আজকের ভারতে বেশিরভাগ শহুরে মধ্যবিত্ত বাঙালি কোন ভাষায় কথা বলেন? ‘সোনার কেল্লা’-র জটায়ুর তুলনায় অনেক বেশি ভাল হিন্দি আর ব্যাকরণের তোয়াক্কা না করে বেশ খানিকটা ইংরেজি। আর যেটা বলেন, সেটাকে আর যা-ই হোক, ‘বাংলা’ বলা যায় কি? বোধহয় না। কারণ, এই যা! ‘কারণ’ শব্দটাই তো এখন প্রায় বিলুপ্ত। ‘কেন কি’, রান্না হয়ে গেলে টেবিলে খাবার ‘লাগিয়ে’ দেন আজকের বাঙালি। বাঙালির এখন ‘লাগছে কী’, যে ভাষা সবচেয়ে পছন্দের, তা হল ‘হিংলিশ’ বা ‘বেংলিশ’। অনেকটা ‘আবোল তাবোল’-এর ‘খিচুড়ি’ কবিতাটার মতো। এই বাঙালির কাছে বাংলা কখনওই সম্মানের যোগ্য মাতৃভাষা নয়। বরং তিনি জানেন, ‘আমি ভাল বাংলা জানি’ বললে আজকের পশ্চিমবাংলায় বেশিরভাগ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তার চাকরি পাওয়ার আশা কম। চাকরি থাকলে, পদোন্নতির আশা ক্ষীণ। শুধু চাকরি কেন, নিদেনপক্ষে পছন্দমতো কোনও প্রেমিক-প্রেমিকা, বন্ধু-বান্ধবীও পাওয়া দুষ্কর। সঠিক বাংলা জানা বাঙালি আজ জাতে ওঠে না। পাতে দেওয়া যায় না।
এবার সেই বাঙালির জন্য তৈরি বাংলা বিজ্ঞাপন তো সেরকমই হওয়া উচিত, যেটা তিনি খুব সহজেই বুঝতে পারবেন। সেই বিজ্ঞাপনের ছবি আর ‘লোগো’ বা ব্র্যান্ডের প্রতীকচিহ্ন দেখে। মনে পড়বে, মূল হিন্দি, ইংরেজি বা ‘হিংলিশ’ বিজ্ঞাপনের ছবি আর লাইনগুলো। মানে, তিনি ‘বুঝবেন কি’— এই বিজ্ঞাপন বাংলায় করা হয়েছে, ‘কেন কি’, বিজ্ঞাপনদাতা জানে, সেই পণ্যের ভোক্তাদের মধ্যে তার মতো কিছু বাঙালিও আছে। আর এই ‘হিনবেং’ ভাষায় কথা বলা বাঙালির কথাও মনে রেখেছে বিজ্ঞাপনদাতা। সোজা কথায় ‘রতনে রতন চেনে’। ‘বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা’ হয়ে গেলেই কেলেঙ্কারি।

আরও পড়ুন: নাট্যভাষের স্বতন্ত্র জোর আছে, যা ভাষার সীমানা টপকে যায়!
লিখছেন সুমন মুখোপাধ্যায়…
‘বলো কথা কেশরী!’, ‘বিশ্ব নায়কত্বের অবিরাম 25 বছর’, ‘দমদার ধামাকা’ ইত্যাদি লাইনের মানে জিজ্ঞেস করেছিলাম কিছু ‘আজকের’ বাঙালিকে। দেখলাম, কারওরই বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না। প্রথমটার মানে জিজ্ঞেস করতেই হিন্দি উচ্চারণে ‘হিংলিশ’ বিজ্ঞাপনের কথা মনে করিয়ে দিলেন। অর্থাৎ, ‘এ মা, এটা বুঝতে পারছ না? বল কী?’ ‘কেন কি’, বাংলা বাক্যের মানেটা বোঝার কোনও মানেই হয় না আজ। কী দরকার?
আজকাল নানা নামী ব্র্যান্ডের বাংলা বিজ্ঞাপনে ক্রমাগত চোখে পড়ে বেঠিক বানান, ব্যাকরণ আর বাক্য গঠন। তাদেরই ইংরেজি বিজ্ঞাপনে কিন্তু সেরকম ত্রুটি দেখা যাবে না। এর কারণ? নামী ব্র্যান্ড। বিরাট মাপের কোম্পানি। বিজ্ঞাপনে কোটি কোটি টাকা খরচ করছে তারা প্রতিনিয়ত। তাদের পক্ষে সঠিক বাংলা লিখতে জানা কপিরাইটার বা অনুবাদক খুঁজে পাওয়া কঠিন, এ-কথা কেউ বিশ্বাস করবেন না। তাহলে?





