বাজার ও ফ্রিদা কাহলো

দিয়েগো রিভেরা সানফ্রান্সিস্কো স্টক এক্সচেঞ্জ আর ক্যালিফোর্নিয়া স্কুল অফ আর্ট-এর মতো আমেরিকার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইমারতে ম্যুরাল আঁকার ডাক পাওয়ার পর ফ্রিদা কাহলো এবং দিয়েগো আমেরিকা যান। সময়টা ১৯৩০-এর শুরুর দিকে। আমেরিকা তখন ‘দ্য গ্রেট ডিপ্রেশন’-এর চাপে ধুঁকছে। দিয়েগো তাঁর ম্যুরালে এই সময়ের কাহিনি জুড়তে থাকেন। ১৯৩২ সালের ডেট্রয়েট ইনস্টিটিউট অফ আর্টের দেওয়ালে আঁকা দিয়েগোর ম্যুরালের কেন্দ্রে রয়েছে সুবিশাল সব মেশিন আর তাকে ঘিরে কাজ করে যাওয়া সাধারণ শ্রমিকের দল। এই সময় ফ্রিদার লেখা চিঠিপত্র থেকে বোঝা যায়, শিল্পী হিসেবে উত্তর আমেরিকা কীভাবে দিয়েগোকে নিয়ে উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল। ২৩ বছরের ফ্রিদাকে তখনও শিল্পী হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া শুরু হয়নি। বস্তুত, ১৯৩৩ সালে ডেট্রয়েট নিউজ কাগজের ‘ভিজিটিং হোমজ অফ ইন্টারেস্টিং পিপল’ কলামে ফ্রিদার বিষয়ে একটি লেখার শিরোনামে ফ্রিদার পরিচয় দেওয়া হয় খ্যাতনামা ম্যুরালচিত্রীর স্ত্রী হিসেবে (‘Wife of the master mural painter gleefully dabbles in works of art’)। সেখানে তাঁর নাম উল্লেখের সম্মানটুকুও জোটেনি তাঁর।

ফ্রিদার খ্যাতি আসে অন্যদিক থেকে— মেক্সিকোর আদিবাসীদের সাজপোশাককে আত্মস্থ করে নির্মিত তাঁর নিজস্ব ফ্যাশন, যাকে তিনি একটি রাজনৈতিক আর সাংস্কৃতিক স্টেটমেন্ট হিসেবে, খুব সচেতনভাবে আমেরিকার বুদ্ধিজীবী মহলে বহন করে নিয়ে যান। তাঁকে ঘিরে গল্প তৈরি হতে থাকে— ট্রাফিক থেমে গেছে তাঁকে দেখে, তিনি কনসার্ট হলে ঢোকার সময় বাজনার আওয়াজ চাপা পড়ে গেছে তাঁর গয়নার উচ্চকিত শব্দে ইত্যাদি। কে জানে, এই-ই হয়তো ফ্রিদা নামক মিথের শুরুয়াত। 

ফ্রিদা ও দিয়েগো রিভেরা। ফ্রিদার তুলিতে

আরও পড়ুন : ‘দ্য টু ফ্রিদাজ’, ব্যক্তিগত যখন রাজনৈতিক! লিখছেন তিস্তা দত্ত…

সানফ্রান্সিস্কোতে ফ্রিদার সঙ্গে আলাপ হয় আভাঁগার্দ আর্টিস্ট ও ফোটোগ্রাফারদের সঙ্গে। এই শহরেই ফ্রিদার কাজ প্রথম আমেরিকায় প্রদর্শিত হয়। ১৯৩১ সালে ফ্রিদা, ক্যালিফোর্নিয়া প্যালেস অফ দ্য লিজিওন অফ অনারে, ‘সানফ্রান্সিস্কো সোসাইটি অফ উইমেন আর্টিস্ট’-এর ষষ্ঠ বার্ষিক প্রদর্শনীতে ‘ফ্রিডা অ্যান্ড দিয়েগো রিভেরা’ (১৯৩১) ছবিটি-সহ অংশ নেন। ডেট্রয়েট শহরে, দিয়েগো যখন তাঁর ২৭ প্যানেলের সুবিশাল ‘ডেট্রয়েট ইন্ডাস্ট্রি ম্যুরালস’ (১৯৩২-’৩৩) তৈরি করছেন, ফ্রিদা তখন ঘুরে বেড়াচ্ছেন শহরের কলকারখানা অঞ্চলে। এখানে থাকাকালীনই তিনি আঁকেন ‘সেলফ-পোর্ট্রেট অন দ্য বর্ডারলাইন বিট্যুইন মেক্সিকো অ্যান্ড দ্য ইউনাইটেড স্টেটস’ (১৯৩২)। আমেরিকা আর মেক্সিকোর সীমানার দু’ধারে পা রেখে গোলাপি গাউন পরে দাঁড়িয়ে আছেন ফ্রিদা, একহাতে মেক্সিকোর পতাকা, আরেকহাতে জ্বলন্ত সিগারেট। লক্ষণীয়, এই ছবিতে ফ্রিদা তাঁর তেহুয়ানা পোশাক ত্যাগ করেছেন। তবে, এখানে হয়তো এই অনভ্যস্থ পোশাক আমেরিকায় তাঁর অস্বাচ্ছন্দ্যের প্রতীক। ছবিতে, ফ্রিদার ডানদিকে মেক্সিকোর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক চিহ্ন, আর বাঁ-দিকে স্কাইস্ক্র্যাপার, ফোর্ড কারখানার ধোঁয়া-ওগরানো চিমনি, আকাশে ভেসে থাকা আমেরিকার পতাকা। একদিকে, দিয়েগো যখন তাঁর প্রতিটি ম্যুরালে যন্ত্রমুখী আমেরিকার শ্রম ও শ্রমিকদের উদযাপন করছেন, তখন দুই বিপরীতমুখী সভ্যতার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একলা ফ্রিদার মানসিক টানাপোড়েন এই ছবিতে স্পষ্ট।

