কোহেন-কোহল

Leonard Cohen

এমন প্রায়শই ঘটে— প্রেম এসে ফিরে যায়, ঈশ্বরও জবাব দেন না কোনও। তবু তো অন্ধকারে, দিনের আলোতে তথাপি, প্রেমকে, ঈশ্বরকে কে যেন উন্মাদের ন্যায় ডাকতে থাকে; ডাকতেই থাকে। লিওনার্ড কোহেনকে বোঝার সবচেয়ে বড় বাধা এই, প্রেম এবং ঈশ্বর; উভয়ই যার কখনও সঙ্গতে, কখনও বা পরস্পর পরিবর্তনযোগ্যভাবে, ওঁর ভাষার, সুরের সহ-নির্মাতা। ভাষারই মূলত, ব্যক্তিগত মতে। এরপরও নিজের শব্দকে নিয়ে অনিশ্চিত ছিলেন কবি, কণ্ঠকে নিয়ে ছিলেন তীব্র সংশয়ে, কবি এবং গায়ক সত্তার সাফল্যকে এহেন ‘জনপ্রিয় সিঙ্গার-সংরাইটার’ শুধুই সন্দেহের চোখে দেখতেন। পাশাপাশি, এই ধ্রুব অন্তর্দ্বন্দ্বই তো ওঁকে স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার বিপজ্জনক নৈকট্য থেকেও বারবার ফিরিয়ে এনেছে লেখার টেবিলে। শিখিয়েছে, কলম ভুলক্রমেও প্রথম আঁচড়ে চূড়ান্ত সত্যকে ছুঁয়ে ফেলবে না কক্ষনও। ভাষাকে সত্যের কাছাকাছি পৌঁছতে দীর্ঘ সাধনা করতে হবে। অপেক্ষা করতে হবে। মুছে যেতে হবে, ফিরে আসতে হবে, মুছে যেতে হবে ফের…

অনল এবং অনিল, ঈশ্বর এবং প্রেম, তুমি এবং আমি বারবার গায়ে-গায়ে কোহেনের গানে (কবিতায়) এসে বসেছে। তাদেরই একটানা সংলাপ ধরে রেখেছে শ্রোতাকে (পাঠককে), গায়কের (কবির) হাতের মুঠোয়। সামান্য মনোযোগ দিলেই চোখে পড়বে, কোহেনের গানে সমকালের ‘মেলানকলিয়া’-র ঢেউ সদা-প্রবহমান— একের সঙ্গে একদা নিখোঁজ হয়ে যাওয়া অন্যের ছেঁড়া-ছেঁড়া কথোপকথন। ওঁর কবিতায় এই কথোপকথন যেমন স্পষ্ট, সাবলীল, তেমনই রহস্যময়, যান্ত্রিকতামুক্ত নানা ধাঁধায় আচ্ছন্ন— তাই বোধহয় এত ‘মর্মস্পর্শী’। সারল্য তো কাউকে ঠকায় না।

মাঝেমধ্যে মনে হয় খুঁজে দেখি, শব্দের প্রতি তপস্যার সমান কোহেনের যে নিষ্ঠা, শিকড়টা কোথায় তার? পরমুহূর্তেই মনে পড়ে যায়, আমরা মূলত ওঁকে গায়ক হিসেবে মনে রাখতে চাইলেও, কোহেন কিন্তু প্রথম আত্মপ্রকাশ করেছিলেন ‘কবি’ হিসেবে। যখন কোহেন ২২। ম্যাকগিলের ছাত্র সম্ভবত। তখনই ওঁর প্রথম ‘কাব্যগ্রন্থ’ প্রকাশিত হয়। কবিতার বই। ‘লেট আস কমপেয়ার মিথোলজিস’ (১৯৫৬)। তখন গান-টান কই? এরপর একে একে প্রকাশিত হয় ‘দ্য স্পাইস-বক্স অব আর্থ’ (১৯৬১), ‘ফ্লাওয়ার্স ফর হিটলার’ (১৯৬৪), ‘প্যারাসাইটস অব হেভেন’ (১৯৬৬) এবং ‘সিলেক্টেড পোয়েমস ১৯৫৬–১৯৬৮’ (১৯৬৮)। আরও কিছু পরে আসে ‘দ্য এনার্জি অব স্লেভস’ (১৯৭২), ‘ডেথ অব আ লেডিজ ম্যান’ (১৯৭৮) এবং ‘বুক অব মার্সি’ (১৯৮৪)। কবিতা আর গানের নির্বাচিত সংকলন ‘স্ট্রেঞ্জার মিউজিক: সিলেক্টেড পোয়েমস অ্যান্ড সংস’ (১৯৯৩)। মাঝে একটা লম্বা বিরতি। অতঃপর, ‘বুক অব লংগিং’ (২০০৬)। তাতে জায়গা করে নেয় ওঁর একগোছা নতুন কবিতা, গদ্য। সঙ্গে নানা আঁকিবুকি। মৃত্যুর পর একটাই বই বেরোয় বোধহয় আর। ২০১৮ সালে। বইয়ের নাম ‘দ্য ফ্লেম’। তাতে আবার জড়ো হয়েছে শেষ জীবনে লেখা কবিতা, গানের কথা, নোট। অন্যান্য অপ্রকাশিত কিছু লেখাও।

আরও পড়ুন: জন লেননের হত্যা এবং…! লিখছেন কৃষ্টি কর…

কবিতার দিকে ঠিক কবে, কখন ঝুঁকে পড়লেন কোহেন? ১৯৩৪ সালে, কানাডার মন্ট্রিয়লে জন্মগ্রহণ করেন কবি। বেড়েও ওঠেন সেখানেই। ওয়েস্টমাউন্ট এলাকায়। ধর্মপরায়ণ ইহুদি পরিবারের মস্ত উত্তরাধিকার, শৈশবের কিছুটা পেরোতেই পিতৃবিয়োগ, চারপাশের ভাষা-সাহিত্য, ভাষাগত বহু বদল— সবটা মিলিয়েই হয়তো কবিতা এসেছে কৈশোরে। ইতিউতি পড়েছি, কবি একাধিকবার জানাচ্ছেন, ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার কবিতা ওঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। কবিতার সঙ্গে পরিচিতি নিবিড় করতে, কাব্যকণ্ঠ, শিল্পীসত্তা, গীতিধর্মিতা এবং লোকজ নানা উৎস সম্বন্ধে ধারণা স্পষ্ট করতে সাহায্য করেছে। এহেন প্রভাবের সুতোর টানেই কোহেন আজীবন ঘুরপাক খেয়েছেন প্রেম, মৃত্যুচেতনা এবং আকাঙ্ক্ষাকে ঘিরে থাকা যাবতীয় বিষয়ভাবনাগুলো চারপাশে। কিছু পরে ডব্লিউ. বি. ইয়েটস, আরভিং লেটন এবং ওয়াল্ট হুইটম্যান-এর নামও উঠে এসেছে এই আলোচনায়।

