সাক্ষাৎকার : আপ্পুপেন

সম্প্রতি শান্তিনিকেতনের ‘সোয়াদ’-এ ‘অ্যান্টনিম’ আয়োজিত ‘লাইনরাইটস’ রেসিডেন্সিতে এসেছিলেন বিশ্ববিখ্যাত কমিকস শিল্পী আপ্পুপেন। কমিকস থেকে ডিসটোপিয়ার জগৎ, অনেককিছু নিয়ে কথাবার্তায় সাত্তিক শঙ্খ। সঙ্গে ছিল ডাকবাংলা.কম।

কমিকস তৈরির কর্মশালা

আমরা ‘অ্যান্টনিম’ আয়োজিত ‘লাইনরাইটস’ রেসিডেন্সিতে বসে কথা বলছি, কাজেই প্রথমেই জিজ্ঞেস করব, এই রেসিডেন্সির অভিজ্ঞতাটা আপনার কেমন?

কেবলমাত্র ‘অ্যাডাপ্টেশন’, মানে গল্পকে গ্রাফিক মাধ্যমে রূপান্তরিত করার জন্য এরকম ‘রেসিডেন্সি’ পরিচালনা করা আমার কাছে একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা। এর আগে আমি কর্মশালা করেছি কিছু। সেখানে অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের গল্প তৈরি করতে বলেছি, তারপর তারা নিজেরাই সেই গল্প সম্পূর্ণ করেছে।

কিন্তু এবারের উদ্যোগে আরও একটা ধাপ যুক্ত হয়েছে। আমরা এই কাজগুলোকে একত্র করে একটি সংকলন প্রকাশ করারও চেষ্টা করছি। আর এই গল্পগুলোকে একটা সুতোয় বাঁধতেও হচ্ছে, কারণ, কাজটা একটা ‘অ্যান্থোলজি’ হবে।

এখানে তাহলে গল্প বাছাইয়ের ব্যাপারটা কীভাবে হচ্ছে?

গল্প বাছাই-সহ যাবতীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে ‘অ্যান্টনিম’ প্রকাশনী। যেহেতু গল্পগুলো অনূদিত, ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গল্পগুলো এমন লেখকদের, যাঁদের মূল লেখা আগে প্রকাশিত হয়েছে, অথবা গল্পগুলোর স্বত্বাধিকারীদের সঙ্গে প্রকাশনার যোগাযোগ রয়েছে। 

ঠিক। কিন্তু গল্পগুলোকে গ্রাফিক মাধ্যমের জন্য অদলবদল করার কাজটা কি আপনি করছেন?

না, আমি নিজে কিন্তু সব গল্প অ্যাডাপ্ট করছি না। যে ন’টি গল্প নিয়ে কাজ হচ্ছে, আগে আমি সবক’টিই পড়েছি। তারপর অংশগ্রহণকারীদেরও গল্পগুলো পড়তে দেওয়া হয়েছে। এখন প্রত্যেকে নিজের-নিজের গল্পের জগতে ঢুকে পড়েছে। তারপর আমরা কাজ শুরু করেছি, খসড়া আঁকছি। প্রথম দু-দিন মূলত গল্পগুলো ভাল করে বোঝার চেষ্টা করেছি। গল্পে আসলে কী ঘটছে, আমাদের কী করতে হবে— সেসব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমি ওদের ব্যাখ্যা শুনতে চাই। গল্পটা পড়ে ওরা কী বুঝছে, কীভাবে দেখছে, সেটাও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

আর একটা বিষয় মাথায় রাখতে হচ্ছে। এদের প্রায় কেউ-ই আগে নিজেদের বই প্রকাশ করেনি। তাই লেখার ধরন বা নির্মাণের ক্ষেত্রে যাতে মূলগত ভুলগুলো না করে বসে, সেটা নজর রাখছি। তাই শৈলী ও লেখার দিক থেকে কাজটা আপাতত একটু সংযত রাখতে বলছি। গল্পের মূল কাঠামোটা চিহ্নিত করতে হবে, মূল প্লটটা সামনে আনতে হবে, এটা প্রাথমিক কাজ। আঁকার কৌশল হয়তো এখনই পুরোপুরি আয়ত্ত হবে না, কিন্তু গল্পটা যেন ঠিকভাবে তৈরি হয়, সেটা আগে নিশ্চিত করতে হবে। আমরা মূলত আঞ্চলিক ভাষার গল্প থেকে সর্বোচ্চ কুড়ি পৃষ্ঠার গ্রাফিক গল্প তৈরি করছি। আমার আশা, শেষ পর্যন্ত আট-ন’টি গল্প নিয়ে একটা ভাল সংকলন তৈরি করতে পারব। তবে তার জন্য আরও অনেকটা সময় দরকার।

এই এক সপ্তাহে আমাদের লক্ষ্য, লেখা-সহ প্রতিটি গল্পের একটি সুসংহত স্টোরিবোর্ড তৈরি করা। চূড়ান্ত ছবির দিকে এখনই মনোযোগ দিতে চাই না, কারণ তাতে অনেক সময় লাগবে। পাঁচ-ছয় দিনে সেটা সম্ভবও নয়। তাছাড়া কমিকসের ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীদের খুব একটা অভিজ্ঞতা আছে বলে মনে হয় না। তাই আমি ওদের এমন কমিকস দেখতে বলেছি, যেগুলো মূলত একক ফ্রেমের বা খুব ছোট পরিসরের। 

একটা গল্পকে স্টোরিবোর্ডে রূপান্তর করার সময় আপনি কৌশলটা কী? প্রক্রিয়াটার মধ্যে কী কী নতুন উপলব্ধি তৈরি হচ্ছে? আপনি তো বিষয়টা ভালই জানেন; কিন্তু ওরা কীভাবে নিজেদের মতো করে বিষয়গুলো আবিষ্কার করছে?

প্রথমে আমি ওদের বলেছি, গল্পটা পড়ে ওরা কী বুঝেছে, সেটা নিজের ভাষায় লিখতে। গল্প পড়ার পর প্রত্যেকে কিছু না-কিছু লক্ষ করে। আমি ওদের বলি, গল্পটা কীভাবে উপস্থাপন করতে চায়, তার নিজস্ব একটা সংস্করণ লিখে ফেলতে। তাতে বোঝা যায়, গল্প পড়ার সময় কোন বিষয়গুলো ওদের মনে দাগ কেটেছে, কোন ঘটনাগুলোকে ওরা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছে। তারপর আমি ওদের লেখা নিয়ে আলোচনা করি। আমার কাছে আসলে প্রথমেই সবকিছু লিখে নেওয়া জরুরি। ওরা লেখে। তারপর স্টোরিবোর্ড তৈরির কাজ শুরু হয়। এটার কারণ একটাই, আমার কাছে স্টোরিবোর্ড তৈরি মানে শুধু ছবি আঁকা নয়। গল্প থেকেই বেছে নিতে হয়— কোন অংশটা বর্ণনা হিসেবে ব্যবহার করা হবে, কোনটা চরিত্রের সংলাপ হবে। আবার ছবির ধরন অনুযায়ী সংলাপ বা বর্ণনাও বদলে যেতে পারে। বর্ণনা পাঠককে ছবিতে কী আসতে চলেছে, সে-সম্পর্কে ধারণা দেয়। এই তিনটি বিষয়— লেখা, সংলাপ ও ছবি— একসঙ্গে তৈরি করতে হয়। আমার মনে হয়, এই পর্যায়েই লেখার সঙ্গে ছবির প্রকৃত মেলবন্ধন ঘটে। যেমন, অনেক সময় যেমন আমার মাথায় একটা স্ক্রিপ্টের ধারণা থাকে। কিন্তু আঁকতে গিয়ে দেখি, চরিত্রের মুখের অভিব্যক্তির কারণে স্ক্রিপ্টটাই বদলে যাচ্ছে। আবার কখনও স্ক্রিপ্ট লিখতে-লিখতেই বুঝতে পারি, এইটুকু অভিব্যক্তিই যথেষ্ট; এর বেশি কিছু দেখানোর দরকার নেই। লেখা আর ছবির মধ্যে এই যে আদানপ্রদান, আমার মনে হয়, কমিকসের সবচেয়ে ভাল দিকগুলোর একটি এটাই।

নির্বাক কমিকস, লেখা এবং ছবির ভাষা

আপনি বলছিলেন, স্টোরিবোর্ড তৈরির সময় শুধু ছবি নয়, লেখাও গুরুত্বপূর্ণ। অথচ আপনার নিজের অনেক কাজই নির্বাক কমিকস। আপনি তো এমন কাজ অনেক করেছেন, এবং সেগুলো উপভোগও করেছেন। সেগুলোও কি আগে লিখে নিতেন?

হ্যাঁ, সেগুলোরও একটা স্ক্রিপ্ট থাকত। আমাকে জানতে হত, গল্পের চূড়ান্ত মুহূর্তটা কোথায়, কীভাবে সেখানে পৌঁছব, কোথায় ভূমিকা থাকবে, কীভাবে গল্পটা শুরু হবে এবং কোথায় একটা মোচড় বা চমক থাকবে। ধারণাটা পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার পরেই আমি ছবির দিকে এগোতাম। আমার ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটা বরাবরই এমন— প্রথমে ধারণা, তারপর লেখা, তারপর ছবি। লেখার মাধ্যমে বুঝতে পারি, গল্পটা সম্পূর্ণ হয়েছে কি না, আমি পাঠককে কোথাও একটা নিয়ে যেতে পারছি কি না।

তাহলে লেখাটাই কি আপনার কাছে পরিকল্পনার মূল অংশ? না কি, ছবির সঙ্গে শব্দ বসাবেন কীভাবে, সেই ভাবনাটা আবার আলাদা করে ভাবতে হয়?

