সম্পাদকের বৈঠক: ২

Representative Image

সাক্ষাৎকার। অজয় গুপ্ত

অজয় গুপ্ত বাংলা গ্রন্থ ও প্রকাশনা জগতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম । ৯০-এর দোরগোড়ায় এসে, এখনও নির্মাণ করে চলেছেন একের-পর-এক বই। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে আজও তাঁর নিত্যসঙ্গী ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অফ সলিটিউড’ এবং ‘গীতবিতান’। তাঁকে অধিকাংশ মানুষ সম্পাদক হিসেবে চিনলেও, একসঙ্গে তিনি অনুবাদক, প্রচ্ছদশিল্পী এবং গদ্যলেখক। বিশ্ব বই দিবসে, বই-দুনিয়ার নানান খুঁটিনাটি নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথোপকথনে শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়…  

গল্প-উপন্যাসলেখক, প্রচ্ছদশিল্পী, গ্রন্থ-সম্পাদক, বই-নির্মাণশিল্পী, প্রেসম্যান, প্রুফ সংশোধক— আসলে অজয় গুপ্ত কে?

অজয় গুপ্ত, তার সময়ের পরিচালিত একজন সাধারণ মানুষ। যে-বিশেষণগুলো তুমি আমায় দিলে, (যদি এগুলোকে বিশেষণ বলা যায় আদৌ)— তার সব ক’টাই আমার জীবনে এসেছে বাধ্যতামূলকভাবে। আবার এই ‘বাধ্যতামূলক’ বিষয়টার পেছনেও একটা জন্মগত কারণ থাকতে পারে; আমি প্রায় জন্ম থেকেই এই কাজগুলো করেছি, কেউ আমাকে হাতে ধরে শেখায়নি। আমার পরিবারে, বাবা লিখতে পারতেন। ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় পুজোর পরে ‘বিজয়ার বিলাপন’ বলে বাবার একটা লেখা বেরিয়েছিল, বাবার লেখা একটা কবিতার বইও ছিল, নাম— ‘পল্লব’। কবিতার বইটা আমি দেখিনি, নাম শুনেছি। বাবার কাছে এও শুনেছি যে, বাবা নাটক লিখতে পারতেন।

অজয়দা, আপনি বললেন— আপনার বাবার দিক থেকে আপনার কাজে-লেখালিখিতে একটা অনুপ্রেরণা এসেছিল, আপনার জ্যাঠামশাইও ভাল ছাত্র ছিলেন…

আমাদের মূল আবাস ফরিদপুর হলেও, কলকাতার ২২ নম্বর বিডন স্ট্রিটে আমাদের একটা ঠেক ছিল। আমার জ্যাঠতুতো দাদাদের কেউ-কেউ, কাকামণি— আরও অনেক আত্মীয়স্বজন থাকতেন সেখানে। এঁদের সকলেরই শিক্ষা কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে। আমার জ্যাঠামশাই, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ক্লাসমেট ছিলেন; তিনি বিএ পরীক্ষা দেন ইংরেজি অনার্স নিয়ে, সম্ভবত ফার্স্ট ক্লাস, এমএ পরীক্ষা দেন বাংলা নিয়ে, ফার্স্ট ক্লাস। কিন্তু কোনওদিন তিনি শহরে আসেননি, গ্রামের ইস্কুলে মাস্টারি করেছেন।

আসলে অনেক কিছুই আমি জীবনে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে গোত্র-পদবি এবং ‘কন্সটিপেশন’। যাই হোক, জ্যাঠামশাই কিন্তু লেখক ছিলেন না; তাঁর ভাণ্ডারে অনেক নতুন শব্দ ছিল, অভিধানে যাওয়ার মতো শব্দ। রাজশেখর বসু সংকলিত ‘চলন্তিকা’র ঋণপত্রে, ‘কুমুদনাথ গুপ্ত’-র নাম রয়েছে, উনিই আমার জ্যাঠামশাই।

অজয়দা, যে-প্রসঙ্গ দিয়ে আমাদের আড্ডা শুরু হয়েছিল— সম্পাদনা-প্রচ্ছদশিল্প-সামগ্রিক প্রেসের কাজ, এগুলোকে কি আপনি একে অপরের পরিপূরক বলে মনে করেন?

অবশ্যই! এর প্রত্যেকটাই একে অপরের পরিপূরক। আমার বাড়ির কেউ কোনওদিন এই কাজগুলো করেনি, আমিই প্রত্যেকটা ধাপে-ধাপে শিখে এগিয়েছি।

আপনার আদি নিবাস ফরিদপুরে বললেন। সে-সময়ে দেশভাগের পর ‘উদ্বা‌স্তু’ শব্দটা জনপ্রিয় হয়ে গেল, কিন্তু আপনি উদ্বা‌স্তুর পরিবর্তে ‘উদ্‌বৃত্ত’ শব্দটা ব্যবহার করেছেন। আপনার তো একটা কলোনিজীবন ছিল, সেখানকার বন্ধুবান্ধবদের স্মৃতি কেমন?

দেশভাগ হওয়ার আগে, ’৪৬-এর দাঙ্গার সময়ে আমি কলকাতা চলে আসি। দমদমের কাছে হরকালী কলোনিতে (এখন সম্ভবত নাম বদলেছে) যখন আমরা থাকতাম, সে-সময়ে বন্ধুবান্ধব বলতে মিহিরের কথা এখনও মনে আছে, মনে পড়ে অধীরের কথা। মিহির ব্যাংকে চাকরি করত, অধীর স্টেট ট্রান্সপোর্ট-এর কন্ডাক্টর ছিল; ওর বাবা ছিলেন শাঁখারি। আমরা দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ওঁকে শাঁখ কাটতে দেখতাম। কানাই ছিল পেশাদার চোর; বয়সে একটু বড় হলেও, ডোয়ার্ফ সাইজের ছিল বলে, আমাদের সঙ্গে খেলত। ওর সঙ্গে আমরা গায়ের জোরে পারতাম না। কিন্তু ও সাঁতার জানত না বলে, হাডুডু খেলার সময়ে ওকে জড়িয়ে আমরা জলে পড়ার চেষ্টা করতাম। কারণ আমরা তো সাঁতার কেটে বেরিয়ে যাব, কানাই পারবে না! দুষ্টু ছিলাম খুব! কানাই থাকত ওর বউদি এবং দাদাদের সঙ্গে। কানাইয়ের বড়দাদা-বউদি থাকত একটা ঘরে, ও আর ওর মেজদা থাকত আরেকটা ঘরে। একদিন রাত্রিবেলা কানাইয়ের চিৎকার— ‘মা কালীর কিরা দাদা, মাইরো না! আমি চুরি করার লগে ঢুকি নাই, বউদির লাইগ্যা ঢুকসি।’ ঘরে সেদিন সিঁধ কেটে ঢুকে পড়েছিল।

কোনও সম্পাদকই সর্ববিদ্যাবিশারদ নন, এই বিনয় তাঁকে আজীবন রাখতে হবে!
পড়ুন: শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার…

এই যে কলোনিতে আপনি বড় হচ্ছেন, সেখানে বইপত্র পড়া হত?

