নিউজল্যান্ড
‘যুগান্তর’-এ এক সপ্তাহ আমাদের ছিল সকালের ডিউটি। সকাল ন’টায় পৌঁছে আমাদের কাজ ছিল সেদিন সকালে প্রকাশিত ‘যুগান্তর’ পত্রিকাটির ডাক সংস্করণ বের করা। ডাক সংস্করণ হল, যে খবরের কাগজটি সকালে বেরিয়েছে, সেই কাগজটির প্রথম পাতার দু’একটি খবর ফেলে দিয়ে, প্রয়োজনে ভেতরের পাতারও দু’একটি খবর ফেলে, সেখানে সকালবেলায় সংবাদসংস্থার টেলিপ্রিন্টারে আসা বিহার (তখনও ঝাড়খণ্ড আলাদা রাজ্য হয়নি) ও ওড়িশার সদ্য-আসা খবর বসিয়ে দেওয়া। তাতেই হয়ে যেত সেদিনের কাগজের বিহার ডাক সংস্করণ, ওড়িশা ডাক সংস্করণ। এই ডাক সংস্করণ আমাদের বের করতে হত বেলা বারো/সাড়ে বারোটার ভেতর। হালকা ধরনের কাজ, দু’তিনটে খবর লেখা। এজন্য আমাদের মত একজন জুনিয়র আর একজন চিফ সাব এডিটর নিয়েই সকালবেলার ওই ডিউটি হয়ে যেত। একজন জুনিয়র অফিস পৌঁছেই দু’তিনটি বিহার-ওড়িশার খবর লিখে প্রেসে পাঠিয়ে দিত। পিটিআই, ইউএনআই ওই সময়ে, সকালবেলায়, অবিরত বিহার-ওড়িশার খবর দিয়ে যেত। সাড়ে দশটা/এগারোটায় পৌঁছে চিফ সাব এসে ডাক সংস্করণের প্রিন্ট অর্ডার দিয়ে দিতেন।
কেন ওই সকালবেলায় বিহার-ওড়িশার দু’তিনটি খবর-জুড়ে-দেওয়া কাগজটিকে ‘ডাক সংস্করণ’ বলা হত? তখনও ডাক বিভাগের হাল খারাপ হয়নি। তিন বেলা— সকাল, দুপুর ও বিকেলে চিঠিপত্র বিলি করতে পোস্টম্যান আসতেন— বালকবেলায় আমিও দেখেছি। মনে হয়, অতীতে এক সময়ে বেলা বারোটায় বেরনো সংবাদপত্র ডাক বিভাগের মাধ্যমেই বিকেলের মধ্যে ধানবাদ, জামশেদপুর, পাটনা, কটক, ভুবনেশ্বর চলে যেত। তাই বলা হত ডাক সংস্করণ। বাগবাজারে গলির ভেতর ‘যুগান্তর’-‘অমৃতবাজার পত্রিকা’ ভবনের উলটোদিকেই ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’র শতবর্ষের সময়ে, ১৯৬৮ সালে স্থাপিত হয়েছিল অমৃতবাজার ডাকঘর, সেটি এখনও আছে বলে শুনেছি। তবে আমি যখন ‘যুগান্তর’-এ যোগ দিই, তখন ডাক সংস্করণের প্যাকেটগুলি হাওড়া-শিয়ালদা-দমদমে যেতেই দেখেছি। দুপুরের ট্রেনে বা বিমানে, বিকেলেই তা পৌঁছে যেত বিহার-ওড়িশায়। সেসব শহরে বিলি হত বিকেলে, সন্ধ্যায়। এখন আর সংবাদপত্রগুলির ডাক সংস্করণের দরকার নেই। মুদ্রণ-প্রযুক্তি যেখানে পৌঁছে গেছে, তাতে কলকাতায় পাতা সাজিয়ে (পেজ মেক-আপ) পাটনা-ভুবনেশ্বর কেন, লন্ডন-নিউইয়র্কেও ছাপিয়ে নেওয়া যায়।
পাইলট আর নরসুন্দরের ছবি! অদলবদল হয়ে গিয়েছিল কাগজে! পড়ুন: সংবাদ মূলত কাব্য পর্ব ৪০…