আমি বিষয়টাকে একটু অন্যভাবে দেখি। প্রথমে একটা ধারণা আসে। সেই ধারণা নিয়ে লিখতে বসলে কীভাবে সেটাকে দৃশ্যের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়, তা বুঝতে পারি। অনেক সময় কোনও গল্পের ধারণা নিয়ে ভাবতে-ভাবতেই মনে হয়, এটা তো কোনও শব্দ ছাড়াই দেখানো সম্ভব। কিন্তু সব ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়। কিছু বিষয় ব্যাখ্যা করতে হয়, নতুন কিছু জানাতে হয়, অথবা এমন কোনও তথ্য দিতে হয়, যার জন্য শব্দের প্রয়োজন। ধরা যাক, আমি প্রেমের গল্প নিয়ে ভাবছি। আবার আমার ‘লেজেন্ড অফ হালাহালা’ ধরনের গল্পের কথাও মনে আসতে পারে। সেই ধরনের গল্পের কথা মাথায় রেখে এগতে গেলে প্রথমে গল্পের কাঠামোটা লিখে নিতে হয়। তখন বুঝতে পারি, কীভাবে গল্পটা এমনভাবে সাজানো যায়, যাতে কোনও লেখা ছাড়াই সেটা কাজ করে। কারণ, শুধু কয়েকটা আঁকিবুঁকি দিয়ে দীর্ঘ গল্প সামলানো কঠিন। গল্পের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। তার একটা কঙ্কাল বা মূল কাঠামো দরকার, যাতে বোঝা যায়, আমরা কোথায় যাচ্ছি। শুধু ছবি আঁকতে-আঁকতে হয়তো সেখানে পৌঁছে যাওয়া যায়। কিন্তু অন্য কোনও দিকে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। ছোটগল্পের ক্ষেত্রে অবশ্য ব্যাপারটা আলাদা। এক পৃষ্ঠার গল্প, যেখানে নয়টা বা বারোটা প্যানেল রয়েছে— এমন গল্প লেখা ছাড়াও তৈরি করা সম্ভব। কারণ, পরিসরটা ছোট। কিন্তু ধরুন, কোনও কিংবদন্তি নিয়ে পঁচিশ পৃষ্ঠার গল্প তৈরি করতে হবে। সেখানে রাজ্য, রাজা, রানি— কত কিছু ঘটছে। সেইসব বিষয় পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। ছবির সাহায্যে সেগুলো দেখানো সম্ভব। কিন্তু পুরো প্রক্রিয়াটাকে নিজের কাছে স্পষ্ট করতে, এবং গল্পের গতি ঠিক রাখতে, আমি লিখে নিই।

একটি গল্পের ধারণা: একটি লোক, বর্জ্যের শহর ও একটি স্থাপত্য

আপনি কি একটা উদাহরণ দিতে পারেন?

একটা গল্পের কথা বলি। গল্পটার বিষয় বর্জ্য বা আবর্জনা। একটা শহর রয়েছে, যা অনেকটা গম্বুজের মতো। পরিবেশটা সামান্য অন্ধকার ভবিষ্যৎধর্মী, যাকে ‘ডিসটোপিয়া’-ও বলা যেতে পারে। শহরের বাইরে চারদিকে বর্জ্য, আবর্জনার স্তূপ, ‘ওয়েস্টল্যান্ড’। শহরের গম্বুজের গায়ে একধরনের নিষ্কাশন-নল রয়েছে। সেই নল দিয়েই একজন লোককে বাইরে বের করে দেওয়া হয়। দৃশ্যটা এমন, যেন শহরটা তাকে নিজের বর্জ্যের সঙ্গে উগরে দিয়েছে। লোকটা এসে পড়েছে সেই বর্জ্যভূমিতে। আমি প্রথমে লিখে ভেবেছিলাম, যে-মানুষটা নিজেই শহরের কাছে বর্জ্য ছাড়া আর কিছু নয়, সে কী চাইতে পারে? সে বর্জ্যভূমিতে পড়ে আছে, তার মৃত্যু আসন্ন। এমন সময় একটা পোকা এসে তাকে কামড়ায়। সে পোকাটাকে মেরে দেয়। তারপর তার মনে হয়, সে অন্তত এই পোকাটার চেয়ে বেশি ক্ষমতাধর। তার মনে একটা আত্মতৃপ্তি আসে— সে কেউ একজন, তার একটা অস্তিত্ব আছে। এরপর তার মনে হয়, পাথরের গায়ে নিজের নাম খোদাই করবে। কিন্তু শহর তাকে যে নাম দিয়েছে, সেটা আসলে একটা সংখ্যার মতো— ১৬৩৯১পি। ওই নামেই শহর তাকে চেনে। সে পাথরে সেই নামটা খোদাই করতে শুরু করে। নিজের নামটা দেখে তার অহং আরও তৃপ্ত হয়। তারপর বর্জ্যভূমিতে পড়ে থাকা একটা ভাঙা টেলিভিশনের ফ্রেম তুলে নিয়ে পাথরটা তার ওপর বসায়। এবার তার নামটা আরও উঁচুতে, আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তারপর সে একটা ওয়াশিং মেশিন তুলে আনে, তার ওপর টেলিভিশনের ফ্রেমটা বসায়, আর তার ওপর নিজের নাম লেখা পাথরটা প্রতিষ্ঠা করে। এবার সে আরও তৃপ্ত।

এভাবে সে চারপাশের জিনিসপত্র জড়ো করে একটা কাঠামো তৈরি করতে থাকে। জিনিসগুলোকে একটার সঙ্গে আরেকটা বেঁধে, স্তূপ করে, সে ক্রমশ একটা উঁচু স্থাপনা তৈরি করে। তার কেন্দ্রে, একেবারে ওপরে, একটা স্টিয়ারিং হুইলের মতো জিনিসও রয়েছে।

সব শেষে সে নিজের নামের ফলকটা সেখানে বসাতে ওঠে। কিন্তু যখন সে ফলকটা বসাতে যায়, তখন যে পাথরের ওপর নামটা খোদাই করা ছিল, সেটা ভেঙে পড়ে। পাথর ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার নামটাও ভেঙে যায়। লোকটাও পড়ে যায়। কোনওরকমে ঝুলে থাকে নিজের তৈরি কাঠামোর সঙ্গে। সে যা কিছু তৈরি করেছিল, শেষ পর্যন্ত সেগুলোর সঙ্গেই আটকে যায়। আর সেই কাঠামোরই একটা অংশ হয়ে ওঠে। যেন নিজের তৈরি শিল্পে, অনেক বর্জ্যর সঙ্গে সেও একটা উপাদান। 

এই গল্পের মাধ্যমে আমি শিল্পী হিসেবে নিজের নাম প্রতিষ্ঠা করার যে প্রবণতা, সেটাকেই প্রশ্ন করতে চাইছি। আমরা সবসময় নিজেদের নাম প্রতিষ্ঠা করতে ব্যস্ত। বাজারে নামের মূল্য রয়েছে, তাই আমরা নিজেদের একটা ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। আমি এই বিষয়টা সম্পর্কে সচেতন। গল্পটার কেন্দ্রে রয়েছে সেই প্রশ্ন।

কিন্তু আপনি তো বলছেন, গল্পটা লেখা থেকেই এসেছে। অথচ সেটাকে শব্দ ছাড়াও দেখানো সম্ভব?

হ্যাঁ, একেবারেই সম্ভব। কেউ যদি শুধু ছবিগুলো দেখে, তাহলেও রূপকটা কাজ করবে। গল্পটা শব্দ ছাড়াই বোঝানো যায়। কিন্তু সেই রূপকটা কী হবে, সেটা প্রথমে খুঁজে বের করতে হয়। শুধু ছবি আঁকতে বসে আমি হয়তো এত সহজে এই রূপকটা ভাবতে পারতাম না। লেখার মধ্য দিয়ে ধারণাটা স্পষ্ট হয়েছে। আমি আসলে এই উদাহরণটাই দিতে চেয়েছিলাম।

আত্ম-প্রতিকৃতি

তাহলে গল্পের ক্ষেত্রে শব্দের ভূমিকা আর ছবির ভূমিকা— এই দুটোর মধ্যে সম্পর্কটা কী?

গল্পটাই আসল বিষয়। গল্পই তার বিষয়বস্তু। শিল্প হল সেই গল্প বলার বাহন। তবে লেখাও তো সেই বাহনেরই অংশ।

ঠিক। লেখাও গল্প বলার মাধ্যম। কিন্তু নির্বাক গল্পের ক্ষেত্রে?

নির্বাক গল্প হলেও গল্প বলার ধরনটাই গুরুত্বপূর্ণ। অজন্তার গুহাচিত্রগুলোও এক অর্থে নির্বাক গল্প। দেওয়ালে আঁকা ছবির মধ্য দিয়েই সেখানে গল্প বলা হয়েছে।

একদম। দেওয়ালজুড়ে গুহাচিত্র— সেগুলোও তো গল্প বলছে।

ঠিক তাই। আসলে গল্প বলাটাই সবচেয়ে জরুরি। আমরা কত রকমের আঁকার শৈলী দেখেছি! কেউ-কেউ শুধু আঁকিবুঁকি, আঁকাবাঁকা রেখা দিয়েও ছবি আঁকেন। কিন্তু সেই ছবিতে চরিত্রগুলোর দেহভঙ্গি যখন ফুটে ওঠে, তখন দেখতে দারুণ লাগে। আমার মনে হয়, একটু শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেই ছবির মধ্য দিয়ে সেই অভিব্যক্তি তৈরি করা সম্ভব। শেষ পর্যন্ত গল্পই আগে। আপনি যে কথাটা বললেন, সেটাও ঠিক— ছবি যতই সুন্দর হোক, গল্প বলার ক্ষমতা না থাকলে তা ভাল কমিকস হয়ে উঠবে না। তবে উল্টোটাও সত্যি। এমন অনেক উদাহরণ আছে, যেখানে আঁকার মান খুব উঁচু নয়, অথচ গল্পটি অসাধারণ।

সিনেমার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই। ক্যামেরার কাজ খুব ভাল না-হলেও গল্প যদি ভাল হয়, তা-হলে দর্শকের তাতে অসুবিধে হয় না। কিন্তু দৃশ্যগুলো সুন্দর, অথচ গল্পের কোনও ঠিকঠিকানা নেই— সেটাই সমস্যা। এখন তো আমরা সবকিছুকেই ঝলমলে করে তুলতে পারি। দৃশ্যকে সুন্দর করে সাজিয়ে দিতে পারি। কিন্তু শুধু সুন্দর দৃশ্য দিয়ে তো গল্প তৈরি হয় না।

আমার মনে হয়, নির্বাক কমিকস তখনই ভাল কাজ করে, যখন পাঠক ছবিগুলো দেখে নিজেরাই গল্পটা বুঝে নিতে পারেন। কিন্তু অনেক পাঠক ছবির ভাষা পড়ার ব্যাপারে খুব আত্মবিশ্বাসী নন। তাঁরা হয়তো ছবির মধ্য দিয়ে গল্পটা বুঝতে পারেন, কিন্তু শেষে একটা বাক্য পেলে আশ্বস্ত হন—যেন তাঁরা যা বুঝেছেন, সেটাই ঠিক। নির্বাক কমিকস পড়ার সময় পাঠক ছবিগুলো দেখেন, আর নিজের মনে গল্পটা তৈরি করেন। এখানে পাঠকও গল্প বলার প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে ওঠেন।

লেখানির্ভর কমিকসে তা হয় না?

