সংবাদ মূলত কাব‍্য: পর্ব ৪৩

আশ্চর্য পরিবর্তন

আমার মা যক্ষ্মার চিকিৎসার পর সেরে উঠেছিল, তার শরীরস্বাস্থ্য ভাল হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু ১৯৭৩ সালের শীতকালটির পর ক্রমশই অসুস্থ হয়ে পড়ছিল সে। মাঝে মাঝে জ্বর, পেটের অসহ‍্য ব‍্যথায় মা ফের রুগ্ন হয়ে পড়ছিল। শ্রীরামপুরে ডা. মিলন রায় মা-র চিকিৎসা করছিলেন, শ্রীরামপুরেই নার্সিংহোম ছিল তাঁর। বাড়াবাড়িরকম অসুস্থ হওয়ায় মা-কে ভর্তি করে দেওয়া হল ওই নার্সিংহোমে। বরিশাল ডা. মিলন রায় যখন স্কুলছাত্র, আমার বাবা তাঁর গৃহশিক্ষক ছিল। কয়েকদিনের চিকিৎসার পর ডা. রায় জানিয়ে দিলেন, ক‍্যান্সারের একেবারে শেষ পর্যায়। গোড়ার যক্ষ্মার চিকিৎসা ভুল হয়েছিল। তাঁর পরামর্শে মায়ের চিকিৎসা চলল বাড়িতেই।

১৯৮৪-র ৬ মার্চ বিকেলে মা মারা যায়। অফিসে ফোন করে আমাকে মায়ের মৃত‍্যুর কথা জানানো হয়। অমিতাভ চৌধুরী আমাকে ১৫ দিন ছুটি দিয়েছিলেন। আমার মা মারা গিয়েছিল ৫৫/৫৬ বছর বয়সে। এখনকার দিনে অকালমৃত‍্যু বলা যায়। মা ছিল স্বল্পশিক্ষিতা। ঢাকার কামরুন্নেসা গার্লস স্কুল (পরে একদিন মায়ের এই স্কুলে ঢুকে পড়েছিলাম আমি, যথাকালে সে-গল্প হবে) থেকে মায়ের ম‍্যাট্রিক পরীক্ষা বাংলা ভাগের জন‍্য দেওয়া হয়নি। কিন্তু আমার মা খুব পড়ুয়া ছিল। বাবা অফিসের লাইব্রেরি থেকে মায়ের পড়ার বই এনে দিত। সেসব বই, বাংলার ক্লাসিক বইগুলি, আমি ওই বয়সে চিলেকোঠায় লুকিয়ে-লুকিয়ে পড়ে নিয়েছি। লেখার সময়ে কোনও বানান সম্পর্কে সংশয় জাগলে মা-কে জিজ্ঞেস করতাম আমি। গল্প-উপন‍্যাস থেকে সরে ক্রমে মা তার সদ‍্যতরুণ পুত্রের ও ছেলের বন্ধুদের কবিতায় কৌতূহলী হয়ে পড়ে। কৃষ্ণগোপাল মল্লিকের ‘গল্পকবিতা’ পত্রিকার মগ্ন পাঠিকা ছিল মা। মা আমাকে জিজ্ঞেস করত, ‘ ‘আমাদের লাজুক কবিতা’র পর রণজিতের আর কোনও বই বেরিয়েছে?’

আরও পড়ুন: দিল্লির রাস্তায় মিছিল থেকে স্লোগান উঠেছিল, ‘ওয়াংচু, ওয়াক থু।’
সংবাদ মূলত কাব্য, পর্ব পর্ব ৪২…

