‘শো মি আ হিরো, অ্যান্ড আই উইল রাইট ইউ আ ট্র্যাজেডি।’— লিখেছিলেন এফ.স্কট ফিটস্জেরাল্ড। কিন্তু আদৌ কোনও লেখককে ‘হিরো’র তকমা দেওয়া যায় কি? বিশেষ করে সেই সব লেখককে, যাদের জনপ্রিয়তা একসময়ে প্রায় সেলিব্রিটি পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল?
একজন আমেরিকান লেখক, যাঁর গোটা জীবনটা কোনও অংশে অ্যাডভেঞ্চারের থেকে কম নয়, বাইরে থেকে যাঁর জীবন চিত্তাকর্ষক মনে হলেও ভিতরে-ভিতরে মানসিক অবসাদে ক্ষয়ে যাচ্ছিল যিনি, সেই আরনেস্ট হেমিংওয়ে। এই একুশ শতকে এসেও সাহিত্য আলোচনা বৃত্তের বাইরে যাকে আজও রাখা যায় না, সেই হেমিংওয়ে-র জন্ম-মৃত্যু দুই-এরই মাস জুলাই। (জন্ম ২১ জুলাই ১৮৯৯ মৃত্যু ২ জুলাই ১৯৬১)।
আরও পড়ুন: যে-ফ্রিদা বাজারের, যে-ফ্রিদা আসল! লিখছেন শ্রীতমা হালদার…
প্রায় ১২৮ বছর আগে যাঁর জন্ম, তাঁকে নিয়ে ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে মানুষ কেন কথা বলবে? বিশেষ করে সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে এটুকু স্বচ্ছ কাচের মতো যখন পরিস্কার যে, অত্যন্ত স্বার্থপর ও অহংকারী মানুষ ছিলেন তিনি। কিছু ক্ষেত্রে স্যাডিস্টিকও বটে। তরুণ লেখক জেমস জোন্সের ‘ফ্রম হিয়ার টু ইটার্নিটি’ পর্যালোচনা করতে গিয়ে একবার হেমিংওয়ে লেখকের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘আই হোপ হি কিলস হিমসেলফ’!


সাংবাদিক ও লেখক আরনেস্ট হেমিংওয়ে তাঁর সারাজীবনে মোট সাতটি উপন্যাস, দু’টি বড়গল্প, অসংখ্য ছোটগল্প এবং বেশ কিছু নন-ফিকশন লিখেছেন। যুদ্ধে গিয়েছিলেন মাত্র ১৮ বছর বয়েসে। তারপর ইটালিতে স্বেচ্ছাসেবী অ্যাম্বুলেন্স চালক থাকাকালীন আহত হন গুরুতরভাবে। এরপর যখন প্যারিসে থাকতে যান, তখনই নিজের অভিজ্ঞতা, ও তাঁর প্রজন্মের সংগ্রামের উপর ভিত্তি করে কলম ধরেন।
বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাস তাঁকে ‘লস্ট জেনারেশন’-এর সাহিত্যিকদের দলে ফেলেছে। সেখানে হেমিংওয়ের সঙ্গে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য নাম হল এজরা পাউন্ড, পাবলো পিকাসো ও আরও অনেকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা তাঁদের বেশিরভাগের ঝুলিতেই। সেই সময়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এলেও বেশিরভাগ লেখকই তখন একাকিত্ব আর নিরাশায় ভুগছেন। ফলে, তাঁদের লেখায় সেই আবেগের ছোঁয়াই স্পষ্ট হয়ে উঠছে বেশি করে। যে-শিল্প আন্দোলনে হেমিংওয়েকে ফেলা যায়, তা হল ‘আধুনিকতাবাদ’। বেশ কিছু আধুনিক উদ্ভাবন সেই সময়ে যেমন মানুষের যাপন সহজ করে তুলছিল, তেমনই মানুষ হয়ে পড়ছিল সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। যার