রিয়েলিটি চেক

‘The choice for mankind lay between freedom and happiness, and that, for the great bulk of mankind, happiness was better.’


—1984, George Orwell.

রাগ হয়?

—হ্যাঁ, হয়।
—কেন হয়?
—যেটা চাইছি, পাচ্ছি না বলে হয়।
—তুমি পাওয়ার যোগ্য কি না ভেবে দেখেছ?
—হ্যাঁ, ভেবেছি। অনেকেই তো পাচ্ছে, যারা যোগ্য নয়। তাহলে আমি কেন পাব না?
—রাগ হলে কী করো?
—খিস্তি দিই, সোশ্যাল মিডিয়াতে।
—কাকে?
—যারা অযোগ্য তাদেরকে।
—অযোগ্য কারা?
—যাদের আমার মনে হয়, তারা অযোগ্য।

ট্রোলিং যখন শিল্প হিসেবে জনমানসে স্বীকৃত, তখন একজন সাধারণ নাগরিকের মানসিক অবস্থার বয়ান হিসেবে এই কথোপকথন এই সময়ের নিশ্চিত দলিল।

আজ আপনি চাকুরিজীবী হন কিংবা ব্যবসায়ী, সোশ্যাল মিডিয়াতে কিন্তু আপনি একজন শিল্পী, ফটোগ্রাফার কিংবা ট্রেড অ্যানালিস্ট, অন্তত একজন শিল্পের প্রকৃত সমঝদার তো আপনি বটেই। সোশ্যাল মিডিয়া আপনাকে অধিকার দিয়েছে আপনার ভাবনা, বক্তব্যকে সবার সামনে কুন্ঠাহীনভাবে প্রকাশ করার। হোক না প্রোফাইল ফেক কিংবা লকড, খাঁটি নির্ভেজাল ঘৃণার বিষ তো আপনারই অন্তরের। ঠিক যেভাবে এই গণতন্ত্রে একহাজার কিংবা তিনহাজারে বিকিয়ে যায় ভোট, যে জনগণ জানেই না দেশের বর্তমান জিডিপি এখন ঠিক কত, তারাই সিদ্ধান্ত নেয় ভোট ব্যালটে। এবার মসনদের গদিতে চোখ বুজে আধশোয়া হয়ে শুয়ে থাকবে কে? এই জনগণের নিরপেক্ষ অশিক্ষার পক্ষপাতে অবধারিত একটা প্রশ্ন উঠে আসে মাথার ভেতর। ঘুরপাক খায় ক্রমাগত। শিল্পী কারা তাহলে? রিয়েলিটি শোতে যাদের দেখা যায়, তারা শিল্পী? না কি যাদের এক ছবিতে কুড়িহাজার লাইক, তারা? না কি অ্যাকাডেমির মঞ্চে থরো থরো আবেগে যিনি হাততালি কুড়োলেন অশ্রুসজল দর্শকের, তিনি শিল্পী?

পরিচালক জন আব্রাহাম বা মণি কউল, বা তাদের অসংখ্য উত্তরসূরিরা চৈতন্য তামহানের মতো কেউ, যারা নিভৃতে সিনেমা নামক শিল্পের নিয়মিত চর্চা করছেন একটুও স্বীকৃতির প্রত্যাশা না করে, তারা শিল্পী। আমি এতগুলো বছর বাংলা সিনেমা ও টেলিভিশন মাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত থাকার দরুণ, আমার মনে হয় এরা কেউ-ই শিল্পী নন ততক্ষণ, যতক্ষণ না এরা মুক্ত বাজারে নিজেকে আর নিজের শিল্পকে ন্যাংটো করে মিডিয়ার তালে তাল দিয়ে নাচছেন।

মিডিয়াতে প্রভাবশালী বন্ধু আছে? অর্থবান ক্ষমতাবান লোকের সঙ্গে মদ্যপানের আঁতাঁত আছে নিয়মিত? পলিটিকাল পার্টির জন্মদিনে কিংবা ইন্ডাস্ট্রি উন্নতিকল্পের পরিকল্পনায় আপনার ডাক পড়ে? কিংবা মুম্বই থেকে শাহরুখ খান এলে তাঁর সেলফিতে গা লাগানোর ভিড়ে জায়গা হয় আপনার? তবে আপনি শিল্পী। শিল্পচর্চায় শিল্পী যুক্ত থাকুক বা না থাকুক, শিল্পীর, শিল্পের মূল্যায়ন পলিটিক্সের পাপস সাজায়, যাতে বুটসমেত পা মুছে যাবে কিছু কেষ্টবিষ্টু কিংবা ছোট-বড় ব্যবসায়ীর ছেলে-মেয়ে।

