প্রথম পর্ব
মূল রচনা
বের্টোল্ট ব্রেখট
বঙ্গীকরণ
নীহার ভট্টাচার্য
পরিমার্জনা ও সম্পাদিত নাট্যরূপ
অনির্বাণ ভট্টাচার্য, প্রতীক দত্ত
নির্দেশনা
অনির্বাণ ভট্টাচার্য
নির্দেশকের বক্তব্য
২০১৯-এ আমরা (‘হাতিবাগান সঙ্ঘারাম’) ‘পন্তু লাহা ২.০’ মঞ্চস্থ করি।
পরিচালক হিসেবে তখন ব্যঙ্গ, বক্রোক্তির মিশেলে রাজনীতির একটা ‘মানে’ আমার কাছে ছিল, আমার মনে হত, জনমানসেও ছিল।
এখন সেসবের বালাই নেই। কোনও ‘মানে’-র আর কোনও মানে নেই। আশা, দুরাশাও চুকে বুকে গেছে।
এইরকম নিরাসক্ত সময়ে ডাকবাংলা.কম ‘পন্তু লাহা ২.০’-র স্ক্রিপ্ট ছাপার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের ধন্যবাদ। আমার ভাল লেগেছে। নিশ্চয়ই বাকিদেরও ভাল লাগবে, এই নাটকের কেন্দ্রে যে ছিল, এবং এখন টুকরো-টুকরো হয়ে আছে আমাদের সবার মধ্যে, সেই প্রসেনজিৎ (বর্ধন)-এরও ভাল লাগবে।


(৩য় বেল)
শাকিল আনসারি: অরজ্ হ্যায়, এক বাপ আপনে বেটেকো বহাত মারতা থা। বেটে নে একদিন বাপসে কাহা কে, এ বাপু, মুঝে ইতনা ভি মত মারো কে মার খাতে খাতে… মার খাতে খাতে… দর্দ কা এহসাস হি না চলা যায়ে—ওয়ে বাজা দো ইয়ারো—
(হাততালি)
তো দোস্ত, উস ভুলে হুয়ে দর্দ কা এহসাসো কে টুকরো কো জোড়কর, উন টুকরো কি অন্দর সে নিকলা হুয়া চন্দ অলফাজো কা দাস্তান হ্যায় পন্তু লাহা ২.০—ওয়ে বাজা দো ইয়ার—
(হাততালি)
প্রশ্ন আ সাকতা হ্যায় কে ২.০ কেন? উত্তর ভি হ্যায়। মসহুর নট-অভিনেতা শেখর চট্টোপাধ্যায় কি পরিচালনা মে এ নাটক হুয়া থা ৭০ কি দশক মে। লেকিন অভি একক-দশক-শতক বহুত হাত-বদল হো গ্যয়া হ্যায়। ইসি লিয়ে ২.০। পুরনো ওয়ান ডে মে থোড়া সা IPL মশালা ডালকে, নাচা-গানা পাঞ্চ করকে, ঠুসকে, ভরকে— এক কথায় নাচে-গানে ভরা নিছক হাসিকা নাটক পন্তু লাহা ২.০। আমি জুনিয়র শাকিল আনসারি, পরিচয় করিয়ে দেব আরেকজন খুবই ফেমাস, পন্তুজি কা করিব, ইস দেশ কা জিগর জুনিয়র মিঠুন চক্রবর্তী। তরস গ্যায়ে সব আপকো দেখনেকেলিয়ে। ক্যায়সে হো মিঠুনদা? খুব ভাল, যাই হোক, আবার মাঝ মাঝ মে মুলাকাত হোগা দোস্তো, অভি চলিয়ে শুরু করতে হ্যায়, ফিরসে ইয়াদ দিলা দে, দর্শকোকা সবসে পসন্দিদা নাচ-গান নিছক হাসিকা নাটক পন্তু লাহা ২.০…
[Projection 1: Title Card]
পন্তু: বেয়াড়া, এদিকে এসো।
উকিল: পন্তুবাবু, আর একটু কন্ট্রোল করুন, দরকারি কথাগুলো সেরে নিই।
পন্তু: আরেবাবা একটু স্ন্যাকস অর্ডার করছি। খিদে পায়না, নাকি? তোমরা শালা আমায় ভোটে দাঁড়করিয়ে খুঁটি-ওপড়ানো বাছুরের মতো দৌড় করাচ্ছ। আগে কিছু খাই…
উকিল: হ্যাঁ, বুঝতে পারছি। কিন্তু শুধু খাবার, প্লিজ।
পন্তু: অবশ্যই। আর সঙ্গে একটু সফ্ট ড্রিংকস, এই হোয়াইট রাম জাতীয়…
উকিল: Fuck, silly… পন্তুবাবু প্লিজ, আলোচনাটার আগে মদ না!