তখন আমরা কাকামণিদের সঙ্গে থাকতাম। আমাদের টিনের ঘরের চৌকিতে, আমি আর আমার ভাই শুতাম। সে-ঘরে আমরা একটা লাইব্রেরি খুলেছিলাম এবং দরমার সঙ্গে কাগজ লাগিয়ে, হাতে লেখা দেওয়াল-পত্রিকাও করেছিলাম। তখন আমাদের বছর দশেক বয়স।

আচ্ছা, এই দেওয়াল-পত্রিকাই কি তাহলে আপনার প্রথম সম্পাদনা? কী নাম ছিল পত্রিকার? আর অত অল্প বয়সে হাতে লিখে পত্রিকা বের করার পরিকল্পনাটাও তো চমৎকার…  

হ্যাঁ, তা বলা যেতে পারে; পত্রিকার নাম ছিল, ‘প্রভাতী’। আসলে আমি ছোটবেলা থেকেই— হাতের লেখা ভাল করার চেষ্টা করতাম, পরে বড় হয়ে, ‘গ’ লেখা আলাদা করে শিখেছিলাম সুবোধদার (সুবোধ দাশগুপ্ত) থেকে। আর ‘ম’ আর ‘স’ লেখা শিখেছিলাম মলয়শংকর দাশগুপ্তর থেকে। সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত, মলয়শংকর দাশগুপ্ত, অসীম সেনগুপ্ত, অজয় গুপ্ত আমরা এই ক’জন আবার কলেজ-ম্যাগাজিনেরও সম্পাদক হয়েছিলাম।

আমি আবার একটু পুরনো দিনে ফিরে যাব। এই যে আপনি হরকালী কলোনিতে থাকেন, যেখানে ফুটবল খেলছেন, হাডুডু খেলছেন, পুকুরে সাঁতার কাটছেন আবার দশ বছর বয়সে নিজের একটা লাইব্রেরিও খুলেছেন, কেউ বলে দেয়নি, তবু ‘প্রভাতী’ নাম দিয়ে একটা দেওয়াল পত্রিকা করছেন, তখন কি আপনার নিজের লেখা সামান্য হলেও শুরু হয়েছিল?

আমার নিজের লেখা তো ক্লাস নাইনের আগে প্রকাশিতই হয়নি!

তাহলে ‘প্রভাতী’তে লিখতেন কারা?

আমার বন্ধুবান্ধবরাই। আমার প্রথম প্রকাশিত লেখা, শেক্সপিয়রের একটা কবিতার অনুবাদ। আমাদের পাঠ্য ছিল কবিতাটি। কী অনুবাদ করেছিলাম, আজ আর সঠিক মনে নেই। সবুজ গাছের নীচে, যে-জন বসবে আমার সাথে… এরকম কিছু একটা লিখেছিলাম।

আপনি বড় হয়ে উঠেছেন হরকালী কলোনিতে, তার পর পড়েছেন স্কটিশ চার্চের মতো সাহেবি-খ্রিস্টান প্রতিষ্ঠানে, এই দুটো তো সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পটভূমি। এই দুইয়ের মধ্যে সেতুবন্ধন হয়েছিল কীভাবে? কোনও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাবোধ তৈরি হয়নি?

সেতুবন্ধন হয়েছিল আমার কাকার সূত্রে। যে-কাকার বাড়িতে আমি থাকতাম, সে-কাকা ছিলেন ওই স্কুলের টিচার। নীচু ক্লাসে পড়াতেন। হ্যাঁ, বিচ্ছিন্নতাবোধ তৈরি হয়েছিল। পড়া করে গেলেও হাত তুলতে পারতাম না; যেমন ধরো আমরা জানতাম, পাখি যার সাহায্যে ওড়ে, তাকে বলে পাখা, কিন্তু ক্লাসে বলতে হবে ডানা। মানে সাংঘাতিক! আর পড়া না পারলেই মার! যেহেতু আমি ‘রিফিউজি’, স্কুলের নির্দিষ্ট পোশাক না পরলেও চলত, স্কুলের ছাপানো খাতা না নিয়ে গেলেও চলত, নিজেই বানিয়ে নিতাম। কিন্তু এই সুবিধেগুলো পাওয়ার জন্য স্কুলের তরফ থেকে শর্ত ছিল, ‘এ’-সেকশনে বরাবর থাকতে হবে, মানে পরীক্ষায় ৬০% কিংবা তার উপরে নম্বর পেতে হবে। ‘এ’-ওয়ান, ‘এ’-টু, ‘বি’-ওয়ান, ‘বি’-টু— এরকম নানা সেকশন ছিল।

স্কুলে আপনার সহপাঠী কারা ছিলেন?    