চুলের তেল আর শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপন।
মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপন। জলের পাম্প-এর বিজ্ঞাপন। বেসরকারি বিমার বিজ্ঞাপন
ব্যাপারটা সহজ। তাদের ব্যবসা, ক’জন হাতে গোনা বাংলা বিজ্ঞাপনের পাঠকের ওপর ভর করে চলছে না। বরং, লক্ষ-লক্ষ ইংরেজি বা হিন্দি পড়তে পারেন, বুঝতে পারেন, এ-ধরনের মানুষের ওপরেই তাদের ভরসা। সেই দলে কিন্তু হাজার-হাজার বাঙালিও আছেন। তাহলে বাংলা অনুবাদে সেই একই বিজ্ঞাপন প্রকাশ করার প্রয়োজন? সহজ ব্যাপার। ব্র্যান্ড বড় হলে, ব্র্যান্ডের মিডিয়া প্ল্যানে বাংলা খবরের কাগজ থাকাটা স্বাভাবিক। আবার কেন্দ্রীয় সরকারের বা বিমা সংস্থার বিজ্ঞাপন, সে তো দেশের প্রায় সব ভাষাতেই প্রচারিত হতেই হবে। আর সেই কারণেই বিজ্ঞাপনের মূল ভাষা থেকে অনুবাদ। বহু-সংখ্যক মানুষের (যারা সেই কাগজ নিয়মিত দেখেন/পড়েন) চোখে পড়ানোর জন্যই সেই কাগজে তাঁদের মাতৃভাষায় বিজ্ঞাপন। সেই বিজ্ঞাপনে ছবি আছে। ইংরেজিতে লোগো আছে। ‘ওয়েবসাইট’-এর লিংক, ‘কিউ-আর কোড’, সামাজিক মাধ্যমের পাতার হদিশ ইত্যাদি… সেগুলোও আছে ইংরেজিতে। আর কী চাই? এবার বাংলা শব্দ, বাক্য, বানান ইত্যাদি নিয়ে মাথা না ঘামালেও বেশ ভালই কাজ করবে সেই বিজ্ঞাপন। মোদ্দা কথা, “আমি মাল বা পরিষেবা বেচতে এসেছি ভাই। কিছু জানাতে এসেছি। তাই, যে কাগজ অনেকে পড়ে, সেখানে বিজ্ঞাপন ‘ডেলেছি’। রবিঠাকুর হতে এসেছি থোড়ি? অনেকেই তো বুঝতে পারছে। মাতৃভাষার ওপর যদি এতই প্রেম আপনার, তো ‘বই’ লিখুন না। আমাদের ব্র্যান্ড বা পরিষেবা কিনে কী লাভ?”
একবার ভাবুন, কথাটা কিন্তু ভুল নয় একেবারেই। ঔপনিবেশিক নেশার ঘোর আজও কাটেনি আপনার-আমার। কাটবেও না কোনওদিন। তাছাড়া, পশ্চিমবাংলার জেলায়-জেলায় অত্যন্ত নিম্নবিত্ত নাগরিকও জানেন, তাঁর সন্তান ইংরেজি না জানলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এ-দেশে যোগাযোগ আর প্রাশাশনিক কাজের ভাষা ইংরেজি আর হিন্দি। সব মিলিয়ে ভারতীয় ভাষা আছে বাইশটা। ভারতীয় মুদ্রার নোটের পিছনে খুদে-খুদে অক্ষরে পনেরোটা ভাষায় সেই নোটের অঙ্ক লেখা আছে। সামনে দুটো। সব মিলিয়ে সতেরোটা। বাংলাও আছে সেখানে। আজ ক’জন সেটা পড়ে নোটের অঙ্ক চিনে নেন, আমার জানা নেই। কিন্তু ওই নোট-এ বাংলাও আছে বলে সেটা আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকলে চলবে কি? শুধু দেখলে হবে না, সমাজে এগিয়ে যেতে চাইলে খরচা