সাক্ষাৎকার। শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়
আজ বিশ্ব বই দিবস। বই সম্পাদনা আসলে কী? তার প্রক্রিয়া কী? কীভাবে করা যায় বই সম্পাদনা? আদৌ কি সম্পাদনার নিয়মনীতি, দর্শন বঙ্গমানসে সুস্পষ্ট? এমন নানা প্রশ্নে শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখোমুখি শুদ্ধব্রত দেব।
শমীকদা, বইয়ের সম্পাদনা বিষয়টি নিয়ে এখনও বাংলা প্রকাশনা জগতের ধারণা বেশ অস্বচ্ছ। পুলিনবিহারী সেনের ‘রবীন্দ্রায়ণ’ ধ্রুপদী সম্পাদনার একটা নজির। আবার যোগেশচন্দ্র বাগলের ‘হিন্দুমেলার ইতিবৃত্ত’ তাঁরই সম্পাদনা কাজের রকমফের। দু-টিই কিন্তু তাঁর ‘সম্পাদিত বই’ হিসাবে বিশিষ্ট। এবার বুঝবার সুবিধার জন্য যদি একেবারে হালে চলে আসি, দেখব, আলাউদ্দিন খাঁ-র ‘আমার জিবনী’ আগাগোড়া সম্পাদনা করছেন আপনি, কিন্তু বইয়ের কোথাও আপনার সম্পাদক-ভূমিকার উল্লেখমাত্র নেই। আমাদের বিশিষ্ট, বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের সম্পাদনায় যে-সব বইয়ের জন্ম হয়েছে, সেগুলি এক অর্থে ‘তাঁদেরই বই’। অন্যদিকে একজন পেশাদার বই-সম্পাদকের হাতে যখন প্রকাশক একটি পান্ডুলিপি তুলে দিচ্ছেন পাঠসম্পাদনার জন্য, তা একেবারে ভিন্ন কিসিমের কাজ। আপনি কি এই দু-ধরনের সম্পাদনাকে একটিই বনিয়াদি কাজের দু-টি স্তর হিসেবে দেখেন, না কি দু-টি সম্পূর্ণ আলাদা পরিসর হিসেবে গণ্য করেন?
এইখানে একটি বিষয় বোধহয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। সাধারণভাবে আমাদের বাঙালি-মানসে, বাঙালি-মননে ‘সম্পাদনা’ শব্দটির কোনও যথার্থ সংজ্ঞা স্পষ্ট হয়নি। অর্থাৎ, একটি বইয়ের মলাটে বা প্রচ্ছদে যখন দেখি, অমুক সম্পাদিত বই এটি, ধরে নেওয়া হয়, তিনি সংকলন করেছেন। কিছু লেখা বেছেছেন, তারপর তা একত্র করেছেন, সংকলন করেছেন। অর্থাৎ ওই সংকলন বা সংগ্রহটাই তাঁর কাজ। এর চেয়ে বেশি কিছু, বাঙালি-মানসে বা বাঙালি-চিন্তায় সম্পাদকের কাছে আশা করা হয় না। পত্রপত্রিকা সম্পাদনা মূলত কিন্তু তাই। কী লেখা যাবে, তার বাছাই ও সেই সংক্রান্ত ওপর-ওপর একটা নজরদারি। আমি ব্যক্তিগতভাবে বলতে পারি, আমি পত্রিকা সম্পাদনা করেছি। তারপর আমি পেশাগতভাবে এসেছি এডিটিং বা সম্পাদনার কাজে। পেশাগত সম্পাদনার যে ইতিহাস, চর্চা, চরিত্র; তা তৈরি হয়েছে বিদেশে, এ-কথা অস্বীকার করে লাভ নেই।
আমার একটা সৌভাগ্য হয়েছিল, আমি খুবই কৃতার্থ যে সেই সৌভাগ্য আমার হয়েছিল, পৃথিবীর প্রাচীনতম প্রকাশনা সংস্থাগুলির মধ্যে যা অন্যতম, সেই অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, যা প্রায় চারশো বছরেরও বেশি সময় ধরে বহমান, সেখানে আমি একটি চাকরি পেয়েছিলাম, রিজিওনাল এডিটর হিসেবে। আমার কাজ ছিল ভারতে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের পূর্বাঞ্চলীয় শাখার সমগ্র প্রকাশনার দায়িত্ব সামলানো। সেই কাজ আমাকে শিখতে হয়েছিল। আমি তার