পন্তু: আরে হোয়াইট রাম আবার মদ হল কবে!
উকিল: ফর গড’স সেক!
পন্তু: রোসো, রোসো, হ্যাঁ, বেয়াড়া…
বেয়াড়া: বলুন স্যার!
পন্তু: বলছি, বড্ড খিদে পেয়েছে, বুঝলে? তুমি এক কাজ করো, দুটো গ্লাস দাও!
উকিল: হোলি খ্রাইস্ট!
পন্তু: দুটো হোয়াইট রামের বোতল দাও আর সেলারে গিয়ে খান চারেক হুইস্কির বোতল আর দু’ক্রেটবরফ রেডি করে রাখো।
উকিল: পন্তুবাবু, আমি মিনতি করছি, প্লিজ ফর গড’স সেক!
পন্তু: আরে দাঁড়াও না! তুমি এক কাজ করো, খান পাঁচেক, ছয়েক… সাতেক বোতল রেডি রাখো, বুঝলে, ব্যাস!
বেয়াড়া: স্যার, খাবার?
পন্তু: কী বার?
বেয়াড়া: খাবার, স্যার। ফুড।
পন্তু: ওটা ও বলবে (উকিলকে দেখায়)।
বেয়াড়া: বলুন, স্যার।
উকিল: হ্যাঁ, প্লিজ রাইট ইট ডাউন। ১২ প্লেট ক্রিস্পি চিলি বেবি কর্ন, ছ-প্লেট বাটার ফ্রায়েড গার্লিক রাইস, চার প্লেট স্পাইসি সেজওয়ান এগপ্ল্যান্ট, পাঁঠা-মুরগি আরশুয়োরের একটা করে ঠ্যাং নিয়ে যাও। ব্রিং ইট টু মি নাও।
বেয়াড়া: ওকে স্যর। কিন্তু শুয়োরের ঠ্যাংটা একটু প্রবলেম।
উকিল: I object, i object, what’s the problem? Go and bring me swine. You swine…
বেয়াড়া: ওকে স্যার।
উকিল: Sorry milord! পন্তুবাবু শুনুন—
পন্তু: বলো…
উকিল: পাঁচদিন পর মনোনয়নপত্র জমা। কয়েকটা ব্যাপার একটু সাজিয়ে নিতে হবে। আমি ঘেঁটে দেখলাম, সম্পত্তির পরিমাণটা একটু বেশিহয়ে যাচ্ছে। মানে রেকর্ড ব্রেকিং!
পন্তু: মানে?
উকিল: মানে এর আগে নির্বাচন কমিশনের খাতায় রেকর্ড আছে, এক প্রার্থী সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকারসম্পত্তি নথিভুক্ত করিয়েছিলেন। আপনারটা তার ডবলের কাছাকাছি দাঁড়াচ্ছে।
পন্তু: বিলিয়ে দেব, বিলিয়ে দেব, ভোটের পর সব বিলিয়ে দেব। বেয়াড়া…
উকিল: আই নো, আই নো। সে তো ভোটের পর। তার আগে মনোনয়নটা তো জমা দিতে হবে। তো তার আগের ব্যবস্থাটা, মানে আমি একটা হিসেব করে দেখলাম, রাধির নামে কিছুটা, হবু-ঘরজামাই আয়ানের নামে কিছুটা, আর আপনার আপত্তি না থাকলে আপৎকালীন পরিস্থিতিতে আমার নামেকিছুটা ডিস্ট্রিবিউট করে দিলেই একটা ভদ্র অঙ্কে এসে ব্যাপারটা দাঁড়ায়। দ্যাট ইজ অল, মিলর্ড।
পন্তু: এই বেয়াড়া, তুমি কি অযোধ্যা গেলে নাকি হোয়াইট রাম আনতে?
উকিল: এই পন্তুবাবু, সুরেন… একটা সিরিয়াস ব্যাপার পন্তুবাবু সুরেন, সুরেন দাস…
পন্তু: হ্যাঁ বলো, বলো… এইত্তো, এসে গেছে!
উকিল: বলছি, সুরেন… সুরেনের ব্যাপারটা ঝামেলার হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ওর চোখ-মুখ কেমন হয়ে যাচ্ছে… ভুরুসব সময়ে কোঁচকানো!