অতীশ সিংহর কথা মনে পড়ে, ওর বাবা ছিলেন বিমলচন্দ্র সিংহ। ওঁরা পাইকপাড়ার রাজাদের উত্তরসূরি। অতীশের ভাই ছিল প্রখ্যাত বিজ্ঞানী বিকাশ সিংহ। আমি দমদম-কলোনি থেকে খালপাড় অবধি নেমে এসে স্কুল পর্যন্ত হেঁটে যেতাম প্রায়ই।

সে তো অনেকটা রাস্তা…

হ্যাঁ, অনেকটা… অতীশদের একটা বড় হুডখোলা গাড়ি ছিল, ও আর বিকাশ সেটায় করে স্কুলে যেত। রাস্তায় যাওয়ার পথে দেখা হলে আমাকেও তুলে নিত কখনও-সখনও। পরবর্তীকালে আশিস বসুমল্লিকের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়, যে পরে আই আই টি-তে গিয়ে বড় কাজ করে। প্রায়ই আসত আমাদের বাড়িতে। আমার তো ইতিহাস-ভূগোল-বাংলার জন্য কোনও আলাদা মাস্টার ছিল না, নিজেই পড়তাম। কিন্তু অঙ্কে খুব দুর্বল ছিলাম। মনে আছে, একবার অঙ্কে শূন্য পাওয়াতে, মা কেঁদে ভাসাল; সেই থেকে ঠিক করলাম যে— না, মাকে দুঃখ দেওয়া যাবে না। অঙ্কে অন্তত পাশ নম্বর তুলতেই হবে। আশিস স্কুল ছুটির পরে আমাকে জ্যামিতির এক্সট্রা, বীজগণিত— এগুলো দেখিয়ে দিত। মনে আছে, আমার বাবা একবার বলেছিল, যেই অঙ্ক পরীক্ষার খাতায় ৩০ নম্বর মতো তুলে ফেলতে পারবি, খাতা জমা দিয়ে চলে আসবি; কারণ আমি যেটুকু অঙ্ক করতে পারতাম, ঠিকভাবে পারতাম। বাবা বলত, শুধু-শুধু ভুল অঙ্ক করে নিজের সময় নষ্ট, যে করবে তারও সময় নষ্ট। এরকম করেছিলাম বোর্ডের স্কুল-ফাইনাল পরীক্ষায়। সেবার ৫০ পেয়েছিলাম।

স্কুল-ফাইনাল পরীক্ষার পর, আপনি গেলেন আশুতোষ কলেজে। সে-সময়ে আপনার মাস্টারমশাই ছিলেন নির্মাল্য আচার্যর মতো মানুষ। শুনেছি, কলেজ ম্যাগাজিনের সম্পাদক হওয়ার জন্যে তখন নাকি একটা পরীক্ষার বন্দোবস্ত ছিল?

হ্যাঁ, ইন্টারভিউ-লিখিত পরীক্ষা হত। আর্টস, সায়েন্স, কমার্স— যে-কোনও বিভাগের ছাত্র সেই পরীক্ষায় বসতে পারত। আমি তখন ‘মানস’-এর সহ-সম্পাদক, থার্ড ইয়ারে পড়ি।

আপনার প্রথম গল্প প্রকাশিত হল কবে?  

সময়টা সম্ভবত ১৯৫৫, আমার প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়। তখন আমি ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। গল্পের নাম আজ মনে নেই, বিষয়টা এক জাল ওষুধের কারবারিকে কেন্দ্র করে। এখানে একটা অন্য প্রসঙ্গও রয়েছে। সে-সময়ে ‘খেয়ালি’ বলে একটা প্রতিষ্ঠান ছিল, যারা গল্প প্রতিযোগিতার আয়োজন করে; সেখানেও আমি গল্প পাঠিয়েছিলাম, গল্পটা নির্বাচিত হয়। বিচারক ছিলেন পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়।

মানে পৃথ্বীশ গঙ্গোপাধ্যায়ের বাবা? পৃথ্বীশ আপনার সহপাঠী ছিলেন না?

হ্যাঁ, পৃথ্বীশ আমার স্কুলজীবনের সহপাঠী। যদিও আমরা এক সেকশনে পড়িনি, কিন্তু ওর সাহিত্য পরিষৎ স্ট্রিটের বাড়িতে প্রায়শই যাতায়াত ছিল। পৃথ্বীশ আমাকে বলত, আমার হাতের লেখা পরে ভাল হবে।

অজয় গুপ্ত

তাহলে ‘খেয়ালি’ আয়োজিত গল্প প্রতিযোগিতার পুরস্কার লাভ আপনার প্রথম সাহিত্য পুরস্কার?

হ্যাঁ, তারপরে, খুব সম্ভবত ’৬৪ সাল নাগাদ ‘সুলেখা’-র গল্প-প্রতিযোগিতায় গল্প পাঠাই। সেখানে বিচারকমণ্ডলীতে ছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। সে-প্রতিযোগিতায় দিব্যেন্দু পালিত, বরেন গঙ্গোপাধ্যায় মেয়েদের ছদ্মনামে নামে অংশ নিয়েছিলেন।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তখন কথা হয়েছিল?

হ্যাঁ, মঞ্চে। আমাকে বললেন, এ কী! তুমি তো নাবালক! যে-সব কথা গল্পে লিখেছ, সেগুলো দেখেছ নিজের চোখে? আমি বলেছিলাম হ্যাঁ, ট্রেনের জানলা দিয়ে দেখেছি।

আপনি ‘মানস’-এর সম্পাদক হয়েছিলেন, আশুতোষ কলেজে পড়ার সময়তেই। সম্পাদক ছিলেন কল্যাণশ্রী চক্রবর্তী আর রবি রায়। ওঁদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল কীভাবে? এই সময়পর্বটা যদি বলেন, কারণ আমার মনে হয়, ‘মানস’ পত্রিকা এবং প্রকাশনা এমন একটা সময়, যা লেখক-সম্পাদক ও প্রচ্ছদশিল্পী অজয় গুপ্তকে লালন করেছে।

যখন আমি আশুতোষ কলেজে ভরতি হলাম, তখন আমাকে একদিন একজন সুদর্শন যুবক এসে, যেচে প্রস্তাব দিল, ‘মানস’ বলে একটা পত্রিকা বেরোচ্ছে, তার সঙ্গে যুক্ত হব কি না। তিনিই কল্যাণশ্রী চক্রবর্তী। আমার থেকে এক বছরের সিনিয়র। রবি রায়ও ছিলেন।

পত্রিকার দপ্তর কোথায় ছিল?

বউবাজারের ওখানে, ফিরিঙ্গি কালীবাড়ির উলটোদিকে। ‘মানস’-এ যখন আমি গেলাম, তখনও পত্রিকা শুরু হয়নি, কিন্তু তার কাজ চালু হয়ে গেছে। ত্রৈমাসিক কাগজ ছিল, প্রকাশিত হত প্রবন্ধ-গল্প-কবিতা। মনে আছে, হাতে করে কাগজের বান্ডিল নিয়ে ঘুরতাম, প্রেসম্যান ছিলেন পরেশবাবু। একদিন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ডেকে বলেছিলেন, সারাদিন কাগজ করলে পরীক্ষা দেবে কী করে!