এখানেই বলে রাখি, কোহেনের একটিমাত্র কন্যাসন্তান। ঘটনাচক্রে তাঁরও নাম রেখেছেন লোরকা।

কোহেন নিজে কবিতা লিখতে শুরু করছেন এমন একটা সময়ে, যখন সমগ্র উত্তর আমেরিকা নতুন একটা ভাষা খুঁজছে। প্রকাশের ভাষা। দেশকালকে দেখার ভাষা। বোঝার ভাষা। আধুনিকতার ক্লান্তি, যুদ্ধ-পরবর্তী শূন্যতা, ব্যক্তিস্বাধীনতার জটিল প্রশ্নগুলো, ধর্মীয় লোকেচারের প্রতিষ্ঠা, প্রচলন, পুনর্বিবেচনা— সব মিলিয়ে সাহিত্য যেন পরনির্ভর আইন-কানুনের, বিধিলিপির বাইরে বেরতে চাইছে। কোহেন তো কোনও সাহিত্য আন্দোলনের মুখপাত্র হননি। একা লিখেছেন। ধীরে লিখেছেন। জনপ্রিয় হতে চেয়ে নিজের ভাষাকে ভাঙেননি। অথচ, সুদূরবিস্তৃত সমাজের এই খোঁজটা, এই চাহিদাটা ওঁর কলমের বিস্তারে, নিয়ন্ত্রণে কেমন অবলীলাক্রমে জীবন পেয়েছে!

পাঠক হিসেবে মনে হয়েছে, কোহেনের কবিতা পড়তে নিলে প্রথম যে অনুভূতিটা জোরালো হয়, তার নাম সংযম। লিরিক, ব্যালাড, এপিকের যাবতীয় অবশেষ সেই সংযমেরই ছাতার তলায় ঢুকে পড়েছে এসে যেন— অঝোর বৃষ্টির দিন— কবি সরাসরি নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। ঈশ্বর এসেছেন, অনন্ত সত্য। প্রেম এসেছে, আজব উপদ্রব। উভয়ই হারিয়েছে যখন, ভরসা এসেছে। ভাষাকে কোহেন তাই আর চমকে দেওয়ার স্বার্থে ব্যবহার করেননি। আলগা বিবেচনায় দু-চারটে লেখা পড়ে, গান শুনে যদি বা মনে হয় পাঠককে বা শ্রোতাকে কবি নিছক একটা ‘রোমান্টিকতার’ সূচনাসূত্র ধরিয়ে দিতে চাইছেন, চাট্টি পিঠ-চাপড়ানি চাইছেন, একাংশের সমালোচক সেই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সহমত হবেন না বলেই বোধ করি। কবি কোহেন শুধুই ভাসা-ভাসা কিছু উদ্ধৃতির সহজ বিচরণক্ষেত্র হয়ে থেকে যেতে চাননি পাঠক-মনে— সেই অবস্থান সম্বন্ধে পর্যাপ্ত সোচ্চারও হয়েছেন বারবার। হল্লাহাটির চাইতে নিরিবিলিকে, প্রত্যয়ের চাইতে দ্বিধাকে দেখেছেন বড় করে। দেখাতেও চেয়েছেন তাই। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, সব ছেড়ে সংযমের কথা বললাম কেন? ধরা যাক, সামান্য এই কবিতাটাই— ‘সামার হাইকু’:

‘Silence
and a deeper silence
when the crickets
hesitate.’

চারলাইনের এই কবিতায় (‘হাইকু’, নামেই বলা আছে) ব্যক্তিগত অনুভবের কোনও মুহূর্তই কি ঠাঁই পায়নি? পাঠ-তথ্যে ‘আত্মজীবনীমূলক’ কোনও উপাদান না থাকলেও, কবিতাটার আগাগোড়াই তো কবির দেখার, শোনার, বোঝার একান্ত ভঙ্গি। অথচ ভঙ্গিটাকে কোহেন গলা উঁচিয়ে কবিতায় আনলেনই না। শব্দ আর নীরবতার মধ্যেকার অনতিক্রম্য টানাপোড়েনটাকে আনলেন। কোত্থাও বললেন না, শব্দ, বা তার অনুপস্থিতি ওঁকে ঠিক কী অনুভব করায়। কয়েকটা শব্দ উল্লেখ করলেন মাত্র। সেই শব্দ দিয়ে একটা বৃত্ত তৈরি করলেন। যথাস্থানে থেমেও গেলেন তারপর। পাঠকেরও কিচ্ছুটি বুঝতে অসুবিধে হল না – ‘অনুভব’ বস্তুটাও কোহেনের একান্ত ব্যক্তিগত হয়ে রয়ে গেল না আর। ‘আমি’-র গন্ডি পেরিয়ে গিয়ে, সে সামূহিক অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে উঠল নিমেষের মধ্যে। মোদ্দা কথা, পাঠকের পাঠ-জীবনে কাঙ্ক্ষিত অভিঘাত তৈরি করতে চাইলে, কবিকে যথাস্থানে থামতে জানতে হয়। কোহেন তা জানতেন। কোহেন তাই কবিই।

টি. এস. এলিয়টের ‘ট্র্যাডিশন অ্যান্ড দি ইন্ডিভিজুয়াল ট্যালেন্ট’ (১৯১৯) শীর্ষক প্রবন্ধে যুক্তি খাড়া করছেন, কবিতা কখনোই কেবল কবির ব্যক্তিগত আবেগের প্রকাশক্ষেত্র নয়। কবির ব্যক্তিগত আবেগ কবিতায় ঢুকে পড়তে পারে নিশ্চয়ই, তাহাই কাম্য, কিন্তু সেই ঢুকে পড়াটাকে নির্দিষ্ট একটা রূপান্তর-প্রক্রিয়া মেনে চলতে হবে:

‘Poetry is not a turning loose of emotion, but an escape from emotion.’

কবিতা মানেই কাঁচা আবেগকে অবাধ ছাড় নয়— তাতে কবি এবং কবিতা, দুয়েরই ক্ষয় হয়। ‘উচিত’ বরং সেই কাঁচা আবেগকে শিল্পের ছাঁচে এনে ঠিক ঠিক ফেলা। তবেই সেই অনুভূতির প্রতি, কবিতার প্রতি ‘জাস্টিস’ হয়। এলিয়ট আরও বলেছিলেন, পরিণত শিল্পী (এক্ষেত্রে, কবি) ‘the man who suffers’ এবং ‘the mind which creates’-কে আলাদা আলাদা করে দেখতে জানে। অর্থাৎ, যে-ব্যক্তি অনুভব করছে, এবং যে শিল্পী সেই অনুভূতিকে কবিতায় জায়গা করে দিচ্ছে, তারা আত্মাগতভাবে পৃথক।

