সাক্ষাৎকার : শিলাজিৎ
টেলিভিশনে চলছে ‘বিগ বস বাংলা’। এই রিয়েলিটি শো নিয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে। এই শো-এর দ্বিতীয় সিজনে ছিলেন শিলাজিৎ মজুমদার। ‘নজরদারি’ সংখ্যার জন্য রইল তাঁর বিশেষ সাক্ষাৎকার।
‘বিগ বস’-এ আপনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
অসম্ভব দমবন্ধ, অসম্ভব সাফোকেটিং। সব মিলিয়ে খুব খারাপ।
দর্শক আপনার ওপর সর্বক্ষণ নজর রাখছে, এই বিষয়টা ঠিক কেমন লাগত আপনার?
আমার কিছু যায় আসত না। কারণ আমি আমার মতো থাকতাম, কাজেই, দর্শক আমাকে ২৪ ঘণ্টা দেখলেও আমার কোনও অসুবিধে ছিল না। আমি তো নিজেকে বা দর্শককে অস্বস্তি দেওয়ার মতো কিছুই করছি না। তাহলে চাপটা কোথায়? হ্যাঁ, দুটো জায়গা ওখানে প্রাইভেট। টয়লেট আর স্মোকিং জোন, এই দুটো ওরা দেখাত না। তাছাড়া, আমরা তো জেনেই গিয়েছিলাম যে আমাদের সর্বক্ষণ দেখা যাবে। ওই নিয়ে আমার কোনও অস্বস্তি হয়নি।
তাহলে দমবন্ধ লাগত কেন?
কারণ আমি বন্দি সর্বক্ষণ। কিচ্ছু করার নেই। নেট নেই, গান লিখব, গান গাইব, তার কোনও অবকাশ নেই। কোনও সরঞ্জাম নেই। এইগুলোর জন্য যেটা হত, আমার খুব ঘুম পেয়ে যেত, সর্বক্ষণ ঘুম পেত আমার।
আর-একটা বড় অসুবিধে আছে। বাইরে থাকলে কী হয়, কাউকে নিয়ে অসুবিধে হলে, কাউকে খারাপ লাগলে সেখান থেকে সরে আসা যায়। এখানে সেই সুযোগটা নেই। তাকে সর্বক্ষণ দেখতে হবে, তার সঙ্গে থাকতে হবে।

আরও পড়ুন: রিয়েলিটি শো, রিয়েলিটি চেক! লিখছেন তথাগত মুখোপাধ্যায়…
এটা তো একরকম টিকে থাকার খেলা! সেখানে প্রতিযোগিতা আছে বুঝলাম, কিন্তু এত অশান্তি হয় কেন?
১৩-১৪টা লোককে একটা ঘরে রাখা হচ্ছে, তাদের সব কাজকর্ম করতে হচ্ছে, তারা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চালাচ্ছে খেলা হলে। এখানে ঝগড়া লাগবেই। অনেকেই ভাবে, এইসব ঝগড়া আসলে স্ক্রিপ্টেড। কিন্তু এর মধ্যে কোনও তৈরি চিত্রনাট্য নেই, চিত্রনাট্য আপনাআপনিই তৈরি হয়। এটার দর্শনটাই তাই।
ঝগড়া তার মানে হওয়া অবধারিত?
হ্যাঁ। সেইভাবেই শো-টা সাজানো। কিছু-কিছু প্রতিযোগীকে নিয়ে আসা হবে, যারা ছোট-ছোট ঘটনা নিয়ে অশান্তি করবে। তাতে আবার অন্য কেউ ঢোকার চেষ্টা করবে। এইগুলো লেগেই থাকবে। কিন্তু পাড়ার মুখুজ্যেবাবুকে ভাল না লাগলে তাকে এড়িয়ে যাওয়া যায়, এখানে সেটা সম্ভব নয়, বরং রোজ তাকে দেখতে হবে, এবং মাথাটা খারাপ হবে।

