সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’— যে-ছবির প্রধান ভূমিকায় ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের সর্বশ্রেষ্ঠ তারকা উত্তমকুমার, সেই ছবি ১৯৬৬ বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে ‘গোল্ডেন বিয়ার’ পায়নি। উত্তমকুমার পাননি সেরা অভিনেতার পুরস্কার। এর নেপথ্যে কি ছিল জুরিদের কোন্দল, না কি তৎকালীন ইউরোপীয় চলচ্চিত্র-রুচির সীমাবদ্ধতা?
বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের পুরস্কারের তালিকা নিয়ে সেই বিতর্ক চলচ্চিত্র মহলে এখনও আলোচনায় উঠে আসেই। সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে লেখা মারি সিটনের ‘Portrait of a Director: Satyajit Ray’ কিংবা অ্যান্ড্রু রবিনসনের ‘Satyajit Ray: The Inner Eye’ পড়লে ও আন্তর্জালের কল্যাণে উৎসব-সংক্রান্ত আর্কাইভ ঘাঁটলে কিছু কথা জানা যায়।
এখানে একটা কথা মাথায় রাখার, উত্তমকুমার ছিলেন বাণিজ্যিক বাংলা সিনেমার প্রতিনিধি। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অন্যধারার সিনেমাকে ও নান্দনিক বিচারে উত্তীর্ণ সিনেমাকে প্রাধান্য দেওয়া হত। ফেলিনি, বার্গম্যান, কুরোসাওয়া, বুনুয়েল, সত্যজিৎ, গোদার, ত্রুফোরা এভাবেই উঠে এসেছেন। সিনে ক্লাবের উৎপত্তি হয়েছে এদের সিনেমার নিবিড় চর্চার তাগিদ থেকে। এক্ষেত্রে সত্যজিৎ রায় যেটা করেছিলেন, বাণিজ্যিক সিনেমার স্টার কনসেপ্টটাকেই ভেঙে দিলেন। এই ছবিটি আসলে উত্তমকুমারের তারকা-ইমেজকে ব্যবহার করে সেই ইমেজেরই ময়নাতদন্ত করা।
ছোটবেলা থেকে উত্তমকুমারকে দেখেই অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন দেখেছি!
লিখছেন চঞ্চল চৌধুরী…
‘নায়ক’ কেবল একজন চলচ্চিত্র তারকার গল্প নয়; এটি মূলত মানুষের অহং, একাকিত্ব এবং আত্মদর্শনের এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক দলিল। একটি ট্রেনযাত্রার চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় এক সুপারস্টারের ভেতরের কৃত্রিম জগৎ।
ছবির মূল চরিত্র অরিন্দম মুখোপাধ্যায় (উত্তমকুমার) খ্যাতির চূড়ায় থেকেও তীব্র একাকিত্বে ভুগছেন। ট্রেনের প্রথম শ্রেণির কামরাটি এখানে রূপক— যা তাকে সাধারণ সমাজ থেকে আলাদা করে রাখে, ঠিক যেমন তার তারকাখ্যাতি। সাংবাদিক অদিতি সেনগুপ্তর (শর্মিলা ঠাকুর) তীক্ষ্ণ প্রশ্নাবলি অরিন্দমের অহংকারের বর্মকে ভেঙে দেয়। অদিতি কোনও চটকদার খবরের খোঁজে ছিলেন না, বরং তিনি একজন আধুনিক, স্বাধীনচেতা নারীর প্রতীক, যিনি তারকার ভেতরের ‘মানুষ’-টিকে দেখতে চান।