আগে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টারি করতাম। ভেবেছিলাম, মাস্টারি করেই জীবন অতিবাহিত করব। কিন্তু যে-কোনও কারণেই হোক, এক সময়ে আমি সিদ্ধান্ত নিই সেই কাজ ছেড়ে যাওয়ার; কারণ মনে হয়, যা করছি, তা মাস্টারি নয়। তখন এই চাকরির প্রস্তাব আমার কাছে আসে। এবং খুবই কষ্ট করে এই কাজ আমাকে শিখতে হয়েছিল। প্রায় ন’বছর আমি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসে চাকরি করি, এবং এই দায়িত্বটি পালন করি। সেখানে আমি যা শিখেছিলাম, এবং পরবর্তীকালে বিদেশেও নানাভাবে সম্পাদনার কাজে যুক্ত হয়ে যা শিখেছি, বুঝেছি— সম্পাদকের দায়িত্ব শুরু হয়ে যায়, কোনও নির্দিষ্ট প্রকাশকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের শুরুতেই। তার কিছু নিয়মনীতি নির্দিষ্ট। প্রকাশক সম্পাদককে দায়িত্ব দেন, বই প্রকাশযোগ্য কি না, তার বিচারের। যোগ্যতা বিচারের পরের দায়িত্ব, বইটির কতটা প্রয়োজন, বিদ্বৎসমাজে তার কতটা চাহিদা, তা নির্ধারণ করা। তারপর সেই যোগ্যতা ও চাহিদার নিরিখে বইয়ের প্রস্তাব আনা, বিষয় নির্দিষ্ট করা। সেই নির্দিষ্ট বিষয়ে যাঁরা লেখার যোগ্য, তাঁদের বাছাই করা, এবং তাঁর লেখার পরিধি নির্ধারণ করে দেওয়া, অবশ্যই আলোচনাসাপেক্ষে। কারণ সম্পাদককে বুঝতে হবে, ওই বিষয়ে যিনি যোগ্য, যাঁর অধিকার আছে, তাঁর কাছে শেখার দায় যেমন সম্পাদকের, তেমনই তাঁকে তাঁর পরিধিটা শেখানোর দায়ও সম্পাদকের। এটা সম্পাদকের কাজের একটা দিক।
আরও পড়ুন: ইতিহাসবিদের কাজ পর্যবেক্ষণ, সময়কে দেখে চলা!
অরুণ নাগের একান্ত সাক্ষাৎকার…
আরেকটা দিক, লেখক নিজেই একটি প্রস্তাবনা নিয়ে আসতে পারেন প্রকাশকের কাছে। তাঁর সেই বইয়ের বিষয়ে একটি ধারণা আছে, সেই বই প্রকাশযোগ্য, তাঁর জ্ঞান-বুদ্ধিমতো তিনি সর্বোচ্চ দিয়েছেন সেই বইয়ে। সেক্ষেত্রে সম্পাদকের প্রাথমিক ভূমিকা নেই। কিন্তু তারপর যোগ্যতা, চাহিদা বিচারের অঙ্কটা থেকেই যাচ্ছে। কোনও সম্পাদকই সর্ববিদ্যাবিশারদ নন, সেই বিনয় তাঁকে আজীবন বহন করতে হবে। কাজেই এমন বই তাঁর কাছে আসতেই পারে, এমন বিষয় আর কি, যে-বিষয়ে তাঁর কোনও অধিকার নেই। সেক্ষেত্রে কিন্তু তাঁকে বইটির যোগ্যতা, চাহিদা প্রাথমিকভাবে বিচার করে, একজন বিশেষজ্ঞ পাঠকের কাছে যেতে হবে, তিনি এই বইটির যোগ্যতা আরেকবার নির্ধারণ করবেন। ফলে, কোনও বইয়ের প্রস্তাব এলে, তাঁর প্রক্রিয়াটা আবার অন্যরকম। সম্পাদক হিসেবে সেই বিষয়ে আমার অধিকার না-থাকলে আমি প্রথমে সাধারণ পাঠক হিসেবে পড়ব সেই বই। সেই বই পাঠযোগ্য হচ্ছে কি না, তা বিচার করব; তারপর একজন বিশেষজ্ঞ পাঠকের কাছে যাওয়া, তিনি যে-যে সংস্কার করবেন, তা সমেত আবার সেই বই ফেরত আসবে সম্পাদকের কাছে। সেখানে শুরু হয়, ওই তুমি যা বললে, সেই পাঠ-সম্পাদনার কাজ। সেখানে বইয়ের প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি শব্দ আমাকে বিচার করতে হবে। কাজেই এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এই পাঠ-সম্পাদনার ক্ষেত্রে আমাকে দেখতে হবে ভাষার প্রয়োগও। কোথাও যদি মনে হয়, পাঠকের বুঝতে অসুবিধে হবে, তাহলে তা সংস্কার করার প্রয়োজন আছে। আবার আমি যদি এত দূর অনধিকারী হই সেই বইটির বিষয়ে, যে সাধারণ সংস্কার নিয়েও আমার ভেতরে কিছু সংশয় থেকে যায়, তখন আবার আমাকে ফিরে যেতে হবে সেই বিশেষজ্ঞ পাঠকের কাছে। কাজেই সম্পাদককে মাথায় রাখতে হবে, তাঁর যেমন কর্তৃত্ব আছে, অধিকার আছে, তেমনই বিনয় আছে, শোভনতা আছে, এবং দায় আছে। যে-বই পাঠকের কাছে যাবে, তা যেন সব মানের দাবি পূরণ করতে পারে যথাযথভাবে। তবেই একটা বই তৈরি হবে। এবং আমি মনে করি যে, সম্পাদকের একটা প্রুফ অন্তত পুরোটা দেখা উচিত। অনেক সময়ে দেখা যায়, সম্পাদক প্রাথমিক স্তরের পান্ডুলিপি পাশ করিয়ে দিয়ে চালান করে দিয়েছেন প্রেসে, এইবার ওটা প্রুফরিডারের কাজ। কিন্তু আমি সেই পদ্ধতিতে বিশ্বাস করি না। কলেজ স্ট্রিটে হোক, পশ্চিমবাংলার প্রকাশনা হোক বা ভারতীয় স্তরে, প্রুফরিডিংয়ের পর্যায়েও সম্পাদকের একটা সক্রিয় ভূমিকা থাকা আবশ্যক। সেই দায় তাঁর থাকা উচিত।

ছবি সৌজন্য: লেখক
একজন সম্পাদকের তো একটা সামগ্রিকতার দায় থাকে। বইয়ের পরিকল্পনা থেকে বইয়ের উপস্থাপনা, পুরোটা মাথায় রেখে তিনি সেই বই সম্পাদনার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন। সেই প্রসঙ্গ থেকে পাঠ-সম্পাদনার প্রসঙ্গে আপনি এতটাই মসৃণভাবে চলে এলেন এই উত্তরের মাধ্যমে, যে তা যেন আরও তিন-চারটি প্রশ্নের দরজা খুলে দিচ্ছে। আমার মনে হয়, যাঁরা ভাবী পাঠ-সম্পাদক বা সম্পাদক হিসেবে নিজেকে উন্নীত করতে চাইছেন, তাঁদের এই বিষয়গুলি জানা প্রয়োজন। আমাদেরও এই বিষয়ে আপনার মতামত জানা বকেয়া রয়ে গিয়েছে। আপনি যা বললেন, সম্পাদনার মূল ধারণাটা পশ্চিমজাত। আমরা যারা এই আন্তর্জাতিক রীতিগুলি, মেনে চলি বলব না, অন্তত ওয়াকিফহাল থাকি, তাদের তরফ থেকেও এটি প্রশ্ন। ধরা যাক, অসম্ভব অথেন্টিসিটি আছে একটি পাণ্ডুলিপির, লেখকের অথরিটিও আছে বইটি লেখার, কিন্তু যা নেই, তা হচ্ছে অথরশিপ। এটা একটি অঞ্চলের ইতিহাস হতে পারে, কিংবা কোনও আত্মকথা। এক্ষেত্রে একজন সম্পাদকের কাজ তো ‘ডেভেলপমেন্টাল এডিটিং’, অর্থাৎ এই বইটির মূল বিষয়টিকে ছেনে-ছেনে সেখান থেকে লেখাটিকে তৈরি করা। ফিকশন হোক, বা নন-ফিকশন, দু-টি ক্ষেত্রেই বলা হত, ‘আমার একটি শব্দেও হাত ছোঁওয়ানো চলবে না’। এখনও দেখি অনেকে বলেন, ‘সম্পাদনার পর আমার লেখার তো আর কিছুই অবশিষ্ট রইল না!’একজন তাঁর লিখন রীতিমতো আড়ষ্ট, অনাধুনিক, অথচ সম্পাদক হিসেবে সেই ভাষা বদলানো যাচ্ছে না লেখকের নিগূঢ় আপত্তিতে। এইরকম সংঘাতের মুখোমুখি শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো অভিজ্ঞ সম্পাদককে নিশ্চয়ই হতে হয়েছে। হতে হোক বা না-হোক, যদি হতে হয়, তাহলে সম্পাদকীয় পর্যায়ে তার মোকাবিলা কীভাবে করা উচিত?
