অধিকারের রাজনীতি

একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটছে পৃথিবীতে। মেয়েদের অধিকার নিয়ে আমরা যে শব্দগুলো এতদিন শুনে এসেছি— সমানাধিকার, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, ক্ষমতায়ন— সেগুলো এখন আর একা মাঠে নেই। তাদের বিপরীতে তৈরি হয়েছে আরও একটা সমৃদ্ধ শব্দভাণ্ডার। ‘পরিবারের মূল্যবোধ’, ‘ঐতিহ্য’, ‘নারী-পুরুষের স্বাভাবিক ভূমিকা’, ‘অতিরিক্ত স্বাধীনতা’, ‘নারীবাদী প্রচার’— শব্দগুলো আলাদা, দেশ আলাদা, রাজনীতি আলাদা; কিন্তু কোথাও-কোথাও যেন গল্পটা একই। মেয়েরা একটু বেশি এগিয়ে যাচ্ছে না তো—ভয়ংকর তরাসে কেউ-কেউ সেই প্রশ্নটাই আবার করতে শুরু করেছে। এবং সেটাই এই সময়ের সবচেয়ে অস্বস্তিকর খবর।

রাষ্ট্রপুঞ্জের মহিলা বিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেন-এর এক সাম্প্রতিক মূল্যায়নে এই প্রবণতাকে খুব স্পষ্ট ভাষায় চিহ্নিত করা হয়েছে। ইউএন উইমেন-এর নীতি, কর্মসূচি ও আন্তঃসরকারি বিভাগের পরিচালক সারা হেনড্রিক্স বলেছেন, বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ, সংঘাত, অর্থনৈতিক চাপ এবং নাগরিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি নারী-পুরুষের সমতার বিরুদ্ধে ক্রমশ আরও সংগঠিত প্রতিরোধ তৈরি হচ্ছে এবং নারীর অধিকারও পিছিয়ে যাচ্ছে বা পিছু হটছে। এই কথাটার গুরুত্ব শুধু ‘নারীরা বিপদে’ বলার মধ্যে নেই।

ভাবনার বিষয় হল, নারীকে বা নারীর অধিকারকে যথাসম্ভব চেপে দেওয়ার পক্ষে প্রতিরোধটি ক্রমশ সংগঠিত হচ্ছে। অর্থাৎ, এটা আর কেবল কোনও অশিক্ষিত শ্বশুরবাড়ির মন্তব্য নয়, কোনও পুরনো পাড়ার কাকুর ‘আমাদের সময়ে এসব ছিল না’ গোছের দীর্ঘশ্বাসও নয়। এটা কখনও রাজনীতির ভাষায় আসছে, কখনও আইনের ভাষায়, কখনও আদালতের বিতর্কে, কখনও সামাজিক মাধ্যমে, কখনও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ রক্ষার নামে। আর সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয়— এই প্রতিরোধ অনেক সময় নিজেকে নারীবিরোধী বলে পরিচয়ও দেয় না। বরং বলে, ‘আমরা নারীদের বিরোধী নই। আমরা শুধু অতিরিক্ত স্বাধীনতার বিরোধী।’ এই ‘শুধু’-টাই সমস্যার জায়গা।

আরও পড়ুন: নারীবাদ কি কেবলই কথার কথা?
পড়ুন ‘চোখ-কান খোলা’ পর্ব ৪০…

একটা সময় ছিল, যখন নারীর অধিকার কমানোর রাজনীতি বেশ সহজে চেনা যেত। মেয়েরা ভোট দেবে না, মেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে না, মেয়েরা সম্পত্তির অধিকার পাবে না, মেয়েরা নিজের পেশা বেছে নেবে না— এই নিষেধগুলো ছিল প্রকাশ্যে। আজকের পৃথিবীতে এসব প্রকাশ্যে বলা কঠিন। তাই ভাষাটা বদলেছে। এখন বলা হয়— নারীকে ‘রক্ষা’ করা দরকার, তার পরিবারকে ‘রক্ষা’ করা দরকার, শিশুদের ‘রক্ষা’ করা দরকার, সমাজকে ‘অতিরিক্ত পরিবর্তন’-এর হাত থেকে ‘রক্ষা’ করা দরকার।