আমি ছেড়ে দেওয়ার পর ‘পরিবর্তন’ পত্রিকাটিতে রমাপ্রসাদ ঘোষাল নামে এক তরুণ যোগ দেয়। রমাপ্রসাদ ও তার ভাই রাধাপ্রসাদ, এই দুই ভাই সে-সময়ে গল্প লিখত, পত্রপত্রিকায় টুকটাক ফিচারও লিখত। বহুকাল তাদের সঙ্গে কোনও দেখাসাক্ষাৎ নেই। তবে তখন, মাঝে মাঝে দেখা হত। সেইরকম একদিন, ধর্মতলায় রমাপ্রসাদের সঙ্গে দেখা, সে বলল, এলাহাবাদের মিত্র প্রকাশনের অলোক মিত্র কলকাতায় আসছেন, তিনি আমাদের মতো কয়েকজনের সঙ্গে দেখা করতে চান। গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলে অলোক মিত্রের সঙ্গে দেখা হল, তিনি জানালেন, মিত্র প্রকাশনের হিন্দি পত্রিকা ‘মনোরমা’র ধাঁচে বাংলায় ‘আলোকপাত’ নামে একটি নিউজ ম‍্যাগাজিন করতে চলেছেন তাঁরা। ‘পরিবর্তন’-এর কথাও তুললেন তিনি। ১৯৯২/’৯৩ সালে কয়েকটি সংখ‍্যা বের হয়েছিল ‘আলোকপাত’-এর। আমি দু’টি লেখা লিখেছিলাম।

ওই তখন, ১৯৯২-’৯৩ সালে, পার্ক স্ট্রিটে হঠাৎ ঘঞ্চুর সঙ্গে দেখা। ঘঞ্চু, সাহিত্যক্ষেত্রে যে কিনা সোমক দাস নামে পরিচিত, আমাদের বন্ধু, তার আসল নাম ঘনশ‍্যাম। তার অপরূপ নভলেটটির নাম ‘ঘন শ‍্যামবাজার’। তখন সে ঘনশ‍্যাম দাস নামেই লিখত। পরে সোমক দাস ছদ্মনাম নেয়। ঘঞ্চু আমাকে দেখেই বলল, ‘যাক, তোকে পেয়ে খুব সুবিধা হল, আমি যাচ্ছি এখন প্রফুল্ল সেনের ইন্টারভিউ নিতে, ‘আলোকপাত’-এ লিখতে বলেছে। তুই সাংবাদিক, আমাকে একটু হেল্প করবি। পলিটিক‍্যাল প্রশ্ন-টশ্ন তুই করবি, আমি জেনারেল কোশ্চেন-টোশ্চেন। দাঁড় করিয়ে দেওয়া যাবে ইন্টারভিউ।’

পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ‍্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেন। কংগ্রেস ছেড়ে আদি কংগ্রেসে ছিলেন, জরুরি আবস্থায় কারাবাস করেছেন, জরুরি অবস্থার পর জনতা পার্টির সঙ্গে। তারপর থাকতেন মিডলটন রো-র যে-ফ্ল‍্যাটটিতে, সেটি কংগ্রেস নেতা অশোককৃষ্ণ দত্ত থাকতে দিয়েছিলেন, জানতাম। আমি আর ঘঞ্চু চললাম ওই ফ্ল‍্যাটের উদ্দেশে। আমরা যখন গিয়েছিলাম, প্রফুল্ল সেনের তখন ৮৬/৮৭ বয়স। পৌঁছে দেখলাম, নীচে গ্রাউন্ড ফ্লোরে যেখানে গাড়ি রয়েছে কয়েকটি, ওই ফ্লোরটি অগোছালো ও অর্ধনির্মিত। সেখানে ঘোরাঘুরি করছেন যাঁরা, সেই শ্রমী মানুষজনকে শুধিয়ে জানলাম, প্রফুল্লবাবু ‘অউর এক বুঢঢা’ ফার্স্ট ফ্লোরেই থাকেন। লিফ্‌ট তখনও বসেনি। দোতলা, তাই দরকারও হল না। ফ্ল‍্যাটে ঢোকার করিডরটি দেখলাম ধুলোয় ধুলো। সেখানে এলোমেলোভাবে পড়ে থাকা কয়েকদিনের ইংরেজি সংবাদপত্র চারদিকে ছড়িয়ে আছে। করিডরের চারদিকের উইন্ডোগুলির কাচ ভাঙা। বৃষ্টি হলে জল ঢোকে এই করিডরে, জল-কাদার ছোপ দেখে মনে হল।