সমালোচক ও জুরিদের ভাষায় এটি ছিল এমন একটি ধ্রুপদী ঘরানার ছবি, যা বিনোদনসর্বস্ব বাণিজ্যিক সিনেমার ইতিহাসের সারাংশকে মেলে ধরে। সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ বলেওছিলেন, উত্তমকে না পেলে তিনি এই ছবি করতেন না। অন্যদিকে স্ক্রিপ্ট পড়ে উত্তম অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে ওঠেন। অ্যান্ড্রু রবিনসনের লেখায় আছে— এর জন্য উত্তম নিজে পেশাগতভাবে অনেকটাই আত্মত্যাগ করেন, তাঁর সাম্মানিকের মাত্র ১০% নিয়েছিলেন তিনি এই ছবির জন্য।
রবিনসনের ভাষায়, বাণিজ্যিক বিলাসিতা ও সুযোগসুবিধা ঝেড়ে ফেলার এই স্বতঃস্ফূর্ত মানসিকতাই প্রমাণ করে যে, উত্তমকুমার একজন গভীর ও সিরিয়াস ঘরানার শিল্পীর মনস্তত্ত্বকে আধার করতেন— যিনি সত্যজিৎ রায়ের বাস্তববাদী এবং অতি-আবেগহীন (মেলোড্রামামুক্ত) একটি ধ্রুপদী চলচ্চিত্রের ভাষার কাছে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করতে প্রস্তুত ছিলেন।
রবিনসন খুব পরিষ্কারভাবে বলেছেন যে, এই ছবিতে ‘অরিন্দম মুখার্জী’ চরিত্রটিকে উত্তমকুমার একেবারে ‘বাস্তব ও জীবন্ত’ করে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে অভিনয় করা অন্য তারকাদের তুলনায় তিনি উত্তমের বেশি প্রশংসা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, উত্তমকুমার একদিকে যেমন একজন বাণিজ্যিক সুপারস্টারের রাজকীয় রূপ ধরে রেখেছিলেন, ঠিক তেমনই একজন সাধারণ মানুষের ভেতরের একাকিত্ব ও দুর্বলতাকেও নিখুঁতভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন।

চলচ্চিত্রবোদ্ধা চিদানন্দ দাশগুপ্ত, যিনি বাণিজ্যিক সিনেমার তুমুল সমালোচক ছিলেন ও ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন— তিনি লিখছেন, ‘স্টারডমের অহংকার ও ভেতরের একাকিত্বর যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য ছবিতে ছিল, তা উত্তম ছাড়া অন্য কেউ অমন নিখুঁতভাবে করতে পারতেন না।’
এই ছবিতে স্টার অরিন্দম আর দর্শকের মনের স্টার উত্তমের যোগাযোগই ছিল প্রাণভোমরা। অরিন্দম যখন মানুষের সামনে হাসেন, দর্শক সেই হাসির সঙ্গে উত্তমকুমারের star persona-কে মিলিয়ে দেখে। অরিন্দমের প্রতিটি চাহনি, চশমা ঘোরানো, অটোগ্রাফ দেওয়া, জানলার কাচের বাইরে ভক্তদের উপচে পড়া ভিড় দেখে উদাসীন থাকা— এসবের সঙ্গে দর্শক উত্তমকে মেলাতে থাকে। আবার যখন রাতের ট্রেনে তিনি নিজের অপরাধ, ভয়, ব্যর্থতা, অপরাধবোধ এবং আত্মহত্যার চিন্তার কথা বলেন, তখন সেই একই স্টার ইমেজের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে এক ভঙ্গুর মানুষ।