ফলে হেমিংওয়ের লেখায় ক্রমশ বর্ধমান হয়ে উঠছিল যৌনতা ও ধর্মের মতো বেশ কিছু নিষিদ্ধ বিষয়। হেমিংওয়ে ও তাঁর সমসাময়িকরা যে বিচ্ছিন্নতাবোধ অনুভব করেছিলেন, তা কিন্তু আজকের সমাজে অনেক বেশি করে প্রকট। লিঙ্গ-পরিচয় নিয়ে আলোচনা এখন যতটা জোরালো ও প্রাসঙ্গিক, তা কিন্তু আগে ছিল না। তার সঙ্গে রয়েছে যৌন আকাঙ্ক্ষা ও পরিচয় অন্বেষণের বিষয়ও।

বর্তমানে সাধারণ থেকে সৃজনশীল মানুষ এখনও লিঙ্গ-দ্বৈততার (gender binary) ধারণাটিকে ভেঙে ফেলার এবং পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। সেই দিক থেকে দেখলে আরনেস্ট যে-সব বিষয় তাঁর লেখায় তুলে এনেছিলেন, তা একেবারে বিস্মৃত হওয়ার মতো বা উপেক্ষা করার মতো নয়, বর্তমানেও। জীবনের শেষের দিকে এসে, স্পেনের বিখ্যাত (বা মতান্তরে কুখ্যাত) বুল-ফাইট নিয়ে লেখার সুযোগ এলে, সেটা নিয়েও যথেষ্ট উত্তেজিত হন। কিন্তু এ-কাজ তাঁর শেষ করে যাওয়া হয়নি।
হেমিংওয়ে একবার বলেছিলেন যে, তিনি একজন ভাল মানুষ এবং ভাল লেখক দুটোই হতে চান, কিন্তু তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, কোনওটাতেই তিনি সফল হতে পারবেন না। বেশ কিছু সাহিত্য সমালোচক তখনও মনে করতেন, এবং এখনও মনে করেন, তাঁর লেখা আমেরিকান সাহিত্যকে এক নতুন রূপ দিয়েছে যা অনেক অংশেই পরবর্তী প্রজন্মকে লেখক হতে সাহস জুগিয়েছে। কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও ভুললে চলবে না, এমন কিছু বইও তিনি লিখেছেন, যা তখন তো বটেই, এখন আরও বেশি করে পাঠকদের অস্বস্তিতে ফেলবে। বিশেষ করে সেই সব গল্প, যেখানে নারী ও কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের প্রতি বিশেষ গ্রহণযোগ্য আচরণ তিনি পোষণ করেননি। লেখকের পুরুষত্বের ধারণার অনেকটাই আবর্তিত হয়েছিল শ্বেতাঙ্গ-কেন্দ্রিক এক আদর্শকে ঘিরে কারণ এর নিরিখেই সবকিছুকে পরিমাপ করতেন তিনি। তাঁর শুরুর দিকের গল্পগুলো এই গতানুগতিক ধারণার ওপর ভীষণরকম নিরভরশীল।
হেমিংওয়ের প্রথম জনপ্রিয় উপন্যাস ‘দ্য সান অলসো রাইসেস’ (১৯২৬)। উল্লেখ্য, এই উপন্যাসের ১০০ বছর ২০২৬’এ) বেশ কিছু সমালোচকের মতে শ্রেষ্ঠ আধুনিক উপন্যাসগুলির অন্যতম। একইসঙ্গে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ‘লস্ট জেনারেশন’-এর অস্তিত্বগত সংকটকে কেন্দ্র করে লেখা এই গল্প কিন্তু আবার কঠোর সমালোচনার অংশীদারও বটে। বেশ কিছু সমালোচনায় এই উপন্যাসে তীব্র নারীবিদ্বেষ, সমকামিতা-ভীতি এবং উগ্র ইহুদি-বিদ্বেষী চিত্র উঠে এসেছে, যা এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে পাঠক হিসেবে গ্রহণ করা মুশকিল। ১৯৪০ সালে যখন ‘ফর হুম