কিন্তু প্রশ্নটা হল— কাকে রক্ষা করতে গিয়ে কার স্বাধীনতা কমানো হচ্ছে? এই জায়গাতেই এই সংগঠিত পাল্টা প্রতিরোধকে বুঝতে হবে। কারণ নারীর অধিকার পিছিয়ে দেওয়ার নতুন কৌশল সবসময় আইন করে বলে না, ‘মেয়েদের অধিকার কমাও।’ কখনও সে বলে— ‘আগের মূল্যবোধে ফিরে যাই।’ কখনও বলে— ‘নারী-পুরুষের ভূমিকা নিয়ে এত কথা বলার দরকার কী?’ কখনও বলে— ‘নারীবাদ পরিবারকে ধ্বংস করছে।’ কখনও বলে— ‘পুরুষদেরও তো অধিকার আছে।’ পুরুষদের অধিকার অবশ্যই আছে। কিন্তু একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তখন আড়ালে চলে যায়— পুরুষের অধিকারের কথা বলার সময় নারীর অর্জিত অধিকারগুলোকে কি আবার দর-কষাকষির টেবিলে বসানো হচ্ছে?

এই পাল্টা প্রতিরোধ হঠাৎ তৈরি হয়নি। গত কয়েক দশকে নারীর অধিকার নিয়ে যে অগ্রগতি হয়েছে, তা খুব সহজে আসেনি। পরিবার আইন বদলেছে, বিবাহ ও বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারীর অধিকার বেড়েছে, সম্পত্তির অধিকার শক্তিশালী হয়েছে, কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে আইন হয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আলোচনা এগিয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের তথ্য বলছে, ১৯৭০ সালের পর থেকে পারিবারিক আইন সংস্কারের ফলে ৬০ কোটিরও বেশি নারী অর্থনৈতিক সুযোগ পেয়েছেন। অর্থাৎ, আইন বদলালে মেয়েদের জীবন সত্যিই বদলায়। এখানেই এই পাল্টা প্রতিরোধের যুক্তিটাও পরিষ্কার হয়। যে সংস্কারগুলো বাস্তব ক্ষমতার সম্পর্ক বদলায়, সেগুলোই সবচেয়ে বেশি প্রতিরোধের মুখে পড়ে। কারণ একটা মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো শুধু তার শিক্ষার প্রশ্ন নয়। এই শিক্ষা তাকে দেয় নিজের অধিকার সম্পর্কে চিন্তা করার ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার— তার বিয়ে কখন হবে, সে চাকরি করবে কি না, নিজের টাকা থাকবে কি না, নিজের সন্তান সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে কি না—সবকিছুকেই সে প্রশ্ন করে এবং নিজের মতো চলতে চায়। একজন মেয়ের নিজের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকলে পরিবারের ক্ষমতার সমীকরণ একটু বদলায়। একজন নারী নিজের নামে সম্পত্তির অধিকার পেলে সংসারের ক্ষমতার সমীকরণ বদলায়। একজন মহিলা যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারলে কর্মক্ষেত্রের ক্ষমতার সমীকরণ বদলায়। সমতা তাই শুধু নীতির প্রশ্ন নয়। সমতা ক্ষমতার প্রশ্ন। আর ক্ষমতা যখন বদলায়, প্রতিরোধ তো আসবেই।