এই নির্বাচন সত্যজিৎ-এর মাস্টারস্ট্রোক। কিন্তু পশ্চিমের দর্শক ও বোদ্ধাদের কাছে এই যোগসূত্রটা ধরা মুশকিল ছিল, কারণ উত্তমকুমার নামক ক্যারিশমাটির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল না বিন্দুমাত্র।
২
বার্লিনের অফিসিয়াল রেকর্ডে দেখা যায়— Golden Bear বিজয়ী Roman Polanski-র Cul-de-sac, সেরা পরিচালক Carlos Saura-র Hunt, Best Actress Lola Albright এবং সেরা অভিনেতা হিসেবে জাঁ-পিয়ের ল্যুদ, গোদারের নিউ ওয়েভ ঘরানার ছবি ‘Masculin Féminin’-এর জন্য এই পুরস্কার ছিনিয়ে যান।


একথা বলা হয় যে, ইউরোপে নতুন সিনেমার হাওয়া, যা সেইবার উড়িয়ে দিল ধ্রুপদী ঘরানার ছবি ‘নায়ক’ ও তার নায়ক উত্তমকুমারকে। এর নেপথ্যে নাকি ছিল এক বিশাল লবির চাপ।
১৯৬৬ সালের ১৬তম বার্লিন উৎসবের জুরি প্রধান বা প্রেসিডেন্ট ছিলেন বিখ্যাত ফরাসি প্রযোজক পিয়ের ব্রনবার্গার। বোর্ডে ছিলেন, ইতালির বিশ্বখ্যাত বামপন্থী পরিচালক পিয়ের পাওলো পাসোলিনি এবং ভারতের বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার ও লেখক খাজা আহমেদ আব্বাস-সহ আরও পাঁচজন। এদের ভেতর একটি তীব্র আদর্শগত ও ভৌগোলিক মেরুকরণ ছিল। জুরিদের একাংশ (বিশেষ করে ফরাসি প্রধান পিয়ের ব্রনবার্গার) ফরাসি ‘নিউ ওয়েভ’ এবং ইউরোপীয় আধুনিক অ্যাবসার্ড ঘরানার চলচ্চিত্রের দিকে অন্ধভাবে ঝুঁকে ছিলেন। অন্যদিকে পাসোলিনি এবং কে এ আব্বাস ছিলেন সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ ছবির ধ্রুপদী মানবিক আবেদনের অনুরক্ত।
পুরস্কার নির্ধারণের চূড়ান্ত ভোটাভুটির রাতে জুরিদের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। ইতালীয় পরিচালক পাসোলিনি ‘নায়ক’ ছবিটির চিত্রনাট্য এবং উত্তমকুমারের মনস্তাত্ত্বিক অভিনয়ে এতটাই মুগ্ধ ছিলেন যে, তিনি শুরু থেকেই একে ‘গোল্ডেন বিয়ার’ দেওয়ার জন্য অনড় থাকেন। ভারতীয় জুরি কে এ আব্বাসও তাঁকে সমর্থন করেন।
ফরাসি লবি সম্পূর্ণ কোমর বেঁধে নেমেছিল রোমান পোলানস্কির ‘কাল-ডি-স্যাক’ (Cul-de-sac) ছবিটিকে জেতানোর জন্য। তাদের যুক্তি ছিল, সত্যজিৎ রায়ের সিনেমার ভাষা বড্ড বেশি ধ্রুপদী বা প্রথাগত, যেখানে পোলানস্কি বা গোদার সিনেমার চেনা ব্যাকরণ ভেঙে নতুন ‘সিনেম্যাটিক সিনট্যাক্স’ তৈরি করছেন। জুরি-প্রধান তাঁর বিশেষ ক্ষমতা (Casting Vote) ব্যবহার করে পাসোলিনিদের দাবিকে কোণঠাসা করে দেন। চলচ্চিত্র সমালোচকদের মতে, এটি কোনও সুস্থ শৈল্পিক বিচার ছিল না, বরং তা ছিল ফরাসি লবির একতরফা আধিপত্য— আরও জানা যায়, প্রাথমিক জুরি ভোটে সত্যজিৎ ৫-৪ এগিয়ে ছিলেন। পরে ভোট পালটে যায়। সত্যজিৎ ৫-৪-এ হারেন।
