কিছু মানুষ ইতিহাস তৈরি করেন। আর কিছু মানুষ ইতিহাসের সংজ্ঞাটাই বদলে দেন। গ্লোরিয়া স্টেইনেম ছিলেন দ্বিতীয় ধরনের মানুষ। তিনি শুধু নারীর অধিকারের জন্য লড়েননি; তার চেয়েও জরুরি একটি কাজ করেছিলেন— অসংখ্য নারীকে নিজের জীবনটাকে নতুন চোখে দেখতে শিখিয়েছিলেন।
কারণ, মেয়েদের জীবনে অন্যায় অনেক সময় এত পুরনো হয়ে যায় যে, সেটাকে আর অন্যায় বলে মনে হয় না। সংসার করা কর্তব্য, নিজের ইচ্ছা বিসর্জন দেওয়া ভালবাসা, চুপ করে থাকা ভদ্রতা, সন্তান মানুষ করা স্বাভাবিক দায়িত্ব— আর নিজের জন্য কিছু চাইলে সেটাই যেন স্বার্থপরতা। স্টেইনেম এসে এই স্বাভাবিক বলে চালিয়ে দেওয়া জায়গাগুলিতেই প্রশ্নচিহ্ন বসিয়েছিলেন।
তাঁর সবচেয়ে বড় কাজ সম্ভবত এই— তিনি মহিলাদের বলেছিলেন, তোমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শুধু তোমার ব্যক্তিগত সমস্যা নয়। তোমার শরীর, তোমার কাজ, তোমার বেতন, তোমার বিয়ে, তোমার সন্তান, তোমার যৌনতা— সব কিছুর মধ্যেই সমাজ ও রাজনীতির কাঠামো লুকিয়ে আছে। এই ভাবনাই পরে দ্বিতীয় তরঙ্গের নারীবাদী আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন: নৃতত্ত্বকে অন্য চোখে দেখতে চেয়েছিলেন ইরাবতী কার্বে! লিখছেন সম্প্রীতি চক্রবর্তী…
কিন্তু গ্লোরিয়া স্টেইনেমকে বুঝতে গেলে আমেরিকায় থেমে গেলে চলবে না। তাঁকে বুঝতে গেলে একটু ভারতেও আসতে হয়।
১৯৫৭ সাল। তখনও গ্লোরিয়া স্টেইনেম বিশ্বখ্যাত নারীবাদী নন। বয়স মাত্র বাইশ। দিল্লির মিরান্ডা হাউসে পড়াশোনা করছেন। আমেরিকা থেকে আসা এই তরুণী ভারতে এসেছিলেন ‘চেস্টার বোলস ফেলোশিপ’ নিয়ে। তাঁর নিজের জীবনও তখন যেন কোনও নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছয়নি। কিন্তু ভারত তাঁকে যে শিক্ষা দেবে, তার জন্য কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম তৈরি ছিল না।
সেই বছরই তৎকালীন মাদ্রাজ স্টেটের রামনাদ জেলায় জাতপাতকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ হিংসা ছড়িয়ে পড়ল। উত্তেজনা বাড়ছে, গুজব ছড়াচ্ছে, এক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অন্য সম্প্রদায়ের প্রতিশোধের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। সেই সময় গ্লোরিয়া তাঁর পড়াশোনা ছেড়ে যোগ দিলেন গান্ধীবাদী শান্তিকর্মীদের একটি দলে। পরে তিনি এই সময়টিকেই তাঁর ভারত-অভিজ্ঞতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বলে মনে করেছিলেন।

গান্ধীবাদী কর্মীদের সঙ্গে তিনি হেঁটে বেড়িয়েছেন এক গ্রাম থেকে আর এক গ্রামে। কাজটা শুনতে যতটা সহজ, বাস্তবে ততটাই কঠিন— গুজব থামানো, মানুষকে প্রতিশোধ নেওয়া থেকে বিরত রাখা, পরস্পরের সঙ্গে কথা বলতে রাজি করানো। কোনও-কোনও জায়গায় হয়তো একটা ভুল কথা, একটা পুরনো অপমান কিংবা একটা গুজবই যথেষ্ট ছিল আরও রক্তপাতের জন্য। আর সেই পরিস্থিতিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজ মানে বক্তৃতা দেওয়া নয়; মানুষের দরজায় দরজায় গিয়ে তাদের কথা শোনা।
স্টেইনেমের জন্য এই অভিজ্ঞতার আরও একটি বিশেষ দিক ছিল। অনেক গ্রামেই পুরুষ স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে মহিলারা সহজে কথা বলতে চাইতেন না। তাই তিনি নিজেই এগিয়ে এলেন। একজন মহিলা হিসেবে স্থানীয় নারীদের সঙ্গে কথা বললেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা শুনলেন। পুরুষদের চোখ এড়িয়ে যে জীবনের গল্পগুলি ঘরের ভেতরে জমে থাকে, সেগুলিও তাঁর সামনে খুলে যেতে শুরু করল।
সম্ভবত এখানেই স্টেইনেম প্রথম গভীরভাবে বুঝেছিলেন— একটি সমাজকে বুঝতে হলে শুধু সমাজের মাথাদের বা নেতাদের কথা শুনলে হয় না; তার নারীদের কথাও শুনতে হয়। আর কোনও একটি গ্রামের কোনও একটি মহিলার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যে বৃহত্তর সামাজিক সমস্যারই অংশ হতে পারে, সেই উপলব্ধিও তাঁর মধ্যে ধীরে-ধীরে তৈরি হচ্ছিল।