রাষ্ট্রপুঞ্জের সংখ্যাগুলোও আসলে সেই প্রতিরোধের মানচিত্র। ২০২৫ সালে বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ দেশ জানিয়েছিল, নারী-পুরুষের সমতার বিরুদ্ধে এই পাল্টা প্রতিরোধ তাদের জাতীয় স্তরে সমতা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ইউএন উইমেন জানিয়েছে, নারীর সমান অধিকারের জায়গা করে দেওয়ার বদলে কোথাও কোথাও নারীবিদ্বেষও ক্রমশ সাধারণ সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাষার অংশ হয়ে উঠছে। এই তথ্যটির দিকে একটু অন্যভাবে তাকানো দরকার। এক-চতুর্থাংশ দেশ মানে এক-চতুর্থাংশ ‘খারাপ দেশ’ নয়। বরং এটা দেখায় যে, নারী-পুরুষের সমতা এখন একটা রাজনৈতিক লড়াইয়ের জায়গা। কেউ চাইছে আরও এগতে। কেউ চাইছে থামাতে। কেউ চাইছে আগের জায়গায় ফিরিয়ে নিতে। এবং এই লড়াইটি কেবল আদালতে হচ্ছে না। সংসদে হচ্ছে, নির্বাচনী প্রচারে হচ্ছে, সামাজিক মাধ্যমে হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে হচ্ছে, পরিবারের খাবার টেবিলেও হচ্ছে। এ-কারণেই এটা এত গুরুত্বপূর্ণ।

‘পুরনো দিনের মূল্যবোধে ফিরে যাওয়া উচিত’— এই বাক্যটি শুনতে খুব নিরীহ। কিন্তু পুরনো দিনটা কার জন্য ভাল ছিল? যে-সময়ে স্ত্রী স্বামীর অনুমতি ছাড়া নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না? যে -সময়ে মেয়ের সম্পত্তি ভাইয়ের কাছে চলে যেত? যে সময়ে স্বামীর হিংসাকে ‘সংসারের ব্যাপার’ বলা হত? যে-সময়ে কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার কোনও ভাষাই ছিল না? যে-সময়ে বিবাহিত নারীর সম্মতির প্রশ্নটিই অনেক সমাজে গুরুত্ব পেত না? পুরনো মূল্যবোধের নস্টালজিয়া খুব বেছে-বেছে কাজ করে। পুরুষ মনে রাখে— বাড়িতে সবাই একসঙ্গে খেত। নারী মনে রাখে— তার নিজের ঘর ছিল না। পুরুষ মনে রাখে— সংসার খুব ঐক্যবদ্ধ ছিল। নারী মনে রাখে— সংসার ছাড়ার অধিকার ছিল না। পুরুষ মনে রাখে— স্ত্রীরা খুব যত্ন করত। নারী মনে রাখে— সেই যত্নকে শ্রম বলে কেউ স্বীকার করত না। তাই ‘আগের দিনে ফিরে যাই’ বলার আগে একটা প্রশ্ন দরকার— আগের দিনটা কার জন্য?

সামাজিক মাধ্যমকে বাদ দিলে এই গল্প অসম্পূর্ণ থাকবে। আগে একটা নারীবিদ্বেষী মন্তব্য করতে গেলে সামনে কাউকে দরকার হত। এখন একটা পোস্ট-ই যথেষ্ট। একজন মহিলা নিজের সাফল্যের কথা লিখলেন— হাজার মন্তব্য, ‘বাড়ির কাজ করেন?’ একজন নারী নিজের শরীর নিয়ে সিদ্ধান্তের কথা বললেন— ‘লোক দেখানো।’ একজন মহিলা যৌন হেনস্থার কথা বললেন— ‘প্রচার চাইছেন।’ একজন পুরুষ নারীবাদ নিয়ে কথা বললেন— ‘বউয়ের কথায় চলেন’ বা নতুন একটি শব্দ, ‘সিম্প’!