এছাড়া আরেকটি কারণ সেই সময় উঠেছিল বলে নানা সূত্রে জানা যায়। টানা দুই বছর ১৯৬৪ ও ১৯৬৫-র উৎসবে পুরস্কৃত হয় যথাক্রমে ‘মহানগর’ ও ‘চারুলতা’। বার্লিনের মঞ্চে সত্যজিৎ রায়ের এই একচ্ছত্র আধিপত্য উৎসবের জুরি এবং ইউরোপীয় সমালোচকদের একাংশের মধ্যে একধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল।


জুরিদের মধ্যে একটি অলিখিত মানসিকতা তৈরি হয়েছিল যে, পরপর তিন বছর একই পরিচালককে শীর্ষ পুরস্কার দিলে উৎসবের আন্তর্জাতিক বৈচিত্র নষ্ট হবে। তাই ১৯৬৬ সালে ‘নায়ক’ যখন উৎসবে যায়, তখন জুরিরা সত্যজিৎ রায়ের চেনা ধ্রুপদী ঘরানার বাইরে কোনো নতুন এবং প্রথাবিরোধী সিনেমাটিক ভাষাকে পুরস্কৃত করার জন্য মানসিকভাবে তৈরি হচ্ছিলেন।
শ্যাম ও কুল রাখতে ‘নায়ক’-কে দেওয়া হয় Special Recognition এবং UNICRIT Award— অর্থাৎ, jury এবং international critics— দুই ক্ষেত্রেই ছবিটির জন্য স্বীকৃতি ছিল।
গোদারের Masculin Féminin-এর মতো ছবিও সেই উৎসবে পুরস্কার পেল না। পেলেন সেই ছবির অভিনেতা।
সম্ভবত আসল গল্পটি লুকিয়ে আছে ছয়ের দশকের ইউরোপীয় চলচ্চিত্র-রুচি এবং অচেনা ভারতীয় তারকা-সংস্কৃতির মধ্যবর্তী এক সাংস্কৃতিক দূরত্বে। যেটা উত্তমকুমারের সূক্ষ্ম অভিনয়ের মধ্যে পাসোলিনি ধরতে পেরেছিলেন, অন্যরা পারেনি। আর গোদারের অভিনেতা জাঁ-পিয়ের ল্যুদ তখন অন্যধারার সিনেমায় ঝড় তুলেছেন। তাঁর অভিনয় ছিল প্রথাবিরোধী, কেবল কোনও একটি চরিত্রের রূপায়ণ ছিল না, সে ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক টালমাটাল সময়ে যুবসমাজের প্রতিনিধি। আর তাঁর এই আপাত ‘স্মার্ট’ ও উদ্ধত আচরণের নিচে লুকিয়ে থাকা তীব্র আবেগ, কোমলতা এবং মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা দর্শক টের পায়। যোগাযোগের দিক থেকে অভিনয়টা এগিয়ে ছিল।
ফলে, সেই চলচ্চিত্র উৎসবে ‘নায়ক’-এর উত্তমকুমার উপেক্ষিত থেকে গেলেন।
বিগত বছরে কলকাতা শহরে উত্তমকুমারকে নিয়ে একটি উল্লেখযোগ্য প্রদর্শনী হয়েছিল নেহরু চিলড্রেন্স মিউজিয়ামে। সেই প্রদর্শনীর একটি চিঠির উল্লেখ করে এই অপ্রাপ্তির লেখাটুকু শেষ করা যাক। গৌরীদেবীকে বার্লিন থেকে লেখা একটি চিঠিতে উত্তমকুমার বলছেন, ‘আর ভালো লাগছে না। সারাদিন খালি ছবি দেখা, পার্টীতে যাওয়া, মদ খাওয়া। আর ভালো লাগছে না! সত্যিই!’
পুরস্কারের চেয়েও বেশি জরুরি ছিল উত্তমকুমারের কাছে, দেশে ফিরে আসা, ফিরে আসা এই বাংলায়, যেখানে তিনি সব পুরস্কারের নিক্তির ঊর্ধ্বে।