১৯৪৮ সালে লেখা জর্জ অরওয়েলের উপন্যাস ‘১৯৮৪’-তে আমরা প্রথম টের পাই— ‘বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং।’ রাষ্ট্র শুধু আপনার কাজকর্ম দেখছে না, আপনার চিন্তা, আপনার পছন্দ, আপনার আচরণ, সবকিছুর ওপর নজর রাখছে। আজ সেই বিগ ব্রাদার হয়তো আর রাষ্ট্রের একক কোনও মুখ নয়; সে ছড়িয়ে আছে মিডিয়ায়, সোশ্যাল মিডিয়ায়, ক্ষমতার অলিন্দে। আপনি কী দেখবেন, কাকে দেখবেন, কাকে শিল্পী বলে মানবেন, তারও অদৃশ্য তালিকা রেডি। আর সেই তালিকার বাইরে দাঁড়িয়ে শিল্পচর্চা করার সাহসটাই হয়ে উঠছে জাতীয় অপরাধ। যেমন ইরানে বারবার হাজতবাস হয় জাফর পানাহির, সেভাবে এদেশে পানাহির জায়গার সৃষ্টিটাই উধাও হয়ে যায়। নিছক ভাবাবেগ আহত হওয়ার ধাক্কায়, সেন্সরের সার্জিকাল স্ট্রাইকে। দিবাকর ব্যানার্জি তাঁর নির্মিত সিনেমা নিয়ে দোরে দোরে ঘুরে বেড়ান, মুক্তির দরজায় আলিবাবার তালা ঝোলানো মস্ত।

অরওয়েল পৃথিবীর ভবিষ্যতের যে সম্যক ধারণা ‘উনিশশো চুরাশি’ নামক উপন্যাসে টের পেয়েছিলেন, তাতে তিনি দূরতম কষ্টকল্পনাতেও ভাবেননি, তার সৃষ্ট বিগ ব্রাদার ভবিষ্যৎ জনজীবনের বিনোদনের এক মস্ত উপাদান হয়ে উঠবে, সংকোচহীনভাবে। অরওয়েলের সাবধাণবানী যে একদিন বিভিন্ন দেশের চ্যানেলের টিআরপি নির্মাণের হাতিয়ার হয়ে উঠবে, এ-কথা ১৯৯৯-এর প্রথম ‘বিগ ব্রাদার শো’-এর ডাচ নির্মাতারাও জানতেন না।

জর্জ অরওয়েলের উপন্যাস দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৯৯ সালে যে ডাচ শো সোশ্যাল এক্সপেরিমেন্টের উদ্দেশ্যে ‘বিগ ব্রাদার’ নাম দিয়ে শুরু হয়, তাতে প্রথম প্রতিযোগী ছিল সাধারণ ন’জন মানুষ। পরে সেই সংখ্যা বেড়ে বারোজন হয়। সেই বারোজন মানুষের ব্যক্তিগত চব্বিশ ঘণ্টা ক্রমশ পৃথিবীর প্রতিটা প্রান্তের সাধারণ মানুষকে নগ্ন করার আবশ্যিক কুৎসিত বিনোদন হয়ে উঠবে, এই গল্প স্বপন কুমারও ভেবে উঠতে পারতেন না। অরওয়েলের বিগ ব্রাদার যেখানে ছিল মানুষের ওপর নজরদারির এক ভয়াবহ প্রতীক, বিগ ব্রাদার শো সেখানে সেই নজরদারিকেই বিনোদনের উপাদান বানিয়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে মানুষের কাছেই বেচে দিল খেলার ছলে। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষ শুধু নজরবন্দি হল না, অন্যের ব্যক্তিগত নজরবন্দিতে নিজে হতে শিখল ক্ষমতার চোখ আর কান। ফ্যাসিস্ট ক্ষমতার অংশ হওয়ার নেট প্র্যাক্টিস।

আর আজ, ২০২৬ সালে সেই আনন্দের পরিধি আরও অনেক বৃহৎ। সাধারণ মানুষের জীবনের চেয়ে অনেক বেশি আনন্দ, অনেক বেশি উত্তেজনা তৈরি হয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতী মানুষদের, শিল্পীদের নগ্ন করে, এই অনুভব প্রতিটা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী মানুষের জানা। ফুটবলার, গায়ক থেকে অভিনেতা, জিম ট্রেনার, ইনফ্লুয়েন্সার থেকে উদ্যোক্তা— কে নেই সেই লিস্টে? সবই আছে, সবাই আছে।