শুনেছি একবার আপনি ‘মানস’ পত্রিকার জন্য নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প এনে রিফিউজ করেছিলেন?

হ্যাঁ, গল্প দিয়েছিলেন একটা; সেটা পড়ে মনে হয়েছিল— ঠিক লিট্‌ল ম্যাগাজিনের গল্প নয়। ওঁকে সেটা জানাতে, ফেরত চান ইতস্তত না করেই। স্বীকার করেছিলেন, ঠিক লিট্‌ল ম্যাগাজিনের গল্পর মতো হয়নি। পরে অন্য কোথাও সেটা দিয়ে দেবেন, জানান। ক্লাসে কিন্তু নারায়ণবাবু আমার গল্প নিয়ে ভাল-মন্দ আলোচনা করতেন। কোন জায়গাটা কীরকম করলে ভাল হত, এ-ধরনের আলোচনা আর কি! তবে, পরে আর ওঁর লেখা ‘মানস’-এর জন্য নেওয়া হয়নি।

আর কার-কার লেখা সে-সময়ে ‘মানস’ পত্রিকায় ছেপেছেন?

রতন ভট্টাচার্য, বরেন গঙ্গোপাধ্যায়, সুনীল-শক্তি, মানস রায়চৌধুরী-সহ আরও অনেকের লেখাই তখন ‘মানস’-এ ছাপা হয়েছে।

‘মানস’ প্রসঙ্গে একটা মজার ঘটনা মনে পড়ছে, আপনার লেখাতেই পড়েছি; প্রেসের পরেশবাবু নাকি একবার আপনার গল্পে চরিত্রের নাম বদলে দিয়েছিলেন?  

হ্যাঁ, তখন তো হ্যান্ড কম্পোজ হত, হ্যান্ড কম্পোজের ক্ষেত্রে আপার-লোয়ার দুটো কেস হত। বাংলাতে থাকত ৪৪৪-টা ঘর, সেখানে র-ফলা, জ-ফলা এরকম অনেক কিছু মিলিয়ে অন্তত ছ’শো রকমের বেশি টাইপ কেস থাকত। আমি ইংরেজিটা শিখতে পেরেছিলাম, বাংলাটা পারিনি সেভাবে। টাইপ কেসের এহেন গঠনের জন্য, মজার কিছু ভুল হত। ধরা যাক, ‘উ’ আর ‘ল’ পাশাপাশি থাকত, সে-কারণে অনেক সময়েই উপন্যাস হয়ে যেত ‘লপন্যাস’। তখন কোন টাইপ কত পরিমাণ কিনলে কতটা কম্পোজ হবে, আন্দাজ করা যেত; ধরা যাক, বাংলার এক ফর্মা টাইপের জন্য টাইপ কেস লাগত ৪০ কেজি। সঙ্গে কিছু শর্ট-টাইপও কিনতে হত, সেটা মূলত লেখায় কোন অক্ষর বেশি পরিমাণে এসেছে, তার উপরে নির্ভরশীল হত। যেমন রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষে, ‘ন্দ্র’ বেশি পরিমাণে ব্যবহৃত হয়েছিল। আমার গল্পে, ছেলেটির নাম ছিল অক্রূর, মেয়েটির নাম ময়ূরী। যেহেতু অক্রূর গল্পের নায়ক, ‘ক্রূ’ তো প্রচুর পরিমাণে লাগবে। বদলে অসীম করে দিলেন। একই কারণে ময়ূরী নামটাও বদলে দিয়েছিলেন। এরপরে কবে আবার কোন লেখায় ‘ক্রূ’ অক্ষর আসবে, তার জন্য টাইপ কেস কেনার ঝক্কি এড়ানোই এই বদলের মূল কারণ। 

‘মানস’ থেকে যখন বই বেরনো শুরু হল, তখন আপনি মানস রায়চৌধুরীর একটা কবিতার বই করলেন, নাম ‘অনিদ্র গোলাপ’; সেটা ছাপার পেছনে একটা মজার গল্প ছিল না?

হ্যাঁ, ঠনঠনিয়া থেকে এগিয়ে, শ্রীমানি মার্কেটের ওখানে, লয়েড প্রেসে ‘অনিদ্র গোলাপ’ ছাপা হয়েছিল। ছাপতে গিয়ে দেখা গেল, মেশিনম্যান গাঁজা খায়। এবারে গাঁজা যারা খায়, তারা দুধ খেতে ভালবাসে; রাত্রিবেলা ভাঁড়ে করে দুধ নিয়ে সেই মেশিনম্যানকে খাইয়ে কাজ করানো হত। ভদ্রলোকের নাম ছিল মাখনবাবু। 

‘মানস’-এ সম্পাদক হিসেবে থাকার সময়েই ১৯৬১ নাগাদ আপনার প্রথম উপন্যাস ‘চন্দ্র সূর্যের আকাশ’ প্রকাশিত হচ্ছে; সেই উপন্যাসের একটা চমৎকার রিভিউও বেরোচ্ছে আনন্দবাজার পত্রিকায়। এই উপন্যাসের কয়েক বছর পর ‘ক্ষয়’, ‘কুশল সংবাদ’ হয়ে এখনও পর্যন্ত আপনার শেষ লেখা উপন্যাস ‘স্বপ্নপুরাণ’। একটা সময়সরণি যদি তৈরি করা যায়,  ১৯৬০ থেকে ২০০০ এই দীর্ঘ ৪০ বছরে একজন সৃজনশীল লেখক মাত্র চারটে উপন্যাস লিখলেন?