আমার মনে হয়, লেখানির্ভর কমিকসের ক্ষেত্রে ছবির নিজস্ব ভাষাটা যেন ক্রমশ আড়ালে চলে যায়। তবে আমি নিজে ছবির মধ্যে অনেক ছোট-ছোট বিষয় লুকিয়ে রাখতে ভালবাসি। আমার আঁকায় এমন অনেক ইঙ্গিত থাকে, যা বেশিরভাগ পাঠক খেয়াল করেন না। ‘Mad Magazine’-এর মতো প্রকাশনায় ছোট-ছোট খুঁটিনাটি বিষয় থাকত, যেগুলো খুঁজে বের করতে আমার খুব ভাল লাগত। সেই অভ্যাস আমার নিজের অনেক বইয়েও এসেছে। কিন্তু খুব কম মানুষই সেগুলো নিয়ে কথা বলেন। কারও-কারও কাছে এই খুঁটিনাটিগুলো আবার বিভ্রান্তিকরও মনে হয়। 

পাঠকের কল্পনা এবং ছবির ভাষা

কিন্তু এমন কি কখনও মনে হয়নি যে, আপনার গল্পে এমন কিছু দৃশ্য বা বিষয় লুকিয়ে আছে, যেগুলো পাঠকের চোখে পড়ুক বলে আপনি আশা করেন, অথচ কেউ সেগুলো নিয়ে কথা বলেন না?

হ্যাঁ, এমন অনেক কিছুই আছে। আমি চাই, পাঠকেরা সেগুলো ধরতে পারুক। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ে কেউ সেগুলো নিয়ে কথা বলেন না। যেমন, আমরা একটু আগে যে অহংকারের গল্পটা নিয়ে কথা বলছিলাম, সেটাই ধরো। ওই গল্পের মধ্যে একটা সম্পূর্ণ ভাবনা আছে। আমার নির্বাক গল্পগুলোর মধ্যেও এমন অনেক ভাবনা থাকে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, মানুষ সেগুলোর গভীরে ঢুকে প্রশ্ন করে না। সম্প্রতি ‘ড্রিম মেশিন’ বইটি নিয়েও এমন একটা অভিজ্ঞতা হল। লেখার সময় আমি ছোট-ছোট কিছু বিষয় ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। যেমন, একটি দৃশ্যে হুগো যখন অফিসে ঢুকছে, তখন সে কফির গন্ধ পায়। সেই গন্ধ থেকেই সে বুঝতে পারে, তার সহকর্মী আর্নেস্তো এসে পড়েছে। আমার কাছে ব্যাপারটা বেশ সুন্দর মনে হয়েছিল। ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে আমি এমন অনেক অফিসের পরিবেশ অনুভব করেছি, যেখানে সর্বক্ষণ কফির গন্ধ থাকে। সেই গন্ধটাই যেন অফিসের একটা নিজস্ব আবহ তৈরি করে।

বইটির সম্পাদকও বিষয়টা নিয়ে কিছু বলেননি। অথচ ব্যাপারটা বইয়ের মধ্যে রয়েছে। সম্প্রতি এক বন্ধু আমাকে বললেন, ওই কফির গন্ধের কথা তাঁর মনে আছে। চরিত্রটিকে আমি বারবার কফির কাপ হাতে দেখিয়েছি। ফলে কফির গন্ধ যেন চরিত্রটির সঙ্গে মিশে গিয়েছে। চরিত্রটার একটা নিজস্ব গন্ধ তৈরি হয়েছে। এমন কিছু কেউ খেয়াল করলে আমার খুব ভাল লাগে। ছবির মধ্যে সব অনুভূতি ধরে রাখা যায় না, ঘ্রাণ এমনই একটা বিষয়। কিন্তু ছবির মধ্যে নানা ইঙ্গিত রেখে দিই। আমার মনে হয়, সেগুলোকে সবসময় যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না।

তার কারণ কি এই যে, এখানে এই ধরনের আলোচনার পরিসরটা কম?

একেবারেই তাই। ইউরোপে গিয়ে অবশ্য দেখেছি, শিল্পী হিসেবে আমাদের কাজকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। সেখানে সাক্ষাৎকারে এমন সব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়, যেগুলো নিয়ে এখানে সচরাচর কথা বলার সুযোগ পাই না। বিদেশে সাধারণ পাঠকের সঙ্গে কথা বললে তাঁরা জানতে চান, কেন আমি কোনও বিশেষ ভঙ্গিতে ছবি এঁকেছি, কেন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই ধরনের আলোচনা সেখানে অনেক বেশি হয়। আমি ২০০৯ সাল থেকে ভারতীয় সাহিত্য উৎসবগুলোতে অংশ নিচ্ছি। এত বছর ধরে সেখানে কমিকস বা গ্রাফিক নভেল নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমার প্রত্যাশা বেশ কমে গিয়েছে। কারণ, অনেক সময় গ্রাফিক নভেল নিয়ে একটা নামমাত্র অধিবেশন রাখা হয়— সূচিতে দেখানোর জন্য যে, এই বিষয়টিও রয়েছে। আর সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটা আমায় হতাশ করে, সেটা হল, ‘গ্রাফিক নভেল ব্যাপারটা কী, একটু বুঝিয়ে বলবেন?’ অথচ প্রতিদিন উৎসবে আরও কত রকমের বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে! সেখানে গ্রাফিক নভেলকে নিয়ে সত্যিকারের আগ্রহ বা গভীর আলোচনা সব সময় দেখা যায় না। যেন অন্য কোনও বিষয় নিয়ে কথা বলতে গেলে গ্রাফিক নভেলকে একবার ছুঁয়ে গেলেই হল। আরও একটা প্রশ্ন ভেসে আসে, ‘কমিকস আর গ্রাফিক নভেলের মধ্যে পার্থক্যটা কী?’ আমার মনে হয়, গ্রাফিক নভেল নিয়ে আলাদা করে লড়াই করারই বা কী আছে? আমাদের কাজ তো কমিকসই। কমিকস আর গ্রাফিক নভেলকে নিয়ে এত তর্ক কেন? মাঙ্গা আর গ্রাফিক নভেলকে আলাদা করে দেখার প্রবণতাও অনেকটা একইরকম। বিভিন্ন ঘরানার মধ্যে পার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু তার জন্য এমন বিভাজন তৈরি করার প্রয়োজন নেই। হেভি মেটালের মধ্যেও কতরকমের ধারা আছে— স্পিড মেটালও আছে, আরও কত কিছু আছে। তবু সেগুলো সবই হেভি মেটালের অন্তর্গত।

আমার কাছে বিষয়টা অনেকটা তেমনই। সবটাই কমিকস। কেউ একসময় ‘গ্রাফিক নভেল’ শব্দটি চালু করেছেন। সম্ভবত ‘কমিকস’ শব্দটি সুপারহিরোদের সঙ্গে বেশি জড়িয়ে গিয়েছিল বলেই অন্য একটি নামের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। ‘গ্রাফিক নভেল’ শব্দটি ব্যবহারের ফলে অনেক পাঠকও বিষয়টিকে আরও স্বচ্ছন্দে গ্রহণ করতে পেরেছেন। আর্ট স্পিগেলম্যান পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়ার পর এই মাধ্যমকে আরও বেশি করে সাহিত্যের মর্যাদায় দেখা শুরু হয়েছিল। ‘গ্রাফিক নভেল’ শব্দটির মধ্যে একধরনের বিপণনমূলক সুবিধেও আছে। বিশেষ করে আমেরিকায়। তুমি যদি বলো, এটা কমিকস, তা হলে অনেকের কাছে তার একটা নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি হয়। কিন্তু যদি বলো, এটা সাহিত্য— তা হলে হয়তো তাঁরা অন্যভাবে দেখবেন। আমার তাতে আপত্তি নেই। যে যা খুশি নাম দিতে পারে। তবে আমার কাছে কমিকস আর গ্রাফিক নভেল মূলত একই মাধ্যমের অন্তর্গত।

‘কার্টুন’ শব্দটির ক্ষেত্রেও কি এমন কিছু ঘটেছে?

হ্যাঁ, সম্প্রতি আমিও জানতে পেরেছি, রেনেসাঁসের সময় বড় কোনও ছবি আঁকার আগে শিল্পীরা যে প্রাথমিক নকশা তৈরি করতেন, সেগুলোকেই ‘কার্টুন’ বলা হত। শব্দটির ঐতিহাসিক অর্থ আসলে এটাই। এখন ‘কার্টুন’ শব্দটা শুনলে অনেকের মনে হয়, এটা বুঝি খুব হালকা বা তুচ্ছ কোনও জিনিস। অথচ লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি কিংবা মিকেলেঞ্জেলোর মতো শিল্পীরাও কার্টুন বা প্রাথমিক নকশা তৈরি করেছেন। তাঁদের কাজের মধ্যেও এই শব্দের ঐতিহাসিক অর্থটি খুঁজে পাওয়া যায়। অথচ আজ শব্দটির অর্থ যেন অনেকটাই বদলে গিয়েছে। দৈনিক পত্রিকার ছোট্ট কার্টুন, কিংবা দ্রুত তৈরি করা কোনও হাস্যরসাত্মক ছবি— এসবের সঙ্গে শব্দটি বেশি জড়িয়ে পড়েছে। ফলে এর আগের শিল্প-ঐতিহ্যটি অনেক সময় আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়।

‘ড্রিম মেশিন’: প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং শিল্পীর উদ্বেগ

আপনার সাম্প্রতিক বইগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, প্রথমদিকে ছবির আধিক্য ছিল, শব্দের ব্যবহার ছিল কম। তারপর ধীরে-ধীরে লেখার পরিমাণ বেড়েছে। শেষ দু-তিনটি বইয়ে তো লেখার ভূমিকা অনেক বেশি। এর কারণ কী?

