বৈশাখে বাঙালি হব

পয়লা বৈশাখ মানেই বাঙালির ‘বাঙালি সাজা’-র দিন। কলকা করা ডিজাইনার ধুতি-পাঞ্জাবি, বাঙালি দেখতে চটি, সঙ্গে গোল চশমা (কেউ কেউ, সবাই না), পারফিউমের বদলে আতর, পকেটে চেন দেওয়া গোল ঘড়ি পরে পুরুষ যাবেন, আর সঙ্গে যাবেন পটচিত্রের মতো লাল পাড়-সাদা শাড়ি (অবশ্যই ডিজাইনার), গুচ্ছ সোনার গয়না, নাকে ইয়াব্বড় একটা নথ, খোঁপা বা খোলা চুলে কেয়ারি করা বাগান-পরিহিতা মহিলা। তাঁরা যাবেন কোনও হারিয়ে যাওয়া বাঙালি রান্নার খোঁজে কোনও বাঙালি রেস্তরাঁয়, যেখানে কাঁসার থালায় খাবার পরিবেশন করা হবে। আজ তাঁরা পোশাকে বাঙালি, খ্যাঁটনে বাঙালি, এমনকী, কথা অবধি বাংলাতেই বলবেন, বেশি ইংরেজি শব্দ মোটেও ব্যবহার করবেন না (বন্ধুদের মধ্যে সম্পূর্ণ বাংলায় কথা বলতে হবে সারাদিন, ইংরেজি শব্দ ব্যহার করলেই জরিমানা— এমন একটা খেলাও ফেঁদেছেন)! রাতে ডাবের জলের সঙ্গে ভদকা মিশিয়ে খাবেন, আর বাঙালির এবং বেশি করে অবাঙালির নিন্দে করবেন আড্ডায়। এমন না হলে আর কীসের পয়লা বৈশাখ, কীসের বাঙালি সাজা, কীসের বাঙালি-বাঙালি উদযাপন।

কিন্তু মননে? মননে কি সত্যিকারের বাঙালি হয়ে উঠতে পারবেন বাবু-বিবিরা? বাঙালি মননের অভিজ্ঞান কিন্তু রাজনীতির ময়দানের অশান্তি আর কথা-চালাচালি নয়, আর সেই নিয়ে রোজ-রোজ টিভির পর্দায় অসভ্যের মতো গলা ফাটানো নয়। সর্বক্ষণ বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাটের ইএমআই-এর হিসেব কষাও নয়। বাঙালি মনন মানে ভদ্রতার উদযাপন করা। পড়াশোনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল, সংস্কৃতির প্রতি উৎসুক হয়ে ওঠা।

আরও পড়ুন: বেনিয়মি মেয়েদের কণ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন আশা ভোঁসলে! লিখছেন শান্তনু মৈত্র…

‘বাঙালি ভদ্রলোক’ বলে লোকজন যতই গালমন্দ করুক না, ভদ্রতা কিন্তু বাঙালির অহংকার ছিল। এখন যেমন কেউ ভদ্রতা করলে, তাঁকে অপমান করা হয়, সেই চল ছিল না আগে। কেউ যদি অগাধ পড়াশোনা করার পরেও একটা সামান্য টাকার চাকরি করতেন, তাঁর প্রতি বাঙালির শ্রদ্ধা বেড়ে যেত। এখন তো বাঙালি যোগ্যতা মাপে টাকা দিয়ে, আর বিদেশে চাকরি করা বা ঘুরতে যাওয়া দিয়ে। সৌজন্য দিয়ে নয়, জ্ঞান দিয়ে নয়। বরং অহরহ শোনা যায়, বাইরের দুনিয়া এখন বড় কর্কশ, তাই ভদ্রতা দিয়ে নাকি তার মোকাবিলা সম্ভব নয়! আর এখন কোনও গণ্ডিতে আটকে থাকা কোনও আত্ম-পরিচিতি হতে পারে না। সবাই নাকি বিশ্ব-নাগরিক। পৃথিবী জুড়ে যার যা ভাল, তা-ই দিয়ে নিজেকে গড়তে হবে। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে, যার যা খারাপ, তা একেবারে মজ্জায় ঢুকে যাচ্ছে তুরন্ত।

