এস্তাদিও মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে লিওনেল স্কালোনি কাঁদছেন। কোচের বাঁ-চোখ থেকে জল নীচে নামছে। জল কি কারও ব্যথা বোঝে? ফকল্যান্ড ওয়ার-ভেটেরান ফাবিও সান্টানা-র ঠোঁট-চোখ-শরীর-অস্তিত্বে জাতীয় সংগীত। সব কিছু কাঁপছে। ‘হিয়ার দ্য নয়েজ অফ ব্রোকেন চেইন্স’। জল ঠোঁট থেকে নেমে চিবুক অবধি গিয়েও শুকোচ্ছে না। গ্রেসিয়াস লিও বলে লিপ-সিঙ্ক-করা গ্যালারিতে একটা ছোট্ট মেয়ের গাল। প্রহরীর মতো রাত জাগে ভালবাসা। সান্টানা গাইছেন, ‘হোয়াট ডিড উই নো হাউ টু অ্যাচিভ?’ আমরা কী জানি? কতটুকুই-বা জানি? জল গলা দিয়ে নামতে-নামতে শুকোচ্ছে। একটা কুইলমাস বিয়ার আর্জেন্টিনার আত্মার গলা থেকে পাকস্থলিতে নামতে-নামতে খেলা চলছে, এগোচ্ছে। আমরা ফার্স্ট হাফের পর স্বভাবোচিত বিজ্ঞাপন দেখতে পাচ্ছি না। কয়েকটা নিশ্চিত সিটার জালে ঢুকছে না। দশ নম্বরের কোমরে হাত, লালচে দাড়ি আর না-ভাঙা অস্তিত্ব। সান্টানার গান তখন শরীরের ভেতরে— ‘লেট আস সুইয়ার উইথ গ্লোরি টু ডাই…’।
আমরা সত্যিই বিজ্ঞাপন দেখছি না। আমাদের চোখে রেট্রোস্পেকটিভ। মেসি’জ বেস্ট গোল্স ফর দ্য ন্যাশনাল টিম। ‘দেশের হয়ে খেলে না’, ‘গদ্দার’ একটা ছেলের ন্যাশনাল টিম। ‘গ্লোরি টু ডাই’। পিক্সেল দেখতে পাওয়া অস্পষ্ট ক্লিপিং, ২০০৭-এর কোপার মেক্সিকো ম্যাচে রিকলমের টার্নিং আর পাস থেকে একজন তরুণের অলৌকিক চিপ। আমাদের চোখে, স্ক্রিনে বসনিয়া ম্যাচ, ইরান, নীলচে গ্রহ। এই ছেলেটা বুড়ো হয়ে গেল! এই ছেলেটা খেলবে না আর! আমাদের মধ্যে কেউ-কেউ কি এ-বছর অবসাদে ডুবে যাবে একা? হলেও তাকে স্বার্থপর বলা হবে কি? কীসের স্বার্থ? কে পর? যে-পৃথিবীতে লিওনেল আন্দ্রেজ মেসিকে ফুটবল ছেড়ে দিতে হয়, সে-গ্রহে বেঁচে থেকে আর কী পাওয়ার? কী সুখ বাকি? সন্তানসুখ? প্রেমিকার আঙুল? মায়ের আরোগ্য? না কি দশ মিনিটে আলোর ছররা, গ্রেসিয়াস লিও, ধোঁয়ায় ধোঁয়া হয়ে যাওয়া স্টেডিয়াম? না কি একা ঘরে হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকা রবীন্দ্রনাথের গান, ‘না চাহিতে মোরে যা করেছ দান, আকাশ আলোক তনু মন প্রাণ…’?
একটা গোলের অ্যাসিস্ট। কর্নার ফ্ল্যাগ। শেষ ম্যাচ খেলা নিকোলাস ওটামেন্ডি বুকের তিন তারায় চাপড় মারতে-মারতে উঠে যাচ্ছেন। উঠে যাচ্ছে সোনার সেইসব খনি, সেইসব দিন থেকে এক তাল পিস অফ গোল্ড। সবুজ মাঠে, ব্যথায় কাতরাতে-কাতরাতে এক সময়ে উঠে যাচ্ছেন অ্যালেক্সিস ম্যাকালিস্টার। আমাদের মনে পড়ছে লোকটার শ্রম, ’২২-এর আগুনে বছরের ওই মিডফিল্ড। মনে পড়ছে অ্যাঞ্জেলের ডান পায়ের আগে গোটা থ্রু-কে নেতৃত্ব দেওয়া আন্ডাররেটেড অ্যালেক্সিসকে। মাঠ ছাড়ছেন জুলিয়ান। মনে পড়ছে ক্রোয়েশিয়া ম্যাচ, পিটার ড্রুরি-র ব্যারিটোন, বিস্ময়— ‘হুলিয়ান আলভারেজ, সেনসেশনাল, সোলো’। হাউ হাউ করে কাঁদছেন এনজো। ’১৬-য় লিডারের অকালবোধনের পর তাঁর ডিসিসিভ খোলা চিঠি, ফেরো মেট, ফেরো। এই দেশ, এই মাঠ তোমাকে চায়।
আরও পড়ুন: লিওনেল মেসি ও একটি ফুটবল-যুগ!