‘ড্রিম মেশিন’ বইটায় আমি অনেকটা লিখেছি। কারণ, এই বইয়ের বিষয়বস্তু বোঝানোর জন্য অনেক কিছু ব্যাখ্যা করা দরকার ছিল। বইটির সঙ্গে একজন বিজ্ঞানী যুক্ত ছিলেন। তিনিই আমাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সম্পর্কে শিখিয়েছেন। এআই কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার জন্য তিনি আমাকে পাঁচটি পিডিএফ দিয়েছিলেন। সেগুলোতে প্রযুক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা ছিল।

লেখা আর ছবি আঁকাই আমার কাজ। কিন্তু এই বইয়ের ক্ষেত্রে অনেক কিছু লিখতে হয়েছে, কারণ বিষয়গুলো পাঠকের কাছে পরিষ্কার করে তুলে ধরতে হত। ওই বিজ্ঞানী আমাকে ধাপে-ধাপে বিষয়গুলো বুঝিয়েছেন। আমি নিজেও খুব প্রযুক্তি-বিশেষজ্ঞ নই। তাই আমার মনে হয়েছিল, আমি যদি বিষয়গুলো বুঝতে পারি এবং লিখে বোঝাতে পারি, তা হলে অন্য পাঠকের পক্ষেও বইটি বোঝা সম্ভব হবে। এই ছিল আমার যুক্তি। তাই তাঁর কাছ থেকে বিষয়গুলো শেখা জরুরি ছিল। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে এআই পড়ান। সেখানে বিষয়টি বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে শেখানো হয়। ‘ড্রিম মেশিন’ বইয়ের প্রযুক্তিগত আলোচনাগুলোও সেই ক্রম অনুসরণ করে সাজানো হয়েছে। কারণ, তথ্যগুলো একটি নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতায় এগোয়। আমি সেই তথ্যগুলো শিখেছি, নিজের মতো করে সংক্ষিপ্ত করেছি, তারপর গল্পের মধ্যে সেগুলোকে বসিয়েছি। বৃহৎ ভাষা-মডেল বা এলএলএমের (লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল) শুরু থেকে পরবর্তী বিকাশ— এই বিষয়গুলোও বইয়ে রাখতে হয়েছে। আমার কাজ ছিল এমনভাবে গল্প ও চিত্রনাট্য তৈরি করা, যাতে প্রতিটি অধ্যায়ের মধ্যে প্রযুক্তির একটি নির্দিষ্ট দিক ব্যাখ্যা করা যায়। এই কারণেই বইটির প্রযুক্তিগত অংশে ওই বিজ্ঞানীর অবদান এত গুরুত্বপূর্ণ। সেই অংশগুলো তিনি লিখেছেন, আর আমি সেগুলোকে গল্পের সঙ্গে মিলিয়ে সাজিয়েছি। প্রযুক্তিগত তথ্যগুলোকে ইচ্ছেমতো বদলে দেওয়ার তো কোনও মানে হয় না।

তবে বইটির কাজ করতে গিয়ে আমার একটা বড় লাভ হয়েছে। আমার যে ভয়গুলো ছিল, বিজ্ঞান সেগুলোর পিছনে যুক্তি জুগিয়েছে। অন্যথায় হয়তো সেগুলোকে নিছক ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বলে উড়িয়ে দেওয়া হত। কেউ হয়তো ভাবত, একজন ডিসটোপিয়ান কমিকস-শিল্পী ভবিষ্যৎ নিয়ে অকারণে আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন। কিন্তু বিজ্ঞান আমাকে বুঝিয়েছে, এই আশঙ্কাগুলোর বাস্তব ভিত্তি রয়েছে এবং সেগুলো সত্যি হয়ে ওঠা কতটা সম্ভব। এই বৈজ্ঞানিক যাচাইয়ের কাজটি করেছিলেন গৌরব বলে আমার এক বন্ধু। তাই ‘ড্রিম মেশিন’ এমন একটি বই, যার জন্য আমাকে সবচেয়ে বেশি লিখতে হয়েছে।

এই বই তৈরির প্রক্রিয়াটা কী ছিল?

‘ড্রিম মেশিন’-এর ক্ষেত্রে শুরু থেকেই ফরাসি প্রকাশকদের সঙ্গে আলোচনা করতে হয়েছিল। আমি ফ্রান্সে একটি রেসিডেন্সি প্রোগ্রামে ছিলাম। সেখানে বইটির ধারণাটি তাঁদের কাছে তুলে ধরি। তারপর প্রকাশকের সঙ্গে কাজ শুরু হয়। আমি ইংরেজিতে লিখতাম, তারপর লেখা তাঁদের কাছে পাঠাতাম। একজন সেটি ফরাসিতে অনুবাদ করতেন। অনুবাদটি আবার আমার কাছে ফিরে আসত। এরপর আমার লে-আউট ডিজাইনার ইংরেজি লেখার জায়গায় ফরাসি লেখা বসিয়ে দিতেন, তারপর ফাইলটি আবার ফ্রান্সে পাঠানো হত। এভাবে একটা কনভেয়র বেল্টের মতো ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল। প্রায় নয়-দশ সপ্তাহ ধরে এই প্রক্রিয়া চলেছে। আমিও দ্রুত কাজ শেষ করছিলাম। প্রকাশকেরা বুঝতে পারছিলেন, বইটির সম্ভাব্য পাঠক শুধু কমিকসের জগতের মানুষ নন। এআই নিয়ে যাঁদের আগ্রহ আছে, তাঁরাও বইটি পড়তে পারেন। কেউ যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে জানতে চান, তাঁর কাছেও বইটি পৌঁছনো উচিত— এটাই ছিল আমাদের ভাবনা। সেই কারণে ছবির শৈলীও আমার বাকি কাজের থেকে অন্যরকম হওয়া দরকার ছিল। ছবির মধ্যে এমন সব বাড়তি খুঁটিনাটি রাখা উচিত নয়, যা পাঠককে মূল বিষয় থেকে সরিয়ে দেয়। তাই এই বইয়ে আঁকা ছবির রেখাগুলো অনেক বেশি স্পষ্ট ও সরল। চরিত্রগুলোর শারীরিক গঠনও যথাসম্ভব বাস্তবসম্মতভাবে আঁকা হয়েছে। কারণ, বইটিতে আমরা যে বিষয়গুলো বলছি, সেগুলো গুরুতর। বিজ্ঞানীর সঙ্গে তথ্যগুলো যাচাই করে নেওয়ার পর আমি চাইছিলাম, বইয়ের মধ্য দিয়ে সত্যিকারের সতর্কবার্তা দিতে।

শুরুতে লরাঁ, মানে যে বিজ্ঞানী আমাকে সাহায্য করছিলেন, তিনি এই বিষয়ে খুব একটা স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। তিনি কর্পোরেট জগতের সঙ্গেও যুক্ত। ফলে এআই-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন এত বিপুল ব্যবসায়িক সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, তখন তার সমালোচনা করে কিছু বলা তাঁর কাছে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হতে পারে। তাঁর আশঙ্কা ছিল, এই সমালোচনা তাঁর কাজের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বইটিতে আমার চরিত্রটি অনেক অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলে। অন্য চরিত্রটি তার উত্তর দেয়, কিন্তু পাঠক বুঝতে পারেন, সেই উত্তরগুলো অনেক সময় বেশ সাধারণ ও অস্পষ্ট। এই নিয়ে আমাদের মধ্যে কিছু তর্কও হয়েছিল। তা সত্ত্বেও আমরা প্রশ্নগুলো রেখেছি। কারণ, আমি যে বিপদের আশঙ্কা করছিলাম, তা নিছক কল্পনা নয়। বিজ্ঞানও সেই আশঙ্কার পক্ষে যুক্তি দেখাচ্ছে। প্রথমবার লরাঁ যখন বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, আমরা এআই-এর পর আরও উন্নত পর্যায়ের— এজিআই বা কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তার দিকে এগচ্ছি। এমনও হতে পারে, একসময় মানবজাতির প্রয়োজন মেটানোর মতো সম্পদও আমাদের হাতে থাকবে না। অর্থাৎ, তিনিও ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তাই বইয়ের মধ্যে সেই দিকগুলো তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে।  সেগুলোকে পাঠকের কাছে স্পষ্ট করে পৌঁছে দেওয়া জরুরি ছিল। 

‘ভাডিভাসাল’ ও ‘পুনাচি’— অন্যের লেখা থেকে কমিকস নির্মাণ

তার আগে তো ‘ভাডিভাসাল’ ছিল?

হ্যাঁ। ‘ভাডিভাসাল’ বইটির মূল তামিল লেখক সি. এস. চেলাপ্পা। তবে মূল লেখা থেকে কোন অংশগুলো নেওয়া উচিত, সে-সম্পর্কে পেরুমল মুরুগনের পরিমার্জন এতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মূল বই থেকে কীভাবে উপাদান বেছে নিতে হবে, সে-বিষয়ে তাঁর মতামত ছিল।

এছাড়াও ‘পুনাচি’ রয়েছে, সেটিও পেরুমলের সাহিত্য থেকে তৈরি করা। এই বইগুলোর অভিযোজনের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

‘ভাডিভাসাল’-এর পর ‘পুনাচি’ বইটির কাজ শেষ করেছি। পেরুমলের কাছে কোনও বিষয়ে সংশয় হলে আমি প্রশ্ন করতে পারতাম, কিন্তু অভিযোজনের ক্ষেত্রে তিনি আমাকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। ফলে কাজটা করতে খুব আনন্দ পেয়েছি। ‘ভাডিভাসাল’-এর তুলনায় বইটি প্রায় ষাট পৃষ্ঠা বড়, অথচ আমি বেশ দ্রুত কাজটা শেষ করতে পেরেছি। আমার মনে হয়, কাজটা ভাল হয়েছে। ইংরেজি ও তামিল— দুই ভাষাতেই পড়ে আমি গল্পটিকে নিজের মতো করে কমিকসে রূপ দিতে পেরেছি। ফলে অভিযোজনের কাজটা আমার কাছে বেশ স্বাভাবিক মনে হয়েছে। এই বইয়ের আঁকার ধরনও তুলনায় মূল ধারার কমিকসের কাছাকাছি। গল্পের সঙ্গে মানানসই করে শৈলী বেছে নেওয়ার চেষ্টা করেছি।

‘ভাডিভাসাল’-এর পর আপনি যখন ‘পুনাচি’-র কাজ করছিলেন, তখনও কি গল্পের পরিবেশ অনুযায়ী শৈলী বেছে নেওয়ার কথা ভেবেছিলেন?