করতে হবে। আপনার মোবাইল ফোন হোক বা এসি, মাইক্রোওয়েভ হোক বা গাড়ি, অথবা কোনও বিনিয়োগ… কোনও পণ্যের বা পরিষেবার বাংলা বিজ্ঞাপন দেখে, সেই বিজ্ঞাপন ভালবেসে কোন দামি জিনিসটা কিনেছেন বলতে পারেন? আমি তো পারব না। ‘কেন কি’ যে দেশে কোনও জাতীয় ভাষা নেই, সে দেশে আরও বেশ কয়েকটা ভাষার সঙ্গে বাংলা ‘আর একটা’ প্রাদেশিক ভাষা। বাংলা ভাষার বিজ্ঞাপনে পান থেকে চুন খসলে কিছু হাতে গোনা বাঙালির গর্ব খর্ব হতে পারে, কোনও পাঞ্জাবির বা মালিয়ালির নয়। বরং একটা কথা ভেবে স্বান্তনা পেতে পারেন, ওঁদের ভাষায় অনুবাদ করা বিজ্ঞাপনেরও একই অবস্থা।

সামাজিক মাধ্যমের বিজ্ঞাপনে এই অবস্থার কারণ মূলত প্রযুক্তি। কোনও মানুষ অন্য ভাষা থেকে অনুবাদ করছেন না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে, অনুবাদ করছে মেশিন। ঢুকছে ইংরেজি। প্রসব হচ্ছে ভয়ংকর বাংলা। সামাজিক মাধ্যমে কোনও ‘ডায়নামিক ক্রিয়েটিভ’ বা ‘প্রোগ্রাম’ করা বিজ্ঞাপন অথবা ‘ক্যাটালগ’-জাতীয় বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হলে ‘মেটা’ সম্ভাব্য ভোক্তার ভৌগোলিক অবস্থান, স্থানীয় আচার-ব্যবহার, সাধারণ কথ্যভাষার আধিপত্যর ধরন ইত্যাদি খুঁজে নিয়ে নিজেই অনুবাদ করে দেয় সেটা। বিশেষ করে ‘ফেসবুক’ বা ‘ইনস্টাগ্রাম’-এর ‘ফিড’ ভোক্তার আঞ্চলিক অবস্থান বুঝে সেইভাবে তৈরি করে দেয় নিজেই। বিজ্ঞাপনদাতার নিশানায় যে অঞ্চলের বা সম্প্রদায়ের মানুষ চিহ্নিত হয়েছেন পণ্যের বা পরিষেবার সম্ভাব্য ভোক্তা-র একটা প্রধান অংশ হিসাবে, সেখানে মেটা নিজেই ঠিক করে নেয়, কোন ভাষায়, কীভাবে তাঁদের সঙ্গে কথা বললে কার্যসিদ্ধি হতে পারে। আর তাই, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে মেশিনেই তৈরি হয়ে যায় বিজ্ঞাপন। তাতে সাপ-ব্যাঙ যা-ই প্রসব হোক না কেন, কারও কিছুই করার থাকে না।
মজার ব্যাপার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাত থেকে রেহাই পায় না কাগজে ছাপা বিজ্ঞাপনও। যে কোনও ব্যাঙ্কের অথবা বিনিয়োগ সম্বন্ধিত পণ্যের আঞ্চলিক ভাষার বিজ্ঞাপন লক্ষ করুন, পরিষ্কার হয়ে যাবে ব্যাপারটা। এখানে প্রযুক্তির হাতে খবরের কাগজ বা ‘হোর্ডিং’-এর কাঠগড়ায় প্রতিনিয়ত বলি হচ্ছে সমস্ত প্রাদেশিক বা আঞ্চলিক ভাষা। শুধু বাংলা নয়। একটা সময়ের কথা মনে পড়ে, যখন ‘দ্য স্টেটসম্যান’ কাগজে ছাপার জন্য পাঠানো ইংরাজি বিজ্ঞাপনের বানানে বা ব্যাকরণগত ত্রুটি থাকলে ছাপা হত না সেই বিজ্ঞাপন। কাগজের সম্পাদকীয় বিভাগ দায়িত্ব নিয়ে দেখতেন যাতে কখনওই কোনও বেঠিক ইংরেজি ছাপা না হয় সেই কাগজে। তা সে খবরই হোক, বা বিজ্ঞাপন।