লিখছেন অর্পণ গুপ্ত…

মনে পড়ছে মেক্সিকো ম্যাচের ইনসাইড, আউটসাইড, ওই ডিসিসিভ গোল। উঠে যাচ্ছেন লাউতেরো। মনে পড়ছে ‘ফকল্যান্ড ইজ আওয়ার্স’ বলার তেজ-দেখানো, আগুন-দেখানো লে সেলসোকে সঙ্গে নিয়ে তুলে ধরা পোস্টার; ৯৩ মিনিটের মাপা হেডার, কোপা ফাইনালের অবিশ্বাস্য লাউতেরো। উঠে যাচ্ছেন রোমেরো। রিভার্স ক্রনোলজিতে ছুটছে নিকো পাজ। গোল, ড্রিম গোল। পাস, ব্যাটনের ম্যাজিকাল রোল-ওভার। সান্টানার স্বর, প্রতিধ্বনি। ‘লেট দ্য আর্জেন্টাইন পিপল, চিয়ার্স’। লোকে বলছে মেসির মতো। হাসছে সোনালি চুলের নিকো। সে তো জানে, তুমি বড়জোর তোমার নিজের মতো হতে পারো, লিওর মতো হতে ’২২-এর ১৮ ডিসেম্বরের বুয়েন্স আয়ার্সের আকাশের নিকটতম নক্ষত্রও সাহস পায়নি হয়তো। কোটি, অর্বুদ তারা অলৌকিক সলিলকি করেছে, ‘মে দ্য লরেলস বি ইটার্নাল, মে দ্য লরেলস বি ইটার্নাল…’।
থিয়েগো কাঁদছে। পিতাকে জড়িয়ে থিয়েগো কাঁদছে। এখনই কি ক্যামেরাকে পেছনে করে রেখে দু’হাত তুলে আকাশে সেই সিগনেচার-মুহূর্ত আঁকা যায়? হোর্হে, কতদূরে আপনি? আপনার সন্ততির শেষ রাত, তাকে জড়িয়ে কাঁদছে তার সন্ততি, রক্ত, ঔরস, সম্ভার। ঈশ্বরের সংজ্ঞা পালটে গেছে। আপনি আপনার পৃথিবীতে কোন ঈশ্বরকে ডাকবেন হোর্হে? মূর্তিকে ডাকুন নিশ্চল, বোধিকে বলুন হেঁটে যেতে, পেরিয়ে যেতে গনগনে আগুনের মতো হলদে সান অফ মে-র করোনা, ক্রোমোস্ফিয়ার। বলুন, আশ্চর্য বিদায়ী তাপে যেন পুড়ে না যায় পা। জনান্তিকে বলুন, ‘আমারই হাতে এত দিয়েছ সম্ভার, জীর্ণ করে ওকে কোথায় নেবে?’ মা সেলিয়া, স্ত্রী আন্তোনেল্লা। টিভি-স্ক্রিনে অ্যাস্টন ব্যান্ডে টলটলে পদ্মপুকুরের মতো স্বচ্ছ, আর্দ্র অক্ষর— ‘থ্যাঙ্ক ইউ ফর এভরিথিং, লিও’। অবাক সমাপতনে দু’মাস আগে পিতাকে লেখা সেই খোলা চিঠি— ‘কোথাও না কোথাও থেকো বাবা, আমাকে দেখো, থ্যাঙ্ক ইউ ফর এভরিথিং…।’
একটা প্রসেনিয়াম। মাঠের ভেতর, মাঠের বাইরে। ওই তো চোখ চকচক করছে এমি-র। যে সব, সব কিছু করল; ’২২-এ, ’২৬-এও সব দিয়েছিল। ইস্পাত থেকে জল বেরলে কী পড়ে থাকে? বিন্দু-বিন্দু ধোঁয়া, ঘাস, বুটের স্ট্র্যাপ? এমিলিয়ানো মার্টিনেজ স্থানু দাঁড়িয়ে। গ্যালারিতে ডিমারিয়া, কয়লাখনির ঘরের বৃষ্টি, অন্ধকার আর হারকিউলিস সাইকেল স্মৃতি নিয়ে স্মিত হেসে। শেষ সময়ের দুজনের জড়িয়ে ধরার অন্তরঙ্গতা। এক ফ্রেমে আটকে, অশ্রুবৎ ’১৮-পরবর্তী সময়ের একটা দল তিলে-তিলে করার স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আইমার-আয়ালা। ’২২-এর মেক্সিকো ম্যাচে ওই গোলের পর হু হু কান্নার স্মৃতিমেদুরতা, সেই আইমার আশ্চর্য শান্ত। ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে বয়সটা কি একটু বেড়ে গেছে ওয়াল্টার স্যামুয়েলের? গোটা আর্জেন্টিনার টাইমলাইন খুঁজে বের করা আরও কয়েকটা মুখ। সারাক্ষণ সহচর আগুয়েরো। ২০০৬-এর ওই টিম। জেনেত্তি-ক্যাম্বিয়াসো-ক্রেসপো-স্যাভিওলা-তেভেজ। এমি-র মতোই ’১৪-র লাস্ট রেসর্ট রোমেরো, ট্রফির এত, এত কাছ দিয়ে হাঁটা মাসচেরানো এবং ’২২-এর সেমিতে সেই অলৌকিক ট্যাকলের স্মৃতি— কিছু পেল না তো ওরা। ২৪ মে-র জন্মদিন ভাগ করে, টুকরো-টুকরো করে এর ওর আত্মার ওপর ছেটানো হুয়ান রিকলমে কিছু পেল না। না কি পেল?
একটা প্রজন্ম বছরের পর বছর ধরে দেখে এল ‘লিটল বয় ফ্রম রোজারিও’ বড় হচ্ছে, গোল করছে, ছুটছে, বিষাক্ত ট্যাকলে পড়ছে, আবার উঠছে, সব পেয়েও কিছুই পাচ্ছে না, প্রবল এক শিশুর স্বর নিয়ে বলছে— ‘আই উইল কুইট দিজ বিউটিফুল গেম’। অথচ ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, হাসছে, পাগলের মতো চাইছে প্রতিশোধ, বলছে— ‘মালভিনাস, মনুমেন্টাল, মারাদোনা’। জিততে শিখছে। মনুমেন্টালে সোনালি চুলের সোলেদাদ পাস্তোরুত্তির ‘ব্রিন্ডিস’ ধরছে কোরাসে। বলছে, ‘কিপ ড্রিমিং ইন আ কর্নার, কন্টিনিউ বিলিভিং ইন গড’। ঈশ্বর আছে, মাঠেই আছে, তোমাদের শুধু বিশ্বাস করতে হবে, বিপজ্জনকভাবে বিশ্বাস করতে হবে। কোচ সাবেল্লা সেই ’১৪-য় বিশ্বাসটা তৈরি করিয়েছিলেন, পারলেন না, হেরে গেলেন মাঠ থেকে, জীবন থেকে। ’১৮-র পর টিম স্কালোনির টাইম-স্পেসে সেই বিশ্বাসের স্থাপত্যেই ইট, রড, সিমেন্ট। সেই বিশ্বাস চিৎকার করছে টিম অ্যালবিসেলেস্তে। ’২৬-এর ট্রফি হোক না-হোক, আজ আমাদের স্বর্গরাজ্য। এই ঈশ্বর, এই টিম, এই মুখগুলো যা দিয়েছে, তাতেই আমাদের আমরা অলৌকিক স্বপ্নপুঁজির মালিক। আমাদের শেষ বড় ট্রফিটা মিস হোক, শেষ ম্যাচের শেষ সেকেন্ডের ফ্রিকিক অনেক উঁচু দিয়ে উঠে যাক, নীল ডিভানে, শতচ্ছিন্ন সোফায়, ফুটপাথে, নাইট শিফটের অফিসে, মদ্যপ রেস্তোরাঁয় গোটা পৃথিবী হু হু কাঁদুক।
শুধু ঈশ্বরের চোখে, তার চোখে, তাহার চোখে আজ আর কোনও জল থাকবে না…