আমি যতদিন পেশাগত সম্পাদনার কাজ করেছি, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসে ন’বছর, তার পরবর্তী পর্বে সিগাল বুকস-এ, বা তারও পরে আমি যে-প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, থীমা— সেখানে এইরকম প্রতিরোধের সম্মুখীন আমাকে হতে হয়নি। একটা বিষয় এক্ষেত্রে কাজ করে, যেটা আমি বললাম, বৃহত্তর যে-মানচিত্রটা আমি মেলে ধরলাম, তার ভিত্তিতে বলি, ওই যে প্রথম থেকে লেখক, বিষয়, বই বাছাইয়ের যে-প্রক্রিয়া, তাতে যদি আমি নিশ্চিত হই, তারপরেই আমি সম্পাদনা বা পাঠ-সম্পাদনার কাজে হাত দিই। আমি দেখেছি, কোনও প্রকাশন সংস্থার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে, এই পর্যায়ে এসে গেলে, লেখকের সঙ্গে সেই আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্কটা তৈরি হয়েই যায়। তিনি মেনে নিয়েছেন, এই সম্পাদক যথেচ্ছাচারী হতে পারেন। যদি তারপরেও দ্বিধা, সংশয় হয়, সেক্ষেত্রেও ওই যা বললাম, সম্পাদককে বিনয়ী হতে হবে। লেখকও জানেন, সম্পাদকের অধিকার নিয়ে তাঁর সংশয় থাকলে তিনি সরাসরি লেখকের কাছে যাবেন। তাহলে লেখক-সম্পাদকের বোঝাপড়াটা তেমনই হবে।
আবার, বলা যেতে পারে, বেসরকারিভাবে এমনটা হতে পারে, অন্য কোনও প্রকাশনা সংস্থা থেকে একটি বই বেরচ্ছে, তার সম্পাদক এসেছেন আমার কাছে, নেপথ্য থেকে আমি কিছুটা সাহায্য করেছি। সেসব বইয়ে কোথাও আমার নামের কোনও চিহ্ন নেই, আমি চাইনি, সেই চিহ্ন থাকুক, এমনকী, কৃতজ্ঞতা স্বীকারেও থাকুক। হতে পারে, সেই বইয়ের পাঠ-সম্পাদনা, প্রুফ দেখা সবই আমি করেছি, কিন্তু আমার নাম আমি সেখানে থাকতে দিইনি। এরকম একটি বইয়ের ক্ষেত্রে একবার ঘটেছিল, একজন লেখক, আমি তাঁকে খুব শ্রদ্ধাই করি, তিনি বলেছিলেন, তাঁর একটি বানানেও হাত দেওয়া যাবে না। এবার তাঁর পান্ডুলিপিতে বানানের অবস্থা ভয়ংকর খারাপ, কোনওমতে সেই বানানে বইটি বের করা যাবে না। যেহেতু সেই বইয়ের সম্পাদক অন্য একজন, তাঁর নামেই বইটি বেরবে, আমি তাঁর ঘাড়েই খানিক দায় চাপিয়ে একটি সম্পাদকীয় লিখি। সেখানে লিখি, আমরা কিছু বানান সম্পাদনা করতে বাধ্য হয়েছি, লেখকের ইচ্ছের বিপক্ষে গিয়ে, তাতে তাঁর অসূয়া, রাগ যাই-ই হোক না কেন, আমরা এই বানান প্রকাশ করতে পারব না। বানানগুলি বিশেষভাবে উল্লেখ করে দেওয়া ছিল সম্পাদকীয়-তে। যেহেতু আমার নাম সেখানে ছিল না, ফলে আমার সঙ্গে তাঁর সরাসরি সংঘাত হয়নি। ওই সম্পাদককেও তিনি আর ঘাঁটাননি। তিনি সত্যিই নামী লেখক, তাঁকে আমি শ্রদ্ধাই করি। তাঁর হয়তো অধিকার আছে সম্পাদকের ভূমিকা নির্ধারিত করার, কিন্তু বানান নিয়ে ওরকম অহেতুক একটি অবস্থান তিনি কেন নিয়েছিলেন, তা আমি ভেবে পাইনি। তিনি এখনও জীবিত, তাঁর সঙ্গে কখনও আলাপ হলে আমি নিশ্চয়ই তাঁর থেকে জানতে চাইব এর কারণ।

এর সঙ্গে আরও একটা কথা বলি, যেটা আমার আদি শিক্ষার অংশ। তা হল প্রতি প্রকাশকের কিছু ‘হাউজ রুলস’ রয়েছে। যেমন অক্সফোর্ডের স্টাইল ম্যানুয়াল রয়েছে। সেটা আমরা অনুসরণ করি অনেক সময়েই, রাখি সামনে। অক্সফোর্ড কখনও দাবি করেনি, সেই ম্যানুয়াল থাকতেই হবে। অক্সফোর্ডের যেহেতু, এখন বোধহয় প্রায় ৩৫টি আলাদা-আলাদা দেশে বই ছাপানোর কার্যক্রম চলে, ফলে তাদের একটা সাধারণ নিয়ম থাকতেই হবে। শিকাগোরও এরকমই নিজস্ব ম্যানুয়াল রয়েছে। বাংলা বই প্রকাশনার ক্ষেত্রেও যেমন বানানবিধি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখন আমি যেমন যেসব বই সম্পাদনা করি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, তা মূলত থীমা-র। আমি কিন্তু সেখানে থীমা-র হাউজ রুলস তৈরি করেছি। আবার সংসদের বানান অভিধানের ক্ষেত্রে অশোককুমার মুখোপাধ্যায়কে আমরা সাহায্য করেছিলাম কিছুটা, আমার নামও আছে। কিন্তু সংসদের বানানবিধির অনেকগুলি দিক আবার আমি মানতে পারি