সামান্য ঝুঁকি নিয়ে, এলিয়টের আলোচনার এই একটুকরো অবয়বের নিরিখে কোহেনকে পড়ে দেখলে অদ্ভুত একটা মজা হয়! মনে হয়, এলিয়টের কথাগুলো বিচিত্রভাবে মিলে যাচ্ছে। সংযমের নানা মানে তৈরি হচ্ছে— সংযম মানে তো কবিতার অন্তরঙ্গ, আবেগঘন স্বরকে অস্বীকার করা নয়! সংযম মানে, সেই স্বরকে একরৈখিক একটা ব্যক্তিস্মৃতিমূলক আখ্যান হিসেবে না দেখে, একধাঁচের নিরসক্ত দূরত্ব বজায় রেখে, তাকে ভাষার কাঠামো, আবর্তন, ছন্দ, চিত্রকল্প, আরও নানা অনুষঙ্গের হাত ধরে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এই দুরূহ কেরামতিটা কোহেন আয়ত্ত করেছেন অনেকের চাইতে অধিক সাবলীলতার সঙ্গে। তাই প্রেম, যৌনতা, পরিত্যক্ত হওয়া, বিশ্বাস, বার্ধক্য, অপরাধবোধ, ব্যর্থতা কিংবা অভিলাষের মতো চেতনা, উপলব্ধি বারবার স্থান পেয়েছে কোহেনের ‘বডি অব ওয়ার্ক’-এ— কিন্তু ওঁর সেইসব ‘স্বীকারোক্তি’-র মধ্যেও একধরনের নিয়ন্ত্রণ এবং শৈল্পিক, নান্দনিক মধ্যস্থতা কাজ করেছে। ফলে ওঁর ব্যক্তিজীবনের নানা মুহূর্তের নানা আবেগ সহজেই সার্বজনীন আবেগের রূপ নিতে থমকে থামেনি। এ তো পরীক্ষিত সত্য: পাঠক নিজেকে ওঁর ভাষার মধ্যে চিনে নিতে চায়— চিনে নিতে পারে। লিখতে-লিখতে মনে পড়ে গেল, স্নাতকোত্তরে ভক্তি-প্রেমের কবিতার সারটুকু নিয়ে তুমুল তর্ক হত আমার বিভাগের সহপাঠীদের। আমি শ্রোতা। ঘুরে-ঘুরে শুনতাম, কার কী মত। এমনই একটা তর্কের মধ্যে এক সহপাঠী একবার বলেছিল: ‘কোহেনের গান শুনলে মনে হয়, সে ভুগছে, তো আমিও ভুগছি। সে ঈশ্বরকে ডাকছে, তো আমিও ঈশ্বরকে ডাকছি। সে বিরহকাতর, তো আমিও বিরহকাতর।’

আরও একটা বিষয় নিয়ে একটা মুগ্ধতা আছে আমার, অনেকেরই— কোহেনের কবিতায় বাইবল, ইহুদি ধর্মীয় ভাষা, সলমস (সামসংগীত), প্রেমের আর্তি এবং প্রার্থনার দীর্ঘ ‘ঐতিহ্য’ বারবার ফিরে এসেছে। এলিয়টের যেমন বলছেন, ‘নতুন’ কবিকে পূর্ববর্তী সাহিত্য-ঐতিহ্যের সঙ্গে সচেতন একটা দোস্তি গড়ে তুলতে হবে— তবেই নিজের স্বাতন্ত্র্য প্রমাণ করা সম্ভব— কোহেন সেই কাজ যথাযথই করেছেন। পাঠ-প্রক্রিয়াকে নিজের জীবনের বিশদবিবরণ দিয়ে ভারী না করে তুলে, ‘ঐতিহ্যগত ভাষা’ এবং সে-ভাষার প্রতীকের সঙ্গে ক্রমাগত সংলাপরত থেকেছেন। শেষ অ্যালবামটা যেমন, ‘ইউ ওয়ান্ট ইট ডার্কার’, তাকে যদি কবিতা বলে ধরি, তবে তাতেও শৈশবের সেই সিনাগগের কোরাস ফিরে এসেছে। এই ফিরে আসা তো নেহাত নগণ্য নয়— বহু লোকের বহুবিধ হা-হুতাশের, অনুনয়ের আকুল সংযোগ।

শাকান্ন যেমন মানুষের ক্ষুধা নিবারণের জন্য যথেষ্ট, সংযমবোধ তেমনই সমষ্টি-বোধকে জাগিয়ে তোলার, সংবেদের প্রয়োজনীয়তাকে শনাক্ত করার মূল মন্ত্র। এমন সংযমই নিজের কথা, নিজের চাওয়া-পাওয়া, নিজের অভিজ্ঞতার মধ্যেই আটকে না-থেকে অন্যের উপস্থিতিকেও সমান জমি তৈরি করে দিতে শেখায় কবিকে; নিজেকে বাদ দিয়ে নয়, নিজের সঙ্গে সকলকে নিয়ে ভাবতে শেখায়। কবিতার তো এই বিস্তারই ‘প্রয়োজন’— ব্যক্তিগত গল্পগাথা যেখানে ক্রমে ব্যক্তিসত্তার সীমানা পেরিয়ে সাধারণের কাছে পৌঁছতে পারে। এই সংযম-ক্ষমতাটা ওঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকেই নজর কাড়ে পাঠকের। যে-বয়সে অধিকাংশ কবি নিজের ভাষার বাহাদুরি জাহির করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন; কোহেন সে-বয়সেই ভাবলেন ভাষার ‘সীমা’ নিয়ে— কবিতায় গ্রিক পুরাণ, বিবলিকাল রেফারেন্স, ইহুদি ইতিহাস— সবই তো এল, কিন্তু পাণ্ডিত্যের প্রদর্শন হিসেবে নয়। মিথকে ভেঙে-ভেঙে কোহেন বরং খতিয়ে দেখলেন, ‘প্রাচীন’ প্রতীকগুলো আধুনিকতার অপার ক্লান্তি, প্রেম, পাপবোধ এবং নিঃসঙ্গতার সঙ্গে মিলেমিশে নতুন নতুন নানা অর্থ তৈরি করছে—

‘O send out the raven ahead of the dove
O sing from your chains where you’re chained in a cave
your eyes through my eyes shine brighter than love
your blood in my ballad collapses the grave.’

যতদিনে ‘দ্য স্পাইস-বক্স অব আর্থ’ প্রকাশ পাচ্ছে, ততদিনে ওঁর এই সূক্ষ্ম, সুকোমল সংযমকে, সংবেদকে আরও সরগড় করে তোলার প্রবণতা যেন উসকে দিচ্ছে কেউ আরো খানিক। প্রকৃতি এবং ধর্ম, শরীর এবং আত্মা, প্রেম এবং প্রার্থনা— কোনওটাই পরস্পরের প্রতিস্পর্ধি হয়ে, একে-অন্যের বিপরীতে এসে দাঁড়াচ্ছে না একবারও। কোহেনের ভাষা-ব্যবহারের আরও একটা আশ্চর্য দীপ্তি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে: যে-কোনও প্রতীককে কখনও স্থির থাকতে দেয় না ভাষাটা। প্রতীক মানে কী এক্ষেত্রে? ধরা যাক, একটা নদী। নদীটা একই সঙ্গে কখনও স্মৃতি, কখনও আল্হাদ, কখনও সময়ের ধারা। ধরা যাক একটা দরজা— সে কেবল স্থাপত্য নয়। মানুষের অন্তর্জগতেরও কাতর একটা সীমানা। একটা ঘুড়ি তবে কোহেনের কাব্যজগতে কী?

