ক্রিকেটের স্বার্থে

Representative Image

আবিশ্বের ক্রিকেটমহল সম্প্রতি বেশ উদ্বিগ্ন। ইমরান খান— পাকিস্তানের প্রাক্তন অলরাউন্ডার এবং প্রধানমন্ত্রী, তিন বছরের বেশি সময় কারারুদ্ধ। কিন্তু যে-তথ্যটি চাঞ্চল্যকর ও বিচলিত করছে, উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে, অবহেলায়, ইমরান খানের ডানচোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যেতে বসেছে প্রায়। যেটুকু অবশিষ্ট, তা সর্বসাকুল্যে ১৫ শতাংশ। ইমরানের বোন, আলিমা খান বলছেন, পরিবারের কাছে ইমরানের স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত স্পষ্ট কোনও মেডিক্যাল রিপোর্ট দেওয়া হয়নি। যা আছে, সম্পূর্ণ ত্রুটিপূর্ণ। নির্ভরযোগ্য নয়। জেল-কর্তৃপক্ষ এমনও জানিয়েছে, ব্যক্তিগত চিকিৎসকের সঙ্গে ইমরানের সাক্ষাৎ অসম্ভব।

ইসলামাবাদের একটি হাসপাতালে, প্রাথমিকভাবে চিকিৎসার অনুমতি মিলেছিল বটে, কিন্তু পাকিস্তান সরকার তা অগ্রাহ্য করে। আকস্মিক সিদ্ধান্ত! পাকিস্তানের আইন-সচিবের বয়ান একেবারে উল্টো। সেই কূটনীতিই অবশ্য সমীচীন। সরকারের তরফ থেকে যে দু’জন ডাক্তার, রাওয়ালপিণ্ডির আদিয়ালা জেলে ইমরানের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছেন, সময়ে-অসময়ে দেখভাল করছেন দুই চোখের, তাদের রিপোর্ট দাবি করছে— ইমরান এখন ভাল আছেন। যদিও সে-দৃষ্টি আবছা, তবু দেখতে পাচ্ছেন!

আরও পড়ুন: সাম্প্রয়াদিক নীতিই কি আইপিএল থেকে মুস্তাফিজুর রহমানের বাদ পড়ার কারণ? লিখছেন সোমক রায়চৌধুরী

দু’পক্ষের এহেন টানাপোড়েনের মধ্যিখানে ইমরান আদৌ কতখানি সুস্থ— সেই বিষয়ে ঢের সন্দেহ আছে। ক্রিকেটের গ্রিক দেবতা কোথায় নেমে এলেন তবে? একজন সাধারণের দুর্দশায়? আস্তাকুঁড়ে? যে-স্বাভাবিক প্রশ্নগুলো উঠবে— পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক নির্দ্বিধায় বলেছে, ইমরান খান একজন ক্রিমিনাল। কাজেই একজন ক্রিমিনালের প্রতি পাকিস্তান রাষ্ট্রের যে আচরণ, এই ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি। তবে এত নেকুপুষু করে কাঁদুনি গাওয়া কেন?

ঠিক তখনই, অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক— গ্রেগ চ্যাপেল, একটি পিটিশান দাখিল করেছেন। পাকিস্তান সরকার এবং জেল-কর্তৃপক্ষের কাছে। পিটিশান অনুযায়ী— ইমরানের উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক। আদিয়ালা জেলের স্বাস্থ্য পরিষেবা উন্নত হোক যত শীঘ্রই সম্ভব। গ্রেগ চ্যাপেল এবং ইমরান খান— দীর্ঘ সময়ের বন্ধু। যোগাযোগ রেখেছিলেন যেটুকু সম্ভব। অথচ জেলবন্দি হওয়ার পর থেকে, ইমরানের কোনওরকম খোঁজখবর পাননি। সেই কারণেই এই পিটিশন! ভেবেছিলেন, পৃথিবীর তাবড়-তাবড় ক্যাপ্টেন যদি পিটিশনে সই করতে সম্মত হন, সেটি তবে হয়ে উঠতে পারে একটি স্টেটমেন্ট। এবং চ্যাপেলের ভাবনাটি বাস্তবায়িত হয়েছে। স্যর ক্লাইভ লয়েড থেকে অ্যালান বর্ডার, নাসির হুসেন থেকে অর্জুন রনতুঙ্গা— পিটিশানের লিস্টে প্রাক্তন অধিনায়কেরসংখ্যা ১৫। সকলেরই বক্তব্যের সারবস্তু হল— ‘ট্রিট হিম উইথ ডিগনিটি!’ ইমরানের ভেতরে যে ক্রিকেটার-সত্তা, সেই সত্তা আসলে লড়ে, ঘাম ঝরিয়ে, অধিনায়কের দায়িত্ব কাঁধে, বিশ্বকাপ জিতেছিল। ’৯২ সালে। অমন দাপুটে আর তুঙ্গ সোয়্যাগের অলরাউন্ডার, পাকিস্তানে তৈরি হয়েছে আর? সেই সম্মান, সেই ক্যারিশ্মা, সেই ক্রিকেটীয় জাদু— পুরোটাই কি উবে গেল? শুধুমাত্র রাজনীতির গ্যাদগ্যাদে ঘূর্ণিপাকে?