পন্তু: তোমার গ্লাসটা দাও।
উকিল: হোলি জিসাস! পন্তুবাবু, ইতিহাস আমাদের শেখাচ্ছে, পচা ডিমকে থেঁতলে না দিলে মুরগি হবে ডিমের মালিক।
পন্তু: (মদ খেয়ে) আহ্ পেটে পড়তেই শুরু ইভোলিউশন…
উকিল: পন্তুবাবু, লাহাপুরে শুরু রেভোলিউশন! হোলি খ্রাইস্ট!
(হোটেলের গুঞ্জন শোনা যায়)
হোটেলমালিক: হ্যাঁ, কত নম্বর? কে দেখি, অ, সাত নং? ওখানে ডাল আছে, ঘ্যাঁট আছে, পরে দু’বার ভাত আছে, ডবল ডিম আছে। হ্যাঁ, বলুন দাদা, কী দেব?
মতি: নিরামিষ আছে?
হো.মালিক: আছে, সবজি-ভাত।
মতি: কী কী থাকবে?
হো.মালিক: ভাত-ডাল-আলুচোখা-একটা ঘ্যাঁট-লেবু-লঙ্কা-লুন।
মতি: পেঁয়াজ নেই?
হো.মালিক: না দাদা, পেঁয়াজ শর্টেজ আছে। মুলো আছে, কেটে দিতে পারি।
মতি: সবজি-ভাত কত?
হো.মালিক: আলুর চোখা নিয়ে ২৮ টাকা, চোখা ছাড়া ২৬।
উকিল: মানে এর আগে নির্বাচন কমিশনের খাতায় রেকর্ড আছে, এক প্রার্থী সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকারসম্পত্তি নথিভুক্ত করিয়েছিলেন। আপনারটা তার ডবলের কাছাকাছি দাঁড়াচ্ছে।
পন্তু: বিলিয়ে দেব, বিলিয়ে দেব, ভোটের পর সব বিলিয়ে দেব। বেয়াড়া…
উকিল: আই নো, আই নো। সে তো ভোটের পর। তার আগে মনোনয়নটা তো জমা দিতে হবে। তো তার আগের ব্যবস্থাটা, মানে আমি একটা হিসেব করে দেখলাম, রাধির নামে কিছুটা, হবু-ঘরজামাই আয়ানের নামে কিছুটা, আর আপনার আপত্তি না থাকলে আপৎকালীন পরিস্থিতিতে আমার নামেকিছুটা ডিস্ট্রিবিউট করে দিলেই একটা ভদ্র অঙ্কে এসে ব্যাপারটা দাঁড়ায়। দ্যাট ইজ অল, মিলর্ড।
মতি: ডিম-ভাত হবে?
হো.মালিক: হবে।
মতি: কী থাকে?
হো.মালিক: ভাত-ডাল-ঘ্যাঁট। ডবল ডিম হলে ৩৮, সিঙ্গল হলে ৩৫।
মতি: আলুর চোখা নেই?
হো.মালিক: আলুর চোখা আলাদা নিলে চার টাকা।
মতি: ঘ্যাঁট বাদ দিয়ে ডাল, সিঙ্গল ডিম আর আলুর চোখা নিলে কত?
হো.মালিক: ঘ্যাঁট বাদ দিয়ে ডাল, সিঙ্গল… দাঁড়ান। ১০ ওদিকে পাঁচ, হ্যাঁ ৩২ টাকা।
মতি: পরে ভাত নিলে কত?
হো.মালিক: পার বাটি চার টাকা।
মতি: হাফ বাটি কত?
হো.মালিক: হাফ বাটি হয় না দাদা…
মতি: মাছ-ভাত হবে?