“A kite is the last poem you’ve written,
so you give it to the wind,
but you don’t let it go
until someone finds you
something else to do.”

কবিতা-বিশারদরা অনেকে বলে থাকেন, কোহেন ‘আধুনিক’ কবি। কিন্তু কোহেনের কবিতা আধুনিক কেন? কারণটা সহজ। কোহেনের কবিতার বক্তা ভবিষ্যদ্বক্তা নন। নীতিবিদ নন। নিশ্চিতও নন। তা সত্ত্বেও ‘বুক অব লংগিং’-এ যখন কবি প্রেম এবং প্রার্থনাকে পাশাপাশি রাখছেন, সেই পাশাপাশি রাখার মধ্যে সামান্যতম বিভ্রান্তি নেই। ভাবনার জট নেই। কোহেন মুক্তকণ্ঠেই যেন বলতে চাইছেন— মানুষ ঈশ্বরের ভাষা শিখতে পারে। কিন্তু ভাষা শিখলেই জবাব মিলবে, এমনটা নয়। আধুনিকতার সবচেয়ে বড় সংকটই তো উত্তরহীনতা। কোহেন উত্তর দিতে আসেন না; প্রশ্নগুলোকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে আসেন। সম্ভবত এই কারণেই কোহেনের কবিতা পড়লে মনে হয় না, পাঠককে নির্দিষ্ট কোনও বুলি শেখাতে চাইছেন। ভুলেও নয়। মনে হয়, নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলছেন কোহেন— চারদিক আঁধার করে আসছে— ভণিতা নেই একমাত্রাও কোনওখানে। আমরা সেই সংলাপেরই সাক্ষী— কেউ-কেউ সে সংলাপের একনিষ্ঠ ধারক এবং বাহক।

এমন সংলাপ এই প্রথমবার নয়। মধ্যে ‘বুক অব মার্সি’-তে ওঁর এই সংলাপের, অতঃপর ‘সর্বশক্তিমানের’ নিকটে প্রার্থনার ভাষা আরও নগ্ন হয়ে সম্মুখে এসেছে। আলাপচারিতা আর প্রার্থনার ভাষার সমস্ত ভেদাভেদ মুছে গেছে। অথচ আশ্চর্য কথা, এই প্রার্থনা কারও অজ্ঞাতসারেও ধর্মীয় আনুগত্যের নয়! ঈশ্বরের কাছে পৌঁছতে হলে তাই, নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করে নিতে হয়েছে পদে-পদে। ভুলে গেলে চলবে না, কোহেনের ঈশ্বর বিচারকের বেশে ধরা দেন না একটা বাক্যে, একটাবারও। কেবল একটা ‘কনফেশনাল’-এর কাঠামোকে, তার প্রগ্রাঢ় নৈশব্দকে সামনে রেখে, ভক্তকে নিজের ভঙ্গুরতা চিনতে শেখান। যে ভঙ্গুরতা পরবর্তীতে কাব্যের নৈতিক শক্তি হয়ে, বিবেক হয়ে, ভাষার সত্যকে ছুঁতে পারার উপায় বাতলে দেয়। দেওয়ার চেষ্টাটুকু অন্তত করে।

এত ঈশ্বরচেতনার প্রসঙ্গের পরেও, আশ্চর্য বিষয়, ইহুদি ধর্ম বা বৌদ্ধ ধর্মের মতো, খ্রিস্ট ধর্মের সঙ্গে কোহেনের ব্যক্তিগত ধর্মাচরণ জড়িয়ে ছিল না কক্ষনও! ওই যে সমষ্টিগত চেতনার কথা বলছিলাম একটু আগে, কোহেনের সেই চেতনার শহরে ও দেশে খ্রিস্ট ধর্মেরও প্রভাব ছিল প্রবল। কোহেন যেমন ওঁর জেন-অনুশীলন এবং ইহুদি পরিচয়ের মধ্যে কোনও বিরোধ দেখেননি, তেমনই খ্রিস্ট ধর্মের প্রতি তাঁর আকর্ষণ বা আগ্রহকেও ইহুদি পরিচয়ের পরিপন্থী বলে মনে করেননি গোড়া থেকেই। খ্রিস্টীয় চিত্রকল্পের দুর্বার ব্যবহার বারবার দেখা গেছে ওঁর কবিতায়, গানে। বিশেষত যিশুর অবয়ব এবং ‘বুক অব রিভেলেশন’। রেকর্ড হওয়া তাঁর প্রথম গান ‘সুজান’— সে-গানে যিশুর জলের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার কাহিনিকে কেন্দ্রে রেখে সম্পূর্ণ একটা স্তবক লিখে ফেলেছেন কবি! ‘দ্য বুচার’-এ ‘ল্যাম্ব অব গড’ হিসেবে যিশুর আত্মত্যাগের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন; অন্যদিকে ‘লাস্ট ইয়ার্স ম্যান’ গানে ‘ব্যবিলন দ্য ব্রাইড’-এর অংশটুকু অন্তত অকপটে ‘বুক অব রিভেলেশন’-এর প্রতি প্রত্যক্ষ ইঙ্গিত করছে। খ্রিস্ট ধর্মের শিকড় যেহেতু হিব্রু বাইবেলে প্রোথিত, কোহেনের এই ধর্মগ্রন্থগুলোর প্রতিটা উল্লেখও তাই খ্রিস্টীয় পরিসরের সঙ্গে সম্পর্কিত।

ওঁর কাব্যের আরও গূঢ় একটা বৈশিষ্ট্য হল, ‘বিমূর্ত’ ধারণাকে কবি আদপে কখনও বিমূর্ত রাখেন না। ঈশ্বরের সঙ্গে তর্ক জোড়েন, তর্কে জড়ান বারবার। বিশ্বাসের ধর্মটুকুর মুখে আলো ফেলতে চেয়ে ধর্মতত্ত্ব রচনা করেন না। প্রেমের ক্ষেত্রেও ছকের বাইরে বেরননি কোহেন। নিত্যদিনের নানা উপমানে আবেগকে টেনে এনে বসিয়েছেন— তাই যেন অকৃত্রিম, স্বাভাবিক। ফাঁকা ঘরের কোণে একটা টেবিল, গির্জার একটা রঙিন জানালা, যত্নে-বোনা কোনও মাকড়সার জাল, কোনও কোনও সূরার হঠাৎ উল্লেখ— সে-সূরা যেন আত্মজনেরই চেনা-আদল— প্রেমের নানাবিধ প্রাপ্তি বা না-পাওয়াকে অনবরত এভাবেই প্রাণ দিয়েছেন কোহেন। কৌশলটা চেনা, ফরাসি সাহিত্যের অনুরাগীরা চাইলেই বলতে পারেন, কোহেন কিছু দূর রিলকের কথা মনে করিয়ে দেন— অস্তিত্বকে অ্যাবস্ট্রাক্ট কোনও ধারণার মাধ্যমে নয়, বস্তুর মাধ্যমে এঁকে—

‘I watch myself from where you are
Please do not be mistaken
The spider web you see me through
Is the view I’ve always taken.’