ভারতকেও এই বিশ্বজোড়া পাল্টা প্রতিরোধের বাইরে ভাবার কোনও কারণ নেই। আমাদের এখানে একই সঙ্গে দুই ধরনের গল্প চলছে। একদিকে মেয়েরা আইআইটি-তে যাচ্ছে, বড় সংস্থার পরিচালনাকক্ষে যাচ্ছে, বিমান ওড়াচ্ছে, সেনাবাহিনীতে যাচ্ছে, সংসদে যাচ্ছে, উদ্যোক্তা হচ্ছে। অন্যদিকে এখনও মেয়ের পোশাক নিয়ে সমাজের বিচার আছে, প্রেম নিয়ে পরিবারের রাগ আছে, বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে সামাজিক চাপ আছে, কর্মজীবী মায়ের ‘ভাল মা’ হওয়া নিয়ে সন্দেহ আছে। এই দ্বৈততাই আসলে নতুন পাল্টা প্রতিরোধের উর্বর জমি। কারণ মেয়েরা যত দৃশ্যমান হয়, তাদের নিয়ন্ত্রণ করার ভাষাও তত নতুন হয়। একসময় বলা হত— ‘মেয়েরা বাইরে যাবে না।’ এখন বলা হয়— ‘বাইরে যাক, কিন্তু নিরাপদে থাকুক।’ কথাটি ঠিক। কিন্তু নিরাপত্তার দায় কার? মেয়ের। সে কী পরল, কখন ফিরল, কার সঙ্গে গেল, কেন গেল— প্রশ্নগুলো আবার মেয়েটির দিকেই ফিরে আসে। অর্থাৎ, স্বাধীনতা দেওয়া হল, কিন্তু স্বাধীনতার ঝুঁকির দায়টিও মেয়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হল। এটা এই পাল্টা প্রতিরোধের একটা খুব পরিচিত কৌশল— অধিকারকে সরাসরি অস্বীকার না করে তার মূল্য এত বেশি করে দেওয়া যে মানুষ নিজেই সেই অধিকার ব্যবহার করতে ভয় পায়।

সামাজিক মাধ্যমকে বাদ দিলে এই গল্প অসম্পূর্ণ থাকবে। আগে একটা নারীবিদ্বেষী মন্তব্য করতে গেলে সামনে কাউকে দরকার হত। এখন একটা পোস্ট-ই যথেষ্ট। একজন মহিলা নিজের সাফল্যের কথা লিখলেন— হাজার মন্তব্য, ‘বাড়ির কাজ করেন?’ একজন নারী নিজের শরীর নিয়ে সিদ্ধান্তের কথা বললেন— ‘লোক দেখানো।’ একজন মহিলা যৌন হেনস্থার কথা বললেন— ‘প্রচার চাইছেন।’ একজন পুরুষ নারীবাদ নিয়ে কথা বললেন— ‘বউয়ের কথায় চলেন’ বা নতুন একটি শব্দ, ‘সিম্প’!

সামাজিক মাধ্যমের স্বয়ংক্রিয় বাছাই-ব্যবস্থা এই উত্তেজনাকে আরও ছড়িয়ে দিতে পারে, কারণ রাগ, ভয়, অপমান, সংঘর্ষ— এসবেই মানুষ বেশি সময় আটকে থাকে। ফলে নারীকে অপমান করা শুধু ব্যক্তিগত আচরণ থাকে না; তা হয়ে ওঠে দেখার মতো বিষয়বস্তু। আর বিষয়বস্তু যখন বারবার দেখা যায়, তখন অস্বাভাবিক কথাও একসময় স্বাভাবিক শোনাতে শুরু করে। আজকের কিশোর যদি প্রতিদিন দেখে যে, সফল মেয়েকে ‘অহংকারী’, স্বাধীন মেয়েকে ‘চরিত্রহীন’, নিজের মতো স্পষ্ট করে বলা মেয়েকে ‘পুরুষালি’ এবং সমান অধিকার চাওয়া মেয়েকে ‘ঘরভাঙা’ বলা হচ্ছে, তাহলে তার কাছে নারী-পুরুষের সমতা কেবল পাঠ্যবইয়ের ধারণা হয়ে দাঁড়ায়। বাস্তব সংস্কৃতি তাকে অন্য শিক্ষা দেয়।