তবে তখন, ‘অমৃতবাজার পত্রিকার’ও ডাক সংস্করণ বের হত। এলাহাবাদ শহরে মতিলাল নেহরু-জওহরলাল নেহরুদের ত্রিমূর্তি ভবনের লাগোয়া বাসভবন ছিল তুষারকান্তি ঘোষের। দুই পরিবারের হৃদ্যতাও ছিলে। পাশেই ছিল তুষারকান্তি ঘোষের সম্পাদিত ‘নর্দান ইন্ডিয়া পত্রিকা’ ভবন ও মুদ্রণালয়। ওই নামের ইংরেজি পত্রিকাটি ছাড়াও একটি হিন্দি সংবাদপত্র ‘অমৃত প্রভাত’ বের হত সেখান থেকে। আমি যখন ‘যুগান্তর’-এ কর্মরত, তখন এলাহাবাদে ‘নর্দান ইন্ডিয়া পত্রিকা’ ও ‘অমৃত প্রভাত’ দেখভাল করতেন তুষারকান্তি ঘোষের নাতি তুহিনকান্তি ঘোষ। আমি একটি পারিবারিক বিবাহ অনুষ্ঠানে এলাহাবাদ গিয়েছিলাম। এলাহাবাদ যাচ্ছি শুনে, কলকাতার অফিসে তুষারকান্তি ঘোষের নাতনি রীতা দত্ত আমাকে বলে দিয়েছিলেন, ‘এলাহাবাদে তুমি আমাদের অফিসে যেয়ো।’ আমারও খুব কৌতূহল ছিল। টাঙা চড়ে আমি নেমেছিলাম এক বিকেলে ‘নর্দান ইন্ডিয়া পত্রিকা’ অফিসের গেটে। ভেতরে যাওয়ার পর তুহিনকান্তি ও সাংবাদিকরা অনেকে আমাকে খুব সমাদর করেছিলেন, কফি খাইয়েছিলেন, ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে অফিস দেখিয়েছিলেন, সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হয়েছিল, সেই সুখস্মৃতি মনে পড়ছে। অনেক পরে, ১৯৯০ সালে ‘যুগান্তর’-‘অমৃতবাজার পত্রিকা’ অস্তমিত হওয়ার মুখে, ভেঙে-পড়া একটি আলমারি থেকে পড়ে-যাওয়া একটি বক্স ফাইলের ভেতরে তাড়া-তাড়া ফোটোগ্রাফের ভেতর আমি আর সতীনাথদা একটি ছবি আবিষ্কার করে চমৎকৃত হয়েছিলাম: তরুণ জওহরলালের পাশে তরুণ তুষারকান্তি, নেহরুর কোলে শিশু ইন্দিরা, সম্ভবত ত্রিমূর্তি ভবনে তোলা ছবি।
‘যুগান্তর’-এ ওই সকালবেলার ডিউটিতে, আমার না, আমার কিছু পরে যারা ‘যুগান্তর’-এ যোগ দিয়েছিল, তাদের একজন জয়ন্ত, জয়ন্ত সিংহের ডিউটিতে ঘটেছিল এক চমকপ্রদ ঘটনা। জয়ন্ত আমার সমবয়সি, এখনও হাওড়ায় থাকে, সে অর্থনীতির তুখোড় ছাত্র ছিল। বাজেটের দিন অফিসে তার কদর বাড়ত। স্বল্পভাষী, শান্ত স্বভাবে জয়ন্ত অল্প কথায় চমৎকৃত করে দিত। তা, সেই জয়ন্ত একদিন সকালের ডিউটিতে একাই ঘাড় গুঁজে বিহার-ওড়িশার খবর লিখছে। চিফ সাব এডিটর একটু পর আসবেন। সারা নিউজ ডিপার্টমেন্ট খাঁ-খাঁ করছে। এমন সময়ে দু’চার পার্ষদ-সহ তরুণকান্তি ঢুকলেন। নতুন যুগের পাঠক-পাঠিকাদের তরুণকান্তি ঘোষের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেওয়া দরকার। তুষারকান্তি ঘোষের পুত্র তরুণবাবু বারাসতের সাংসদ ছিলেন, এবং এক সময়ে রাজ্যের কংগ্রেস সরকারের মন্ত্রীও ছিলেন তিনি। তা, তরুণকান্তি জয়ন্তকে একা কাজ করতে দেখে ঘাড়ের কাছে এসে শুধোলেন, ‘তুমি একা যে?’
মুখ তুলে জয়ন্ত বলল, ‘আমি একাই একশো!’
তরুণবাবু বললেন, ‘বেশ, বেশ, তোমার নাম কী?’
