড ক্রিকেট খেলা যেত। বা বারান্দায় আসন-কলাপাতা বিছিয়ে পঁচিশ-তিরিশজন লোককে খাওয়ানো সম্ভব ছিল। সরস্বতী পুজো-লক্ষ্মীপুজোয় এরকম পাত পেড়েই খাওয়ানো হত।
তখন বিয়েবাড়ি ভাড়া পাওয়া যেত না তেমন। বাড়ির ছাদেই প্যান্ডেল বেঁধে বিয়ের ভোজ হত, মফস্সলে বাড়ির উঠোনেই প্যান্ডেল। রিফিউজি কলোনিতে প্যান্ডেলও নয়। শুধু ত্রিপল। কলকাতায় অনেক বাড়ির ছাদ থাকত না। রাস্তার একপাশে কিম্বা এক টুকরো ফাঁকা জায়গা জোগাড় করে ওখানেই।
আমাদের ওই বাসাবাড়ির ছাদটা ব্যবহারের অযোগ্য ছিল, কারণ ওখানে কালি তৈরির মণ্ড শুকনো হত। কালিমাযুক্ত ছাদ। কিন্তু একটা বারান্দা ছিল। ওই বারান্দায় লোক বসিয়ে খাওয়ানো যেত। আর ঝুলবারান্দাটায় বিয়ের আসর বসানো যেত। আমাদের আত্মীয়স্বজনরা বেশিরভাগ-ই ছিল দুঃস্থ। ওপার বাংলা থেকে সর্বস্ব খুইয়ে আসা মানুষজন। ওদের ত্রাতা জাহ্নবী জীবন চক্রবর্তী। এই বাড়িতেই, আমার মনে পড়ে দুটো বিয়ের আসর বসেছিল। বিয়েতে পায়েস খাওয়ানোর কথাও মনে পড়ে। লুচি-টুচি ছিল না। ভাতই খাওয়ানো হত। ডাল থাকত। ডাল তখন পূর্ববঙ্গীয়দের একটি লোভনীয় পদ। কারণ ওধারে খেসারি ছাড়া অন্য কোনও ডালের ফলন হত না। আর এপাশ থেকে পদ্মা-যমুনা পেরিয়ে ওধারে অনেক কিছুই যেত না খুব একটা। যে-কারণে বাঙালরা পোস্তর তরকারি জানত না, লুচি-পরোটা এসবে পটুত্ব ছিল না। ডাল ছিল অতি আদরের। যে- কারণে বাঙাল বাড়িতে মাছের পদের পরে ডাল খাবার চল ছিল। ঘটিরা আগে ডাল পরে মাছ। বিয়ে-বাড়িতে দু’রকমের ডালও খেয়েছি। শীতকালে বিয়ে-বাড়িতে মুলো দিয়ে বিউলির ডাল ভাবা যায়?
বিয়ে-বাড়ির রান্নাবান্নাও নিজেদের লোকজনই করত। বেশি লোকের রান্নাবান্নার জন্য রান্নাপটু কোনও আত্মীয়কে ডাকা হত। ওরাও রাজি হয়ে যেত। আমার ছোটপিসির বিয়ে হয়, ১৯৪৯/৫০ সালে। আমার জন্মের আগে। শুনেছি ছোটপিসির বিয়ে হয়েছিল এই বারো নম্বর গ্যালিফ স্ট্রিটেই। ছোটপিসির বিয়েতেই প্রথম ‘রান্নার ঠাকুর’ আনা হয়। শুনেছি ধোকার ডানলা হয়েছিল, সেটা কেউ খেতে পারেনি, খুব দুর্গন্ধ ছিল। হিং দেওয়া হয়েছিল। জানি না, হিং বেশি দেওয়া হয়েছিল কি না। না কি হিং-এর গন্ধটাই তৎকালী বাঙালি পাবলিক সহ্য করতে পারেনি। সে-সময়ে পূর্ববঙ্গে হিং-এর প্রচলন ছিল না। একটা বিয়ে-বাড়ি গিয়েছিলাম ছোটবেলায়; মনে আছে পায়েসের সঙ্গে আমও দেওয়া হয়েছিল। আম হাতে কচলে নিয়ে, পায়েসের সঙ্গে মেখে হাপুস-হুপুস শব্দে আম-পায়েস খাওয়া হচ্ছিল।