হো.মালিক: দাদা, এক মিনিট। মন দিয়ে, কান খুলে… ঠিক আছে দাদা? সবজি-ভাত: ভাত-ডাল-আলু চোখা-ঘ্যাঁট-লেবু-লঙ্কা-নুন ২৮ টাকা। ঘ্যাঁট বাদ দিয়ে চোখা নিলে ২৭ টাকা। চোখা বাদ দিয়ে ঘ্যাঁট নিলে ২৬ টাকা। ডিমভাত: ডাল-ভাত-লেবু-লঙ্কা-নুন-ঘ্যাঁট-আলু চোখা ৪২টাকা। চোখা বাদ দিয়ে ডবল ডিম নিলে ৩৮টাকা, সিঙ্গল ডিম চোখা দিয়ে নিলে ৩৯, চোখা আর ঘ্যাঁট বাদ দিয়ে ডবল ডিম ৩২। মাছ-ভাত পাবেন: ঘ্যাঁট-লংকা-ডাল-লেবু-মুন-কাটাপোনা ঝোলে এক পিস আলু পাবেন ৪৬টাকা। ঝোলের আলু-ঘ্যাঁট বাদ দিলে ৪২টাকা। আলু চোখা-ঘ্যাঁট নিয়ে ঝোলের আলু বাদ দিলে ৪৪টাকা। মাংস-ভাত পাবেন: লেবু-নুন-দু’পিস চিকেন-লঙ্কা-ডাল নিয়ে ৫৬টাকা। ডাল-আলু চোখা নিয়ে ঘ্যাঁট বাদ দিয়ে ৫৮ টাকা। ডাল বাদ দিয়ে ঘ্যাঁট নিয়ে আলু চোখা ছাড়া ৫৫টাকা।৫ আর ৯ নং টেবিলে একটা করে সিট খালি আছে। ডানদিকের ঈশান কোণে হাত ধোবার জল আছে, ট্রে-তে লাইফবয় সাবান আছে দাদা। কাউন্টারে ভাজা মৌরি, ছোটোদানার মিছরি মিশিয়ে আছে। বলুন দাদা, কী দেব?
মতি: ভাত আর ডাল দিয়ে দাও এক বাটি। আর লেবু-লঙ্কা-নুন।
হো.মালিক: লেবু-লংকা-নুন শর্টেজ আছে দাদা। শুধু ভাত আর ডাল দিয়ে দিই?
মতি: ঠিক আছে।
হো. মালিক: ওই ৫নং টেবিলে ন্যাতা লাগা…
[Projection 2: Pontu Election campaign]
পন্তু: রিট্রিট, কভার, ফায়ার (লুকিয়ে ঢুকে উকিলকে দেখে), এটা আবার কে রে ভাই! ও ফর গড’স সেক ওঠো, তুমি আমায় এভাবে ছেড়ে যেতে পারো না, ওয়েক আপ। কমরেড স্তালিনকে আমি কী মুখ দ্যাখাব?! কমরেড কে আছ?
বেয়াড়া: স্যার, এইতো আমি!
পন্তু: তো তুমি তো সাড়া দাও। কতক্ষণ ধরে ডাকছি শোনো, হি ইজ ডেড। মুসোলিনি ইজ ডেড। যাকগে, বাদ দাও। কদ্দিন হল আমরা এখানে এসেছি?
বেয়াড়া: দু’দিন, স্যার।
পন্তু: শুনলে? মাত্তর ছোট-ছোট দুটো দিন। ব্যাস, তাতেই হয়ে গেল? ভাবলাম ভোটের আগে, মাল নিয়ে বসে দুটো সুখ-দুঃখের রাজনৈতিক আলোচনা করব! কী হে বাপু তোমরা? আরেকটু মাল খেয়েআমার সাথে বসে গল্প করলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হত? স্বার্থপর! এই, কী বার?
বেয়াড়া: চ্যামেলি বার।
পন্তু: চ্যামেলি বার? আরে বার, বার, সোম-মঙ্গল-বুধ কী বার?
বেয়াড়া: আজ্ঞে স্যার শনিবার।
পন্তু: কী! আজ শনিবার? বৃহস্পতিবার রাতে এলাম, আমার পষ্ট মনে আছে, পরদিন সকালেই শনিবারহয়ে গেল? তুমি তো অবাক করলে হে কমরেড!
বেয়াড়া: মাপ করবেন স্যার, আজ কিন্তু শনিবার।
পন্তু: এইসব বলে আমাদের তাড়িয়ে দিতে চাইছ তো? তার চেয়ে বাপু এই ঘাড়টা ধরেই বের করে দাও না! ঠিক আছে, আরেকটা বোতল নিয়ে এসো, যাও। ভাল করে শোনো, আবার সবউলটোপালটা করে বোসো না, তুমি যেমন লোক, একটা বোতল। এই, কী বার?
বেয়াড়া: স্যার শনি… না, শুক্রবার।
পন্তু: গুড। একটা বোতল। যাও…
বেয়াড়া: আজ্ঞে স্যার, আনছি।
পন্তু: (উকিলকে) উঠে পড়ো বাবা, ওঠো। সোনা আমার, উকিল আমার, ওঠো। মাল তো খেলাম আমি, তুমি গন্ধ শুঁকেই কাত হয়ে পড়লে বাবা? এই আমায় দ্যাখো, কই, আমার কিছু হচ্ছে? দ্যাখো,কীরকম গ্যারি সোবার্সের মতো গোলটা দিলাম। কেমন শচীন দেব বর্মনের মতো ছয়টা মারলাম, টক্কাস… (মতিকে দেখে চমকে) ওহ্ শিট, এনিমি ইজ হিয়ার। আই নিড ওভার, কভার। মানে কভার, ওভার। এই, তুমি কে বিপ্লবের শত্রু? তুমি কি রাশিয়ার জার না হিটলার না রুনু গুহনিয়োগী না সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়?