মনে পড়ছে, আফগানিস্তানের কথা। দারুণ বেকারত্ব। বাকস্বাধীনতা শূন্য। ধর্মীয় শাসনের বুলডোজার এতখানি বিস্তৃত ও হিংস্র, যখন ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপে আটকেছিলেন অসংখ্য নারী, কাতরাচ্ছিলেন, এগিয়ে আসেনি কোনও পুরুষ। দেশ এক অর্থে টুকরো-টুকরো। দ্বন্দ্বে। বিরোধে। সংঘর্ষে। যেন স্বতন্ত্র কোনও পরিচয় নেই, নিঃস্ব, যা থেকে তৈরি হতে পারে সম্ভ্রম।

তবু আফগানিস্তানের অগুনতি নাগরিক বলেছেন— প্রতি পলের অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি দেয়, একমাত্র ক্রিকেট! মুক্তি পেয়ে তারা শেখে রশিদ খানের স্পিন-বোলিং। বলে আজমাতুল্লাহ ওমারজাই, কখনও-বা রহমানউল্লাহ গুরবাজের কথা। একমাত্র তখনই, দেশের সমস্ত সংঘর্ষ থেমে যায়। এ আসলে এক ধরনের ক্রিকেটীয় ঐক্য।

সাম্প্রতিক সময়ের পৃথিবীতে, আফগানিস্তানের সেই অনন্য আইডেন্টিটি কিন্তু ক্রিকেট থেকেই নির্মিত! সেই পরিচিতি, সেইক্রিকেটীয় দক্ষতা এবং প্যাশন এতখানি মনোমুগ্ধকর, যে আমরা, অন্যদেশের মানুষেরা, অনায়াসেই ভুলে যাই আফগানিস্তানের কুৎসিত তালিবানি শাসন। আফগানিস্তানের ক্রিকেট দেখতে-দেখতে, অজান্তেই আমাদের মনে যেন জন্মেছে সমীহ। শ্রদ্ধা। আবেগ। তেমনই পাকিস্তানের ক্ষেত্রে, ইমরান খান! অতএব, দেশের ওপরেও নিশ্চিত কিছু দায় বর্তায়। এবং সেই কর্তব্য পালনে, পাকিস্তান আপাতত অপারগ। 

তাই বলতে হয়, অধিনায়কেরা অধিনায়ক-সুলভ কাজ করেছেন। খেলার নিয়ম! মাঠের ভেতরে এবং বাইরেও। ইমরানের পরিবার যখন অসহায়! দলের কর্মীরা যখন বলছেন, ইমরানের বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ মিথ্যে, অথচ প্রত্যেকেই বিভ্রান্ত! বোধহয় একজন অধিনায়কই তখন বুঝতে পারেন, কী করতে হবে। এ-আসলে একধরনের ক্রিকেটীয় বোধ। যা রক্তে ঢুকে যায় আজীবনের মতো। সেই স্পোর্টসম্যান স্পিরিট! যেখানে ইমরান খান এখনও হয়তো গ্রিক দেবতাই। সুপারস্টার। কোনও অবিস্মরণীয় ইনিংস যেন ক্রমে-ক্রমে আবছা করে দিয়েছে পাকিস্তান রাষ্ট্রের যাবতীয় অভিযোগ!

গ্রেগ চ্যাপেল রীতিমতো বিস্মিত হয়েছেন আরও একটি কারণে। ইমরানের জন্য পিটিশানে সই করেছেন— সুনীল গাভাস্কার এবং কপিল দেব! সম্প্রতি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় একটি সাক্ষাৎকারে বলছেন, সমগ্র পৃথিবীর মানচিত্রে, পাকিস্তানের পরিচয় তৈরি করতে পেরেছিলেন ইমরান খান। ক্রিকেটীয় পরিসরকিংবা রাজনীতি। উভয়ক্ষেত্রেই। তাই চ্যাপেল বলছেন, যেহেতু আমি একজন অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক, আমার পক্ষে এই পিটিশানে সই করা অত্যন্ত সহজ। কিন্তু সুনীল গাভাস্কার? কপিল দেব? যদি বিগত বছরের ভূ-রাজনীতি লক্ষ করি, যদি প্রধানমন্ত্রী ইমরানের ভারত-নীতি লক্ষ করি, স্পষ্টতই বোঝা যায়, গ্রেগ চ্যাপেল বিস্মিত হয়েছেন কেন! এখানেই মহৎ হয়ে ওঠেন কপিল দেব। সুনীল গাভাস্কার। উভয়ের ক্রিকেটার-সত্ত্বা। মহৎ শব্দটিও বড় বেমানান আসলে। ভারতের দুই প্রাক্তন অধিনায়কের খেলোয়াড়-সুলভ আচরণও ইদানীং আশ্চর্য করে আমাদের!

মহৎ আসলে এই ক্রিকেটীয় ঐক্য। দেশের বাইরেও একখানি দেশ। মুক্তচিন্তা। ভালবাসা। গাভাস্কার বলছেন, ইমরানের যখন ১৭ বছর বয়স, ওয়ার্চেস্টারশায়ারে যখন কাউন্টি খেলছে, তখন থেকে আমাদের বন্ধুত্ব। দুই দেশের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের আঁচে সেই বন্ধুত্ব পোড়ে না। পোড়ে না ক্রিকেটার ইমরানও।

তাই ঐক্যের কথাই বলি। আর এ-কথাও মনে করিয়ে দিই, সোনম ওয়াংচুক, উমর খালিদ এখনও কারারুদ্ধ। আমার দেশে।