এর উত্তরে আমি যেটা বলব, সেটা বিশ্বাসযোগ্য নাও মনে হতে পারে। যে-সময়ে আমি লেখা শুরু করলাম, আমার সিনিয়র ছিলেন বীরেন চট্টোপাধ্যায়, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী। আমাকে খুব স্নেহ করতেন ওঁরা, আমার লেখাও খুব ভালবাসতেন। জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী আমাকে বলেছিলেন, ‘মনে রেখো যদি লিখতে হয়, তবে অন্য কিছু করা চলবে না।’ কিন্তু আমার পক্ষে সেটা সম্ভব হয়নি, আমাকে সংসার চালানোর জন্য অর্থ রোজগারের দিকে নজর দিতে হয় অল্প বয়সেই। বাবা হঠাৎ অসুস্থতার জন্য অবসর নিয়ে ঘরবন্দি হলেন, আমার অর্থ রোজগার করা ছাড়া কোনও উপায় ছিল না। সেটার জন্য আমাকে একইসঙ্গে একাধিক কাজ করতে হয়েছে।  

কিন্তু আপনার প্রথম উপন্যাসদুটো যখন বেরোচ্ছে, তখন তো আপনাকে বাংলা সাহিত্যের উদীয়মান ঔপন্যাসিক হিসেবে অনেকে ধরেই নিয়েছেন… সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যখন ‘আজকের গল্প’ বলে বইটা করলেন, প্রকাশ করলেন কৃষ্ণগোপাল মল্লিক, সে-বইয়ের প্রথম গল্পই আপনার— ‘দ্বাররক্ষীর স্বপ্ন’। এই লেখাটার অন্যতম থিম হিসেবে উঠে আসছে ‘মৃত্যু’। আপনার অন্য গল্প-উপন্যাস লক্ষ করলেও দেখা যাবে, একটা দীর্ঘ দুপুরবেলা, অপরাহ্ণ ফিরে-ফিরে আসছে…  এর পেছনে কী কারণ?

আমার মনে আছে, একদিন প্রচণ্ড গরমের দুপুরবেলা আমি বাড়িতে রয়েছি; বড় রাস্তা দিয়ে একটা লরি-মতো কিছু যাচ্ছে, আর দুপুরের সেই নির্জনতা ভেদ করে অদ্ভুত একটা শব্দ আসছে, আজও সেই শব্দ আমার কানে বাজে।

এটা কি কোথাও গিয়ে একটা নিঃসঙ্গতাকে ইঙ্গিত করছে?

তোমার কি মনে হয় না? আমি সত্যিই নিঃসঙ্গ…      

কিন্তু সেই নিঃসঙ্গতা আপনাকে লেখার দিকে না ঠেলে, সংসারের দিকে ঠেলে দিল কেন?

আমি সত্যিই সময় পাইনি! টাকা রোজগার হবে, এমন কোনও কাজ না করে আমার উপায় ছিল না। মানে কতটা বেপরোয়া হলে আমি এমএ পড়তে-পড়তে নোটবই লিখতে শুরু করে দিই! আমার কিন্তু নাম সামনে ছিল না, নাম থাকত স্বনামধন্য সব অধ্যাপকের।

আবার আমরা একটু পিছিয়ে যাই। আপনি যেমন বললেন, সম্পাদনা বা প্রচ্ছদ এগুলোর কোনওটার সঙ্গেই আপনি পূর্ব-পরিকল্পিতভাবে যুক্ত হননি, সময়ের সঙ্গে-সঙ্গেই যুক্ত হয়েছেন এই কাজগুলোর সঙ্গে… আপনার প্রথম প্রচ্ছদ কীভাবে হয়েছিল?

আমি ‘মানস’-এ যোগ দেওয়ার আগেই, প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদ করে দিয়েছিলেন জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর ভাই শঙ্কর নন্দী। একটা ব্রাশে ইয়োলো অকার দিয়ে, ব্রাউনের ওপরে চমৎকার কাজ করেছিলেন। প্রথমবারে পত্রিকার সাইজ অনুযায়ী কাজটা করা হলেও, দ্বিতীয় সংখ্যা থেকে আমিই প্রচ্ছদ করি। ‘মা’ ‘ন’ ‘স’ এই অক্ষরগুলো দিয়েই নানাভাবে সাজাতাম…

অক্ষর নিয়ে তো আপনার ছোটবেলা থেকে বিশেষ যত্ন ছিলই…

হ্যাঁ, মানসের জন্য একইসঙ্গে ইংরেজি-বাংলা লেটারিং মিলিয়ে, নিরীক্ষামূলক প্রচ্ছদ করেছিলাম। ‘মানস’-এর মলাটই আমার প্রচ্ছদ হিসেবে প্রথম কাজ। এরপর ‘একতা’ পত্রিকা-সহ আরও নানা কাজ করেছিলাম; ‘একতা’-র মলাটে রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবিও কাজে লাগিয়েছিলাম। একদিন কলেজে ক্লাস করছি, স্যারেদের ঘরের উলটোদিকে ১০০ নম্বর ঘরে আমাদের ক্লাস ছিল। দেখি তুষারদা (তুষার চট্টোপাধ্যায়) ডাকছেন, গিয়ে দেখি পূর্ণেন্দুও দাঁড়িয়ে। যাওয়ার পর ব্যাগ থেকে, আমার করা ওঁর বইয়ের একটা কভার বের করে দেখিয়ে বললেন, ‘দেখ পূর্ণেন্দু, অজয় এটা করেছে।’ পূর্ণেন্দু তুষারদাকে বললেন, ‘তুই এটা ছাপ! এ তো দারুণ হয়েছে!’ আমি দেখে অবাক! আমি তখন নভিস, আমার কাজ দেখে ওরম বলছেন! পরে পূর্ণেন্দুদার সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হলেই বলেছেন, ‘খুব ভাল কাজ হচ্ছে।’ আমিও হাত নাড়িয়ে বলতাম, ‘আমি ভাল কাজ ছাড়া করি না!’ কী মানুষ ছিলেন! এখন ভাবি, এক সময়ে কাদের সঙ্গে মিশেছি!

আপনার বন্ধু পৃথ্বীশ আপনার কাজ নিয়ে কী বলতেন?

পৃথ্বীশ বলত, ‘তোর বড় গোছানো কাজ, এলোমেলো করে দে!’ পৃথ্বীশের এলোমেলো করেও চমৎকার কাজ করার বিদ্যে আছে, আমার সে-বিদ্যে আছে নাকি! ওর কাজ ছিল অদ্বিতীয়!   

আপনি সোভিয়েত কনস্যুলেটে চাকরি করতেন, সেখানে কী কাজ করতে হত?

মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রচার। ওখানে থেকে প্রচারপত্র আসত, সেগুলো অনুবাদ করতে হত। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কিছু অংশ জুড়ে, উড়িষ্যা-বাংলা-অসমের জন্য বিভিন্ন লেখার অনুবাদ করতে হত; কখনও বাংলা থেকে ইংরেজি, কখনও ইংরেজি থেকে বাংলা। সোভিয়েত কনস্যুলেটে আমার সহকর্মী ছিলেন নবারুণ ভট্টাচার্য। আমি ঢোকার আগেই, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় মস্কো চলে যান, সেই জায়গায় ও জয়েন করেছিল। আবার, ওখানে হেমাঙ্গদাও (হেমাঙ্গ বিশ্বাস) কাজ করতেন আমি জয়েন করার আগে। উনি নকশাল করেন ইত্যাদি বলে প্রতিনিয়ত অপমানিত হওয়ায় দরুন, ওখান থেকে চাকরি ছেড়ে দিলেন, ওঁর টেবিলে গিয়ে আমি বসলাম। ওখানে আমাদের মূল কাজ ছিল সম্পাদনার… তখনকার দিনে একটা প্রথম সারির কাগজের সম্পাদককে যে-মাইনে  দেওয়া হত, আমরাও সেই পরিমাণ মাইনে পেতাম। প্রায় ১৫০০!

১৯৭৪ সালে সে তো অনেক টাকা!

হ্যাঁ, তা বটে। পাশাপাশি যেহেতু সম্পাদনার কাজটা জানতাম, কনস্যুলেটের প্রকাশনা, প্রদর্শনী এই কাজগুলোও আমি দেখতাম। এজন্য মাসের ১৫ তারিখে আরও ১৫০০ টাকা দেওয়া হত। প্রায় ১৭ বছর ওখানে চাকরি করেছিলাম। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর, চাকরিটা চলে যায়।

চাকরি চলে যাওয়ার পর কী করলেন?

মগরাহাটে সাইকেলের দোকান দিয়েছিলাম। সে এক অন্য গল্প… আমি আর আমার এক পার্টনার মিলে সেই দোকান দিই। আমার সে-সময়ে সংসারের যা খরচ দাঁড়িয়েছে, এ-ছাড়া কোনও উপায় ছিল না। দোকানের নাম ছিল বি জি সাইকেল মার্ট। বি ফর বংশী, জি ফর গুপ্ত।  

সোভিয়েত কনস্যুলেটে আমার সহকর্মী ছিলেন নবারুণ ভট্টাচার্য। আমি ঢোকার আগেই, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় মস্কো চলে যান, সেই জায়গায় ও জয়েন করেছিল। আবার, ওখানে হেমাঙ্গদাও (হেমাঙ্গ বিশ্বাস) কাজ করতেন আমি জয়েন করার আগে। উনি নকশাল করেন ইত্যাদি বলে প্রতিনিয়ত অপমানিত হওয়ায় দরুন, ওখান থেকে চাকরি ছেড়ে দিলেন, ওঁর টেবিলে গিয়ে আমি বসলাম। ওখানে আমাদের মূল কাজ ছিল সম্পাদনার… তখনকার দিনে একটা প্রথম সারির কাগজের সম্পাদককে যে-মাইনে  দেওয়া হত, আমরাও সেই পরিমাণ মাইনে পেতাম। প্রায় ১৫০০!

তার মানে এ-সূত্রে আপনি দোকানের সাইনবোর্ডও লিখেছেন একবার?

হ্যাঁ নিজের দোকানের জন্য। এই দোকান যখন চলছে, তখন তিনদিন ওখানে আর তিনদিন কলেজ স্ট্রিটে কাজ করতাম।

এর আগেই তো ‘আশা’ প্রকাশনীর কাজ শুরু হয়ে গেছিল?

হ্যাঁ, তার মূল কাণ্ডারি ছিলেন শংকর ভট্টাচার্য; হ্যারিসন রোডের ওপরে তার দপ্তর ছিল। আশা যখন চলছে, তখন আমি ওখানে সম্পাদক হিসেবে কাজ করতাম। পরে যখন ‘অয়ন’ করি, সেখান থেকে সুবীর রায়চৌধুরী সম্পাদিত ‘জগদীশ গুপ্তর গল্প’, সমর সেনের ‘বাবুবৃত্তান্ত’, অশোক মিত্রর ‘কবিতা থেকে মিছিলে’ এরকম বেশ কিছু বই করেছিলাম। প্রকাশনার মালিক হিসেবে ছিল আমার দাদার নাম। ‘অয়ন’-এর দপ্তর ছিল সুবর্ণরেখার ওপরে। বইমেলাতে অনেকের সঙ্গেই ‘অয়ন’-এর স্টল দিতাম। ‘অয়ন’-এর বই বিক্রি ভালই হত, কিন্তু যা রোজগার হত, সবই খরচ হয়ে যেত; ফলত অতগুলো চালু বই থাকা সত্ত্বেও, বাধ্য হয়ে তুলে দিতে হল। সে-সময়ে বাজারে আমার প্রায় হাজার সাতেক টাকা ধারও হয়ে গিয়েছিল।

এ-প্রসঙ্গেই সমর সেনের ‘বাবুবৃত্তান্ত’ নিয়ে একটি ঘটনার কথা তোমাকে বলি। আমরা বই করার আগে, কাউকে অ্যাডভান্স দিতাম না; অশোক মিত্রর ক্ষেত্রেও তাই-ই হয়েছে, সমর সেনের ক্ষেত্রেও তাই। প্রথম সংস্করণ শেষ হওয়ার পর যখন আমরা দ্বিতীয় সংস্করণের জন্য অনুমতি নিতে গেলাম, আমাদের বললেন, ‘আপনারা দ্বিতীয় সংস্করণ করতে পারেন কিন্তু আমাকে রয়্যালটি অগ্রিম দিয়ে দিতে হবে।’ আমি বললাম, ‘না, আমি পারব না, বিক্রি হলে তখন আমরা টাকা দিতে পারব।’ তখন উনি বললেন, ‘তাহলে একটা কাজ করুন, আমাকে অন্য একজন প্রকাশক জোগাড় করে দিন, কিন্তু মলাট বদলানো যাবে না।’ পরে যখন অন্য প্রকাশকের থেকে বইটা বেরল, ‘বাবুবৃত্তান্ত’ লেখাটা বদলায়নি। এই বইটা তো প্রচুর পরিমাণে বিক্রি হয়েছিল, তখন কিন্তু ওঁর কাছে বহু বড়-বড় প্রকাশক বইটা করার আর্জি জানায়, উনি রাজি হননি। বলেছিলেন, ‘ওরা তো প্রথমে করেছিল, ওরা তো এখনও কিছু জানায়নি, ওরা আগে জানাক, তার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।’ এই ছিলেন তখনকার দিনের মানুষ!