যে বাঙালি ঝোলা-ব্যাগ কাঁধে নিয়ে নীরবে হেঁটে যেত, তার মাথায় হয়তো তখন কোনও বিজ্ঞানের সূত্র বা অলৌকিক কবিতার লাইন ঘুরত। সে তার নিজের বোধ-বুদ্ধির প্রেক্ষিতে দেখত, বিচার করত দুনিয়াকে, কোনও সেল্ফ-হেল্প গুরুর ম্যানেজমেন্টের সূত্র দিয়ে নয়। তার বেড়ে ওঠা ছিল বাঙালি পরিবেশে, যেখানে স্বচ্ছন্দে দেবব্রত-কণিকা-সুচিত্রার সঙ্গে হেমন্ত-সন্ধ্যা-লতার আধুনিক গান ছিল, কিন্তু হিন্দি চটুল সিনেমার ক্ষেত্রে একটা গণ্ডি ছিল। সুনীল-শক্তির কবিতা না-জানা বাঙালিকে কেউ দর দিত না। গল্প-উপন্যাস পড়ে ফেলা ছিল অবশ্যকর্তব্য। আর ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সমবেদনার জন্য মিছিল করা। সেই মিছিলে কাজ না হলেও প্রতিবাদ জানানোটা মজ্জাগত ছিল বাঙালির। আর এই সবের মধ্যেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষ হত। একটা নিখাদ বাঙালি পরিবেশে। তাই তাকে আলাদা করে বাঙালি সাজতে হত না। সে ছাপা শাড়ি কিংবা খাদির পাঞ্জাবি পরেই দিব্য বাঙালি হতে পারত।

যেখানে বাংলা শুধু বলার ভাষা নয়, ভাবারও ভাষা— নিজেকে বোঝার, অন্যকে ছোঁয়ার জায়গা। যেখানে ভদ্রতা নিছক ভীরুতা নয়, বরং একধরনের সংযম, একধরনের শক্তি— যা আমাদের কথাকে কম ধারালো করে, কিন্তু বেশি গভীর করে। যেখানে পড়াশোনা শুধুই ডিগ্রির সিঁড়ি নয়, বরং দুনিয়াকে একটু বেশি করে বুঝে নেওয়ার আনন্দ।

পয়লা বৈশাখ আসলে আমাদের খুব নিঃশব্দে একটা কথা মনে করিয়ে দেয়— বাঙালি হওয়া কোনও উৎসবের পোশাক নয়, যা পরা যায়, আবার আলমারিতে তুলে রাখা যায়। এটা এক ধরনের চর্চা— যা ধীরে ধীরে ভাষার, ব্যবহারের, ভাবনার ভেতর দিয়ে তৈরি হয়।

যেখানে বাংলা শুধু বলার ভাষা নয়, ভাবারও ভাষা— নিজেকে বোঝার, অন্যকে ছোঁয়ার জায়গা। যেখানে ভদ্রতা নিছক ভীরুতা নয়, বরং একধরনের সংযম, একধরনের শক্তি— যা আমাদের কথাকে কম ধারালো করে, কিন্তু বেশি গভীর করে। যেখানে পড়াশোনা শুধুই ডিগ্রির সিঁড়ি নয়, বরং দুনিয়াকে একটু বেশি করে বুঝে নেওয়ার আনন্দ।

তাই উৎসবের সাজ থাকুক— ধুতি-পাঞ্জাবির ভাঁজে, লালপাড় শাড়ির উজ্জ্বলতায়, আতরের হালকা গন্ধে, কাঁসার থালার শব্দে, পান্তা-ইলিশের স্বাদে, আড্ডার ঢেউয়ে। কিন্তু তার পাশাপাশি যদি একটু সচেতন জায়গা তৈরি করা যায়— নিজেকে একটু থামিয়ে ভাবার, অন্যের উপস্থিতিকে গুরুত্ব দেওয়ার, আর আচরণে অযথা ঔদ্ধত্য না দেখানোর— তাহলে এই পরিচয়টাকে আর আলাদা করে তুলে ধরতে হয় না। তখন বাঙালি হওয়াটা আর-একটা দেখানেপনা নয়, নিঃশব্দে, স্বাভাবিকভাবেই থেকে যায়— যা একটা নির্দিষ্ট দিন ধরে প্রমাণ করতে হয় না। আর বাঙালি হয়ে ওঠা যদি না পোষায়, তাহলে এই দিনটাকেও ছেড়েই দিলে ভাল। একলা বৈশাখ একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।