অবশ্যই। ‘ভাডিভাসাল’-এর জগৎটা আমি কিছুটা চিনতাম। সেখানকার পরিবেশ, রোদ, গরম— এসব বিষয় ছবির ধরন নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমার মনে হয়, এই গল্পের জন্য সাদা-কালো ছবি খুব ভাল কাজ করে। বইটিতে মানুষের গাঢ় শরীর, ঘাম গড়িয়ে পড়া, পেশির টান— এসবের বর্ণনা রয়েছে। মাঠের পরিবেশটাও এমনই। গল্পের যে অভিজ্ঞতাটা পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া দরকার, তা হল ঘটনাটির তীব্রতা, বিশেষ করে ষাঁড়টির উপস্থিতি। ষাঁড়টি যখন ছুটে আসে, তখন পাঠকেরও যেন সেই অভিঘাতটা অনুভব হয়। আমি এমন একটা আঁকার ধরন বেছে নিতে চেয়েছি, যার মধ্য দিয়ে সেই শক্তি ও গতি ধরে রাখা সম্ভব। আমার কাছে শেষ পর্যন্ত সেটাই আসল— কোনও একটি নির্দিষ্ট শৈলীকে আঁকড়ে থাকা নয়, বরং গল্পের যে অনুভূতিটা পাঠকের কাছে পৌঁছনো দরকার, ছবির সাহায্যে সেটাকে যথাসম্ভব জীবন্ত করে তোলা।

গল্পের প্রয়োজনেই বদলায় আঁকার ধরন

আপনার আঁকার শৈলীর দিকে তাকালে একটা পরিবর্তন চোখে পড়ে। প্রথম দিকের কাজগুলোতে অনেকটা বিকৃত, অদ্ভুত রসের, কখনও যেন পাঙ্ক-ধাঁচের একটা ভঙ্গি ছিল। পরে, বিশেষ করে নির্বাক কমিকস থেকে ‘রাষ্ট্রাম্যান’— এই পর্যায়ে এসে আপনার ছবি আরও সংহত ও নির্দিষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথমদিকে যেন আপনি নিজের সঙ্গেই কথা বলছিলেন; পরে মনে হয়, অন্যদের সঙ্গেও কথা বলতে শুরু করেছেন। আপনার কি এমনটাই মনে হয়?

কথাটা শুনে ভাল লাগল। তবে আমাকেও নিজেকে সেইভাবে গড়ে তুলতে হয়েছে। কাজ শুরু করার সময় তো তুমি অন্য কেউ কী ভাবছে, তা নিয়ে খুব একটা চিন্তা করো না। নিজের মতো করে কাজ করে যাও। আমি নিজেও জানতাম না, কোনওদিন আমার কাজ প্রকাশিত হবে কি না। কিন্তু যখন প্রকাশক এলেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই নিজের কাজ সম্পর্কে সচেতন হতে শুরু করলাম। তবে আমার কাজকে আরও বেশি মানুষ চিনুক— এটা আমার কাছে ভাল লাগারই বিষয়।

‘অ্যাসপিরাস’-এর ক্ষেত্রেও কি তাই?

হ্যাঁ, ‘অ্যাসপিরাস’ আমার কাছে একরকম গোপন বই। খুব কম মানুষই বইটা দেখেছেন। বহু দিন হল বইটি আর ছাপা হয় না। প্রকাশকের কাছে বইটি আছে বটে, কিন্তু কীভাবে বিতরণ করতে হবে, তা তাঁরা যেন বুঝে উঠতে পারেননি। আমার তো মনে হয়, তাঁদের গুদামেই কোথাও বইটা হারিয়ে গিয়েছে! প্রতি তিন মাস অন্তর আমাকে বিক্রির হিসেব পাঠানো হয়। সেই বিবরণীতে দেখা যায়, একটিও বই বিক্রি হয়নি। অথচ বইটি কোনও দোকানেই পৌঁছয়নি। তা হলে আমাকে সেই হিসাব পাঠিয়ে লাভ কী? প্রতিবারই সেটা দেখে মন খারাপ হয়।

আপনার আঁকার শৈলীর এই বিবর্তনটা কীভাবে ঘটল? আপনি কি সচেতনভাবেই শৈলী বদলেছেন?

আমার মনে হয়, সেটা অনেকটাই নির্ভর করে গল্পের ধারণার ওপর। এখন আমি গল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী আঁকার ধরন বদলাতে আগের চেয়ে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করি। গল্পটা কী চাইছে, তার মেজাজ কেমন— সেগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দেখি। তারপর বোঝার চেষ্টা করি, কোন ধরনের আঁকার শৈলী গল্পটির সঙ্গে সবচেয়ে ভাল মানাবে। আগেও এভাবে করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সবসময় খুব কার্যকর হয়নি। যেমন, ‘লেজেন্ডস অফ হালাহালা’— এই গল্পগুলোকে আমি একটু হাস্যরসের ভঙ্গিতে তুলে ধরতে চেয়েছিলাম। তাই গোটা বইয়ের ছবিতে হালকা কৌতুকের একটা আভাস রেখেছি। পাঠক সেটা ধরতে পারবেন। আমি চাই, গল্পগুলোর মেজাজের প্রতি আরও বিশ্বস্ত থাকতে। যে গল্প যেমন, তার অন্তর্নিহিত সুরের কাছাকাছি পৌঁছতে চাই। কোনও-কোনও গল্পে একটু অমসৃণ, খসখসে আঁকার ধরনই ভাল কাজ করে। আবার ‘স্নেক অ্যান্ড দ্য লোটাস’-এর ক্ষেত্রে আমার মনে হয়েছিল, আমার নিজস্ব আঁকার ধরনটা বেশ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। বইটা অনেকটা নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথনের মতো হয়ে গিয়েছিল। এমন একটা বই, যেটা আমি নিজে পড়তে চাই, কিন্তু হয়তো খুব বেশি মানুষ পড়তে চাইবেন না। তা সত্ত্বেও বইটি নিয়ে কাজ করতে আমার অনেক সময় লেগেছিল, আর সেই অভিজ্ঞতাটা উপভোগ করেছি। আমার কাছে সেটা একটা ভাল অনুশীলন ছিল। এর পাশাপাশি আরও অনেক কাজ চলছিল। ‘রাষ্ট্রাম্যান’-এর জন্য আমি আরও একটি ১২০ পৃষ্ঠার বই শেষ করেছি। ‘রাষ্ট্রায়ন ২: ডিভাইড অ্যান্ড ফুল’— এই কাজটিও সেই ধারার সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি রাষ্ট্রাম্যান নিয়ে আরেকটি ছোট স্বাধীন প্রকাশনার বইও রয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরে এভাবে কাজ করতে-করতে আমার মনে হচ্ছে, আঁকার শৈলী ক্রমশ বিকশিত হচ্ছে। আর একটা বিষয় আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে: শিল্পশৈলীর কাজ হল গল্পকে সাহায্য করা, নিজের দক্ষতা দেখানো নয়। গল্পের যা প্রয়োজন, শৈলীকে সেটাই দিতে হবে।

গ্রাফিক নভেলের বাজার

গ্রাফিক নভেল বা কমিকসের বাজার নিয়ে মাঝেমধ্যেই প্রশ্ন ওঠে। ফরাসি প্রকাশকদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে কি তেমনটা মনে হয়েছে?

ফরাসি প্রকাশকদের সঙ্গে কাজ করে অনেক কিছু শিখেছি। তাঁরা কীভাবে একটি বইকে দেখেন, কীভাবে তার বাজার ও নির্মাণের খরচ নিয়ে ভাবেন— সেটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখানকার অনেক প্রকাশকই গ্রাফিক নভেল বা ছবিনির্ভর বই প্রকাশের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ নন। কিন্তু ফরাসি প্রকাশকদের কাছ থেকে আমি বেশ কার্যকর প্রতিক্রিয়া পেয়েছি। যেমন, একজন সম্পাদক আমাকে বলেছিলেন, বইটি দুই রঙে করলে খরচ প্রায় অর্ধেক হয়ে যেতে পারে। খরচ কমলে একই বাজেটে আরও বেশি কপি ছাপানো সম্ভব হবে। এভাবে ভাবলে প্রকাশনার সিদ্ধান্তগুলো অনেক বেশি পরিষ্কার হয়ে ওঠে। খরচ, পরিকল্পনা এবং কাজের প্রক্রিয়া— সবকিছুর মধ্যে একটা স্বচ্ছতা থাকে। এখানে সবসময় যে সেই স্বচ্ছতা পাওয়া যায়, তা নয়। এই অভিজ্ঞতা থেকে আমি বুঝেছি, শিল্পী হিসেবেও আমার কিছু দায়িত্ব রয়েছে। 

‘মুনওয়ার্ড’-এর দৃশ্য

কৌতুক, কমিকস ও বীভৎসা

কমিকস ব্যাপারটা কৌতুকপূর্ণ বলেই তার নাম ‘কমিকস’। তোমার সুপারহিরোরা কমিক। কিন্তু আপনার আগের কাজগুলো— যেমন ‘মুনওয়ার্ড’ বা তারও আগের বইগুলো— আমার কাছে ঠিক কৌতুকপূর্ণ বলে মনে হয় না। বরং সেগুলোর মধ্যে একটা বিকৃত, অস্বস্তিকর আবহ আছে।

হ্যাঁ, সেটা ঠিক। তবে ‘ড্রিম মেশিন’-এর ক্ষেত্রে বিষয়টা আরও নির্দিষ্ট। আগের বইগুলোতে সেই অর্থে কোনও বিষয় ব্যাখ্যা করার দায় ছিল না। কিন্তু ‘ড্রিম মেশিন’-এ একটা দায়িত্ব রয়েছে। বইটি সমসাময়িক একটি বিষয় নিয়ে কথা বলছে, এবং তার বক্তব্য খুব স্পষ্ট: এখনই কিছু না করলে ভবিষ্যতে গুরুতর পরিণতি হতে পারে। তাই এখানে পাঠকের সঙ্গে একটা প্রত্যক্ষ মানবিক সংযোগ তৈরি করা জরুরি। তাঁরা যেন বুঝতে পারেন, বিষয়টা তাঁদের জীবন থেকেও বিচ্ছিন্ন নয়।

তবে একটা মজার কথা বলি, এই বীভৎসার কথা উঠল বলেই। মাঝেমধ্যে আমার মনে হয়, আসলে ডিসটোপিয়া বলে এখন আর কিছুই হয় না। আমার তো ইদানীং সংকট হয়, চারপাশকে যত নরক দেখাতে চাই, চারপাশটা ততই, প্রতিদিন আরও বেশি নরক হয়ে ওঠে। আর কোনও মজা নেই ডিসটোপিয়ায়।

ভারতীয় গল্পের নিজস্ব জগৎ ও অ্যানিমেশনের সম্ভাবনা

আপনি গ্রাফিক উপন্যাস থেকে অ্যানিমেশনের সম্ভাবনাকে কীভাবে দেখেন? যেখানে একটা নিজস্ব ভারতীয় জগৎ গড়ে উঠবে?