কোহেনের প্রেমের কাব্যে যৌনতার উপস্থিতি থাকলেও, তা হঠাৎই ‘উগ্র’ বা প্রদর্শনমূলক হয়ে ওঠেনি। চাহিদা সেখানে সংযত, প্রেম-ভিত্তিক, অন্তরঙ্গ এবং ইঙ্গিতনির্ভর। কামকে কবি আধাআধি লিখে, বাকিটা ছেড়ে দিয়েছেন পাঠকের কল্পরাজ্যের আস্থায়। শরীর কবির কাছে কেবল কামনার ‘বস্তু’ হিসেবে এসেছে বলে মনে হয়নি ওঁকে পড়তে-পড়তে, বা শুনতে-শুনতে। মনে হয়েছে, স্নেহ, কোমল স্পর্শ, ক্ষমতা, অধিকারবোধ— চারে মিলে একাকিত্ব এবং মানবিক সান্নিধ্যের আকুলতাকে একসূত্রে বেঁধে নিচ্ছে। অতএব, কোহেনের কবিতায় যৌনতা কামনার চাইতে ঢের বেশি অন্তরঙ্গতার ভাষা— একরকম ‘কনফিউশন’-ও বটে— শরীরের চেয়ে মনের কাছাকাছি পৌঁছনোর এক বিফল আকাঙ্ক্ষাই সম্ভবত। তিনটে কবিতায় (বা গানে) তিনটে এমন নমুনা নয় ফিরে দেখি এবেলা—

‘Beneath my hands
your small breasts
are the upturned bellies
of breathing fallen sparrows.’

উদ্ধৃত অংশে স্তনের সরাসরি উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। উপমাটাকে স্বভাবদোষে ‘বেয়াড়া’ ঠাহর করতে চাইতেই পারে কেউ, কিন্তু উপমাটা আসলে কোমল, কাব্যিকই— শরীরকে অবলম্বন করেও শরীরের বহিরঙ্গের ভাবটুকুকে অতিক্রম করার একটা পথ যেন এর মধ্যে নিহিত। কবিতার ভেতরে আসলে আছে অন্য কথা। ‘শরীর’ সম্পর্কে নারীর নিজস্ব যে ‘নিরাপত্তাহীনতা’ (যে নিরাপত্তাহীনতা উদ্রেক করে সামাজিক নানা মাপকাঠি), বক্তার উদ্দেশ্য তাকে খণ্ডন করে, আত্মজনকে আশ্বস্ত করা। তা সে যেভাবেই হোক।

‘I have seen the hunters kneel before her
even in her sleep she turns away from them.’

এক্ষেত্রেও যৌনতা পরোক্ষ। নারীকে ঘিরে পুরুষের দৃঢ়বদ্ধ একটা আকর্ষণ, বা অভীপ্সা দেখা দিচ্ছে বটে, কিন্তু তাঁর ঘুমন্ত, অধরা শরীরের সামনে দাঁড়িয়ে, তা অবিলম্বে নস্যাৎ হয়ে যাচ্ছে কোহেনের কল্পনায়। ফলে কবিতাটায় কামনার চেয়ে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে বেড়া-ব্যবধান, নিষেধ-নিয়ম, সম্মতি জানানোর, বা না-জানানোর হকটাই।

‘In the bed the lovers, slowly and deliberately and silently
perform the act of love.’

তৃতীয় নমুনাটার ক্ষেত্রে বরং বলা যায়, শরীর আর আড়ালে থাকছে না। থাকবেই বা কেন সবসময়? যৌনতা নিয়ে কোহেনের কোনো ‘ট্যাবু’ তো ছিল না— এই কবিতায় যৌনতাকে তবুও কেবল শরীরী প্রয়োজন হিসেবে পড়তে, পড়াতে নারাজ কবি। প্রেমিক-প্রেমিকার কাছাকাছি আসা, তাদের আলিঙ্গন, অতঃপর ঘনিষ্ঠতার চিত্র ক্রমশ এক ধরনের আচার বা ‘রিচুয়াল’-এর চেহারা নিতে প্রস্তুত হয়ে উঠছে ওঁর কাব্যে যেন-বা। এর নড়চড় হচ্ছে খুব কম।

কাজেই প্রেমকে কোহেন আসলে কীভাবে দেখছেন, তাই নিয়ে একাধিক প্রশ্নচিহ্ন থেকে যায়। জাগতিক, জৈবিক নানা চাওয়া-পাওয়ার কথা কবি উল্লেখ করছেন ঠিকই— লিখেছি যেমন— কিন্তু সেই উল্লেখ থেকে সরেও তো আসছেন বারবার। এ-কথাও ভেবে নেওয়া বাতুলতা, যে এমনতর সংযম বা নিয়ন্ত্রণ কোহেনের কাছে শুধুমাত্র গৌরবের। পাঠকের দায় থেকে যায়, খানিক থেমে ভাবার, এই সংযমের কোহেনের কলমে এলো কেন? আমার মনে হয়েছে এই সংযম সচেতনভাবে আসেনি। অর্থাৎ, এই সংযম আরোপিত সংযম নয়। এসেছে সংকোচকে ঘিরে। বদলাতে থাকা অনুপস্থিত নানা উপস্থিতির আভাসকে ঘিরে। যে সংকোচ, যে আভাস আহত প্রেমিককে শান্তিতে থাকতে দেয় না কিছুতেই— ভিটেমাটি উড়িয়ে দেয়, মাঝরাতে পাঁচিলের দিকে চেয়ে চেয়ে অনর্থক অপেক্ষা করতে বাধ্য করে তাকে। কিন্তু জানাই তো আছে, কেউ আসবে না অধিকাংশ সময়ই। এই সত্যটুকুই ওঁর সমগ্র সৃজনের খড়ের-চাল। বহু সাক্ষাৎকারে কবি বারবার বলেছেন, কাব্যের মতো প্রেমও এক ধরনের দীর্ঘ শ্রম। বারবার সংশোধনের সাদা পাতা। অনন্ত ধৈর্যর অন্বেষণ।