গান্ধীবাদী শান্তিকর্মীদের কাজের ধরন তাঁকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল। গোল হয়ে বসে প্রত্যেকে নিজের কথা বলছেন, অন্যরা শুনছেন; কারও কথা বলার অধিকার অন্যের চেয়ে বেশি নয়। সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া নয়, বরং আলোচনা এবং ঐক্যমত্যের মধ্য দিয়ে সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়া। বহু বছর পরে আমেরিকায় নারীবাদী সংগঠক হিসেবে কাজ করার সময় এই অভিজ্ঞতার ছাপ তিনি বহন করেছিলেন। নারীদের একসঙ্গে বসিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া, একে-অপরের কথা শোনা এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্যে সামাজিক সমস্যার সূত্র খুঁজে নেওয়া— এসবই তাঁর পরবর্তী feminist organising-এর গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হয়ে ওঠে।
আজ পিছন ফিরে তাকালে তাই রামনাদের সেই ধুলোমাখা গ্রামগুলিকে গ্লোরিয়া স্টেইনেমের জীবনের একটি অদ্ভুত বাঁক বলে মনে হয়। তখন তিনি জানতেন না যে, ভবিষ্যতে তিনি আমেরিকার নারীবাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে উঠবেন। জানতেন না ‘Ms.’ ম্যাগাজ়িন তৈরি হবে, জানতেন না তাঁর লেখা লক্ষ-লক্ষ নারীকে নিজেদের জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখাবে।
কিন্তু সেই সময় তিনি একটি জিনিস শিখছিলেন— পরিবর্তন সবসময় মঞ্চ থেকে শুরু হয় না। কখনও-কখনও তা শুরু হয় মাটির রাস্তায় হেঁটে, অপরিচিত একজন মানুষের পাশে বসে, এবং তাকে প্রথমবারের মতো সত্যি করে জিজ্ঞাসা করে— ‘আপনার কথা বলুন।’

পশ্চিমের তরুণী গ্লোরিয়া ভারতে এসে দেখলেন, মেয়েদের জীবনকে বোঝার জন্য শুধু বড় বড় তত্ত্বের দরকার হয় না। দরকার মেয়েদের সঙ্গে ওঠাবসা করা। তাদের কথা শোনা। ট্রেনের মহিলা কামরায় অপরিচিত মেয়েদের সংসার, সন্তান, বিয়ে, শরীর, ভয় আর আকাঙ্ক্ষার কথা শুনতে শুনতে তিনি বুঝেছিলেন— একজনের গল্প আসলে অনেকের গল্প। যে সমস্যাকে একজন মহিলা নিজের ব্যর্থতা ভাবছেন, একই সমস্যায় আরও একশো মহিলা আটকে আছেন। সম্ভবত ভারতের কাছ থেকে গ্লোরিয়া স্টেইনেমের সবচেয়ে বড় পাওয়া এটাই— কথা বলার আগে শুনতে শেখা। আর সেই শিক্ষা পরবর্তীকালে তাঁর নারীবাদী আন্দোলনের ভাষাকেও বদলে দিয়েছিল। এই জায়গাটিই পরে তাঁর নারীবাদী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
গ্লোরিয়া ভারতীয় দেবীদের দেখে উপলব্ধি করেছিলেন যে, হিন্দু দেবদেবীর জগতে নারী কখনও শুধু কোমল নন। তিনি শক্তি। তিনি সৃষ্টির উৎস, আবার ধ্বংসের শক্তিও। তিনি মা, কিন্তু প্রয়োজন হলে যুদ্ধও করেন। এই দ্বৈততা স্টেইনেমের চোখে নিশ্চয়ই একেবারে অপরিচিত ছিল না। তবে তাঁর ভারত-অভিজ্ঞতার সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ছাপ পড়েছিল কালী-র ছবিতে।
১৯৭২ সালে তাঁর সম্পাদিত ‘Ms.’ ম্যাগাজ়িনের প্রথম প্রিভিউ সংখ্যার প্রচ্ছদ নিয়ে তখন একটি সমস্যা হয়েছিল— কোন ধরনের নারীকে সেখানে দেখানো হবে? এমন একজনকে, যার মধ্যে সব নারীর অভিজ্ঞতা ধরা যায়? প্রথমে বিভিন্ন বর্ণের মুখ মিলিয়ে একটি মুখ করার কথা হয়েছিল। কিন্তু সেটা খুব মেকি আর বানানো মনে হয়েছিল। তখন স্টেইনেম তাঁর ভারত-অভিজ্ঞতা থেকে বহু-হাতওয়ালা দেবী কালী-র কথা ভাবেন।
তারপর শিল্পী মিরিয়াম ওস্ক তৈরি করলেন সেই বিখ্যাত ছবি— গর্ভবতী নীলচে এক নারী, আট হাতে সংসারের যাবতীয় বোঝা। এক হাতে কড়াই, এক হাতে টাইপরাইটার, এক হাতে আয়না, কোথাও টেলিফোন, কোথাও গাড়ির স্টিয়ারিং, কোথাও ইস্ত্রি। আর মুখে জল।

ছবিটির নাম— ‘দ্য হাউসওয়াইফ্স মোমেন্ট অব ট্রুথ (The Housewife’s Moment of Truth.)’