অর্থ উপার্জনের এই সাপলুডোয়, গেম শোয়ে অংশগ্রহণ করতে এসেছেন কেউ খ্যাতির লোভে, কেউ অর্থের লোভে, কেউ বা সময়ের দাবিতে। শিল্পী বা কৃতী মানুষ হিসেবে এই গেম শো-তে যাদের প্রবেশাধিকার, তাঁদের শিল্প বা শিল্পী মনন এখানে গৌণ। তারা ঠিক কতটা ম্যানিপুলেশনে, নিষ্ঠুরতায়, অমানবিক আচরণে, নিয়ন্ত্রণে, ঝগড়ায় দক্ষ, কিংবা মানুষকে অপমান করায়। যত বেশি অশ্লীল আস্ফালন, অপমান আর নীচতার অভিঘাত যত বেশি, তত বেশি উৎসাহ দর্শকের, নির্মাতাদের।

এ যেন মধ্যযুগের কলোসিয়ামে গ্ল্যাডিয়েটরের খালি হাতে লড়াই হিংস্র জন্তুর সঙ্গে। নিশ্চিত পরাজয় জেনেও দর্শক উৎসাহে উল্লসিত, রোমাঞ্চিত। নিয়মিত ব্যক্তিগত হ্যাজ চলছে স্যোশাল মিডিয়ায়। পুলকিত নিশ্চিত খামারির বিনোদনে। আক্রমণ, প্রতি-আক্রমণে রক্ত ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে, জন্তুর কামড়ের দাগে সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত, শতচ্ছিন্ন পোশাকে নগ্ন গ্ল্যাডিয়েটর চিৎকার করছে আর্তনাদ। আর দর্শক বিপুল উল্লাসে চিৎকার করছ— এবার হবে একটা মৃত্যু। নতুন দেহ। মৃতদেহের ওপর শকুনের মতো দৃষ্টিত টিআরপি-তে, নতুন রেকর্ড, ভবিষ্যতের ইতিহাস।

অথচ রিয়্যালিটি শোয়ের প্রচারে উন্নত জীবনের, বাঁচার বিজ্ঞাপন, একসঙ্গে ভাল থাকার, মানিয়ে নেওয়ার, বন্ধুত্বের ঔদার্যের ম্যানিফেস্টো। একদল শিল্পীকে অর্থের বিনিময়ে গিনিপিগ সাজিয়ে ল্যাবের খাঁচায় আটকে তাদের ঘুমনো থেকে খাবার ধরন, প্রতিটা ব্যবহারের চুলচেরা বিশ্লেষণ এই নতুন উন্নত জীবনের সংজ্ঞা। ঝগড়া, অশান্তি, অশ্লীল, অসভ্য আচরণ আর অনৈতিক ভাবনা হয়ে ওঠে অস্তিত্বের জন্য সংগ্রামের বির্বতনবাদ।

সাধারণ দর্শক তখন বিগ ব্রাদার। মুখে লেবেঞ্চুষ আর চোখে নীতিপুলিশের চশমা। এই অশ্লীল, আশ্চর্য দুনিয়ায় পতাকা হাতে নিয়ে নীরব, নিস্পৃহ, স্থির যে, সে হয়ে যায় দর্শকের কাছে অসহ্য, অবমাননাকর, অহেতুক। তার অপরাধ সে ভদ্র, সে নম্র, সে বিনয়ী, সে শিল্পী। প্রতিদিন শিল্পী হিসেবে কাঁচামালের রসদের জোগানে নিজেকে খুঁড়ে একটু-একটু করে সে তার শিল্প নির্মাণ করেছে নিজের মতো করে। পরিচিত করেছে নিজেকে, যোগ্যতা অর্জন করেছে রিয়েলিটি শোয়ের আমন্ত্রণের।

এর পরও প্রশ্ন উঠছে, সে কেন টাকার জন্য অংশগ্রহণ করেছে? বিজ্ঞাপনদাতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটা রিয়েলিটি শো, যার নামীদামি সঞ্চালক থেকে প্রতিটা অংশগ্রহণকারী প্রতিযোগী সকলেই টাকা উপার্জনের জন্য হাজির। আর সেই স্বাভাবিক। এই বাংলা বাজারে নিয়মিত কাজ করা প্রতিটি শিল্পী জানেন, একজন শিল্পী হিসেবে প্রত্যেক মাসে অর্থ উপার্জনের জন্য কতটা অবক্ষয় ধারণ করতে হয়। তাই আজ শিল্পী টাকার জন্য রিয়েলিটি শোতে সম্মান বিকোতে আসবে— এটাই স্বাভাবিক। অস্বাভাবিক হল, তার শিল্পকে নয়, তার অর্থের প্রয়োজনকেই তার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে বহিষ্কারের গিলোটিনে সাজা শোনানো।