আজ অবশ্য সকলেই, বিজ্ঞাপন-স্রষ্টা এবং পাঠক, মেনে নিয়েছেন ব্যাপারটা। বিজ্ঞাপনের ভাষা, বানান বা ব্যাকরণ ঠিক না বেঠিক, তা নিয়ে অত চিন্তার কোনও প্রয়োজন নেই। সময়ও নেই। বিজ্ঞাপন তৈরি তো কোনও শিল্পকর্ম সৃষ্টি নয়, কোনও বিশেষ পণ্য বা পরিষেবার বিপণন আর বিক্রির জন্য তৈরি একটি ঘোষণা মাত্র। কোনও ছাপা বই তো নয়, যে পাঠক টাকা খরচ করে তা কিনবেন। ঘরের দেওয়ালে বাঁধিয়ে রাখার জন্য উপযুক্ত কোনও ছবি বা কোনও মহাপুরুষের বিশেষ বাণীও নয়। বিজ্ঞাপনের আয়ুর মেয়াদ বাঁধা। তার প্রয়োজন বা কর্মক্ষমতা তাৎক্ষনিক। কাজ ফুরলেই তার মৃত্যু। এবার কোনও বিজ্ঞাপনের স্রষ্টা তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত ‘বিগ আইডিয়া’-কে ভালবেসে ফেলে নিখুঁত, নিখাদ, নির্ভুল বিজ্ঞাপন লিখে, ছবি দিয়ে সাজিয়ে কোনও বিজ্ঞাপনের ‘অস্কার’ জেতার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করবেন কি না, তা নিয়ে তিনি বা তাঁর সংস্থা ছাড়া আর কারও কিসসু যায় আসে না। অবশ্য তাঁর সঙ্গে আছেন তাঁরই সমগোত্রীয় নিতান্তই হাতে-গোনা কিছু ‘ভাল-বিজ্ঞাপন’প্রেমী মানুষ। ব্যস! ওই পর্যন্তই।


অনেকগুলো প্রশ্ন মাথায় আসে আজকাল। সব কিছুর উত্তর মেলে না। স্বাধীনতার অনেক আগে পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বাঙালিকে ‘ছিন্নমূল জাতি’ বলেছেন। বলেছেন বাঙালি ‘আত্মবিস্মৃত’। নীরদ চৌধুরীর মতে, বাঙালি ‘অলস, আবেগপ্রবণ এবং আত্মঘাতী’। ঋতুপর্ণ ঘোষ একটি বিজ্ঞাপনের হেডলাইনে লিখেছিল, ‘বাঙালি খবর হন রোজ। হেডলাইন হন কখনও কখনও।’ আমি কর্মসূত্রে পশ্চিমবাংলার বাইরে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, বাংলার বাইরে, বেশিরভাগ কলকাতার বাঙালিকে কেউ পাত্তা দেয় না। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে প্রায় সব সময়েই। তাদের কাছে ‘বেঙ্গলি ফ্রম ক্যালকাটা’ মানেই অলস, ভাবপ্রবণ, সময়ের থেকে পিছিয়ে থাকা, ‘কালচার’, কবিতা, ফুটবল আর রাজনীতি-বিশারদ। ছুতো-সন্ধানী, হুজুগে পাবলিক। অধিকাংশ জাতীয় স্তরের ব্র্যান্ড-এর বিজ্ঞাপনের কাজ হয় বাংলার বাইরে। সুতরাং, সেই বিজ্ঞাপনের স্রষ্টা ভাবতেই পারেন, এই ধরনের বাঙালির জন্য বিজ্ঞাপন তৈরির ব্যাপারে অত ‘মাথা-পাচি’ করার কোনও দরকার আছে কি?
আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম ইশকুলে যে কী ধরনের বাংলা শিখেছে তা বলাই বাহুল্য। অবশ্য এ ব্যাপারে হয়তো কিছু ইশকুলের বাংলা শিক্ষকদের ভূমিকা অনেকাংশেই দায়ী। কলকাতার এক ইংরেজি মাধ্যম ইশকুলের বাংলা শিক্ষিকার কথা মনে পড়ছে আজ। বছর কুড়ি আগের ঘটনা। ‘য়’ দিয়ে শুরু, এ রকম বাংলা শব্দ না লিখতে পারা এক ছাত্রকে তার খাতায় শুধরে দিয়েছিলেন ‘য়ামাহা’ শব্দটি লিখে। সেসব ছাত্রদের অধিকাংশই আজ বাংলাকে ‘টাটা গুডবাই’ বলে পাড়ি দিয়েছে অন্য দেশে, অন্য প্রদেশে। তাদের পশ্চাৎদেশে ‘কলকাতার বাঙালি’ বা ‘বাংলার মুখ’ ছাপ মারা নেই। আর আমরা, এই হাতে-গোনা কয়েকজন, ইংরেজির সঙ্গে সঙ্গে ‘মোদের গরব মোদের আশা’ সম্বল করে আজও বসে আছি ‘বাংলা’-র দিকে তাকিয়ে, ‘সুদিন’-এর অপেক্ষায়।


‘আবেগপ্রবণ’। দেখেছেন? এই বাঙালি ‘আবেগপ্রবণ’ বলেই, যে-বিষয়ে লিখতে চেয়েছিলাম, তা এড়িয়ে, সুযোগ পেয়ে, যা ইচ্ছে তাই লিখছি। মানে, যাচ্ছেতাই। কে বলেছে, পশ্চিমবাংলার বা প্রবাসের বাঙালি বাংলা বিজ্ঞাপন বোঝেন না, দেখেন না? দেখে জিনিস কেনেন না? আজকের বাঙালি মোটেই অলম্বুষ নন। তিনি মোবাইল ফোনে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত বিজ্ঞাপন দেখেই বাংলা ভাষার ‘টি-শার্ট’ কেনেন। বাংলা ব্যান্ড আর নাটকের শোয়ের টিকিট কাটেন। বাংলা কাগজ পড়েন। তাতে ছাপা বেশ কিছু ভয়ংকর বাংলা বিজ্ঞাপনও দেখেন। ‘ইউটিউব’-এ বাংলা রেসিপি দেখে রান্না করেন নিয়মিত। প্রত্যেক একুশে ফেব্রুয়ারি সঠিক বাংলায় বাংলা ভাষার জনা দু-ফোঁটা চোখের জলে ভিজিয়ে ফেসবুক পোস্ট লেখেন। রিল তৈরি করেন বাংলাতেই। বিজ্ঞাপনকর্মী হলে (নিজের স্বার্থেই) প্রত্যেক বাংলা নতুন বছরে আর দুর্গাপুজোর আগে অবাঙালি মক্কেলদের মনে করিয়ে দেন, ওই সময়ে বাঙালিকে খুশি করতে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করার কথা। নিজের সংস্থার হয়ে বাংলা নববর্ষে তৈরি করেন বুদ্ধিদীপ্ত, উচ্চমানের শুভেচ্ছাবার্তা। বাংলা ছবির পাশে দাঁড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেন। ভিড় করেন বইমেলায়। সমসাময়িক অবস্থা আর রাজনীতি নিয়ে সর্বদা, সমস্ত পোস্ট লেখেন বাংলাতেই। কারও সঙ্গে মতপার্থক্য হলে তাঁকে সেখানেই সুনির্বাচিত কাঁচা বাংলা খিস্তি দিয়ে ভরিয়ে দেন। উকুলেলে বাজিয়ে, ফেসবুক-ইনস্টা সাজিয়ে দেন শচীনকত্তা, অখিলবন্ধু, মান্না দে আর বাংলা ব্যান্ড-এর গান দিয়ে।
আজ শুধুমাত্র ‘সীমিত সময়ের জন্য উপলব্ধ’ হলেও, এই বাঙালির জন্যই বেঁচে থাকবে বাংলা সংস্কৃতি, সাহিত্য, বিনোদন আর বিজ্ঞাপন। আর-একদিন, এই সীমিত সময়ের মধ্যেই হয়তো কেউ কেউ সোচ্চার হবেন পশ্চিমবাংলার ইশকুলে-ইশকুলে সঠিক ইংরেজি বা বাংলা জানা শিক্ষক-শিক্ষিকার জন্য। আবারও ইংরেজি-মাধ্যমের ইশকুলে-ইশকুলে সঠিক ইংরেজির পাশাপাশি ছাত্র-ছাত্রীরা শিখবে সঠিক বাংলাও। বাংলা বই পড়বে। শিখবে বাংলা প্রবাদ আর বাগধারার সঠিক প্রয়োগ। যে-কোনও ভাষাতে, যেখানেই হোক, বেঠিক বানান আর ব্যাকরণ লেখার আগে হাত কাঁপবে তাদের। হয়তো তারাই প্রতিবাদ করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি আর অনুবাদ করা বাংলা বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে। বাঙালির কথায়-কথায় আরও একবার ফিরে আসবে ‘কারণ’ আর ‘কেননা’ শব্দের মতো অনেক হারিয়ে যাওয়া বাংলা শব্দ। বাঙালির স্বার্থে। বাংলার স্বার্থে। এই দেশে সঠিকভাবে লেখা, কথা বলা বাংলা ভাষার স্বার্থে। এভাবেই হয়তো একদিন সত্যিকার অর্থে বলা যাবে, ‘এগিয়ে বাংলা’।