এই জায়গাটায় ভাবনাচিন্তার অনেক সুযোগ রয়েছে। কারণ, এর সাহায্যে আমরা প্রচলিত মাধ্যমের গণ্ডিটাকেও চ্যালেঞ্জ করতে পারি। আমি এখন অ্যানিমেশন নিয়েও এভাবে ভাবছি। ছোট-ছোট অ্যানিমেটেড সিরিজ তৈরি করার ইচ্ছে আছে। অর্থের জোগাড় করা অবশ্য কঠিন। তবে কোনও ভাল ভাবনা নিয়ে একটা বই শেষ করতে পারলে, সেটিকে অ্যানিমেশন বা সিরিজে রূপ দেওয়ার প্রস্তাব দিতে চাই। আমাদের চারপাশে এমন অনেক গল্প ও ভূখণ্ড রয়েছে, যেগুলো আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে একেবারে নতুন মনে হতে পারে। যেমন, আমেরিকার আদিবাসীদের নিয়ে গল্প। ফ্রান্সে ‘ইয়াকারি’ খুব জনপ্রিয়। তাদের কাছে সেই জগৎটা একটা কল্পনার জগৎ। ওয়াইল্ড ওয়েস্ট বা পশ্চিমের সীমান্তভূমিকে ঘিরেও এমন একটা কল্পনার জগৎ তৈরি হয়েছে। স্প্যাগেটি ওয়েস্টার্নের জনপ্রিয়তার কথাই ধরো। সেই জগৎটাকে ইউরোপের মানুষ খুব সহজে কল্পনায় গ্রহণ করতে পারে। তারা নিজেদের ইতিহাস থেকে ওই জগৎটাকে পায়নি; বরং নিজেদের মতো করে তাকে নির্মাণ করেছে। আমরাও যদি ইউরোপের চোখ দিয়ে ভারতকে দেখি, তা হলে বুঝব, ভারতীয় গল্পের মধ্যেও এমন অসংখ্য জগৎ রয়েছে, যেগুলো বাইরের পাঠকের কাছে কল্পনাপ্রবণ ও অভিনব বলে মনে হতে পারে। আমরা এখনও সেই সম্ভাবনাকে যথেষ্ট কাজে লাগাতে পারিনি।

আমার মনে হয়, কিছু গল্প নিয়ে অন্তত এই দিকটায় আমাদের এগোনো উচিত। সুপারহিরোর গল্প না লিখেও কমিকসকে নতুন জায়গায় নিয়ে যাওয়ার অনেক উপায় আছে।

সুপারহিরো ছাড়াও কমিকসের জগৎ

বাংলায় বড় হয়ে আমরা এমন অনেক কমিকস পড়েছি, যেখানে সুপারহিরো নেই। নারায়ণ দেবনাথের নন্টে-ফন্টে যেমন— দুই ছাত্রের দৈনন্দিন জীবন, তাদের দুষ্টুমি, পরস্পরের সঙ্গে ঝগড়া— এসব নিয়েই গল্প। সেখানে সুপারহিরো হওয়ার কোনও ব্যাপার নেই। টিনটিন বা অ্যাস্টেরিক্স-এর মতো অনূদিত কমিকসও আমরা পড়েছি। সেগুলোও তো সুপারহিরোদের গল্প নয়। আবার বাঁটুল দি গ্রেট আছে, যে সুপারহিরো, কিন্তু প্রায় প্রতিবেশীর মতো, তাকে ঠিক সুপারহিরো বলে মনে হয় না।

ঠিক। কেরলেও শিশুদের পত্রিকায় ববনুম-মলিয়ুম-এর মতো কমিকস ছিল। এই ধরনের গল্পের একটা নিজস্ব স্থানীয় আবহ থাকে। মনে হয়, এই গল্পটা শুধু কেরলেই ঘটতে পারে, কিংবা শুধু বাংলাতেই ঘটতে পারে। আমাদের নিজেদের চারপাশের জীবন, চরিত্র ও অভিজ্ঞতা থেকে এমন গল্প তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু সেই জগৎগুলো এখন যেন ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।

এর একটা কারণ কি প্রকাশনার খরচ এবং বই পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থার অভাব?

অবশ্যই। এখন কমিকস বা গ্রাফিক নভেল প্রকাশ করা খুব ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। বাংলা, মালয়ালম, তামিল, মারাঠি— বিভিন্ন ভাষাতেই পাঠক আছেন। কিন্তু সাধারণ বইয়ের দাম যদি একশো থেকে দেড়শো টাকার মধ্যে থাকে, তা হলে সেই পাঠকের কাছে অনেক বেশি দামের গ্রাফিক নভেল পৌঁছে দেওয়া কঠিন। ‘ভাডিভাসাল’-এর মতো সাদা-কালো বইও, প্রায় ১২০ পৃষ্ঠার হওয়া সত্ত্বেও, তামিল সংস্করণে ২৭৫ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছিল। গ্রাফিক নভেলের হিসেবে দামটা অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু তামিল ভাষার সাধারণ পাঠকের কাছে সেটাও বেশ বেশি। ইংরেজি সংস্করণটির দাম আরও অনেক বেশি— প্রায় ৬৯৯ টাকা। 

ছোটবেলায় আমরা বাংলায় টিনটিন কিনতাম প্রায় ৭৫ টাকায়। তখন অনেক বই কেনা সম্ভব ছিল। এখন একটি টিনটিন-এর বইয়ের দামও প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। সংকলন বা অমনিবাস কিনতে গেলে কয়েক হাজার টাকা লাগে। একসময় বইগুলো অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছত। এখন সেগুলো অনেকটা সংগ্রহ করার বস্তু হয়ে উঠেছে। পাঠকের সঙ্গে বইয়ের সেই সহজ সম্পর্কটা আর আগের মতো নেই। তাহলে আঞ্চলিক ভাষার কমিকসের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হল, কম দামে পাঠকের কাছে পৌঁছনো।

হ্যাঁ। শুধু বই তৈরি করলেই হবে না, সেটি পাঠকের হাতে পৌঁছনোর ব্যবস্থাও থাকতে হবে। বইয়ের দোকান কমছে, বিতরণব্যবস্থাও দুর্বল হচ্ছে। ফলে পাঠক থাকলেও তাঁদের কাছে বই পৌঁছনো কঠিন। অন্যদিকে, এখন ফোনেই বিনা খরচে অ্যানিমেশন, সিনেমা, নানা ধরনের বিনোদন পাওয়া যায়। সেখানে সময় দিয়ে পৃষ্ঠা উল্টে কমিকস পড়ার জন্য মানুষকে রাজি করানো সহজ নয়। কমিকসকে আবার জনপ্রিয় করে তোলার কাজটা তাই বেশ কঠিন। যেসব দেশে কমিকসের একটা শক্তিশালী অতীত রয়েছে, সেখানে আজও সেই পুরনো পাঠকসমাজের ভালবাসা মাধ্যমটিকে টিকিয়ে রেখেছে। আমাদের দেশে সেই ধারাবাহিকতা অনেক ক্ষেত্রে তৈরি হয়নি।

মার্ভেল ও ডিসির মতো সংস্থাগুলো সিনেমার মাধ্যমে নিজেদের জগৎকে আরও জনপ্রিয় করেছে। তাদের সিনেমা দেখতে গিয়ে অনেক মানুষ কমিকসের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। কিন্তু স্বাধীন কমিকসের পাঠক তো অন্য ধরনের গল্পও চান। এই পরিস্থিতিতে স্বাধীন কমিকস কীভাবে টিকে থাকবে?

ইউরোপে বা আমেরিকায় কোনও বই প্রকাশ করলে তার একটা নির্দিষ্ট পাঠকসমাজ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু ভারতে পরিস্থিতিটা আলাদা। এখানে অনেক সময় বই বিক্রি করতে হলে বিদেশের বাজারের দিকে তাকাতে হয়, অথবা বইটিকে অন্য কোনও মাধ্যমে রূপান্তর করার সুযোগ খুঁজতে হয়। শুধু ভারতীয় বাজারের ওপর নির্ভর করে সব ধরনের কমিকস প্রকাশ করা কঠিন। তবে মার্ভেল ও ডিসির কথা বললেন, তারা এখন এই মাধ্যমের মূলধারার মূলধারা। একটা অর্থে তারা ম্যাকডোনাল্ডসের মতো— সবাই চেনে, সবাই সহজে চিনতে পারে। সুপারম্যান, স্পাইডারম্যানের মতো চরিত্রের একটা সুবিধে আছে। যে-কেউ তাদের দিয়ে কমিকস পড়া শুরু করতে পারে। তারপর যদি তার মাধ্যমটির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়, সে অন্য ধরনের গল্পও খুঁজে নিতে পারে। কেউ হয়তো সুপারহিরোতেই থেকে যাবে, কেউ আবার স্বাধীন কমিকসের দিকে এগোবে। সুতরাং, সুপারহিরো কমিকসকে আমি একেবারে অপ্রয়োজনীয় বলছি না। এগুলো অনেকের কাছে কমিকসের দুনিয়ার প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে। কিন্তু আমি নিজে সুপারহিরো নিয়ে গুরুতর কোনও গল্প লিখতে পারব কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। চেষ্টা করার কথা ভেবেছি, কিন্তু এখনও এমন কোনও জায়গা খুঁজে পাইনি, যেখানে বিষয়টিকে নিজের মতো করে বলতে পারব। সুপারহিরোর গল্পে ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে একটা বড় প্রশ্ন আছে। ব্যাটম্যান, ক্যাপ্টেন আমেরিকা কিংবা মার্ভেল-ডিসির অন্যান্য চরিত্রকে কীভাবে ইতিহাসের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, সেটা আমার ভাল লাগে না। যুদ্ধ, ভিয়েতনাম, অস্ত্রের ব্যবসা, পারমাণবিক শক্তি— এসবের সঙ্গে সুপারহিরোদের যুক্ত করে এমন একটা ধারণা তৈরি করা হয়, যা আসলে রাজনৈতিক প্রচারের কাজও করতে পারে। মূলধারায় পৌঁছে যাওয়া কোনও জনপ্রিয় চরিত্রের সঙ্গে তাই শুধু গল্প জড়িয়ে থাকে না; তার সঙ্গে নানা ধরনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বোঝাও যুক্ত হয়ে যায়। ক্যাপ্টেন আমেরিকার মতো চরিত্রকে যারা আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে, সেইসব বাচ্চাদের জন্য আমার কখনও-কখনও খারাপ লাগে। কারণ, তারা হয়তো বুঝতেই পারে না যে গল্পের আড়ালে কী ধরনের প্রচার কাজ করছে। তবে মূলধারা থাকবেই। ম্যাকডোনাল্ডস যেমন থাকবে, তেমনই ছোট, স্বাধীন বার্গারের দোকানও থাকবে। আমার মনে হয়, আমাদের কাজ হল সেই ছোট জায়গাগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা, যেখানে নতুন ধরনের গল্প বলা যায়। আর সুপারহিরো সিনেমার জনপ্রিয়তার একটা ভাল দিকও আছে। সিনেমার মাধ্যমে আরও বেশি মানুষ কমিকস সম্পর্কে জানতে পারছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ-কেউ পরে আরও গভীর, জটিল ও ভিন্ন ধরনের গল্প খুঁজবেন। তাঁরা যখন বুঝবেন যে, সুপারহিরোদের অনেক গল্পই একই ধরনের চক্রে ঘুরছে— নায়ক আসে, খলনায়কের সঙ্গে লড়ে, কিন্তু সেই লড়াই কখনও পুরোপুরি শেষ হয় না— তখন হয়তো অন্য কিছু পড়তে চাইবেন। সেই পাঠকরা একসময় স্বাধীন কমিকসও খুঁজে পাবেন।