অজয়দা, এবার আমরা আপনার সম্পাদক সত্তার প্রসঙ্গে আসব। অনেক পাঠক আপনার এই সত্তাটাকেই চেনেন। প্রথমত অনেক বইতেই আপনি সম্পাদনা করেন, কিন্তু আপনি নিজের নাম দেন না, কেন?

বিষয়টা সেরকম নয়, আমি একটা সম্পাদিত বইতে সকলের নাম দিতে চাই। এই যে ধরা যাক, ব্লক লেটার এখন আলাদা করে বসাতে হয়, সেজন্য প্রেসকে এই কাজটার কথা আলাদা করে জানাতে হয়। এই কাজগুলো যে বা যারা করছে, তাদের নাম কি থাকবে না? তারাও তো যুক্ত পদ্ধতিটার সঙ্গে। আমি সম্পাদকের সঙ্গে আরও অনেকের নাম দিতে চাই।

এই যে একজন সম্পাদক হিসবে, কপি হোল্ড করে, প্রুফ দেখা, এ তো আজকের দিনে অনেক কমেই গিয়েছে, এটা আপনি আজও করে চলেছেন…

একজন সম্পাদক কপি হোল্ড না করে, কীভাবে প্রুফ দেখবে? আমার কাছে এমন অনেক প্রুফ আসে, যেখানে আমি পাশে-পাশে মন্তব্য লিখে দিই, সঠিকভাবে প্রুফ দেখার লোকই কমে আসছে! এখন কী করে এত তাড়াতাড়ি প্রুফ দেখা হয় জানি না, আমার তো পাঁচ থেকে ছ’পাতা প্রুফ দেখতেই এক ঘণ্টা সময় লাগত।

অজয় গুপ্ত সম্পাদিত মহাশ্বেতা দেবী রচনাসমগ্র

সম্পাদনার সাধারণ গুণ বলতে আপনি কী বোঝেন? কী গুণ থাকলে একজন ভাল সম্পাদক হওয়া যায়?

সম্পাদনা বলতে সাধারণ মানুষ বোঝেন, যদি মৃত লেখক হন, তাঁর কী কী লেখা পাওয়া গিয়েছে, সেগুলো এক জায়গায় করে দেওয়া এবং লেখাগুলি সম্পর্কে একটা জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ লেখা। কিন্তু এই-ই কি সম্পাদনা? সম্পাদক যেভাবে ভাবছেন, সম্পাদক যেভাবে দেখছেন— সেভাবে তো লেখক না-ও ভাবতে পারেন। বাজারচলতি সম্পাদনা নিয়ে, এই ছিল আমার ছাত্র বয়সের আপত্তি। তাহলে পাঠক কী জানবে? অন্তত যে-পাঠক সম্পাদকের মতো জানে না, সে কীভাবে পাঠ করবে? আমার মতে, আমি কোনও রচনা যেভাবে পাচ্ছি, সেটা তো সাজিয়ে দেওয়া অবশ্যকর্তব্য, কিন্তু পাশাপাশি সেই নির্দিষ্ট লেখাটুকু সম্পর্কে যেখানে যা তথ্য পাওয়া গিয়েছে, সে-সমস্তটা গ্রন্থপ্রসঙ্গ বা রচনাপ্রসঙ্গে সাজিয়ে দেওয়াও জরুরি। এর ফলে সম্পাদকের নিজের ‘জ্ঞানগর্ভ’ সত্তা সরিয়ে রেখে, লেখকের সত্তা ও সেই নির্দিষ্ট লেখাটি সম্পর্কে প্রাপ্ত অনেক তথ্যই ধরে রাখা যাবে। একজন ভাল সম্পাদকের কাজ— নিজেকে প্রচ্ছন্ন রেখে লেখকের সত্তাকে সামনে এগিয়ে দেওয়া। সম্পাদনা করতে গিয়ে, কোনও টেক্সটকে নিজের মন্তব্যে বা কোন জায়গায় সেই নিয়ে কোন লেখা নিয়ে বেরিয়েছে, সে-সব দিয়ে জর্জরিত না করাই ভাল।

তার মানে সম্পাদনার ক্ষেত্রে কি আপনি পুলিনবিহারী সেনের অনুরাগী?

হ্যাঁ, একদম তাই। এ-প্রসঙ্গে বলি, যোগেশচন্দ্র বাগল সম্পাদিত বই বা গোপাল হালদারের বিদ্যাসাগর-সংক্রান্ত মন্তব্য যদি দেখো, দেখবে— তিনি বলছেন বিদ্যাসাগর কেন কমিউনিস্ট হলেন না, এ-নিয়ে ওঁর ক্ষোভ থেকে গিয়েছে। এই ক্ষোভটুকু দিয়ে বিদ্যাসাগরকে কতটুকু চেনা যাবে? আবার, যোগেশ বাগল খুব পণ্ডিত মানুষ হলেও, ওঁর সম্পাদিত বঙ্কিম রচনাবলি পড়ে পরীক্ষা দেওয়া যায় না। কারণ, পুস্তক-প্রসঙ্গটা খুব দুর্বল। এখন জীবিত লেখকের ক্ষেত্রে তাঁর বই সম্পাদনা করলে বেশ কিছু সুবিধা পাওয়া যায়। আমার ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে মহাশ্বেতা দেবীর রচনাবলি সম্পাদনা করতে গিয়ে।