সারা হেনড্রিক্সের বক্তব্যের আর একটা অংশ তাই গুরুত্বপূর্ণ— এই পাল্টা প্রতিরোধকে তিনি গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ, সংঘাত, অর্থনৈতিক চাপ এবং নাগরিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার সঙ্গে পাশাপাশি রেখেছেন। এটা কাকতালীয় নয়। যে-সমাজে প্রশ্ন করার জায়গা কমে যায়, সেখানে মেয়েদের প্রশ্ন করার অধিকারও দ্রুত অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। যে-সমাজে সাংবাদিকের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়, সেখানে নারী সাংবাদিকের কণ্ঠ আরও বেশি আক্রমণের মুখে পড়তে পারে। যে-সমাজে নাগরিক সংগঠনগুলোর কাজ কঠিন হয়, সেখানে নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোও দুর্বল হয়। যে সমাজে ‘ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ’ রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে ওঠে, সেখানে সেই মূল্যবোধের প্রথম পাহারাদার হিসেবে নারীকেই দাঁড় করানো হয়। তাই নারী-পুরুষের সমতা কোনও আলাদা সামাজিক ইস্যু নয়। এটা গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যপরীক্ষা।

যুদ্ধের সময় এই পিছিয়ে যাওয়া আরও নগ্ন। ২০২৪ সালে প্রায় ৬৭ কোটি ৬০ লক্ষ নারী ও মেয়ে এমন এলাকার ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাস করছিলেন যেখানে প্রাণঘাতী সংঘাত ঘটছিল— বিশ শতকের নয়ের দশকের পর সর্বোচ্চ। একই সময়ে সংঘাত-সম্পর্কিত যৌন হিংসার ঘটনাও ৮৭ শতাংশ বেড়েছে। যুদ্ধের সময় রাষ্ট্র দুর্বল হয়, আইন দুর্বল হয়, সামাজিক সুরক্ষা দুর্বল হয়। আর তখন সবচেয়ে দ্রুত দুর্বল হয় সেই মানুষটি, যার ক্ষমতা আগে থেকেই কম। অর্থাৎ, নারী। এই কারণেই নারী-পুরুষের সমতার বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিরোধকে শুধু নারীবাদ বনাম নারীবিরোধী শক্তির লড়াই হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটা আসলে ক্ষমতা বনাম সমতার লড়াই।

সবচেয়ে বড় বিপদ হবে যদি আমরা এটাকে শুধু অগ্রগতি থেমে যাওয়া ভাবি। অগ্রগতি থেমে যাওয়া আর পিছিয়ে যাওয়া এক নয়। থেমে গেলে আপনি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন। পিছিয়ে যাওয়া মানে আপনি আগের জায়গা থেকে সরে যাচ্ছেন। রাষ্ট্রপুঞ্জের রিপোর্টের ভয় এখানেই। বিশ্বের কোনও দেশ এখনও পূর্ণ আইনি সমতা অর্জন করেনি। নারীরা বিশ্বজুড়ে পুরুষদের আইনি অধিকারের মাত্র ৬৪ শতাংশ ভোগ করেন। তার উপর যদি নতুন করে সংগঠিত প্রতিরোধ তৈরি হয়, তাহলে যে ৩৬ শতাংশ অধিকার এখনও অর্জিত হয়নি, তার লড়াই তো থাকছেই—তার সঙ্গে অর্জিত অধিকারগুলোকেও রক্ষা করার লড়াই শুরু হচ্ছে। অর্থাৎ মেয়েদের এখন শুধু সামনে এগোতে হবে না। পিছন থেকে টানাটানিও সামলাতে হবে।এটাই নতুন বাস্তবতা।