যে রাজা বিগ ব্রাদারে এই খবরের নিদান দেন তাকে কেউ প্রশ্ন করে না— মহারাজা, তোর কাপড় কোথায়? টাকাকে কেন্দ্র করে রিয়্যালিটি শোয়ের সমস্ত আহ্নিক, বার্ষিক গতি ঘূর্ণায়মান। তা সত্ত্বেও এই সত্যি উচ্চারণ নিষিদ্ধ। কারণ, তুমি বিনোদন দাওনি। বিনোদন শিল্পীসত্তার নয়। শিল্পী হয়েও তুমি মানুষ হিসেবে কতটা কুৎসিত, তার প্রমাণপত্র এখনও দাখিল করেনি জনতার দরবারে।

এই দাবি কি নির্মাতার, এই দাবি কি প্রতিযোগীদের, এই দাবি কি সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞাপনদাতাদের? না, এইসমস্ত চাহিদা কলোসিয়ামের গ্যালারিতে বসে থাকা উত্তেজিত দর্শকের, আমাদের। সবটাই তো আমরা। বণিকরা তো খালি বোঝে চাহিদা আর জোগানের খেলা। যে-সমাজে বাস করি, তারই বিজ্ঞাপন এই রিয়েলিটি শো।

যেসব শিল্পীর এই ট্রাপিজ খেলায় যার কিছু যায়-আসে না, রক্ত আর ঘাম দিয়ে সে প্রতিনিয়ত নিজের খেরোর খাতায় লিখে চলেছে বিবর্তনের ইতিহাস, সে তো এখন বাড়তি। তার জন্য ফ্ল্যাশ-বালবের ঝলকানি নেই, নেই প্রিন্টের খরচ, রিয়েলিটি শো-এর রিয়েলটাইমে সে ব্রাত্য। তাই বাদ পড়ে যায় অনিন্দ্য আর অনিন্দ্যরা।

যে লোকটা বুক ঠুকে স্তাবক-পরিবৃত হয়ে ক্রমাগত বলছে, আমি শ্রেষ্ঠ, প্রতিনিয়ত ম্যানিপুলেট করছে জীবনের প্রতিটি স্তরকে, সাধারণের বিজমাল্য তো এ-সময়ে তারই কণ্ঠে। মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়াতেও তার কাজ নিয়ে স্তুতির গীতগোবিন্দ রচনা হয় রোজ, রোজ। সে কাজের মান যতই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর কবিতা লেখার মতো হোক না কেন, সাহিত্য অকাদেমি তো বাঁধা।

ব্যক্তিপূজার এই দেশে ভারত গোটা বিশ্বে গরুর মাংসের রপ্তানিতে তিন নম্বর হলেও, গরুর মাংস খেতে ভালবাসার অপরাধে শিল্পীর ছবিতে দেওয়া হয় জুতোর মালা। আবিষ্কার হয় নতুন দেশদ্রোহী। জনগণ চোখ বুজে, মুখে লজেঞ্চুষ নিয়ে অভ্যাস করে বিগ ব্রাদার সাজার। অপেক্ষা চলে নতুন বয়কটের ডাকের।

ক্ষমতা আসে, ক্ষমতা যায়, জনগণ আঙুল তোলে সামনের দিকে, ভুলে যায় প্রতিটা শিল্পী, প্রতিটা মন্ত্রী, প্রতিটা অপরাধী, আসলে তাদেরই অংশ। আমাদেরই কারও না-কারও বাড়ির মানুষ। জনগণের যেরকম মান, যেরকম রুচি, সেরকমই তো আমাদের মন্ত্রীরা, আমলারা, সেরকমই আমাদের সুপারস্টার নায়ক-নায়িকা, সেরকমই জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচালক, সে-রকমই সেরা খেলোয়াড়, সে-রকমই আধুনিক লেখক কিংবা কবি।