ফ্ল‍্যাটের দরজায় বেল নেই, আমরা দরজা ঠক ঠক করলাম। বুঝলাম, ভেতরে কেউ ছিটকিনি খুলতে চেষ্টা করছেন কিন্ত পারছেন না। পারলেন অনেকক্ষণ পর। ফ্ল‍্যাটের ঘরটিতে ঢুকেই চমকে উঠলাম। কঙ্কালসার প্রাক্তন মুখ‍্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেন একটি খাটে শুয়ে আছেন। অপরিষ্কার বিছানা, ময়লা চাদর। প্রফুল্ল সেনের পরনে ময়লা একটি ফতুয়া, ময়লা ধুতি লুঙ্গির মতো করে পরা। সারা ঘরে মুড়ি ছড়িয়ে আছে। আর ছিটকিনি খোলার পরিশ্রমে হাঁটু ভাঁজ করে মাঝে মুণ্ডটি বসিয়ে যে-বুঢঢাটি বসে আছেন, তাঁর কটা চোখদুটি দেখেই আমি বুঝলাম, তিনি বোদুদা, নির্মলেন্দু দে, আমাদের শ্রীরামপুরের।

শ্রীরামপুর পুরসভার লাগোয়া হুগলি জেলা কংগ্রেসের অফিসে বালক বয়সে আমি এই বোদুদাকে দেখেছি। মনে পড়ে গেল, বালকবেলায় বিকেলে আমরা ছেলের দল ঝাঁক বেঁধে যখন স্পোর্টিং গ্রাউন্ডে ফুটবল ম‍্যাচ দেখতে যেতাম, রেলের ওভার ব্রিজে চড়তে যেতাম, এই জেলা কংগ্রেস অফিসের জানালার ধারে বসে কালো চশমায় চোখ-ঢাকা একজন ঠোঙা থেকে আমাদের লজেন্স দিতেন, তিনি অতুল‍্য ঘোষ। কখনও-সখনও মুখ‍্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেনকেও দেখেছি এই জেলা কংগ্রসের অফিসে। তখন মন্ত্রী, মুখ‍্যমন্ত্রীদের এত রমরমা ছিল না। ঢক্কানিনাদ ছিল না। নিরাপত্তার বালাই ছিল না। তারপর, হ‍্যারিকেন জ্বালার কেরোসিন দুর্মূল‍্য হল, বাজার থেকে উধাও হল, কালোবাজারি হল। কেরোসিনের দাবিতে বসিরহাটে পুলিশের গুলিতে ক্লাস সেভেনের নুরুল ইসলাম নিহত হল। আর পরদিন ছাত্র ধর্মঘটে আমরা দুনিয়ার ক্লাস সেভেনের ছাত্ররা বড় হয়ে গেলাম।

প্রফুল্লচন্দ্র সেন

ধূলিধূসরিত, মুড়ি-ছড়ানো ওই ফ্ল‍্যাটে আমার মনে পড়ে গেল, একটি বালক ওই ১৯৬৭ সালে শ্রীরামপুর  স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে নীচে আরএমএস গ্রাউন্ডে মুখ‍্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেনের নির্বাচনী ভাষণ শুনতে-শুনতে বালকোচিত ক্ষোভে ভেবেছিল, এই মুখ‍্যমন্ত্রীকে যদি সে কখনও একা পায়…। বসিরহাটে পুলিশের গুলিতে নিহত নুরুল, যে কিনা ছিল সমবয়সি, নুরুলের কথা ভেবে হাত মুঠো হয়ে গিয়েছিল, দাঁত কিড়মিড় হচ্ছিল। আর তার কয়েক বছর গড়াতেই তো জেগে উঠেছিল দিনবদলের লাল টুকটুক স্বপ্ন, মেতে গিয়েছিল সেই বালকটি।

আমাদের সঙ্গে অস্ফুটে, জড়ানো কণ্ঠস্বরে কথা বলতে-বলতে প্রফুল্লচন্দ্র সেন বললেন, ‘বোদু, জল দাও।’ ঘরের কোণে একটা মাটির কুজো, মাথায় একটা স্টিলের গেলাস। আমি দেখলাম, গ্লাসে জল ঢেলে নিতে কুজো হেলাতে পারছেন না বোদুদা। আমি উঠে গিয়ে গেলাসে জল ঢেলে প্রফুল্ল সেনের কাছে যেতেই মাথা উঁচু করে তিনি কয়েক ঢোঁক জল খেলেন। আমার মাথায় হাত বুলিয়েও দিলেন একটু। কী সরু-সরু আঙুল তাঁর!