মহাশ্বেতা দেবী রচনাবলি সম্পাদনার কাজ তো আপনার প্রসিদ্ধ কাজগুলির মধ্যে অন্যতম…

হ্যাঁ, এই কাজটা শুরু করার সময়ে আমি মহাশ্বেতা দেবী জীবিত থাকার সুবিধেটুকু পেয়েছিলাম। বইগুলো করার সময়ে, যারা মহাশ্বেতা নিয়ে চর্চা করে, তাদের দিয়ে লিখিয়েছিলাম, কিন্তু তারা লেখার পর দেখলাম, লেখাগুলো মনঃপূত হচ্ছে না, সব লেখাই যেন একটা সারসংক্ষেপের অভিমুখে চলে যাচ্ছে। তখন প্রতিটি লেখার পটভূমি, হয়ে ওঠা সম্পর্কে— ওঁকে দিয়েই বইয়ের গ্রন্থপরিচয় অংশে লেখালাম। সেই জিনিসটা হল বই এবং পাঠকের কাছে নতুন আবেদনের বিষয়। আমি মনে করি, রবীন্দ্র রচনাবলির পর মহাশ্বেতা দেবী রচনাবলির মতো সু-সম্পাদিত বই আজ পর্যন্ত তৈরি হয়নি। এটা অনেক লেখক এবং পাঠক-সমাজেরও দুর্ভাগ্য যে, অনেক লেখকের জীবদ্দশাতেও তাঁদের বইয়ের সম্পাদিত রচনাবলি প্রকাশিত হয়নি, ভবিষ্যতে হবেও না…

আপনার সম্পাদিত বইতে সব সময়ে একটা বাহুল্যবর্জিত বিষয় দেখতে পাই…

আমি সব সময়ে বাহুল্যবর্জনেই বিশ্বাসী। তবে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে তো কাজ করতেই হবে। মহাশ্বেতার ক্ষেত্রে যেমন, শেষদিকে ওঁর স্মৃতি হারাতে শুরু করল, কিছু কথা ভুল লিখলেন, সেই সামান্য তথ্যপ্রমাদ সংশোধন, সংযোজন— এগুলোই তো সম্পাদকের কাজ। একজন সম্পাদকের সবসময়ে একটা অনুসন্ধিৎসু মন থাকতে হবে। সেটাই তার কাজকে আলাদা করবে গুণগত দিক থেকে।

আপনার সমসময়ের সম্পাদকদের মধ্যে, কাদের কাজ আপনার ভাল লাগে?

সত্যি বলতে আমার কারও কাজই ভাল লাগে না, কারণ আমার ভাবনার সঙ্গে কারও ভাবনাই মেলে না…    

বাংলা প্রকাশনা জগতে তো সম্পাদককে গুরুত্বই দেওয়া হত না, কুক্ষিগত করে রাখা হত ক’দিন আগেও, আজও অনেক  ক্ষেত্রে সম্পাদক যোগ্য সম্মান পান না…

শোনো, শুধু সম্পাদক নয়, বাংলা প্রকাশনা জগতের সঙ্গে যুক্ত থাকতে গেলে, জীবনধারণের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা আবশ্যক। 

এখন সম্পাদনার সময়ে সম্পাদক যেমন নিজের ভাবনা চাপিয়ে দেবে না, তেমনই কোনও লেখক সম্পর্কে যদি ভ্রান্ত ধারণা ছড়িয়ে থাকে, সেটাকেও রোধ করা সম্পাদকের কাজ। তাঁর লেখা থেকেই সেই উপাদানগুলো সাজিয়ে দিতে হবে, যেমন আমার বিদ্যাসাগর রচনাবলির কাজে, এটা দেখিয়ে দেওয়া কর্তব্য ছিল। বাঙালি সমাজে যারা মনে করে বিদ্যাসাগর শেষ জীবনে মানববিদ্বেষী হয়ে গিয়েছিলেন, সেটা আদপে ভুল! আসলে বিদ্যাসাগর সেই সব ভদ্রমানুষের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতেন, যারা নানাভাবে তাঁকে ঠকিয়েছে, ছলনা করেছে। এটা চিহ্নিত করে দেওয়া কর্তব্য ছিল। বিদ্যাসাগর তো শেষ জীবনে এসে বলেছিলেন, বাঙালি ভদ্রমানুষের এহেন রূপ দেখলে উনি বিধবা বিবাহ-র আইন পাশ করেই ক্ষান্ত হতেন।  আসলে, প্রকাশক-সম্পাদক-পাঠক নির্বিশেষে সম্পাদনা প্রসঙ্গে এই শিক্ষাগুলো খুব দরকারি। অনেক প্রকাশক আবার, মুদ্রণ আর সংস্করণের পার্থক্য করতে পারেন না। আর কীই-বা আশা করা যায়! আমাকে প্রেস একবার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রুফ-কপি দিয়েছিল। ওমা! দেখি, সে-প্রেস একেবারে মানিকবাবুর বানান-সহ অনেক কিছুই বদলে দিয়েছে! এটা সে কীভাবে করতে পারল? নিশ্চয় কোথাও দেখেছে বলেই পেরেছে!

আপনার সম্পাদিত বই মূলত দে’জ পাবলিশিং থেকেই প্রকাশিত হয়ছে এ-যাবৎ। সে বঙ্কিম রচনাবলি, বিদ্যাসাগর হোক বা মহাশ্বেতা হয়ে সুকান্ত রচনাবলির কাজ। প্রেমেন্দ্র মিত্রর অনুবাদ সমগ্রর কাজও করেছেন। আমি নিজে কাজ করার সময়ে আপনার কোনও বই সামনে রেখে তারপর কাজ গোছাই। আপনার কাছে সবচেয়ে কাছের ও জরুরি কাজ কোনটা?

বিদ্যাসাগর…

মহাশ্বেতা নয়?

মহাশ্বেতা তো আর পারছি না বয়সের সঙ্গে-সঙ্গে…

এখন কি সামগ্রিক সম্পাদনা-কাজের পরিস্থিতি বদলেছে বলে মনে হয়?

আমার মনে হয় না… নতুনরা কিছু কাজ অবশ্য ভাল করছেন, কিন্তু একটা কথা মনে রাখতে হবে— সম্পাদনা কখনও একক উদ্যোগে হয় না, এটা একটা যৌথ কাজ। একটা বই নির্মাণের প্রতিটা স্তরের যৌথ পরিশ্রমই একটা সু-সম্পাদিত বই জন্ম দিতে পারে… আমাদের সব সময়ে পরের প্রজন্মের কথা ভাবতে হবে। এমন কাজ হবে যেটা বহু মানুষ মনে রাখবে বহুকাল।