যেসব শিল্পীর এই ট্রাপিজ খেলায় যার কিছু যায়-আসে না, রক্ত আর ঘাম দিয়ে সে প্রতিনিয়ত নিজের খেরোর খাতায় লিখে চলেছে বিবর্তনের ইতিহাস, সে তো এখন বাড়তি। তার জন্য ফ্ল্যাশ-বালবের ঝলকানি নেই, নেই প্রিন্টের খরচ, রিয়েলিটি শো-এর রিয়েলটাইমে সে ব্রাত্য। তাই বাদ পড়ে যায় অনিন্দ্য আর অনিন্দ্যরা। এই পৃথিবীর জন্য জরুরি এদের মুছে ফেলা যাবতীয় খাতার পাতা থেকে।

জর্জ অরওয়েলের ‘১৯৮৪’ উপন্যাসে শেষে যে-পৃথিবীর চিত্র তিনি এঁকেছিলেন, যেখানে মানুষের মুখ পিষে দাঁড়িয়ে আছে একটা বুট, অনন্তকাল ধরে— ‘If you want a picture of the future, imagine a boot stamping on a human face forever.’

কিন্তু সেই সময়ও বোধহয় আমরা পেরিয়ে এসেছি। ২০২৬ সালে আমাদের বর্তমান পৃথিবীর নিরিখে, ১৯৩১ সালে জর্জ অরওয়েলের শিক্ষক অ্যালডাস হাক্সলির ‘Brave New World’ উপন্যাস ক্রমশ প্রাসঙ্গিক আর জীবন্ত হয়ে উঠছে। ‘Brave New World’-এ হাক্সলি যে ভয়াবহ পৃথিবীর চিত্র এঁকেছিলেন, তা সময়ের দর্পণে আরও সত্যি হয়ে ধরা পড়ছে। যে ভয়ংকর ভবিষ্যতে সবাই পরাধীন, অথচ সবাই খুশি। কারণ সেখানে মানুষকে স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার যন্ত্রণা দেওয়া হয়নি, বরং এমন এক আনন্দের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে, যেখানে স্বাধীনতার প্রয়োজনটুকুই মানুষ বিস্মৃত। স্বাধীনতা হারিয়ে কেউ এতটুকু দুঃখিত নয়, কারণ সে জানেই না, সে কী হারিয়েছে। কৃত্রিম আনন্দ, ভোগ আর সুখের মাধ্যমে মানুষ নিয়ন্ত্রিত। যারা নিয়ন্ত্রণের বিরোধী, যাদের কাছে স্বাধীনতার মূল্য বেশি, তারা সভ্য শহরের পরিখার পাঁচিলের বাইরে। জঙ্গলে, সভ্যতার যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত, পরিচয়হীন, দেশহীন, বেওয়ারিশ মানুষ।

ঠিক বর্তমানে এই রাজ্যের শিল্পীদের মতো। সমাজের রিয়্যালিটি শোয়ের পরীক্ষার বাইরে, আদিম জন্তুর মতো, নিভৃতে, সভ্যতার আলোর পরিধির বাইরে শিল্পসাধনা করে যাচ্ছে নিজের খেয়ালে। দায়হীনভাবে। একবুক স্বাধীনতা নিয়ে।

লেখার শুরুতে প্রশ্নটা ছিল, মানুষ রেগে কেন? এতটা ঘৃণা কেন? কারণ সে যা চায়, তা পায় না।

আর এ লেখার শেষে প্রশ্নটা বোধহয় অন্য।

মানুষ কি আদৌ স্বাধীনতা চায়?

না কি স্বাধীনতার বদলে তাকে যদি যথেষ্ট বিনোদন, যথেষ্ট ভোগ, যথেষ্ট স্বীকৃতি আর যথেষ্ট কৃত্রিম সুখ দেওয়া যায়, তবে সে নিজেই ভুলে যাবে, সে কী হারিয়েছে?

‘Brave New World’-এর শেষ দৃশ্যে মুক্ত মানুষজন স্যাভেজের ঝুলন্ত পা-দুটো ধীরে ধীরে ডানে ঘুরে, থেমে, আবার বাঁদিকে ফিরে যায়। যেন পৃথিবীর শেষ স্বাধীন মানুষটিও স্বাধীনতার শেষ সিদ্ধান্তটুকু নিয়ে ফেলেছে।

“He was not there. They stepped inside, and looking through an archway that led up to the higher floors, they saw a pair of feet dangling just under the crown of the arch. ‘Mr. Savage!’ Slowly, very slowly, like two unhurried compass needles, the feet turned towards the right… then paused, and, after a few seconds, turned as unhurriedly back towards the left…”

—Brave New World
Aldous Huxley