অতএব, ঠুকরে-ঠুকরে একই ফল খাওয়ার মতো, প্রেম এবং ঈশ্বরের কাছে বারবার ফিরে যাওয়ার অভ্যাসটা কোহেনের ঘরজোড়া— অনুপস্থিত উপস্থিতি ভাষায় ধরার অত্যাশ্চর্য রুচি! অথচ ভাষা বারেবারে ধেয়ে যায় উল্টো স্রোতে। প্রেমে যেমন কামনা আর প্রত্যাখ্যান পাশাপাশি থাকে, ঈশ্বরের ক্ষেত্রেও তেমনই প্রার্থনা এবং নৈঃশব্দ্য, বা বলা ভাল, উত্তরহীনতার অবিচল সহাবস্থান। কোহেনের কবিতায় প্রেম তাই ‘আমি’-তে আবদ্ধ নয়। ঈশ্বরও কেবল ধর্মবিশ্বাসের সংকেত নন। প্রেম, ঈশ্বর, দুইই ভাষার সেই উল্লেখিত ‘সীমা’-কে পরখ করে দেখার সুবিশাল ময়দান— যে ভাষার সীমাকে কোহেন গোড়াতেই দেখে ফেলছেন বলে, ভাষার সাজসজ্জা নিয়ে, অলংকার নিয়ে অহেতুক মাথা ঘামাচ্ছেন না কৈশোর থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত কখনওই।

শেষ অঙ্কটা খানিকটা এমন: ঈশ্বর বা প্রেম, কেউ-ই আখেরে ধরা দেয় না সম্পূর্ণ— কিন্তু কবির দোয়াতে প্রয়োজনীয় শব্দ ঢেলে দেয় সময় সময়— উত্তর না মিললেও তাই তো এত ডাকাডাকি।

কথা না-হয় শুরু হয়েছে কোহেনের কবিতা নিয়ে, কিন্তু কোহেনের ক্ষেত্রে কবিতা থেকে গানে যাব না— এও কি সম্ভব? কবিতা এবং গানকে এখনো বৈরিতামূলক দ্বন্দে নিহিত থাকতে হলে এমনিতেই ভারি মুশকিল! ইতিহাস বলছে, কবিতা আর গানের মধ্যে যে ‘স্বতন্ত্র’ বিভাজন, তা বেশ সাম্প্রতিক। ‘লিরিক’ কাব্য গ্রিক সংস্কৃতিতে ‘লায়ার’ নামের তারযন্ত্রের সঙ্গে পরিবেশিত হতো— সে তো একরকম সংগীতই। একটি লিরিক-কবিতা তাই শব্দনির্ভর একটি পাঠ অস্তিত্বশীল হতে পারে; কিন্তু একটি গান তৈরি হয় তার শব্দ, কণ্ঠ, সুর, ছন্দ, পরিবেশনা পারস্পরিক সহায়তায়। তাই গানের কথাকে কাব্য বলে স্বীকার না করা সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিচারে যতই গ্রহণযোগ্য হোক, নৈতিকতার প্রশ্নে, বিশেষত কোহেনের ক্ষেত্রে, তা কতটা যুক্তিসঙ্গত, সে প্রশ্নের উত্তরই বা হলফ করে দিতে পারে কে?

কোহেনের গানের সঙ্গে, গানের ‘কথা’-র সঙ্গে, ভাবের সঙ্গে তো অল্পবিস্তর সকলেই পরিচিত। কবিতাকে উপেক্ষা করে নয়, কবিতাকেই আষ্টেপৃষ্ঠে পেঁচিয়ে ধরে গান এসেছে ওঁর। আনুষ্ঠানিকভাবে কবিতার বহু পরেই এসেছে বরং। ছয়ের দশকে। লোকসংগীতশিল্পী জুডি কলিন্সের হাত ধরে।

কোহেনের বেশিরভাগ গানই ওঁর কোনও না কোনও কবিতার বইয়ে প্রকাশিত কবিতা আসলে (উপরোক্ত কবিতাগুলোর বেশিরভাগও গান হয়ে সারা বিশ্বে ঘুরে বেড়িয়েছে)— পরে যা-সব এই কর্ড, সেই কর্ডে পড়ে, সুরের দ্যোতনাগুলো চিনে চিনে, গান হয়ে বেজেছে। প্রথমে মঞ্চে। তারপর রেকর্ডে। শ্রোতাদের, শিল্পীদের কণ্ঠে কণ্ঠে ফিরেছে। যেমন ‘ওয়ান অব আস ক্যানট বি রং— প্রথম কবিতার বইটা একটু উল্টে-পাল্টে দেখলেই খোঁজ মিলে যাবে অপূর্ব এই ‘ছড়াটার’— কিছু শব্দের হেরফের রয়েছে নিশ্চয়ই মূল গানের সঙ্গে—

“I showed my heart to the doctor
He said I’d just have to quit
Then he wrote himself a prescription
And your name was mentioned in it
Then he locked himself in a library shelf
With the details of our honeymoon
And I hear from the nurse that he’s gotten much worse
And his practice is all in a ruin.”

চেলসির সস্তা হোটেলে বসে লেখা এই গানটার চরিত্রসম্পন্ন বিশেষ একরকম যন্ত্রণা আছে। পরাবাস্তব ভাবচিত্রের মতো প্রেমের নানা টানাপোড়েন, প্রত্যাখ্যান, ঈর্ষা এবং নিজেরই অনুভূতিকে বোঝার ব্যর্থতা— কী নেই গানটায়? বক্তা যেন বারবার প্রেমের সম্পর্কের অর্থ খুঁজতে গিয়ে গভীর বিভ্রান্তিতে ডুবে যান ক্রমশ। এমনকী, ডাক্তারের কাছে সমাধান চাইলে, সেও কোনও সুদত্তর দিতে পারে না। পাঠে উপস্থিত তথ্য কেবল ডাক্তারের কথা উল্লেখ করে যেমন, কবিতা নিয়ে, গান নিয়ে চর্চা করেন এমন নানা মানুষ মনে করেন, ‘ইন্টারপ্রেটিভ পসিবিলিটি’ (ব্যাখ্যার সম্ভাবনা) ধরে এগোলে, কোহেন হয়তো বা ফ্রয়েডের কথা বলেছেন কাব্যে। প্রেমের সম্পর্ককে, তার জটিলতাকে মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার মধ্যে দিয়ে বোঝারই হয়তো একরকম মরিয়া চেষ্টা করেছেন। ওষুধ যখন কিছুতেই মেলেনি, আত্মবিশ্বাসী, ব্যঙ্গাত্মক একরম বিষণ্ণতার কাঁধে মাথা রেখে উচ্চারণ করেছে: দু-জনের মধ্যে অন্তত একজন যে ভুল নয়, সে বিষয়ে বক্তা নিশ্চিত। কে ভুল, বা কে ভুল নয়, গানকে সেই নিদান দেওয়ার ছাড়পত্র দেননি তা বলে। ঘোলাটে ভাবটাই গানের মূল সুর: প্রেমের সম্পর্কে সত্য-মিথ্যা, অপরাধী-নির্দোষ কিংবা যুক্তি-অযুক্তির সীমারেখা নানা ক্ষেত্রেই অস্পষ্ট থেকে যায় কি না!