দ্য বেল টোলস’ মুক্তি পাচ্ছে, যুদ্ধের নৃশংস চিত্র এবং ঘটনাবহুল লেখার জন্য এই উপন্যাস প্রশংসা পেলেও তাঁর নারী চরিত্রের চিত্রায়ণ নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠছে সাহিত্য সমালোচকদের মাঝে। তাঁর এই লেখায় গৃহযুদ্ধের উভয়পক্ষের চরিত্রের প্রতিই মানবিক সহানুভূতি প্রকাশ পেয়েছে, সেই সঙ্গে নিজের মানুষদের নৃশংসতা, ভণ্ডামি এবং নৈতিক দুর্বলতাকেও তিনি স্পষ্ট তুলে ধরেছিলেন। ফলে এই উপন্যাস অনেকের কাছেই গলার কাঁটার মত আটকে থেকেছে আজীবন। বামপন্থীরা সহজেই এই লেখাকে তাদের আদর্শের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা বলে দাগিয়ে দিয়েছিল আর ডানপন্থীরাও এই গল্পের নায়কের আদর্শকে মেনে নিতে পারেনি। ১৯৪১ সালে তাই ‘পুলিৎজার’ পুরস্কারের জন্য এই গল্প মনোনীত হলেও, পরে তা খারিজ করে দেওয়া হয়। পরে অবশ্য ‘দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সি’-এর জন্য এই পুরস্কার পান তিনি।

তাঁর লেখায় ‘ম্যাচিস্মো’ আর ‘নারী চরিত্রের’ সমস্যাপূর্ণ উপস্থাপন থাকলেও, এ-কথা অনস্বীকার্য যে, সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের মধ্যে যে-বিভাজন, তাকে অনায়াসে মুছে দিতে পেরেছিলেন তিনি। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে সাহিত্যের জগতে তীক্ষ্ণ ভাষার ব্যবহার, যে-কোনও ঘটনাকে উপস্থাপনের ক্ষমতা এবং আবেগ প্রকাশের সংযম এমন এক রচনাশৈলী গড়ে তুলেছিল, যা অনেক লেখকই ভবিষ্যতে অনুসরণ করতে চেয়েছে। এটাও ঠিক যে, আমেরিকার শ্রেষ্ট দু’টি যুদ্ধ উপন্যাস (‘আ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’ এবং ‘ফর হুম দ্য বেল টোলস’) তাঁরই উপহার। সংযমী ও মিতবাক গদ্যের ব্যবহার আধুনিক তো বটেই, আজকের যুগে কোনও আড়ম্বর ছাড়া হেমিংওয়ের লেখনী যে-কোনও বর্তমান লেখকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সেই সঙ্গে তাঁর লেখায় যে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি বারবার ফিরে এসেছে, তা একুশ শতকে আরও বেশি করে প্রাসঙ্গিক এই ডিজিটাল স্ক্রিনে মজে থাকা দুনিয়ায়।

এই দুই বৈপরীত্যের মাঝে দাঁড়িয়ে, শিল্প ও শিল্পীর জীবনকে আলাদা করে দেখা উচিৎ কি না সেই প্রসঙ্গ এসেই যায়। আর পাঠকেরা জানেন যে, এই বিতর্কের কোনও শেষ নেই। হেমিংওয়ের বিশৃঙ্খল ব্যক্তিগত জীবন এবং মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সংগ্রাম তাঁকে জনসমক্ষে এক অতিপৌরুষ ভাবমূর্তি বজায় রাখতে বাধ্য করলেও ভিতর-ভিতর একেবারে ভেঙ্গে পড়েছিলেন তিনি। আর সেই চাপ সহ্য করতে না পেরেই ২ জুলাই, ১৯৬১ সালে নিজের জীবন নিজের হাতেই শেষ করে দেন নোবেল পুরস্কার প্রাপক এই বিখ্যাত লেখক। ৬২ বছর পরিপূর্ণ করার আগেই মৃত্যুর পথ বেছে নেন। জীবনকে ছাপিয়ে যাওয়ার মতো ব্যক্তিত্ব আসলে ভিতর থেকে ভঙ্গুর হচ্ছিল ক্রমশ। যে-জীবনশক্তি তাঁর লেখায় হয়ে উঠেছিল প্রাঞ্জল, বাস্তব জীবনে সেটাই ক্ষীণ হয়ে আসছিল ক্রমশ।