না। যেমন আমি একটা উদাহরণ দিই, সংসদ এবং আকাদেমি— দুই ক্ষেত্রেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে একটি নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল, যা হল, যেসব শব্দ তৎসম নয়, অর্থাৎ সংস্কৃত থেকে যে-শব্দ আসেনি, সেইসব শব্দে দীর্ঘ ই-কার (ী) বা দীর্ঘ উ-কার (ূ) ব্যবহার করা যাবে না। খুব জোরের সঙ্গেই বলি, এই নীতি আমি মানি না। কারণ আমার মনে হয়েছে, বিশেষ করে বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার সঙ্গে আমার আদানপ্রদান হয়েছে। এটাকে বলা যায়, বিদ্বৎজগতের বা জ্ঞানজগতের একটি জীবন্ত প্রক্রিয়া। এক্ষেত্রে প্রতিটি শব্দের যেমন একটি ব্যাকরণগত ব্যুৎপত্তি রয়েছে, তেমনই তার একটি ধ্বনিগত মূল্যও রয়েছে। একটা শব্দ যখন সেই ভাষায়, সেই ভাষীরা উচ্চারণ করে, তখন তার ধ্বনির মধ্যেও কিন্তু একটা অর্থময়তা থাকে, ব্যঞ্জনা থাকে। আমি যদি একটি কেঠো রীতি চাপিয়ে এই ধ্বনিগত দিকটিকে উপেক্ষা করি, তাহলে তাতে শব্দের অর্থও নষ্ট হয়।
একটি বিষয় নিয়ে আমার লেখার ইচ্ছে রয়েছে, জানি না কখনও লেখা হয়ে উঠবে কি না। কয়েক সপ্তাহ আগে একটি পত্রিকার প্রচ্ছদ দেখে আমি কিছুটা হতচকিতই হলাম। সেই প্রচ্ছদে কয়েকটি পড়ন্ত বোমার ছবি, তার মাঝে বাংলা হরফে লেখা, ‘গিভ পিস এ চান্স’। ইংরেজিতে একটা শব্দ হচ্ছে ‘Peace’, যার মানে শান্তি, তাকে যদি আমি কেঠো বাননারীতিতে বাংলায় লিখি ‘পিস’, তাহলে আরও একটি ইংরেজি শব্দের কথা মনে হতে পারে ‘Piss’. যার মানে মূত্র। এর কিছু আগেই সংবাদপত্রে একটি সংবাদ পড়ে আমি মজাই পেয়েছিলাম। তা হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি যে-চন্দ্রযান পাঠিয়েছিল, তার অভিযাত্রীদের শৌচবর্জ্য নিয়ে খুবই সংকট দেখা গিয়েছিল। বাংলায় ‘পিস’— এই বানান দেখে আমার হঠাৎই মনে হল, এটা কি তবে ওই ‘পিস’-সংক্রান্ত কোনও লেখা? এরকম বিশ্রী, অশালীন বিপর্যয় কিন্তু ঘটে যেতে পারে বানানবিধির গোলযোগে।
বাবা আলিউদ্দিন খাঁ-এর উদাহরণ যখন দিলে তখন বলি, এমনই একটা বিশেষ বয়ান এই আত্মজীবনী, সেই বয়ান আমরা পেয়েছি হাতের লেখায়, ফ্যাক্সিমিলি আকারে। আলাউদ্দিন খাঁ সাত বছর বয়সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন, প্রথাগত শিক্ষার ধারকাছ না দিয়ে না-গিয়েও ওই শিখরে পৌঁছেছিলেন। এবং সেই ওঁর এই বয়ানেই তো আমরা প্রথম জানতে পারলাম, আলাউদ্দিন খাঁ গিরিশচন্দ্র ঘোষের থিয়েটারে চার বছর সমস্ত বাদন বাজিয়েছেন, সুর দিয়েছেন। বাংলা নাট্যের ইতিহাসে কোথাও এই উল্লেখ নেই। কারণ হিসেবে, এই প্রথম আমরা জানতে পারলাম, গিরিশচন্দ্র ঘোষ একদিন সমস্ত অভিনেতাকে ডেকে বলেন, একজন ‘লেইড়ে’-র নাম আমার থিয়েটারে থাকুক আমি চাই না, তাঁর নাম তখন রাখা হল প্রসন্ন বিশ্বাস। এই লজ্জার ইতিহাসের ভার আমরা বহন করছি। তাই আমাদের সচেতন সিদ্ধান্ত ছিল, ওই বানান একেবারে সরাসরি প্রচ্ছদে থাকবে, কারণ এটা ওঁর বয়ান। এটা একটা স্টেটমেন্টও বটে।
হ্যাঁ, আপনি বলেওছেন, যেমন ধরা যাক… ‘গ্রীস’ বা ‘গ্রীক’ শব্দের বানান দীর্ঘ ঈ দিয়েই লিখতে হবে, কারণ গ্রীকরা তাই লিখতে বা শোনাতে চেয়েছেন। থীমা নামের বানানেও তো আপনি দীর্ঘ ই-কার ব্যবহার করেন। এ-নিয়ে আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। আমি একটি লেখমালার সূত্রে আরবি শব্দের লিপ্যন্তরের ক্ষেত্রেও এই সংকট লক্ষ করলাম। যেমন আমরা আগে যেখানে শহীদ লিখতাম, এখন সেখানে লিখি ‘শহিদ’। দুটোর মানে কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা। ‘শাহীদ’ মানে martyr, আর ‘শাহিদ’ লেখা হলে তার শব্দার্থ witness। এখন আমি martyr অর্থে ‘শহীদ’ লিখলাম ধরুন। কিন্তু যে-শব্দের যে-বানান বহুল-ব্যবহৃত নয়, তাকে তো নিম্নরেখ দেওয়া হবে ভুল বানান বলে চিহ্নিত করে। সেক্ষেত্রে কী করণীয়?