একটু আগেই কথা হচ্ছিল, সুজানে যিশুর ভূমিকা নিয়ে। কিন্তু সত্যিই কি সুজান চা আর কমলালেবু খাইয়েছিলেন কোহেনকে? নিত্য এই নাছোড় প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতে কোহেন আর রহস্য করেননি একটা সময়ের পর। নির্লিপ্ত, তবু হাসিমেশানো সুরে জবাব দিয়েছিলেন, ওঁর সুজান ওঁকে ‘কনস্ট্যান্ট কমেন্ট’ নামের একধরনের চা খাইয়েছিলেন; যে চায়ের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল কমলালেবুর খোসার ছোট-ছোট টুকরো। স্রেফ এতটুকুই। স্রেফ এতটুকু থেকেই জন্ম নিয়েছিল পৃথিবীবিখ্যাত ‘টি অ্যন্ড অরেঞ্জেস’-এর চিত্রকল্প। অর্থাৎ, চিন-টিন ছিলই না কোত্থাও। ছিল কেবল মামুলি এক কোম্পানির তৈরি বাজারচলতি চা। তাকেই একপ্রকার ভেঙে ফেলে, তার গায়ে দূরদেশের আবছা আলো জড়িয়ে দিলেন কোহেন। এমন তো হামেশাই করে থাকেন ‘প্রকৃত’ কবিরা— অটোকে বলেন উড়োজাহাজ, উড়োজাহাজকে চাঁদ—দৃশ্যের জন্ম হয়, পরপর। সেসব দৃশ্যরাই বেঁচে থাকে।

এরপর একশ্বাসে, একসঙ্গে কোহেনের লোকপ্রিয় কিছু গান (সব নয়) পাশাপাশি রাখব— যাতে ওঁর প্রেম, বিচ্ছেদ, চাহিদা, স্মৃতি এবং মৃত্যুচেতনাকে ফিরে দেখার তুলনায় ব্যাপ্ত একটা পরিসর তৈরি হয়। ‘সো লং, মারিয়ান’ দিয়ে শুরু করি— সে-গানে বিচ্ছেদ পরবর্তী গভীর স্নেহ, অসম্পূর্ণতার মায়াবী টান। ‘উইন্টার লেডি’-তে প্রেম ক্ষণস্থায়ী। গভীর অনিশ্চিত। একদিকে সে হাতের নাগালে, তো অন্যদিকে অধরা। কতকটা সাময়িক সহযাত্রার মতো— ফুরিয়ে যাবে যে, তাতে সন্দেহ নেই কোনও। ‘সিস্টার্স অব মার্সি’-র ক্ষেত্রে প্রেম আশ্রয়ের রূপ নেয়— প্রেমকে সরল ‘রোমান্টিক’ পরিণতি দেওয়া তো হয়ই না— নির্দ্বিষ্ট সংজ্ঞাটুকু খোলসা করে বলা হয় না। ‘হ্যালেলুজা’-তে প্রেম ক্রমে আরও জটিল হয়ে ওঠে: কামনা, বিশ্বাস, শরীর, বিশ্বাসভঙ্গ এবং আধ্যাত্মিকতার ভাষা— প্রেমের ভাষার আড়ালে ইতিহাস, মৃত্যু এবং বিপর্যয়ের স্মৃতিও এসে বাসা বাঁধে গানে। শেষে এসে ‘হু বাই ফায়ার’-এ এসে থামি যদি, দেখতে পাব, ব্যক্তিগত প্রেমের পরিসর ছাপিয়ে প্রশ্নটি এসে পৌঁছয় মানুষের অস্তিত্ব, পরিণতি এবং মৃত্যুর অনিবার্যতার কাছে। ফলে এই গানগুলির মধ্যে ঈশ্বরদর্শন অথবা প্রেমের মিলনের ন্যূনতম নিশ্চয়তাও নেই—বিচ্ছেদ আছে। ক্ষয় আছে। আকাঙ্ক্ষা, স্মৃতি, এবং শরীরও আছে।

কোহেনের লেখার টেবিলের একটা ছবি দেখা যায়। অবিন্যস্ত কাগজের স্তূপ, গোছা গোছা খসড়া, নোট, অভিধান, টাইপরাইটার, কলম। সবই পড়ে আছে অনাদরে। অবহেলায়। যেন মধ্যযুগীয় কোনও নকলনবিশ বহুদিন ধরে একই পাণ্ডুলিপি সংশোধন করে চলেছেন। ভাবনাটা যে খুব ভুল, তাও নয়। কোহেন একটামাত্র গান নিয়ে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিতে পারতেন।

এই যে একের পর এক কবিতার বই, কিছু পরে উপন্যাস, তারও পরে গান—কয়েক দশকের আন্তর্জাতিক খ্যাতি, শেষ বয়সে ফিরে আসা এবং মৃত্যুর অল্প আগে এক অসামান্য অ্যালবাম। এই ঘটনাক্রমের নিজস্ব একটা নাটক আছে। নেই? এ যেন দীর্ঘ আত্মশিক্ষার ফল। কোহেন নিজেই বলছেন, গান ওঁর পেশা হলে, ভাষা ছিল ওঁর নিয়তি। আমৃত্যু ভাষা শিখেছেন। শব্দকে ধৈর্য শিখিয়েছেন— নীরবতার যতি। এই কারণেই কোহেনকে কেবল ‘সিঙ্গার-সংরাইটার’ বললে ওঁর ব্যাপ্তিকে সম্পূর্ণ ধরা যায় না— অভিধাটি ওঁর কাজের প্রকৃতি বোঝাতে অক্ষমই একরকম। কোহেন গান লিখতেন ঠিকই, কিন্তু গানের জন্য আলাদা কোনও ভাষা তৈরি করেননি। কবিতা এবং গান ওঁর কাছে ছিল একই নদীর দু’টি স্রোত। কোনওটা যদি ঠাঁই জুটিয়ে নিত বইয়ের পাতায়, কোনওটা আবার পৌঁছে যেত মঞ্চে। সহজ হিসেব— শব্দের প্রতি দায়বদ্ধতা।

কোহেনের লেখার টেবিলের একটা ছবি দেখা যায়। অবিন্যস্ত কাগজের স্তূপ, গোছা গোছা খসড়া, নোট, অভিধান, টাইপরাইটার, কলম। সবই পড়ে আছে অনাদরে। অবহেলায়। যেন মধ্যযুগীয় কোনও নকলনবিশ বহুদিন ধরে একই পাণ্ডুলিপি সংশোধন করে চলেছেন। ভাবনাটা যে খুব ভুল, তাও নয়। কোহেন একটামাত্র গান নিয়ে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিতে পারতেন।

গানের প্রসঙ্গটা শেষ করব ‘ইন মাই সিক্রেট লাইফ’ দিয়ে— আমার অন্যতম প্রিয় কবিতা, গান। এই কবিতার, এই গানের সংশয় কোহেনের চরিত্রেরও অংশ। কোহেন ঈশ্বর নন। ঈশ্বরের সঙ্গে সংলাপরত রক্তমাংসের মানুষমাত্র! যে মানুষ ভুল করে, অন্যায় করে, একাধিক প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে, অবসাদে ভোগে, খাবলে-খাবলে এটা-ওটা সম্বল করে উঠে দাঁড়াতে চায় তারপর। আমরা অভ্যস্ত শিল্পীদের আত্মবিশ্বাসের গল্প শুনতে। কোহেনের ক্ষেত্রে তার উল্টোটাই দেখতে পাই—

“I smile when I’m angry
I cheat and I lie
I do what I have to do
To get by
But I know what is wrong
And I know what is right
And I’d die for the truth
In My Secret Life.”