মতি: আমি স্যার আপনার ড্রাইভার।
পন্তু: কী, তুমি কী!
মতি: আজ্ঞে, আমি স্যার আপনার ড্রাইভার।
পন্তু: ও-কথা সবাই বলতে পারে, আমি তোমাকে চিনিই না।
মতি: আপনি বোধহয় আমায় এখনও ঠিকমত লক্ষ করেননি। আমি সবে মাসখানেক হল কাজে লেগেছি।
পন্তু: এখন এলে কোত্থেকে?
মতি: আজ্ঞে বাইরে থেকে। দু’দিন ধরে বাইরে গাড়িতে বসে আছি।
পন্তু: কোন গাড়ি?
মতি: আজ্ঞে আপনার গাড়ি।
পন্তু: আমার গাড়ি? এই দ্যাখো কী বলছে, বলছে আমার গাড়ি!
উকিল: প্রমাণ?
পন্তু: কী! ও হ্যাঁ, প্রমাণ! অদ্ভুত ব্যাপার! প্রমাণ করতে পারবে?
মতি: আজ্ঞে না, অনেক হয়েছে। আপনার আশায় আর বসে থাকবার কোনও ইচ্ছে আমার নেই। সেইকথাটাই বলতে এলাম, একটা মানুষের সাথে আপনি এরকম করতে পারেন না। আমি একটা মানুষ।
পন্তু: কী? তুমি কী?
মতি: মানুষ।
পন্তু: কী মিথ্যে কথা বলে রে বাবা! এই একটু আগে বললে তুমি ড্রাইভার, এখন বলছ মানুষ! দ্যাখো বাবা, কথা বলবে, ভেবেচিন্তে বলবে। এই কেমন ধরা পড়ে গেলে… গেলে তো?
মতি: আমার পাওনা টাকাটা মিটিয়ে দিন, আমি এক্ষুনি চলে যাব।
পন্তু: তোমার গলাটা চেনা কোনও মানুষের মতোই লাগছে। বসো, গলাটা একটু ভিজিয়ে নাও। তোমার সাথেঅবশ্যই আলাপ করা দরকার।
বেয়াড়া: এই নিন স্যার, আপনার একটা বোতল…
পন্তু: গুড। আজ কী বার?
বেয়াড়া: শুক্রবার, স্যার।
পন্তু: গুড। এই হচ্ছে আমার এক বহুদিনের পুরনো বন্ধু, একটু আগে আলাপ হল। ওর নাম সত্যজিৎ রায়।
বেয়াড়া: আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার, আপনার ড্রাইভার।
মতি: বেশ। আমার নাম মতি সরকার আর আমি আপনার ড্রাইভার।
পন্তু: দিল, দিল… বুঝলে? দিল… আমার দিলটা বিরাট বড়। আর দিল দিওয়ানা বিন সজনাকে মানে না। তুমি হলে আমার সজনা। জানো সজনা, আমি দেখেছি, অনেকে চাকর-বাকরকে ভাল করে খেতেই দেয় না। গালাগালি করে। আমার ওসব সহ্য হয় না বাপু। আমি বলি, ওরাও তো মানুষ, আমারই মতো। তা সবাই মিলে একটুভাগ-যোগ করে খেলেই হয়! তাই তো?
মতি: নিশ্চয়ই!
পন্তু: কে আমার ড্রাইভার?
বেয়াড়া: ও।
পন্তু: আচ্ছা, তুমি তাহলে কমরেড ড্রাইভার! এতক্ষণ কোথায় ছিলে? আমি যুদ্ধে হেরে গেলাম! লেনিনের চিঠি এনেছ?