কী ভয়ংকর সুন্দর একটি ব্যঙ্গ!
যে সমাজ একজন নারীকে বলে, ‘তুমি তো সবই পারো’, সেই সমাজ আসলে তাকে আটটা হাত দিয়েছে কি না, তা কখনও জিজ্ঞাসা করে না। বরং ধরে নিয়েছে— রান্না করবে, সন্তান সামলাবে, চাকরি করবে, স্বামীকে সময় দেবে, সুন্দর থাকবে, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেবে, আবার নিজের স্বপ্নটাও হাসিমুখে সামলাবে।
কালী এখানে দেবী নন শুধু। তিনি হয়ে উঠলেন সেই সর্বকর্মা আধুনিক মহিলা— যাঁর আটটি হাত আছে বলে ধরে নিয়ে সমাজ তাঁর কাছ থেকে আটজন মানুষের কাজ আশা করে।
তবে আজ, এত বছর পরে, এই প্রচ্ছদকে দেখার সময় আমাদের আরও একটি প্রশ্ন করা উচিত। একটি ভারতীয় ধর্মীয় প্রতীককে আমেরিকান নারীবাদের ভাষায় ব্যবহার করার মধ্যে সাংস্কৃতিক দূরত্বও আছে। কালীকে কেবল ‘অনেক হাতওয়ালা নারী’ করে ফেললে তাঁর নিজস্ব ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক অর্থের অনেকটাই হারিয়ে যায়। স্টেইনেমের ভারত-অভিজ্ঞতা তাঁকে সমৃদ্ধ করেছিল ঠিকই, কিন্তু ভারতকে তিনি সম্পূর্ণ বুঝে ফেলেছিলেন— এমন দাবি করারও কারণ নেই। বরং এই দ্বন্দ্বটাই ইতিহাসকে আরও আকর্ষণীয় করে।
আজ, ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে, গ্লোরিয়া স্টেইনেমকে আমরা কীভাবে দেখব? শুধু একজন পুরনো সময়ের ‘ফেমিনিস্ট আইকন’ হিসেবে? একটা সাদা চুলের ছবি, কয়েকটা বিখ্যাত বক্তৃতা, Ms. ম্যাগাজ়িন-এর সম্পাদক, নারীবাদী বইয়ের লেখক, এবং নারীবাদী ইতিহাসের একটি অধ্যায় হিসেবে? তা হলে বোধহয় তাঁকে খুব ছোট করে দেখা হবে।

কারণ আজকের পৃথিবীতে মেয়েরা অনেক বেশি স্বাধীন। কিন্তু স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে কাজের তালিকাও বেড়েছে। মেয়েরা অফিস করে, সংসার করে, সন্তান মানুষ করে, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে সুন্দর রাখে, আবার নিজের মানসিক সুস্থতারও দায়িত্ব নেয়। আট হাতের সেই কালী যেন এখনও আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়ান। শুধু কড়াইয়ের জায়গায় এসেছে ল্যাপটপ, টাইপরাইটারের জায়গায় স্মার্টফোন, আর আয়নার জায়গায় ইনস্টাগ্রাম।
তাই স্টেইনেমের সবচেয়ে জরুরি উত্তরাধিকার কোনও স্লোগান নয়। একটি প্রশ্ন। কেন সব কিছু সামলানোর দায়িত্ব শুধু আমার? আর তার পরের প্রশ্নটি আরও বিপজ্জনক— আমি যে জীবনটা বাঁচছি, সেটা কি সত্যিই আমার নিজের পছন্দের জীবন? গ্লোরিয়া স্টেইনেমের গুরুত্ব এখানেই। তিনি মেয়েদের হয়ে কথা বলতে চাননি শুধু। তিনি মেয়েদের নিজেদের হয়ে কথা বলতে শিখিয়েছিলেন।
তাঁর প্রয়াণের পর তাই তাঁকে শুধু স্মরণ করার প্রয়োজন নেই। বরং তাঁর হাতে ধরিয়ে দেওয়া প্রশ্নগুলিকে আবার হাতে তুলে নেওয়ার প্রয়োজন আছে। কারণ নারীবাদ শেষ হয়ে যায়নি। শুধু তার সমস্যাগুলোর পোশাক বদলেছে।
আর কালী? গ্লোরিয়ার চোখে– তিনি এখনও আট হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। শুধু এবার হয়তো আমাদের তাঁকে জিজ্ঞাসা করা উচিত— ‘দেবী, আপনারও কি একটু বিশ্রাম দরকার?’