এখানেই হাউজ রুলস-এর গুরুত্ব। আমি যেমন থীমা-র ক্ষেত্রে এই হাউজ রুলস বজায় রাখি। কারণ বিদেশি ভাষার শব্দ যখন ব্যবহার করব, তখন তার উচ্চারণগত মর্যাদা বজায় রাখব।
এটা তো একটা সৌজন্যও বটে!
অবশ্যই তাই। তাই পৃথিবীতে এটা একটি প্রতিষ্ঠিত আচার যে, প্রকাশক তার হাউজ রুলস তৈরি করবে।
এখানে এই ঠিক-ভুলের প্রসঙ্গে আরও একটি প্রশ্ন উঠে আসে। আমাদের বিবিধ ভাষা-প্রতিষ্ঠানের যতটা আনুগত্য সংস্কৃত বা ইংরেজির প্রতি, তার এক শতাংশও বোধ হয় আরবি-ফারসি বা দক্ষিণ এশীয় ভাষার ক্ষেত্রে নয়। যেমন কবি ওয়রওয়রা রাও-কে যখন গ্রেফতার করা হয়েছিল, তখন আমরা তাঁর মুক্তির দাবিতে ‘কবিকে মুক্ত করো’ নামে একটি মঞ্চ তৈরি করেছিলাম। আপনার মনে থাকবে, কারণ আপনি ছিলেন সে-আহ্বানপত্রে প্রথম স্বাক্ষরদাতাদের একজন। তখন কবির নামের উচ্চারণ নিয়ে একটা বিতর্ক তৈরি হয়। তখন প্রচলিত বানান ছিল ‘ভারভারা রাও’। যেহেতু ইংরেজিতে ও-রকম লেখা হয়। Varavara কিন্তু এসেছে ‘বর্বর’ থেকে, বর্বর ঋষির নামে কবির নাম। এবার বাংলায় বর্বর রাও লিখলে তা তো মোটেই সুখশ্রাব্য হবে না। এক্ষেত্রে কাঞ্চন কুমার-সহ যাঁরা অনুবাদক, তাঁরা বললেন, অন্য ভাষার উচ্চারণের প্রতি আমরা অনুগত থাকব। আমরা তেলুগুভাষী লেখক-কবিদের থেকে যাচিয়ে নিলাম এবং তেলুগু উচ্চারণ অনুযায়ী লেখা হল— ওয়রওয়রা রাও। এই রীতি ও পদ্ধতিকে কি আপনি সঠিক মনে করেন?
হ্যাঁ, একশোবার। আমি এমনকী, লেখার সময়েও কোনও স্পেনীয়, রুশ বা জার্মান শব্দ ব্যবহার করি, তখন কিন্তু আমি ফরাসির জন্য চিন্ময় গুহ-কে ফোন করি, জার্মানের জন্য রামন বা দেবব্রত চক্রবর্তীকে ফোন করি, স্প্যানিশের জন্য মালবিকা বা অর্পিতাকে ফোন করি, যাতে সেই ভাষার উচ্চারণের শুদ্ধতা বজায় থাকে। আমার মনে হয়, কলেজ স্ট্রিটের প্রকাশকদের এই বিষয়ে বোধ থাকা উচিত। তারা হয়তো আরও নানা বিষয়ে ব্যস্ত, আরও নানা দায় আছে তাদের। কিন্তু এই বোধটুকু থাকা জরুরি।

সম্পাদকের নিয়ন্ত্রণরেখা, কেতাবি ভাষায় ‘লাইন অফ ডিস্টিংকশন’-টি কী? সম্পাদককে তো এটা মাথায় রাখতে হয়, কোথায় এগোব, কোথায় এগোব না। উদাহরণ হিসেবে যদি বলি, ‘আমার জিবনী’, বাবা আলাউদ্দিন খাঁ-এর আত্মজীবনীতে তাঁর লেখা এই বানান আপনারা অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। অর্থাৎ, বাবা আলাউদ্দিন খাঁ-এর মতো একজন ব্যক্তির জীবনকে তার শিকড়ের অনুষঙ্গে ধরতে গেলে এই মাটির বানানটিও বজায় রাখতে হবে। এটা তো একটা স্টেটমেন্ট?