হেমিংওয়ে একবার বলেছিলেন যে, তিনি একজন ভাল মানুষ এবং ভাল লেখক দুটোই হতে চান, কিন্তু তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, কোনওটাতেই তিনি সফল হতে পারবেন না। বেশ কিছু সাহিত্য সমালোচক তখনও মনে করতেন, এবং এখনও মনে করেন, তাঁর লেখা আমেরিকান সাহিত্যকে এক নতুন রূপ দিয়েছে যা অনেক অংশেই পরবর্তী প্রজন্মকে লেখক হতে সাহস জুগিয়েছে। কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও ভুললে চলবে না, এমন কিছু বইও তিনি লিখেছেন, যা তখন তো বটেই, এখন আরও বেশি করে পাঠকদের অস্বস্তিতে ফেলবে।
১৯৫৪ সালে যখন ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’-এর জন্য নোবেল পুরস্কার পান, তখন পরপর দু’টি বিমান দুর্ঘটনায় আহত হয়ে সুস্থ হয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন হেমিংওয়ে। পুরস্কার নিতে স্টকহোম-এ যেতে পারেননি। স্বীকৃতিসূচক ভাষণের এক জায়গায় তিনি বলছেন, ‘লেখালিখি করতে হলে নিঃসঙ্গ জীবন বেছে নিতে হয়। লেখকদের সংগঠন সেই নিঃসঙ্গতার ভার কিছুটা লাঘব করলেও, কারোর লেখাকে যে উন্নত করে তোলে তা আমি মানি না। নিঃসঙ্গতা ঝেড়ে ফেলতে পারলে, জনসমক্ষে একধরনের জনপ্রিয়তা তৈরি হয় বটে, কিন্তু এতে লেখার মান ক্ষয়ে যায়। লেখকের কাজ তাকে একাই করে যেতে হয়। মুখোমুখি হতে হয় অনন্তের বা এই সত্যের, যে অনন্ত বলে আসলে কিছুই নেই’।


ফলে, এত বছর পরেও বই-বাজারের সমীক্ষা বলছে, আরনেস্ট হেমিংওয়ের লেখা বইয়ের চাহিদা পাঠকের মধ্যে যথেষ্ট। বিশেষ করে ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ বা ‘ফর হুম দ্য বেল টোলস’-এর। তাঁর লেখা ছোটগল্পেরও পাঠক সংখ্যা নেহাত কম নয়। তাঁর লেখনীর ধরন তো বটেই, তাঁর ‘লারজার দ্যান লাইফ’ ব্যক্তিত্বও মানুষকে আজও আকৃষ্ট করে। আর তাই সমালোচনা ও চর্চার জের সামলে এত বছর পরেও সাহিত্য জগতে হেমিংওয়ের উপস্থিতি ফিকে হয়ে যায়নি।
১৯২৫ সালে ফিটস্জেরাল্ডকে হেমিংওয়ে লিখছেন, ‘I think you should learn about writing from everybody who has ever written that has anything to teach you’— অর্থাৎ যারা আজ অব্দি লেখালিখি করেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের কাছ থেকেই লেখা সম্পর্কে শেখা উচিৎ। লেখক হিসেবে তাঁর যদি কোন উত্তরাধিকার থেকে থাকে, তবে তার প্রকৃত প্রতিফলন এটুকুই।