এরপর যা শুনেছি, জয়ন্তর কাছে, শুনে হো-হো হাসিতে গড়িয়ে পড়েছিলাম আমরা। দিন কয়েক বাদে জয়ন্ত সকালে অফিসে পৌঁছোতে নরহরি তাকে বলে, ‘নীচে গাড়ি রয়েছে। সিটি অফিসে চলে যান। সেখানেই আজ আপনার ডিউটি।’ সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউতে ধর্মতলায় পৌঁছনোর আগে, ডানদিকে আনন্দবাজারের গলির আগেই ‘যুগান্তর’-‘অমৃতবাজার পত্রিকা’র সিটি অফিস ও বিজ্ঞাপনকেন্দ্র। জয়ন্ত সেখানে পৌঁছে তরুণকান্তি ঘোষের ঘরে ঢুকতে দেখল, একটি মাদুরে খালি গায়ে সুপুরুষ মানুষটি বসে আছেন আর পালোয়ান গোছের এক সহচর তরুণকান্তির সর্বাঙ্গে তেল ডলছেন। গ্রীষ্মের সকালে তেল মালিশের পর তিনি গঙ্গাস্নানে যাবেন, তার আগে তিনি জয়ন্তকে কাজের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলেন। তরুণবাবুর সামনে বিছিয়ে দেওয়া খবরের কাগজের ওপর রাশি-রাশি টাকার স্তূপ, ঢিবিই একটা। হেসে তরুণকান্তি জয়ন্তকে বললেন, ‘এসো, এসো, একাই একশো, গুনে দাও তো টাকাগুলো…।’ তখন টাকা গোনার মেশিন ছিল কি না জানি না, ওই সিটি অফিসে ছিল না। উত্তেজিত হলে জয়ন্ত ঈষৎ তোতলাত। আমাদের এ-ঘটনার কথা জানিয়ে জয়ন্ত বলেছিল, ‘গ্ গুনে দিয়েছি। স্ সব গুনে গাটার এঁটে দিয়ে এসেছি…।’
জয়ন্ত সেখানে পৌঁছে তরুণকান্তি ঘোষের ঘরে ঢুকতে দেখল, একটি মাদুরে খালি গায়ে সুপুরুষ মানুষটি বসে আছেন আর পালোয়ান গোছের এক সহচর তরুণকান্তির সর্বাঙ্গে তেল ডলছেন। গ্রীষ্মের সকালে তেল মালিশের পর তিনি গঙ্গাস্নানে যাবেন, তার আগে তিনি জয়ন্তকে কাজের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলেন।
‘যুগান্তর’-এ শিক্ষানবিশ সাব এডিটরের কাজ করার ফাঁকে-ফাঁকে আমি ‘ছোটদের পাততাড়ি’তে ছড়া লিখতাম। গৌরাঙ্গ ভৌমিক সম্পাদনা করতেন ‘ছোটদের পাততাড়ি’। প্রতি সপ্তাহে মঙ্গলবার বের হত। গৌরাঙ্গদা চাইলেই আমি ছড়া দিয়ে দিতাম। অমিতদা চাইলে ‘রোজনামতা’য় ছড়া দিতাম। প্রথম পাতার প্রথম কলমের নীচে, অমল চক্রবর্তীর ছোট্ট কার্টুনের সঙ্গে সমসাময়িক রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক ঘটনা বা বিষয়ে রঙ্গব্যঙ্গের ছোট্ট কয়েক লাইনের ছড়া। ওই ছড়া অনুযায়ী অমলদা কার্টুনটি আঁকতেন। ‘রোজনামতা’ দেখভাল করতেন অমিতাভ চৌধুরী। ‘রোজনামতা’য় আমি অনেক ছড়া লিখেছি। মাধবরাও সিন্ধিয়া যখন রেলমন্ত্রী ছিলেন, তখন, মনে পড়ছে, রেল বাজেটে ভাড়া বাড়ানোয় লিখেছিলাম:

‘আল্লা কেয়া দিন দিয়া
চাকরি করে যে টাকা পাই
লেংটি কাপড় পিন্ধিয়া
মান্থলি কেটে অফিস যাব
একের ভাড়া তিন দিয়া
রেল বাজেটে ভাতের থালায়
টান দিয়েছেন সিন্ধিয়া।’
একবার আরবের সারজায়, বোধ করি ক্রিকেটের বিশ্বকাপে ফাইনালে খবর এল নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে ভারত বিশ্বজয়ী হয়েছে, সঙ্গে-সঙ্গে লেখার একটি প্যাড নিজে নিয়ে একটা প্যাড আমার দিকে ঠেলে অমিতদা বললেন, ‘মৃদুল, তুমি একটা ছড়া লেখো, আমি একটা, যেটা ভাল হবে ‘রোজনামতা’য় যাবে।’
অমিতদা দু’তিনটি শব্দ লিখেছেন, আমার ছড়া লেখা হয়ে গেল:
‘আজ সকালের কাগজ জুড়ে
থাকুক যত News-ই
সেরা খবর ভারত জয়ী
হেরেছে ল্যান্ড নিউজি।’
আমার ছড়াটি ‘রোজনামতা’য় ছাপতে পাঠিয়ে দিলেন অমিতদা। কিছুদিনের মধ্যে ‘রোজনামতা’র দায়িত্ব আমাকে দিয়ে দিলেন অমিতদা।
‘রোজনামতা’য় অনেকে ছড়া লিখতেন। বাংলায় এখন যাঁরা ছড়া লেখেন, তাঁদের অনেককেই চিনি-জানি, অনেকের সঙ্গেই সখ্য আছে আমার। যাঁরা ছড়া লেখেন, কেন জানি না, কবিদের সামনে জড়োসড়ো বোধ করেন। কেন? কেন? কেন? সর্বদা মনে রাখবেন, ছড়ায় কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দশ গোল দিয়েছেন সুকুমার রায়। চুন দেওয়া ডালনার চেয়ে ঢের-ঢের ভাল পাঁউরুটিতে ঝোলাগুড়। তাই না?