মতি: না।
পন্তু: গুড। মাল খাও।
মতি: হ্যাঁ, দিন। না… হ্যাঁ… না, থাক।
পন্তু: বুঝেছি। আমার সাথে বসে মাল খেতে ভরসা পাচ্ছ না। ঠিকই তো! যার-তার সাথে মাল খাওয়া ঠিক না। তাই আগে পরিচয় করে নেওয়া ভাল। এই আলো দাও, আলো দাও। আমি লাহাপুরের পন্তু লাহা। বিয়াল্লিশ হাজার পাঁচশ ছত্রিশটা ভোটে জিতে এবার এমএলএ হব। নির্বিবাদী মানুষ। ছ-টা চা-বাগান, ২৬ একর জমি, ন-টা মাছের ভেড়ি, চারটে তেলের কল, ১৬টা গাড়ি, ৪০টা গরু, সাতটা হোটেল, তিনটে হসপিটাল, চারটে লটারির দোকান, দুটো প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটা হেলিকপ্টার আর একটা শনিমন্দির আছে আমার। ব্যাস, এটুকুই। আমার সাথে বসে অনায়াসে মাল খেতে পারো।
মতি: বেশ। আমার নাম মতি সরকার আর আমি আপনার ড্রাইভার।
পন্তু: দিল, দিল… বুঝলে? দিল… আমার দিলটা বিরাট বড়। আর দিল দিওয়ানা বিন সজনাকে মানে না। তুমি হলে আমার সজনা। জানো সজনা, আমি দেখেছি, অনেকে চাকর-বাকরকে ভাল করে খেতেই দেয় না। গালাগালি করে। আমার ওসব সহ্য হয় না বাপু। আমি বলি, ওরাও তো মানুষ, আমারই মতো। তা সবাই মিলে একটুভাগ-যোগ করে খেলেই হয়! তাই তো?
মতি: নিশ্চয়ই!
পন্তু: আমি কি তোমাকে সত্যি-সত্যিই বাইরে বসিয়ে রেখেছিলাম?
মতি: হ্যাঁ স্যার।
পন্তু: কাল সারারাত?
মতি: আজ্ঞে পরশুও।
পন্তু: ইশশশ! এই তোমাকে বলে রাখছি, আবার যদি এরকম করি তো আমায় জুতোপেটা কোরো। মতি,তুমি আমার বন্ধু না?(মতি মাথা নামিয়ে নেয়) বন্ধু না?
মতি:(একটু ভেবে) না, স্যার।
পন্তু: জানতাম। আমাকে একবার ভাল করে দ্যাখো মতি। কী দেখছ?
মতি: সত্যি বলব? রাগ করবেন না তো?
পন্তু: না, না, মাইরি বলছি। বলো, বলো…
মতি: হোঁৎকা, মোটা। বেহেড মাতাল আর প্রচুর টাকার মালিক।
পন্তু: গুলি করবে। এরকম লোক দেখলেই গুলি করবে।
মতি: না, না, ঠিক আছে।
পন্তু: না। ঠিক নেই মতি। তুমি গুলি করো, এক্ষুনি।
মতি: আমার কাছে তো বন্দুক নেই!
পন্তু: আরে, মনে-মনে গুলি করো। করেছ? (মতি ঘাড় নাড়ে) একটু আওয়াজ করে করো…
মতি: ঢিঁচকাও…
পন্তু: আ… এরকম ২০০ গুলি বুকে নিয়ে সংগ্রাম করতে পারি। লেনিনের বুকে ক’টা গুলি ছিল?
মতি: জানি না।
পন্তু: তিনটে। করমচাঁদ গান্ধী তো দুটো গুলিতে টেঁসেই গেল। ২০০টা গুলি, ২০০টা… আসে কেউ আছেপাছে? মতি, আজ থেকে আমি আমার নতুন নাম দিলাম ভ্লাদিমির পন্তু গান্ধী লাহা। কেমন?
মতি: দারুণ!
পন্তু: আচ্ছা মতি, তুমি আমার এখানে কী করে এলে বলো তো?
মতি: এমনি।
পন্তু: এমনি কেমনি?
মতি: ওই আগের চাকরিটা চলে গেল।
পন্তু: ইশশ, কী করে গেল?
মতি: আমি ভূত দেখে ফেলেছিলাম।
পন্তু: ভূত! সত্যিকারের ভূত?
মতি: হ্যাঁ, মানে ওই আর কী!
পন্তু: মানে উউউউউউট (ভূতের মত শব্দ করে), এরকম ভূত?
পন্তু: চ্যামেলি বার? আরে বার, বার, সোম-মঙ্গল-বুধ কী বার?
বেয়াড়া: আজ্ঞে স্যার শনিবার।
পন্তু: কী! আজ শনিবার? বৃহস্পতিবার রাতে এলাম, আমার পষ্ট মনে আছে, পরদিন সকালেই শনিবারহয়ে গেল? তুমি তো অবাক করলে হে কমরেড!
বেয়াড়া: মাপ করবেন স্যার, আজ কিন্তু শনিবার।
মতি: হ্যাঁ প্রায় সেরকমই।
পন্তু: কোথায় বলো তো?
মতি: আপনি চেনেন।
পন্তু: কে?