বাবা আলাউদ্দিন খাঁ-এর উদাহরণ যখন দিলে তখন বলি, এমনই একটা বিশেষ বয়ান এই আত্মজীবনী, সেই বয়ান আমরা পেয়েছি হাতের লেখায়, ফ্যাক্সিমিলি আকারে। আলাউদ্দিন খাঁ সাত বছর বয়সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন, প্রথাগত শিক্ষার ধারকাছ না দিয়ে না-গিয়েও ওই শিখরে পৌঁছেছিলেন। এবং সেই ওঁর এই বয়ানেই তো আমরা প্রথম জানতে পারলাম, আলাউদ্দিন খাঁ গিরিশচন্দ্র ঘোষের থিয়েটারে চার বছর সমস্ত বাদন বাজিয়েছেন, সুর দিয়েছেন। বাংলা নাট্যের ইতিহাসে কোথাও এই উল্লেখ নেই। কারণ হিসেবে, এই প্রথম আমরা জানতে পারলাম, গিরিশচন্দ্র ঘোষ একদিন সমস্ত অভিনেতাকে ডেকে বলেন, একজন ‘লেইড়ে’-র নাম আমার থিয়েটারে থাকুক আমি চাই না, তাঁর নাম তখন রাখা হল প্রসন্ন বিশ্বাস। এই লজ্জার ইতিহাসের ভার আমরা বহন করছি। তাই আমাদের সচেতন সিদ্ধান্ত ছিল, ওই বানান একেবারে সরাসরি প্রচ্ছদে থাকবে, কারণ এটা ওঁর বয়ান। এটা একটা স্টেটমেন্টও বটে। প্রকাশক কেবলই যান্ত্রিকভাবে লেখকের বই প্রকাশ করবে না, সে কিন্তু সাংস্কৃতিক ইতিহাসেও কিছু অবদান রাখছে, এ-কথা মাথায় রাখতে হবে।
এইখান থেকে পরের প্রশ্নেরও একটা ধরতাই পাওয়া যায়। একেবারে হালে জীবনানন্দ দাশের গদ্যপাঠের পুনর্নির্মাণ করতে গিয়ে একটা সমস্যা, সঙ্গে নতুন পরিসরেরও একটা আভাস পাচ্ছি। সমস্যাটা হচ্ছে, দেবেশ রায় বা ভূমেন্দ্র গুহ-র মতো যেসব প্রথিতযশারা সম্পাদনা করে গিয়েছেন, আজ আবিষ্কৃত হচ্ছে, তাঁদের অনেক পাঠে ভুল ছিল। অনেকগুলো উপন্যাসের ক্ষেত্রে তা মূলভাব নিয়ে ধরা দিচ্ছে, অনেকগুলোর ক্ষেত্রে তা নিদারুণভাবে ব্যাহত হয়েছে। কবিতা হলে তো তা ঘটতই। এই পুনঃপাঠ নির্মাণের ক্ষেত্রে আমাদের সামনে দু-টি মত মুখোমুখি এল। অনেকে বললেন, আমরা আগের সম্পাদকদের নস্যাৎ করছি। আমরা বললাম, আমরা আগের ভুলগুলো অতিক্রম করছি। আবিশ্ব এইভাবেই কাজ হচ্ছে। কিছু-কিছু জায়গায় নির্মমভাবে সম্পাদনা করতে হচ্ছে। আগের সম্পাদকদের ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়া অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের জন্য ‘অসম্মানজনক’ মনে হচ্ছে। আবার না উল্লেখ করা জীবনানন্দর নিষ্ঠ পাঠকদের জন্য ক্ষতিকর হয়ে থাকত। আপনি বলুন।
এইখানে একটা আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিত তুলে ধরা জরুরি। শেক্সপিয়রের ক্ষেত্রে, সাড়ে চারশো বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর, কিছু কথা বলা যায়। শেক্সপিয়রের নাটক যে-থিয়েটারে অভিনীত হত, গ্লোব থিয়েটার, তাদের ভয় ছিল, শেক্সপিয়রের নাটক যদি প্রকাশিত হয়ে লোকের হাতে পৌঁছে যায়, তাহলে দর্শকরা কেন নাটক দেখতে আসবে? শিক্ষিত সমাজ তখন ইউরোপে সংকীর্ণ; শিক্ষার প্রসার, ইউরোপীয় নবজাগৃতি তখন সদ্য এসেছে। থিয়েটার অনুমতি দেয় না। ওদিকে প্রকাশকরা এসে গিয়েছেন, তাঁরা বুঝতে পারছেন, এটা একটা নতুন সম্ভাবনার দিক। তখন শর্টহ্যান্ড এসে গিয়েছে, দর্শক হিসেবে পাঠানো হচ্ছে শর্টহ্যান্ড জানা মানুষদের। তাঁরা