পিন্টুদা ও বুয়াদা
আগেও অনেক লেখায় নিশ্চয়ই বলেছি এই দু’জনের কথা। পিন্টুদা আর বুয়াদা। গড়িয়ায় আমরা যে-বাড়িতে ভাড়া থাকতাম, সে ছিল ওদেরই বাড়ি। বাড়ির মালিক অজিতকুমার দত্ত, আমাদের অজিতমামু। ওরকম জাঁদরেল এবং পরোপকারী মানুষ ও-পাড়ায় খুব কম ছিলেন। তাঁরই দুই ছেলে পিন্টু এবং বুয়া। আমি তখন নেহাত ছোট, যখন ওই বাড়িতে ভাড়া নিয়ে বাবা-মা চলে এসেছেন লেক গার্ডেন্স থেকে। পিন্টুদা বোধহয় কলেজের গণ্ডির শুরুর দিকে, বুয়াদা স্কুল শেষ করছে। আমরা যাওয়ার কয়েক বছরের মধ্যে দুই ভাইয়ের মা চলে যান। সেই মৃত্যুর ছায়াতেই দু’জনে বড় হয়ে ওঠে।
তখন সদ্য এ-বাড়ি ও-বাড়ি টেলিভিশন আসা শুরু হয়েছে, সে এক তুমুল উত্তেজনা। বেশির ভাগেরই সাদা-কালো, কেননা রঙিন টিভির দাম সাধারণ মধ্যবিত্তের ধরাছোঁয়ার বাইরে। সেইসঙ্গে আসছে ভিডিয়ো ক্যাসেট প্লেয়ার বা ভিসিপি। তারও উত্তেজনা কিছু কম নয়। ভিসিপি অবশ্য খুব কমজনের বাড়িতেই ছিল, তখন পাড়ার এদিক-ওদিক ভিডিয়ো ক্যাসেটের জমজমাট দোকান, সেখানেই ভিসিপি ভাড়া পাওয়া যেত। এক রাতের জন্য একটা ভিসিপি আর তিনটে ভিডিয়ো ক্যাসেট ভাড়া করে দেখেনি, হেন দলবল কোনও পাড়াতেই ছিল না।
এখন কথা হচ্ছে, নতুন জিনিস যেমন আসবে, তেমন খারাপও হবে। বাড়ি-বাড়ি টিভি-ভিসিপি এসব বিগড়োনো শুরু হল। তখনও এইসব ক্রেতা-সুরক্ষা, ব্যক্তিগত পরিষেবা ইত্যাদি ভাল করে শুরু হয়নি। পাড়ার দোকান আর কারিগরই ভরসা। ততদিনে পিন্টুদা এসব নিয়ে পড়াশোনা করে রীতিমতো হাত পাকিয়ে ফেলেছে। বেশ কিছু অকেজো টেলিভিশন সারিয়ে নাম কিনেছে পাড়ায়; এমনকী, পাড়ার বাইরেও খবর গেছে, পিন্টু-র কাছে গেলে আর চিন্তা নেই।
এখানে বলি, আমরা যখন ও-বাড়িতে ভাড়া যাই, তখন রান্নাঘর ছিল মূল বাড়ির বাইরে। বাড়ির খিড়কি দরজা দিয়ে বেরিয়ে একটা ছোট উঠোন, সেখানে টিপকল, আর সেটা পেরলেই টিনের চাল দেওয়া ছোট একখানা রান্নাঘর। কয়লার উনুনে প্রথম কয়েক বছর সেখানেই বাড়ির হেঁশেল চলত। গ্যাস সিলিন্ডার আসার পর স্বাভাবিকভাবেই রান্নাঘর বাড়ির মধ্যে এক কোণে জায়গা করে নিল। একতলায় পাশাপাশি দু’খানা ফ্ল্যাট, পাশের বাড়িতে দীপ আর তার বাবা-মা থাকেন। তাঁদের রান্নাঘরও একইসঙ্গে ফাঁকা হয়ে গেল।
পিন্টুদা করল কী, এই দু’খানা রান্নাঘর এক করে নিয়ে একটা বেশ টানা লম্বা জায়গা তৈরি করে সেখানে কারখানা খুলে ফেলল। দোকান ঠিক বলা যায় না, কেননা সেখানে বিক্রি হয় না কিছুই। বরং কারখানাই বলা ভাল, কেননা বিকল যন্ত্রপাতি সেখানে সারানো হত। রাজ্যের খারাপ-হওয়া টেলিভিশন, টেপ রেকর্ডার, ক্যাসেট প্লেয়ার ইত্যাদি এসে জড়ো হতে লাগল। পিন্টুদা একটা কড়া সবুজ রঙের শাটার লাগিয়ে দিল দরজায়, পাড়ার পঞ্চা এসে সাদা তুলিতে লিখে দিয়ে গেল, ‘Multichannel Electronics’। এই শুরু হল পিন্টুদা-র কারিগরি সফর।