সেলফ-পোর্ট্রেট অন দ্য বর্ডারলাইন বিট্যুইন মেক্সিকো অ্যান্ড দ্য ইউনাইটেড স্টেটস। ১৯৩৩

১৯৩৩ সালে, দিয়েগো নিউ ইয়র্কের রকফেলার সেন্টারে তাঁর ম্যান ইন দ্য ক্রসরোডস ম্যুরালে ভ্লাদিমির লেনিনের প্রতিকৃতি যোগ করার ফলে একটি তুমুল বিতর্ক আরম্ভ হয়। দিয়েগো ওই প্রতিকৃতি সরাতে অস্বীকার করার পর, ম্যুরালটি ধ্বংস করে ফেলা হয়। দিয়েগোর এই ম্যুরালের কাজ চলার সময় ফ্রিদা যে ছবিটি আঁকেন: ‘মাই ড্রেস হ্যাংস দেয়ার’— তাতে তাঁর ‘সেলফ-পোর্ট্রেট অন দ্য বর্ডারলাইন’ কাজটির টানাপোড়েন ও একাকিত্ব আরও জটিলভাবে ও বিশদে পাওয়া যায়। 

মাই ড্রেস হ্যাংস দেয়ার

এই ছবির ঠিক মাঝখানে, একটি নীল হ্যাঙারে ঝুলে আছে ফ্রিদার তেহুয়ানা পোশাকটি, তার একদিকে একটি গ্রিক স্তম্ভের ওপর রাখা একটি কমোড আর অন্যদিকে আরেকটি গ্রিক স্তম্ভের ওপর একটি সোনালি ট্রফি, আর নিচে একটি উপচে পড়া আবর্জনা ফেলার পাত্র। তার পিছনে গিজগিজ করছে কারখানা আর চিমনি, আকাশছোঁয়া ইমারত, ডলারের চিহ্ন, স্ট্যাচু অফ লিবার্টি, জর্জ ওয়াশিংটনের মূর্তি, ফেডারেল হল, টেলিফোন, আমেরিকান অভিনেত্রী মে ওয়েস্টের পিনআপ প্রতিকৃতি দেওয়া বিলবোর্ড, দূরে নিউ ইয়র্ক শহর— এককথায়, ফ্রিদার চোখে যে-সমস্ত চিহ্ন আদতে দ্রুত ক্ষয় হতে থাকা পুঁজিবাদী আমেরিকার প্রতিফলন, তারই একটি কোলাজ এই কাজ। আর এই ক্ষয়ের সামনে দুলে যায় তাঁর তেহুয়ানা পোশাক, যেন যে বহিরাবরণ তাঁর পরিচয়ের ফাসাদকে নির্মাণ করে, যা তাঁর পোলিওতে সরু হয়ে যাওয়া পা, সদ্য গর্ভপাতের আঘাত, একাকিত্ব, বছরের পর বছর নিজের বাড়ি থেকে বহু দূরে থাকার বেদনা লুকিয়ে রেখে এক্সোটিকের মিথ গড়ে তোলে, তাকে খুলে রেখে চলে গেছেন ফ্রিদা।