নাটকটি শুনে তা লিখে নিয়ে আসছেন, তারপর বেআইনিভাবে তা ছাপা হচ্ছে। এছাড়াও ছোট-ছোট অভিনেতাদের থেকে তাঁদের চিত্রনাট্য নিয়ে নেওয়া হচ্ছে, শর্টহ্যান্ডে যেহেতু অনেক গোলযোগ থেকে যেতে পারে, তাই তার সঙ্গে মিলিয়ে অবশেষে নাটকটা ছাপা হচ্ছে। সেই বেআইনি প্রকাশনা বাজারে চলছে, তার দ্বিতীয়-তৃতীয় সংস্করণ হচ্ছে। এবার থিয়েটারের মালিকদের মনে হচ্ছে, বাজারে তো চলছে, তাহলে আসলটাই এবার ব্যবহার করতে দেওয়া হোক। শেক্সপিয়র মারা যাচ্ছেন ১৬১৬ সালে, মৃত্যুর আগে একটি উইল করে যাচ্ছেন। সেখানে দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছেন তাঁর দুই অভিনেতা বন্ধু, জন হেমিং এবং হেনরি কন্ডোল-কে, যে তাঁর সমস্ত নাটকগুলির সংকলন তাঁরা প্রকাশ করবেন। ১৬২৩ সালে শেক্সপিয়রের নাট্যরচনার সংকলন তাঁরা প্রকাশ করলেন। তার পরেও, ওতে সংকলিত হয়নি, হয়তো শেক্সপিয়রের নির্দেশমতোই, এমন কিছু নাটকের প্রামাণ্য পাঠ পরে পাওয়া যাচ্ছে। তা পরে প্রকাশিত হচ্ছে। যেমন ‘ডাবল ফলসহুড’ নাটকটি আমরা পাইনি শেক্সপিয়রের কোনও সংকলনে আগে। একেবারে সম্প্রতি তা পাওয়া গিয়েছে।
ফলে, এমন একটা কাণ্ড ঘটতেই পারে, এবং তা খুব সম্ভ্রমের সঙ্গে, শ্রদ্ধার সঙ্গেই স্বীকার করা যায়, একজন লেখকের ইতিহাস এমন হতেই পারে। সেই ইতিহাস স্বীকার করলে কোনও ব্যক্তির অসম্মান হয় না। আমার লাইব্রেরির দুটো তাক জুড়ে শেক্সপিয়র কেন? কারণ এ-সবই পাঠান্তর। ফলে, পাঠান্তরও সম্পাদনার অংশ হয়ে উঠতে পারে।


কথাবার্তার শেষ ভাগে পৌঁছিয়ে একটা উদাহরণ টেনে আনতে প্ররোচিত হচ্ছি। টি এস এলিয়টের ‘ওয়েস্টল্যান্ড’—বই হিসাবে যা আন্তর্জাতিক সম্পাদনার একটি মাইলফলক। যখন প্রশ্ন ওঠে, এজরা পাউন্ডের এই বিপুল সংশোধনের পর এলিয়টের আদত পোড়ো জমির কতটাই-বা আর অবশিষ্ট থাকে, তখন তার কী উত্তর হতে পারে?
টি এস এলিয়ট ‘ওয়েস্টল্যান্ড’ লিখে এজরা পাউন্ডকে দিয়েছিলেন, কারণ তিনি মনে করেছিলেন এজরা পাউন্ড যোগ্যতর লেখক। এজরা পাউন্ড অনেকটা সংশোধন করেন, এলিয়ট তা অনেকটা গ্রহণও করেন। পরে ফেবার অ্যান্ড ফেবার-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর হয়েছিলেন এলিয়ট। প্রকাশক হিসেবে শেষদিকে তিনি মনে করেন, তাঁর যে-পান্ডুলিপিতে এজরা পাউন্ড সংশোধন করেছিলেন, তা তিনি প্রকাশ করবেন, এবং সসম্ভ্রমেই তা তিনি প্রকাশ করেন। এখানে মাথায় রাখতে হবে, এটি একটি অনন্য দৃষ্টান্ত, যেখানে কবি আরেকজন কবিকে সম্পাদনার দায়িত্ব দিচ্ছেন। বিষয়টা কখনওই এমন নয় যে, একজন প্রকাশক একজন সম্পাদককে ডেকে বলছেন, নে, এলিয়টের কবিতা, তুই শুধরে দে। এখানে এজরা পাউন্ড যতটা সম্পাদক, ততটা কবিও। এবং প্রকাশক হিসেবে এলিয়ট, ফেবর অ্যান্ড ফেবর প্রকাশনীতে ডিরেক্টর হয়ে যোগ দিয়েছিলেন এলিয়ট, সেই সম্পাদনাকে যখন সম্মান দিচ্ছেন, তখন তিনিও ‘ওয়েস্টল্যান্ড’-এর কবির পাশাপাশি প্রকাশকও। অর্থাৎ কবি-সম্পাদক হিসাবে তাঁর লেখায় যে-সম্পাদনা করেছেন পাউন্ড, কবি-প্রকাশক হিসাবে সে-কাজকে সম্মান জানালেন এলিয়ট।




