স্বতন্ত্র হতে চাইত

Nana Patekar

নানা পটেকরের সঙ্গে আমার ৪৪ বছরের সম্পর্ক। একসঙ্গে বেড়ে ওঠা। কেননা, দু’জনেরই মাইলস্টোন ছিল ‘অঙ্কুশ’, যা এত বছর পার করে এসেও প্রাসঙ্গিক। ওই ছবির গান, ‘ইতনি শক্তি হামে দেনা দাতা’ আজও প্রায় ৭৫ হাজার স্কুলে, পার্লামেন্টে, রাষ্ট্রপতি ভবনে গাওয়া হয়। এখন যখন পুরনো ছবিটা নিয়ে ভাবি, সত্যিই গর্ব হয়।

আমি কলকাতায় চলে আসার পরও নানার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থেকে গেছিল। কয়েকদিন আগেও ফোনে কথা হয়েছে। ও যে একজন অভিনেতা হিসেবে নিজের জায়গা করে নেবে, সেটা ‘অঙ্কুশ’-এর সময় থেকেই বোঝা গেছিল। নিজের সবটা দিয়ে ও অভিনয় করত। যে-কোনও চরিত্র নিয়েই ওর ভাবনাচিন্তা ছিল দেখবার মতো। যে-চরিত্রে ও অভিনয় করবে, সেটা কতটা আকর্ষণীয় করা যায়, কতটা বাস্তবসম্মত করে তোলা যায়, সেই দিকে মন দিত বরাবর। মঞ্চাভিনেতা হিসেবেও নানা অতুলনীয়। আমাদের থেকে বয়সে কিছুটা কিছুটা বড় ছিল, ফলে অভিজ্ঞতা ছিল বেশি। অভিনয়ের বিভিন্ন খুঁটিনাটি আমি ওর থেকে শিখেছি।

আরও পড়ুন: নানা পাটেকর ছিল সত্যিকারের ‘মেথড অ্যাক্টর’!
লিখছেন গৌতম ঘোষ…

রিমা লাগু-র সঙ্গে ও একটা নাটক করত ‘পুরুষ’ বলে। অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল সে-সময়ে। আমি প্রায় তিন-চারবার দেখেছি নাটকটা। যখনই শো থাকত, নানা ফোন করে বলত, ‘কী রে, যাবি আমার সঙ্গে?’ তো আমি চলে যেতাম। ওই নাটকে আমি দেখছি, নানা কোলাপুর থেকে একটা বিশেষ ধরনের জুতো আনিয়েছিল, যেটা পরে হাঁটলে চড়মড় করে শব্দ হয়। ওই নাটকে নানা একজন দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক নেতার চরিত্রে অভিনয় করত। যেটা হত, ও যখন প্রথম মঞ্চে আসত, তখন ওই জুতোর শব্দটা শোনা যেত। সেই সঙ্গে বিরাট হাততালি। তখন থেকে খেয়াল করতাম, ও যখনই কিছু করার চেষ্টা করছে, সেটা এমনভাবেই করছে, যাতে লোকে সেটা মনে রাখে। নিজের স্বাতন্ত্র্যটা চিনিয়ে দিত এভাবে।

জয়বন্ত দলভির‘পুরুষ’ নাটকের টিভি-চিত্রায়নের সময়

পরবর্তীকালে আমার মনে হতে থাকে, ও বলিউডকে খুব একটা পছন্দ করত না। ফোন করে সেসব কথা বলতও। পারিপার্শ্বিক নানান ভণ্ডামি, ওকে দুঃখ দিত। যে-কারণে ও মুম্বই ছেড়ে পুনে চলে যায়। সেখানে একটা ফার্ম হাউস করে। তবে গোয়াতেও যে ও একটা জায়গা করেছিল, সে-খবর আমার কাছে ছিল না।

ওর চলে যাওয়াটা আমার কাছে খুবই মনখারাপের। এখন স্মৃতিটুকুই সম্বল। কী হইহই করেই-না আমরা ‘অঙ্কুশ’-এর সময়ে শুটিং করেছিলাম! এমনও সময় গেছে, প্রযোজকের টাকা না থাকায়, আমাদের লাঞ্চের টাকা দিতে পারেনি। চ্যাপেল রোডে যেখানে অভিনয় করতাম, প্রতিবেশীরা এতই বন্ধু হয়ে গেছিল, আমরা লাঞ্চের সময়ে এর-ওর বাড়ি ঢুকে দুপুরের খাবার খেতাম। আমাদের সাম্মানিক ছিল এক-একজনের দশ হাজার টাকা। আমি, নানা, আরও অনেকে মিলে এইভাবে ছবিটা করেছিলাম। কোনও অভিযোগ ছিল না কারওর। আনন্দটুকুই সব। সেই ছবি যে সুপারহিট হবে, নানা বা আমি বা আমরা কেউই কি তা ভাবতে পেরেছিলাম? কলকাতার মেট্রো সিনেমায় ৩৬ সপ্তাহ টানা চলেছিল ‘অঙ্কুশ’।

ওখানে একটা দৃশ্য আছে, নানা আমাকে বেশ ঝাঁঝিয়ে বলছে, আমি যেন হিংসাত্মক পরিস্থিতির মধ্যে না থাকি। শুটিং-এর আগে ও আমায় বলেছিল মনে আছে, ‘তোকে একটা সত্যিকারের চড় মারব? তাহলে তোর চোখে আপনাআপনিই জল আসবে!’ মেরেওছিল। ফলে দৃশ্যটা হয়ে উঠেছিল ভীষণই স্বতঃস্ফূর্ত। যে-‘স্বতঃস্ফূর্ততা’র দিকে যাত্রাই ছিল ওর একমাত্র লক্ষ্য।