এবারের ‘বিগ বস’ দেখছেন?
না। আমি যখন ভেতরে ছিলাম আগেরবার, তখন তো দেখার সুযোগ ছিল না। বেরিয়ে এসেও আমি দেখিনি। এবারেরটাও দেখছি না কাজেই।
আপনি কেন গিয়েছিলেন ‘বিগ বস’-এ?
কিছু অর্থ উপার্জন করব বলে, সোজা কথা। আমাকে বন্দি করার জন্য যে অর্থ ওরা দেবে বলেছিল, তা আমি পেয়েছিলাম। একটা সময় এও মনে হয়েছিল, বেরিয়ে যেতে পারলে খুব ভাল হয়, কিন্তু বুঝতে পেরেছিলাম, টিআরপির জন্য ওরা আমাকে রেখেই দেবে শেষ অবধি। তারপর খেলার নিয়ম অনুযায়ী একজনকে চ্যাম্পিয়ন করে দেওয়া হল।
এই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার খিদেটা কি আদৌ বেঁচে থাকে?
আসলে কী হয়, ওখানে থাকতে-থাকতে একটা সময় সত্যিই মনে হয়, খেলাটা বোধহয় আমিও জিততে পারি।কিন্তু চ্যাম্পিয়ন হয়েও, ওখান থেকে বেরিয়ে আসার পর, কারও জীবনে বিরাট কোনও অনুপ্রেরণা তৈরি হয় বলে আমার মনে হয় না।

এই ধরনের শো-এ গেলে কি শিল্পীসত্তার ক্ষতি হয়?
সেটা নির্ভর করছে, কার সামনে কী কাজ আছে, তার ওপরে। আমার ছেলে ধী একটা সময় প্রস্তাব পেয়েছিল বিগ বসে যাওয়ার, ওকে আমি বারণ করেছিলাম। কারণ ও তখন একটি কোম্পানির ব্র্যান্ড ম্যানেজার, তিনটি ব্যান্ডের সঙ্গে বাজায়, নিজের মতো গানবাজনা করে। আমার মনে হয়েছিল, সেই অবস্থায় বিগ বস-এ গেলে ওর কাজের ক্ষতি হবে। আমার পরিস্থিতি বিগ বস-এর সময় এমনই ছিল যে, আমি ওখানে কিছুদিন থাকলে আমার কোনও কাজের ক্ষতি হত না। আমি ওটাকে ১০০ দিনের কাজ হিসেবে দেখেছিলাম। বুঝিনি, ওরা আমাকে এতদিন রেখে দেবে। কলকাতায় থেকে আমি যে রোজগার করতে পারতাম, তার চেয়ে বেশি রোজগার ওখানে থেকে করছিলাম। তার জন্য একটু কষ্ট সহ্য করব না হয়— এই ভেবেই গিয়েছিলাম। কিন্তু কারও সামনে যদি সত্যি করার মতন অনেক কাজ থাকে তাহলে তার এই সমস্ত শো-এ না যাওয়াই মঙ্গলের।
দর্শক এতটা উত্তেজনা নিয়ে কেন দেখে এই শো?
সোজা কথা, তারা নিজেরা পার্টিসিপেট করতে চায়। সেলেব্রিটি-দের নিয়ে এমনিতেই মানুষের কৌতূহল অঢেল, যে-জন্য আমি এই সাক্ষাৎকারটা দিচ্ছি। বিষয়টা আদতে নন ফিকশন, কিন্তু হয়ে উঠছে ফিকশন। তার চেনা সেলেব্রিটি কী করছে, কতটা খুলছে নিজেকে, কতটা মেলে ধরছে, কাকে গ্রিল করছে, কাকে ‘আহা’ বলছে— এইগুলো মানুষ দেখতে চায়। কৌতূহল থেকেই। এই কৌতূহল তো আদিম। আর এই আধা-ফিকশনে সে নিজে একটা সময় ঢুকে পড়ে। এইজন্যই এত আগ্রহ, এত উত্তেজনা!