মূলধারার বাইরে এমন অনেক শিল্পী আছেন, যাঁরা সুপারহিরোদের নিয়েই সম্পূর্ণ ভিন্ন, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্ন তুলেছেন। রবার্ট ক্রাম্বের মতো শিল্পীদের কাজের কথা বলা যায়। আমি নিজেকে তাঁর সঙ্গে তুলনা করছি না, কিন্তু স্বাধীন কমিকসের একটা শক্তি হল— এখানে এমন সব কথা বলা সম্ভব, যা মূলধারার সুপারহিরো কমিকসে প্রায়ই অনুপস্থিত। আরেকটা সম্ভাবনা রয়েছে গ্রাফিক নভেলকে অন্য মাধ্যমে নিয়ে যাওয়ার। কিছু শিল্পী নিজেদের কাজের মাধ্যমে এমন একটি জগৎ তৈরি করেছেন, যা পরে সিনেমাতেও রূপান্তরিত হয়েছে। আমার কাছে এই দিকটা খুব আকর্ষণীয়। কোনও গল্পকে অ্যানিমেশন বা সিরিজে রূপ দেওয়ার সুযোগ পেলে আমি সেটা নিয়ে কাজ করতে চাই। এতে আমরা শুধু নতুন পাঠকের কাছেই পৌঁছব না, মাধ্যমটির নিজস্ব সীমাবদ্ধতাকেও চ্যালেঞ্জ করতে পারব।

১৯৭০ থেকে ১৯৯০— ভারতীয় কমিকসের শ্রেষ্ঠ সময় গেছে। সেই সময় ইন্দ্রজাল কমিকস একটা আলাদা ইন্ডাস্ট্রির মতো হয়ে উঠেছিল…

ইন্দ্রজাল ইন্দ্রজাল-ই। ডায়মন্ড কমিকস, ফ্যান্টম থেকে ফ্ল্যাশগর্ডন, ম্যানড্রেক থেকে বাজ সয়ার-রা যেমন ছিল, আবার বাহাদুর-ও ছিল। বাহাদুর যেমন ভারতীয় সুপারহিরো, কিন্তু বাহাদুরের ব্যাপারটাই আলাদা!

আপনার একটা উদ্যোগ ‘ব্রেনডেড’, সেই নিয়ে কিছু বলুন। 

এটা আমাদের বন্ধুদের একটা কালেক্টিভ। ২০১৪-র পর, যখন দেখা গেল, গ্রাফিক শিল্পীদের প্রতিবাদী স্বর ছড়িয়েছিটিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে, তখন অনলাইনে সেগুলোকে একজড়ো করার একটা পরিকল্পনা আমরা করে ফেলি।তবে অনলাইনের ব্যাপারে আমি খানিকটা কাঁচাই, এইটার জন্য রিয়া বা নাতাশার মতো আমার বন্ধুদের ওপর আমাকে ভরসা করতে হয়। এখন অনলাইনে আমরা বহরে বাড়ছি, আমাদের প্রায় ৫০০০ ফলোয়ার।

মাঙ্গা কেন এত জনপ্রিয়?

নতুন প্রজন্মের অনেকেই মাঙ্গা পড়তে খুব ভালবাসে। কিন্তু নিজেদের ভাষার কমিকসের মধ্যে তারা সবসময় সেই আকর্ষণ খুঁজে পায় না। এর কারণ কী বলে আপনার মনে হয়?

আমার মনে হয়, এটা একটা প্রবণতা। অনেকে প্রথমে অ্যানিমে দেখেছেন, তারপর মাঙ্গা পড়তে শুরু করেছেন। এখন এই নিয়ে একটা সম্পূর্ণ পাঠকসমাজ তৈরি হয়েছে। তারা একে-অন্যের সঙ্গে কথা বলে, নিজেদের মধ্যে একটা সম্পর্ক ও পরিচিতির অনুভূতি খুঁজে পায়। কেউ-কেউ স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমি গ্রাফিক নভেল পড়ি না, আমি শুধু মাঙ্গা পড়ি।’ অর্থাৎ, মাঙ্গা যেন তাদের কাছে আলাদা একটা পরিচয় হয়ে উঠেছে। আমার যেটা মনে হয়, মাঙ্গাকে খুব ভালভাবে বাজারজাত করা হয়েছে। এটিকে শুধু কমিকসের আরেকটি ধরন হিসেবে নয়, বরং একটা স্বতন্ত্র ও আকাঙ্ক্ষিত সাংস্কৃতিক জগৎ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, একটা যাপনের ধরন তৈরি করা হয়েছে। পাঠকরা তার চরিত্র, কাহিনি ও জগতের সঙ্গে নিজেদের একাত্ম করতে পারেন। ফলে এর মধ্যে এক ধরনের গোষ্ঠীগত পরিচয়ও তৈরি হয়। আমি নিজেও মাঙ্গা পড়ি। কিন্তু আমি এই বিভাজনটা করি না যে, শুধু মাঙ্গাই পড়ব, অন্য কিছু পড়ব না। আমার কাছে এগুলো সবই কমিকস— আঁকার ধরন আলাদা হতে পারে, গল্প বলার পদ্ধতি আলাদা হতে পারে। ব্যাপারটা অনেকটা হেভি মেটালের ভক্তদের মতো। কেউ হয়তো বলেন, তিনি শুধু ডেথ মেটাল শুনবেন, সেই ঘরানার পোশাকই পরবেন। কোনও ঘরানার ভক্ত হওয়ায় সমস্যা নেই। কিন্তু ভক্তির সঙ্গে এমনভাবে আটকে যাওয়ারও দরকার নেই যে, অন্য কিছু আর গ্রহণই করা যাবে না।

তা হলে মাঙ্গা এত জনপ্রিয় কী করে? এর ছবির ভাষা বা গল্প বলার ধরনে কি বিশেষ কিছু আছে?

নিশ্চয়ই এর নিজস্ব শক্তি আছে। তবে এর জনপ্রিয়তার পিছনে দীর্ঘদিনের কাজও রয়েছে। কয়েক দশক ধরে তারা বিপুল পরিমাণ কমিকস তৈরি করেছে। অ্যানিমে, সিনেমা এবং অন্যান্য মাধ্যমের সাহায্যে সেই জগৎগুলো মানুষের কল্পনায় জায়গা করে নিয়েছে। মিয়াজাকির কাজও অসংখ্য মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। কোরিয়ান পপ সংস্কৃতির জনপ্রিয়তার কথাও ধরুন। আমি নিজে সেই জগতের খুব বড় ভক্ত নই, কিন্তু এটুকু বুঝি যে, সেগুলোকে খুব ভালভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। মানুষের সঙ্গে একটা সংযোগ তৈরি হয়েছে। এখন আমরা জানি, মানুষ কী ধরনের বিষয় পছন্দ করতে পারে। সেই অনুযায়ী নানা কনটেন্টকে সাজিয়ে, প্যাকেজ করে, তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমও এই প্রক্রিয়ার অংশ। তুমি কী পছন্দ করছ, কী দেখছ, কোথায় থামছ— এসবের ভিত্তিতে তোমার আগ্রহ সম্পর্কে নানা তথ্য সংগ্রহ করা হয়। অনেক সময় তুমি নিজে বুঝে ওঠার আগেই ব্যবস্থা তোমার পছন্দের ধরন আঁচ করতে পারে। ফলে আরও বড় পাঠকসমাজের উপযোগী করে গল্প তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। আমার ভাল লাগে যে, এই জনপ্রিয়তার ফলে নতুন ধরনের বিষয়, নতুন দৃশ্যভাষা ও নতুন গল্প নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমার কাছে মাঙ্গা কোনও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন মাধ্যম নয়। এটি কমিকসেরই একটি ধারা, যার নিজস্ব শৈলী ও ঐতিহ্য রয়েছে। মিয়াজাকির কাজের কথাই যদি ধরি, তাঁর ছবির প্রকাশভঙ্গি খুবই নিজস্ব, স্থানীয় আবহও রয়েছে। অথচ তাঁর অনেক গল্পে ইউরোপীয় পরিবেশের প্রভাব দেখা যায়। কোথাও ভিক্টোরীয় ইউরোপের স্মৃতি, কোথাও ঔপনিবেশিক আবহ, কোথাও আবার অন্য জগতের উপাদান। তিনি নানা জায়গা থেকে উপাদান নিয়ে সম্পূর্ণ নতুন একটা জগৎ তৈরি করেন। আমার মনে হয়, এই মিশ্রণটাই গুরুত্বপূর্ণ। নিজের স্থানীয় অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করেও এমন একটা জগৎ তৈরি করা যায়, যা সীমানা পেরিয়ে অন্য মানুষের কাছেও পৌঁছতে পারে।

‘ভারতীয় শৈলী’ বলে কি সত্যিই কিছু থাকা উচিত? ইউরোপীয় কমিকস দেখলে তার রেখা ও রঙের ব্যবহার থেকে একটা পরিচিত দৃশ্যভাষা বোঝা যায়। আমেরিকান কমিকসেরও নিজস্ব ভঙ্গি রয়েছে, জাপানি কমিকসেরও রয়েছে। কিন্তু ভারতীয় কমিকসের কি তেমন কোনও নিজস্ব দৃশ্যপরিচয় আছে?