এই জায়গায় এসে পুরুষদেরও প্রশ্নটি করা দরকার। কারণ নারী-পুরুষের সমতা মানে পুরুষের জায়গা ছোট করা নয়। বরং পুরুষের কাছ থেকেও কিছু পুরনো ভূমিকা সরিয়ে নেওয়া। ‘পুরুষ কাঁদে না’, ‘পুরুষই সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী’, ‘সন্তানের দায়িত্ব মায়ের’, ‘ঘরের কাজ মেয়েদের’— এই ধারণাগুলোও পুরুষকে বন্দি করে। সমতার পৃথিবীতে মেয়ের স্বাধীনতা বাড়ে, ছেলেরও চাপ কমে। কিন্তু সংগঠিত পাল্টা প্রতিরোধ এই জটিল সত্যিটিকে সরল করে ফেলে। বলে— নারীরা বেশি অধিকার পেলে পুরুষেরা কম পাবে। যেন অধিকার একটা কেক— একজন বেশি খেলে অন্যজনের টুকরো কমে যাবে। বাস্তবে তা নয়। ন্যায়বিচার কেক নয়। এটা এমন একটা দরজা, যেটি একবার সবার জন্য খুললে ঘরটি বড় হয়।

নারীর অধিকার নিয়ে সবচেয়ে বড় বিপদ এখন হয়তো প্রকাশ্য নারীবিদ্বেষ নয়। বরং এমন একটা পৃথিবী, যেখানে নারীবিদ্বেষ নতুন পোশাক পরে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। যেখানে ‘স্বাধীনতা’-কে বলা হয় ‘অতিরিক্ত স্বাধীনতা’। সমতাকে বলা হয় ‘পুরুষবিদ্বেষ’। নারীবাদকে বলা হয় ‘পরিবারবিরোধী’। অভিযোগকে বলা হয় ‘লোক দেখানো’। অধিকারকে বলা হয় ‘বিশেষ সুবিধা’। আর পিছিয়ে যাওয়াকে বলা হয়—’মূল্যবোধে ফিরে যাওয়া।’

তাই সারা হেনড্রিক্সের ‘ক্রমশ আরও সংগঠিত প্রতিরোধ’ কথাটি এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে শোনা দরকার। কারণ মেয়েদের অধিকার কোনও একদিন পাওয়া ট্রফি নয়, যেটি আলমারিতে তুলে রেখে দেওয়া যায়। অধিকার অর্জন করতে হয়। তারপর তাকে রক্ষা করতে হয়। তারপর তাকে আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হয়। আর যখন কোনও সমাজে সেই অধিকারের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ তৈরি হয়, তখন নীরব থাকা মানে নিরপেক্ষ থাকা নয়।

কারণ ইতিহাসের প্রতিটি পশ্চাদপসরণ প্রথমে খুব ছোট দেখায়। একটা আইন। একটা মন্তব্য। একটা রাজনৈতিক স্লোগান। একটা স্কুলের নিয়ম। একটা আদালতের ব্যাখ্যা। একটা সামাজিক মাধ্যমের প্রচার। তারপর একদিন দেখা যায়—যে অধিকারটি একসময় স্বাভাবিক বলে মনে হত, সেটিই আবার ‘বিতর্কিত’ হয়ে গেছে।

এই কারণেই আজ নারীর অধিকারের লড়াই শুধু আরও কিছু অধিকার পাওয়ার লড়াই নয়। এটা ইতিমধ্যে অর্জিত অধিকারকে পিছিয়ে যেতে না দেওয়ার লড়াই। আর সম্ভবত এটাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে কম আলোচিত, অথচ সবচেয়ে জরুরি নারী-অধিকারের লড়াই।

কারণ প্রশ্নটি আর শুধু— ‘মেয়েরা কবে সমান হবে?’-তে আটকে নেই।

প্রশ্নটি এখন আরও কঠিন—

‘যে সমতা তারা এতদিনে অর্জন করেছে, সেটুকুও কি আমরা তাদের রাখতে দেব?’