সকালবেলা পেয়েছি দুঃসংবাদটা। তারপর থেকে ভারাক্রান্ত হয়ে আছে মন। নানা, নানা পটেকর, আমার কাছাকাছিই বয়স ছিল ওর, চলে গেল। এখনও বিশ্বাস করে উঠতে পারছি না। আমার কাছে নানা তো শুধু বড় অভিনেতা নয়, আমার দীর্ঘদিনের বন্ধুও বটে। সেই নয়ের দশক থেকে নানা-র সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল আমার।
আমার নিজের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ তো বটেই, নানা-র জীবনেও খুব গুরুত্বপূর্ণ ছবি ‘যাত্রা’-তে আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। এই ছবিটা করে যে নানা কী আনন্দ পেয়েছিল, তা কল্পনাতীত! চরিত্রটা জটিল ছিল। একজন লেখক, দশরথ যোগলেকর, তার সাহিত্য সম্মান নিতে দিল্লি যাচ্ছে ট্রেনে করে। পথে দেখা হয়ে যাচ্ছে চলচ্চিত্রকার মোহনের সঙ্গে। এবার তার উপন্যাস ‘জানাজা’ নিয়ে তার সঙ্গে কথা শুরু হয় মোহনের। এইখান থেকে চরিত্রটা অন্যরকম হয়ে যায়। দেখা যায়, লেখক নিজেই তার চরিত্র হয়ে উঠছে। এই উপন্যাসের চরিত্র লাজবন্তী, সেই চরিত্রে ছিল রেখা। একদিকে পরিবার, লেখক দশরথের নিজস্ব জগৎ।অন্যদিকে, ওর চরিত্রের জগৎ। কঠিন কাজ।


একটা ছবি তৈরি করতে গেলে নানারকম সমস্যা হয়েই থাকে। এই ছবিতেও হচ্ছিল। কিন্তু হায়দরাবাদের ব্যস্ত রাস্তায় শুটিং করতে পারতাম না নানা বা রেখার মতো তারকাদের নিয়ে, যদি না ওঁরা সহযোগিতা করত! নানা থিয়েটারের লোক, ও সাহায্য না করলে শুটিংটাই হয়তো হত না।
আবার, এই নানা-ই, এই চরিত্রটা নিয়ে এতটা মগ্ন হয়ে ছিল, যে বিভিন্ন সময় ও, যাকে বলে ‘ফ্লিপ’ করা, মানে মেজাজ হারিয়ে ফেলা, তাই করছিল। কখনও সহযোগী পরিচালকদের সঙ্গে ঝগড়া করে তাদের জন্য রান্না করছে নিজে, কখনও বা আবার সাংবাদিকদের দূর দূর করে তাড়াচ্ছে। আসলে কিছুই না, চরিত্রটা নিয়ে ও নিজের মতো করে ভেবে যাচ্ছে। যেমন করে ‘মেথড অ্যাক্টর’-রা। ও ছিল সত্যিকারের মেথড অ্যাক্টর, চরিত্রের মধ্যে বসবাস করত। সেই সময় কোনও সাংবাদিক এসে বিরক্ত করলে ও সেটা নিতেই পারত না। গালাগাল দিয়ে বের করে দিত, সোজা বলে দিত, যাও এখান থেকে!



তাতে সাংবাদিকরা রেগে যেত, সবাই ভেবে নিতে যে, ও বোধহয় বদমেজাজি। কিন্তু তা ঠিক নয়, ও তখন চরিত্রের মধ্যে ডুবে। মেথডের মধ্যে ও থাকত। শুটিংয়ের পর ও বিশ্রাম বা আড্ডা ফেলে ও আমার ঘরে এসে বসে থাকত। আমার সঙ্গে চরিত্র নিয়ে আলোচনা করত, আমার স্ত্রী নীলাঞ্জনার সঙ্গে চরিত্রের কস্টিউম নিয়ে আলোচনা করত। ওই ছবিতে রেখা, দীপ্তি নাভালের মতো সহ-অভিনেত্রীরা ছিলেন, আবার জুন মালিয়া একটি চরিত্র করেছিল, আমার কন্যা আনন্দী একটি চরিত্র করেছিল। সকলের সঙ্গেই ও চরিত্র নিয়ে আদানপ্রদান করে যেত টানা।
নানা যখন এক কোটি টাকা নিত অভিনয় করে ছবিতে, সেইসময় আমার ছবির জন্য একটা সামান্য টোকেন অ্যামাউন্ট ও নিয়েছিল। চরিত্রের খিদে, কাজ করার খিদে ওর এতটাই বেশি ছিল। ও বলেছিল, এই চরিত্রটা তুমি আমাকে দিয়েছ, এতেই আমি খুশি!

একভাবে দেখলে, নানা-র নাম ছিল সার্থক। কারণ ও একমাত্রিক মানুষ ছিল না। বহুমাত্রিক ছিল ও। ও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বহু মানুষকে সাহায্য করেছে, অনেকেই তা জানে না। নর্মদা আন্দোলনের সময় ওর অবদান ছিল অতুলনীয়। সেই নর্মদা আন্দোলন নিয়ে আমি ছবি করেছি একটা। ‘পরিক্রমা’। যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এই আন্দোলন ভারতের ইতিহাসে, নানা ছিল সেই আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ শরিক।
পুনে-তে ওর শেষকৃত্য হবে। চেষ্টা করব যেতে। মনের ভার নিয়েই যাব। একজন বন্ধু চলে গেল।