আমার মনে হয় না, ভারতের জন্য একটি মাত্র নির্দিষ্ট আঁকার শৈলী থাকা উচিত। ইউরোপীয় কমিকস বহু বছর ধরে বিকশিত হয়েছে। হার্জের ‘ligne claire’ বা স্পষ্ট রেখার শৈলী বহু শিল্পীকে প্রভাবিত করেছে। সেই প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা এখনও চলছে। কিন্তু ওই শৈলী কার্যকর হয়েছিল, বাজারে তার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছিল। আমেরিকান কমিকসের ক্ষেত্রেও এমন কিছু পরিচিত শৈলী রয়েছে, যেগুলো দীর্ঘদিন ধরে বাজারে প্রতিষ্ঠিত। মাঙ্গার ক্ষেত্রেও তাই। কিন্তু ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশে একটি মাত্র ‘ভারতীয় শৈলী’ নির্ধারণ করার চেষ্টা আমার কাছে সমস্যাজনক। সেটা অনেকটা এই বলার মতো যে, ভারতের সবাইকে একটি ভাষায় কথা বলতে হবে। আমাদের এখানে নানা ভাষা, নানা সংস্কৃতি, নানা সামাজিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন ধরনের আঁকার শৈলী তৈরি হওয়া উচিত। আমি আশা করি, ‘ভারতীয় শৈলী’ বলে কোনও একটি নির্দিষ্ট ধরন ভবিষ্যতে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে না, যা অন্য সব ধরনের পরীক্ষাকে আটকে দেয়। বরং আরও নানারকম শৈলী তৈরি হোক। কোনও-কোনও বাণিজ্যিক শৈলী জনপ্রিয় হতে পারে, বাজারেও জায়গা করে নিতে পারে। যেমন, বড় বড় ভ্রু, হাসিখুশি মুখ, নির্দিষ্ট ধরনের চরিত্রের নকশা— এমন কিছু চেনা ভঙ্গি হয়তো জনপ্রিয় হয়ে উঠবে। তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু একটিমাত্র শৈলীই যদি সবকিছুর প্রতিনিধিত্ব করতে শুরু করে, তা হলে অন্য শিল্পীরা সেই ছাঁচে আঁকতে বাধ্য হবেন। তখন পরীক্ষার জায়গাটা নষ্ট হয়ে যাবে। আমি নিজের শৈলী নিয়েই কাজ করতে চাই। অন্যদেরও নিজেদের শৈলী তৈরি করার স্বাধীনতা থাকা উচিত। প্রয়োজনে সেই শৈলী বদলানোর স্বাধীনতাও থাকা দরকার— গল্পের প্রয়োজন হলে বদলাবে, শিল্পীর ইচ্ছে হলে বদলাবে। একটিমাত্র শৈলী, ভাষা, জনগোষ্ঠী বা ধর্ম দিয়ে ভারতকে প্রকাশ করা যায় না। তেমনই একটি মাত্র আঁকার ধরন দিয়েও ভারতীয় কমিকসকে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমার আশা শুধু এটুকুই—ভারত থেকে ভালো কমিকস তৈরি হোক, এমন গল্প তৈরি হোক যা পাঠকের কাছে পৌঁছবে। কিন্তু সেই আশাকে যদি আমরা একটি নির্দিষ্ট ‘ভারতীয় শৈলী’র মধ্যে আটকে ফেলি, তা হলে বরং সেই সম্ভাবনাটাকেই সীমিত করে দেব।

এআই-এর ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। এআইকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য যে জনপ্রিয় ছবিগুলো ব্যবহার করা হয়, সেগুলো আবার নতুন করে তৈরি করা হতে পারে। ফলে কিছু পরিচিত ভঙ্গি আরও বেশি ছড়িয়ে পড়ে। পুরাণের সুপারহিরো, রাগী হনুমান— এই ধরনের ছবি হয়তো অনেকের পছন্দ। কিন্তু সেটাকেই ভারতীয় শৈলী বলে ধরে নেওয়া যায় না। যদি কোনও একটি বাণিজ্যিক শৈলী খুব বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, তা হলে সবাই সেই ধরন অনুসরণ করতে শুরু করতে পারেন। তখন দৃশ্যভাষার বৈচিত্র্য কমে যাবে। তাই আমি চাই, প্রত্যেক শিল্পী নিজের মতো করে কাজ করুন, নিজের গল্প বলার জন্য উপযুক্ত শৈলী খুঁজে নিন এবং প্রয়োজনে তা বদলানোর স্বাধীনতা রাখুন।

নতুন কমিকস-শিল্পীদের জন্য 

যাঁরা এই জগতে আসতে চান, তাঁদের জন্য আপনার কী পরামর্শ? একজন ভাল শিল্পী হওয়া বেশি জরুরি, না কি ভাল গল্পকার হওয়া? কমিকস তৈরির ক্ষেত্রে কোনটাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত?

আমার উত্তর হল, গল্প বলার ক্ষমতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ভাল ছবি আঁকতে পারলেই হবে না। একজন ভাল ডিজাইনার হতে হবে, গল্পের গতি বুঝতে হবে, কোন দৃশ্য কতক্ষণ থাকবে, কীভাবে এক দৃশ্য থেকে অন্য দৃশ্যে যাওয়া হবে— এসব জানতে হবে। গল্প বলার ক্ষমতা ভাল হলে যে কোনও শৈলীতেই ছবিকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা সম্ভব। মাঙ্গা-র মতো স্টিক-ফিগার কমিকসের কথাই ধরা যাক। আঁকার ধরন খুব সরল হলেও গল্প বলার ক্ষমতা না-থাকলে পাঠক তার সঙ্গে থেকে যান। 

আমি এমন মানুষদের দিয়েও কমিকস তৈরি করানোর চেষ্টা করেছি, যাঁরা প্রচলিত অর্থে কমিকস আঁকতে খুব স্বচ্ছন্দ নন। কিন্তু লেখা ভাল হলে, ছবির ধরন ও বিন্যাসকে নিয়ন্ত্রণ করে একটা কার্যকর ফল তৈরি করা যায়। সরল ছবি, সামান্য রঙ এবং ভালো পৃষ্ঠাবিন্যাস দিয়েও দেখতে সুন্দর কমিকস তৈরি করা সম্ভব। শেষ পর্যন্ত লেখাটাই পাঠককে গল্পের মধ্যে ধরে রাখবে।

আমরা আগেও বলেছি, ছবি আর লেখার মধ্যে যে সম্পর্ক, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি ছবিকে অসাধারণ বা স্মরণীয় করে তুলতে হবে— এমন কোনও কথা নেই। ছবিকে গল্পের প্রয়োজন মেটাতে হবে। এটা অনেকটা সংগীতের মতো। কখনও একটি বাদ্যযন্ত্র সামনে আসে, অন্যটি পিছনে সরে যায়। আবার কখনও অন্য যন্ত্রটি প্রধান হয়ে ওঠে। লেখা ও ছবির মধ্যেও এমন সম্পর্ক তৈরি হয়। যদি আমার আঁকার দিকটি তুলনায় দুর্বল হয়, তা হলে লেখাকে আরও শক্তিশালী করে, ছবির জন্য যথেষ্ট জায়গা রেখে, গল্পটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। কিন্তু উল্টোটাও সত্যি। আঁকার শৈলী খুব ভাল, অথচ গল্প দুর্বল— এমন হলে কাজটা শেষ পর্যন্ত সফল হবে না। শিল্পী হয়তো অসাধারণ ছবি আঁকতে পারেন, কিন্তু সেই ছবিগুলোকে একসঙ্গে জুড়ে একটি গল্প তৈরি করার ক্ষমতা আলাদা বিষয়। কিছু শিল্পীর এই সমস্যা থাকে। মোবিয়ুসের গল্পগুলোর কথাও কখনও কখনও আমার মনে হয়েছে— আঁকা অসাধারণ, কিন্তু গল্পটা ততটা শক্তিশালী নয়। তাই আমি শেষ পর্যন্ত মনে করি, গল্প বলার ক্ষমতাই মূল কথা। কমিকস এমন একটি মাধ্যম, যেখানে লেখা, ছবি, নকশা এবং রং— সব মিলিয়ে গল্প তৈরি হয়। পৃষ্ঠায় লেখা কোথায় থাকবে, পাঠকের চোখ কোন দিকে এগোবে, কোন ছবির পরে কোন ছবি আসবে— এসবও খুব গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক লেখা থাকলে শুধু নকশার সাহায্যেও গল্পকে কার্যকর করে তোলা যায়।

সম্প্রতি আমি একটি কমিকস তৈরি করেছিলাম, যেখানে একাধিক প্যানেল থাকলেও ছবিটি আসলে একই। সেখানে মোদি, শি জিনপিং ও পুতিনকে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। আমি একই ছবিটিকে বারবার কেটে বিভিন্ন প্যানেল তৈরি করেছি। প্রতিবার নতুন করে ছবি আঁকার দরকার হয়নি। কৌতুকটা তৈরি হয়েছে মূলত সংলাপের মাধ্যমে— তাঁরা জনসমক্ষে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু নিজেদের মধ্যে কী কথা বলছেন, সেটাই আসল মজা। এখানে ছবির চেয়ে প্যানেল সাজানো এবং লেখার বিন্যাস বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই ছবিকে কীভাবে বিভিন্নভাবে দেখানো যায়, কীভাবে পাঠকের প্রত্যাশাকে কাজে লাগানো যায়— সেটাও কমিকসের শিল্প। আমরা ছবির সাহায্যে অনেক কিছু করতে পারি। একই বিষয়কে ভিন্নভাবে তুলে ধরতে পারি, পাঠককে চমকে দিতে পারি। সেখানেই মৌলিকতার সুযোগ তৈরি হয়। আবার বলছি, শিল্প হল মাধ্যম, গল্প হল তার বিষয়বস্তু। তবে লেখাও সেই মাধ্যমেরই অংশ। নির্বাক গল্প হলেও গল্প বলার ধরনটাই গুরুত্বপূর্ণ।