মতি: ওই পুলিন মজুমদারের বাড়িতে। সবাই সেখানে ভূত দেখত।
পন্তু: কেন?
মতি: কেন, কে জানে! আমার মনে হয় কী জানেন?
পন্তু: কী?
মতি: ওখানে চাকরবাকরদের ভাল খেতে দিত না তো, তাই রাতে ভাল ঘুমও হত না…
পন্তু: ও!
মতি: সবাই স্বপ্ন দেখত।
পন্তু: কী স্বপ্ন?
মতি: দুঃস্বপ্ন। প্রথম-প্রথম আমি কিছু দেখিনি।
পন্তু: তারপর?
মতি: তারপর একদিন আমিও দেখলাম।
পন্তু: কী?
মতি: তখন পুলিনবাবুর স্ত্রী আঁতুড়ঘরে। জ্যোৎস্নারাত। ঘুম ভেঙে উঠেই জানলা দিয়ে দেখতে পেলাম, পুলিনবাবু… পুলিনবাবুর ভূ-উ-উ-ত গোয়ালঘরের দিকে এগিয়ে চলেছে! ঝিঁঝি ডাকছে। আকাশে কালো মেঘ, গোয়ালের দরজা খুলে ভূত গিয়ে ঢুকল গয়লা মেয়েটির ঘরে। খানিকক্ষণ চারিদিক silent! তারপরেই শুরু বিকট আওয়াজ।
পন্তু: কী ধরনের আওয়াজ মতি?
মতি: আজ্ঞে, অসভ্য টাইপ আওয়াজ স্যার। পাবলিক প্লেসে করা যায় না।
পন্তু: Shut up! পাবলিক প্লেস! This is Pontu place, কী আওয়াজ বলো।
(মতি আওয়াজ করে)
পন্তু: হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক আছে, ঠিক আছে। আস্তে, আন্তে। পুরো ব্যাপারটাই আমি বুঝতে পেরেছি। তাহলে মতি, দেখা যাচ্ছে, ভাল খাবারটাই হচ্ছে সমস্যা। ভাল খেতে পাচ্ছে না, তাই ঘুম আসছে না, আর তাই ওসব দুঃস্বপ্ন দেখে ফেলছে। কিন্তু মতি, অত চাকরের মধ্যে তোমার চাকরিটাই কেন গেল?
মতি: আজ্ঞে, পুলিনবাবু বললেন আমাকে দেখতে ছুঁচোর মতো আর স্বভাবটা খোঁচরের মতো। এই ভূত-চোদন নাকি আমিই রটিয়েছি।
পন্তু: কোন চোদন বলেছে তোমাকে ছুঁচোর মতো দেখতে? কোন শালা! পুলিনের ইয়ে মারি আমি।তোমাকে বিবেকানন্দের মতো দেখতে। এইভাবে দাঁড়াও মতি, দাঁড়াও। পুরো কমরেড বিবেকানন্দ। আমার কাছে তুমি ওসব পাবে না। খাওয়া, ঘুম, স্বপ্ন, সবটাই আমার একেবারে composed। আমার কাজটি ঠিকমতো করো, ব্যাস, আর কিছু চাই না। কী কুক্ষণেই যে জন্মেছিলাম এই পন্তু লাহা হয়ে! কিন্তু এইবার, এই তোমাকে বলছি, এবার আর ওসব চলবে না। দু’দিন বাদেই মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছি, ব্যাস, খবরদারি করার আর লোক থাকবে না। তোমাদের মাইনে বাড়িয়ে দেব। আমার যা আছে, তাতে তোমাদের আর আমার মিলেমিশে চলে যাবে। তুমি বিবেকানন্দ, আমি বিদ্যাসাগর, আমরা দু’টি ভাই। আমাদের দুজনের মধ্যে কোনও তফাত থাকুক, এ আমি চাই না। বলো মতি, কোনো তফাত নেই। আমরা দুজনেই এক, বলো…
মতি: আপনি যদি হুকুম করেন, তবে আমরা এক।
উকিল : অর্ডার। অর্ডার! আদালতের অবমাননা করলে উড়ে গিয়ে লাথি মেরে দেব কাঠগড়াতে…
পন্তু: ও শালা স্বপ্ন দেখছে। বাড়ি গেলেই বউ মারবে। আমার ওসব ঝামেলা নেই। মেয়েটাকে পার করতে পারলেই বেঁচে যাই। আমার হবু জামাই দারোগা। ভোটের আগেই বিয়েটা সেরে ফেলছি। তবে আসল দারোগা ওর পিসি। মাগি বিধবা হয়েছে অনেকদিন, কিন্তু তেজ কমেনি। গায়ে-গতরে ভালই আছে। বলে কিনা জামাইকে শালবাগান যৌতুক দাও, নয়তো আমাকে বিয়ে করো। একটু বুদ্ধি করে বলো তো মতি, কী করি? শালবাগান বেচি না নিজেকে বেচি?