কাব্যে হৃদয়বত্তা আর অধ্যায়ত্মিকতার প্রায় সমান গুরুত্বও তো দেখতে পাই আবার— সুরের মধ্যে মধ্যে পাশ্চাত্য পরিভাষার অষ্টকটাও, নির্ভুল। যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়ার দায় নেই সেই সততার, সেই সৃজনের?

লেখার টেবিলে

ওঁর সমসাময়িক বেশিরভাগ শিল্পীর সঙ্গেই কোহেনের বহু পার্থক্য ছিল— ছয়ের দশক তো পক্ষ বেছে নেওয়ার দশক। দৃপ্ত স্বরের, স্লোগানের দশক। প্রতিবাদী গানের, প্রকাশ্য রাজনীতির দশক। ডিলানের মত, কোহেনও কখনও প্রতিবাদের কবি-সাহিত্যিক হয়ে ওঠেননি। তাঁর কবিতার, সাহিত্যের কোথাওই তেমন সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান খুঁজে পাওয়া যায় না— এমনটাই মত সমালোচক-মহলের। শুধু সমালোচক কেন, তিনি নিজেও বহুবার স্বীকার গেছেন, কোনও নির্দিষ্ট পক্ষের হয়ে দাঁড়ানোর তেমন ইচ্ছে তাঁর নেই। অথচ, সাহিত্যজীবনে তাঁর প্রেরণার কথা উল্লেখ করতে নিয়ে, বারবার ফিরে গেছেন স্পেনের গৃহযুদ্ধের গান, সমাজতান্ত্রিক লোকসংগীতের কাছে। কোহেনকে রাজনীতির বাইরে রাখা সহজ নাকি? বরং নিতান্ত কষ্টসাধ্য। ওঁর গানে রাজনৈতিক স্লোগান লেখা নেই ঠিকই— নির্দিষ্ট কোনও মতবাদের পক্ষে যুক্তিও সাজানো নেই। কিন্তু শিল্পী নিজে যাই বলুন, ওঁর কাজের ভেতর এমন সব প্রশ্নের অবাধ বিচরণ, যে-প্রশ্নগুলো শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকও তো।

কোহেনের কবিতা ও গানে প্রার্থনার ভাষা, প্রেমের ভাষা এবং ক্ষমতার ভাষা প্রায়ই একে-অপরের খুব কাছাকাছি চলে আসে। প্রেমিক, ঈশ্বর, নারী, পুরুষ, নেতা, অনুসারী, প্রভু, দাস, শরীর এবং আত্মসমর্পণের মতো আপাত ভিন্ন-ভিন্ন বর্গ বারবার পরস্পরের ভাষা ধার করে। পড়ে বা শুনে মনে হয়, বক্তা যেন একই সঙ্গে ক্ষমতাকে পেতে চাইছেন নিজের করে, সেই ক্ষমতার ভয়াবহতাও সম্পর্কেও তিনি ওয়াকিবহাল।

ডিলান এবং কোহেনকে একাধিক সংগীত-সমঝদার দু’টি মেরু হিসেবে দেখেছেন। আমি সে তত্ত্ব না মানি কেমন করে? ডিলানের শিল্পসত্তার কেন্দ্রে এক ধরনের নব্য-ধ্রুপদি আত্মধার্মিকতা আছে। তিনি যেন বারবার এমন এক নৈতিক অবস্থানে পৌঁছতে চাইছেন, যে নৈতিক অবস্থানে পৌঁছলে সারা পৃথিবীটাকে বিচার করা যায় নির্দ্বিধায়। বলা যায় কী ভাল, আর কী ভাল না। তারই বিপরীতে কোহেনের গোটা জগৎটাই যেন নৈতিক নিশ্চয়তার অবসান-পরবর্তী উদ্ভট একটা ভূখণ্ড। উদ্ভট, কিন্তু আত্মসচেতন। আত্মবীক্ষণী। আত্মসমালোচনাপ্রবণ। সেখানে রায়ঘোষণার কোনও জমি নেই; আছে মানুষের ভঙ্গুরতা, নিষিদ্ধ কামনা, অপরাধবোধ, বিশ্বাসহীনতা আর মৃত্যুচেতনার সঙ্গে অবিচল সহাবস্থান।

বব ডিলান সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন, এতে বিস্ময়ের কিছু নেই, কিন্তু বিস্ময় এখানেই, কোহেন সাহিত্যে নোবেল পেলেন না দেখে— এমনতর বিচারের মানে কী? বলা বাহুল্য, পশ্চিমের প্রেস-মিডিয়া এই নিয়ে জোর বিতর্ক তৈরি করতে উদ্যত হয়েছিল যারপরনাই। কিন্তু কোহেন ডিলানের এই প্রাপ্তি নিয়ে একটাই মন্তব্য করেছিলেন। ছোট। ধীর-স্থির। সহজাত নিয়ন্ত্রণক্ষমতাটারই পরিচয় দিয়েছিলেন আরও একবার। উচ্ছ্বাসের সঙ্গে জানিয়েছিলেন—

‘It is like pinning a medal on Mount Everest for being the highest mountain.’

অনুষ্ঠান করছেন তখনও এদিক-ওদিক। মঞ্চে এসে হঠাৎ একদিন বললেন, অনেকদিন বেঁচেছেন। এবার তিনি মরতে প্রস্তুত। কিছুদিনের মাথায়, অন্য কোনও মঞ্চে নাকি ফের বললেন, ‘ওই যে বলেছিলাম, মরতে আমি প্রস্তুত, তা অত ভেবে বলিনি। তৎকালীন অনুভূতির গায়ে সামান্য রং চড়িয়েও বলে থাকতে পারি। অতি-নাটকীয়তা আমার স্বভাবসিদ্ধ তো! আসলে আমি আদি-অনন্তকাল জুড়ে বেঁচে থাকতে চাই।’

হাসিতে ফেটে পড়ল সমস্ত প্রেক্ষাগৃহ। হাসিতে ফেটে পড়লেন কোহেনও।

তার কিছুদিন পর মৃত্যু। ২০১৬ সালে।

কার মৃত্যু?

প্রেমের দোসর, ঈশ্বরের ভাবশিষ্য— সদা-সংশয়ী, সদা-সরল, সময়োত্তীর্ণ লিওনার্ড কোহেনের।