এখানে বলি, দেখতে-দেখতে পিন্টুদা-র বেশ কয়েকজন সহায়কও যোগ দিল তাদের এই সারাইখানায়। যেমন দেবুদা। রোগাসোগা চেহারার সদাহাস্যময় এক যুবা। অসমের কোথায় যেন তার বাড়ি। সে এসে জুটে গেল ছায়াসঙ্গী হয়ে। পিন্টুদা-বুয়াদাদের সঙ্গে তাদের বাড়িতেই থাকতে শুরু করল আর দিনরাত কারখানায় কাজ নিয়ে পড়ে থাকত। ওই চেহারায় অত পরিশ্রম করতে দেখে আমরা বেশ অবাকই হতাম। পিন্টুদা ততদিনে একখানা কাইনেটিক হন্ডা স্কুটার কিনেছে, তাকে ‘কল’ এলে এদিক-ওদিক যেতে হয়। অনেকটা সময় জুড়ে কারখানা সামলায় দেবুদা। আমাদের ওই একতলার বাড়িতেও যখনই টেলিভিশন বা ক্যাসেট প্লেয়ার বিগড়েছে, দেবুদা এক ডাকে হাজির। সারিয়ে তবে শান্তি। এর পাশাপাশি ভাইদা, দীপকদা, সৌমিত্রদা— এরাও ছিল পিন্টুদা-র সহকারী। দেখতে-দেখতে সকলের সঙ্গে আমার বেশ আলাপ হয়ে গেছিল।
কুয়াশা লেগে সেতুগুলো আবছা হয়ে আসে একে-একে। কয়েক বছর আগে, এক মাঝরাতে খবর পেলাম, পিন্টুদা আর নেই। শরীর নিয়ে ভুগছিল অনেকদিনই, শেষমেশ লড়াই থামল। আমার ছোটবেলার অনেকখানি অংশ সেদিন ওই আগুনেই পুড়ে গেছিল। তার ছাই এখনও উড়ছে বাতাসে, তাকে আর সারাই করা যাবে না।
আলাপের অবশ্য কারণও ছিল। স্কুলের দিনগুলোয় স্কুল থেকে ফিরে, আর ছুটির দিনগুলোয় সকাল থেকে বিকেল আমি ওই ছোট্ট কারখানাতেই পড়ে থাকতাম প্রায়। নাওয়া-খাওয়ার জন্য যেটুকু বাড়িতে ঢুকতে হয়, সেটুকু বাদ দিয়ে। যন্ত্রপাতির ব্যবচ্ছেদ দেখার ভারি উৎসাহ ছিল আমার মধ্যে। বিশেষত, টেলিভিশনের ক্ষেত্রে। তখনও টেলিভিশন মানে মস্ত চেহারার হোমরাচোমরা ভারী এক যন্ত্র। তার পেটের মধ্যে কী কী আছে, এটা জানার সুযোগ পেয়ে ছেড়ে দেবার কোনও মানে হয়? একদিকে খুলে রাখা তার গায়ের বাক্স, টেবিলের ওপর শোয়ানো পিকচার টিউব, এদিক-ওদিক খুলে রাখা বোর্ড, তার গায়ে কত সব সূক্ষ্ম যান্ত্রিক নকশা, এসব দেখতে দিব্য লাগত। আর ভাল লাগত সোল্ডারিং-এর পোড়া-পোড়া গন্ধ। ওই সরু অস্ত্রের মুখ থেকে ঝরে পড়া গরম রুপোলি ধাতু আর তার বারুদ গন্ধে আমার মন ভাল হয়ে যেত, কেন কে জানে। তাই সারাদিন ওদের সকলের সঙ্গে কারখানায় আমার আড্ডা চলত।
আসল মজাটা শুরু হত বিকেলের পর। সারাদিনের কাজকম্ম সেরে কারখানা আধবন্ধ করে সকলে সামনের এক চিলতে জমিতে ক্রিকেট খেলতে নামত। আমি সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়, বলাই বাহুল্য। পিন্টুদা-র উইলো কাঠের পালিশ করা ভারী ডিউস ব্যাট হাতে নিয়েই অর্ধেকটা নুয়ে পড়তাম। কখনও-সখনও রীতিমতো নেট টাঙিয়ে ব্যাডমিন্টনও হত। ক্রিকেটে পিন্টুদা-র আইকন ছিলেন দিলীপ দোশি। তাঁর মতো পিন্টুদারও চৌকো চশমা, সেইরকম হাত ঘুরিয়েই বল করত। আর ব্যাডমিন্টনে আমাদের সকলের একজনই দেবতা, প্রকাশ পাড়ুকোন।
এই খেলা আমাদের অনেক বছর চলেছিল। আমি ছোট থেকে একটু বড় হয়ে মাধ্যমিক পাশ করছি যখন, তখন পিন্টুদা-র কারখানায় বিকল টেলিভিশন আর ধরছে না। গড়িয়ার বড় রাস্তায় জমজমাট এলাকায় পিন্টুদা দোকান খুলল, সেখানে নানা ঝকঝকে ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি বিক্রি হয়। কারখানার কাজকম্ম কমে এল স্বাভাবিকভাবেই। দীপকদা, ভাইদা, সৌমিত্রদা— এরা অন্য-অন্য কাজে কোথায় যেন চলে গেল। থেকে গেল কেবল দেবুদা। আমরাও থেকে গেলাম আরও বেশ কিছু বছর, তারপর সেলিমপুরে বদলি।
টানা যোগাযোগ ছিল অনেকদিনই, তারপর যেমন হয়, কুয়াশা লেগে সেতুগুলো আবছা হয়ে আসে একে-একে। কয়েক বছর আগে, এক মাঝরাতে খবর পেলাম, পিন্টুদা আর নেই। শরীর নিয়ে ভুগছিল অনেকদিনই, শেষমেশ লড়াই থামল। আমার ছোটবেলার অনেকখানি অংশ সেদিন ওই আগুনেই পুড়ে গেছিল। তার ছাই এখনও উড়ছে বাতাসে, তাকে আর সারাই করা যাবে না।