মতি: আজ্ঞে, শালবাগান বেচলে যদি ল্যাঠা চুকে যায়, তাহলে নিজেকে কে আর বিক্রি করে?
পন্তু: শালবাগান বিক্রি করব! তুমি ভাই সত্যিই হতাশ করলে আমায়। একটা শালবাগান মানে কি শুধু কয়েকশো কুইন্টাল কাঠ? অমন সবুজ, সুন্দর একটা বাগান, কত মজুরের রোজগার সব বেচে দেব! কমরেড স্তালিনকে মুখ দেখাব কী করে?
মতি: স্তালিনকে জিজ্ঞেস করুন।
পন্তু: না, ঝগড়া হয়ে গেছে।
মতি: তাহলে পরেরটাই করুন।
পন্তু: ঠিক আছে। মেয়ের জন্য আমিই শহিদ হব। ধুর শালা জমি-জায়গা, টাকা-পয়সা সব বিলিয়ে দিয়ে সর্বহারা হয়ে, তুমি আর আমি গলা জড়াজড়ি করে, দুই কমরেড বেরিয়ে যাব মতি।
উকিল: অর্ডার! অর্ডার! আদালতের অবমাননা করলে helicopter থেকে পোঁদে লাথি মেরে ফেলে দেব…
পন্তু: ওই দেখো, ও হেলিকপ্টরে উঠেছে, ওকে নামাও, ওকে তোলো… আর এই মানিব্যাগটা ধরো। এদের হিসেব চুকিয়ে দিয়ে তোমার কাছে রেখে দাও। আমার কাছে থাকলে ফুরোবে। আমার কিছু না থাকলেই ভাল হত। যন্ত্র, টাকা-পয়সা সব যা, চলে যা, পালা, ওই পালিয়ে যাচ্ছে… আমরা দু’জন ঘুরে বেড়াতাম সারাটা দেশ। পায়ে হেঁটে। বড়জোর একটা ছোট্ট মোটরগাড়ি করে। একটুখানি পেট্রোল? সে জোগাড় হয়ে যেত। মধ্যে-মধ্যে যখন ক্লান্ত হতাম, গিয়ে বসতাম কোথাও দু’জনে, একটুখানি মাল খেতাম দু’জনে বসে। আয় আয় আয় (বেয়ারা ঢোকে) দাঁড়া দাঁড়া দাঁড়া, রোম্যান্টিক বাজা। তার জন্য না-হয় কোথাও এটটু মজুর খাটতাম, তা আর এমন কী বলো? এগারো বোতল হোয়াইট রাম, ন’বোতল হুইস্কি, সাত বাটি চানাচুর, দশ প্লেট চিপস, বারো প্লেট ক্রিস্পি চিলি বেবি কর্ন, ছয় প্লেট বাটার ফ্রায়েড গার্লিক রাইস, চার প্লেট স্পাইসি সেজওয়ান এগপ্ল্যান্ট, সতেরোটা মুরগির ঠ্যাং, পাঁচটা খাসির দাবনা— দুর্ভাবনা আর ভাল লাগে না। কে? কামিং, কামিং ট্রাম্প, ওকে ইউ নিড কভার? আই অ্যাম কামিং, স্ট্যাচু অফ লিবার্টি— ওভার।
(শাকিল আনসারির প্রবেশ। গান।)
কত যে সাগর নদী পেরিয়ে এলাম আমি
কত পথ হলাম যে পার
পন্তু লাহার মতো অপরূপ সুন্দর
কাউকে তো দেখিনি গো আর।
পন্তু লাহা মনে রেখো, পন্তু লাহা সাথে থেকো
হাওয়ায় হাওয়ায় ওড়ে ভোটের খবর
লাহাপুরে রাত ঘুচে আসবে যে ভোর
রিগিং ছাড়া ভোটিং হবে, দ্যাখা যাবে শ্রমিকের জোর
সিপিএম গ্যাছে বলে ভেবেছিলাম আমি
গরিবের কেউ নেই আর
পন্তু লাহার মতো অপরূপ বিপ্লবী
কাউকে তো দেখিনি গো আর
পন্তু লাহা মনে রেখো
পন্তু লাহা সাথে থেকো।।