ছবিটি ফ্রিদা শুরু করেছিলেন আমেরিকায় থাকাকালীন, শেষ করেন মেক্সিকোতে; রকফেলার সেন্টারের ম্যুরাল ভেঙে দেওয়ার পর দিয়েগোর কমিশনের দৌড় শেষ হয়ে যায় আর তাঁরা মেক্সিকো ফিরে আসেন। এই ছবির সঙ্গে ফ্রিদার অন্যান্য ছবির আকাশপাতাল তফাত। প্রথমেই যা চোখে পড়ে, তা হল ফ্রিদার মুখের অনুপস্থিতি। যে শিল্পী বলেন, ‘আমিই আমার মিউজ’, আর যাঁর প্রতিটি ছবিই যেন তাঁর ডায়েরির একেকটি পৃষ্ঠা, একটি দৃশ্যায়িত জীবন, সেখানে তাঁর মুখের অনুপস্থিতি থেকে আসলে কোনও উপস্থিতির আভাস তৈরি হয় না। সেখানে অনুপস্থিতির অর্থ নিজের কাহিনি থেকে নিজেরই অদৃশ্য হয়ে যাওয়া। 

এই অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার কথা থেকে আমরা চোখ ফেরাই ফ্রিদা কাহলো নামের শিল্পীর মুখের বাণিজ্যিকীকরণের দিকে। গত কয়েক বছর ধরে প্রায় গোটা বিশ্বই ‘ফ্রিদাম্যানিয়া’-তে ভুগছে। মূল ধারায় তাঁর জনপ্রিয়তার এই হঠাৎ বিস্ফোরণের উৎস খুঁজতে গেলে আমরা দেখতে পাই, ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত হেয়ডেন হেরেরার লেখা ‘ফ্রিদা: আ বায়োগ্রাফি’, যার তুমুল প্রভাব পড়েছিল গত শতকের নয়ের দশকের নারীবাদী আন্দোলনের ওপর। কিন্তু, পপ আইকন হিসেবে ফ্রিদার জনপ্রিয়তার এই প্রাবল্যের জন্য সম্ভবত সবচেয়ে বেশি দায়ী ২০০২ সালে জুলি টেমর পরিচালিত ও সলমা হায়েক ও আলফ্রেড মোলিনা অভিনীত ‘ফ্রিদা’ চলচ্চিত্রটি। এমনকী, ফ্রিদাকে বিক্রির উপযোগী করে তোলার ক্ষেত্রেও হয়তো এই ফিল্মের অবদান আছে। উদাহরণ, ফিল্মে কমিউনিজমের সঙ্গে ফ্রিদার সম্পর্ককে যেভাবে দেখা হয়েছে। 

ফ্রিদা সেই ১৯২৭ সালেই ইয়ং কমিউনিস্ট লিগের সদস্য ছিলেন। ১৯২৯ সালে, জোসেফ স্তালিনের সমালোচনা করায় দিয়েগোকে মেক্সিকোর কমিউনিস্ট পার্টি বহিষ্কার করে। তার প্রতিবাদে, ফ্রিদা পার্টির সক্রিয় সদস্যপদ ছেড়ে দিলেও কমিউনিজমের ভাবধারায় তাঁর বিশ্বাস যায়নি; তারপরেও ফ্রিদা ও দিয়েগো সক্রিয় ছিলেন ও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সমাবেশ ইত্যাদিতে উপস্থিতও থেকেছেন।

‘সেলফ-পোর্ট্রেট উইথ স্তালিন’ (১৯৫৪, অসম্পূর্ণ)। (ডানদিকে) ‘মার্ক্সিজম উইল গিভ হেলথ টু দ্য সিক’ (১৯৫৪)

১৯৩৭ সালে, তাঁরা তাঁদের কাসা আজুল নামের বাড়িতে নির্বাসিত রাশিয়ান কমিউনিস্ট নেতা লিয়ন ত্রৎস্কিকে আশ্রয় দেন। এছাড়াও, ১৯৪৮ সালে, কমিউনিস্ট পার্টিতে সদস্য হিসেবে আবার যোগ দেওয়ার পর, স্তালিন-বিরোধী ত্রৎস্কির সঙ্গে বন্ধুত্ব ও একটি সংক্ষিপ্ত সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও, ফ্রিদা স্তালিনের অনুসারী হয়ে ওঠেন এবং ‘সেলফ-পোর্ট্রেট উইথ স্তালিন’ (১৯৫৪, অসম্পূর্ণ) নামে একটি ছবিও আঁকেন। তাঁর শেষ কাজগুলির মধ্যে একটি ছিল ‘মার্ক্সিজম উইল গিভ হেলথ টু দ্য সিক’ (১৯৫৪), যেখানে মেডিক্যাল কর্সেট পরে ফ্রিদা দাঁড়িয়ে আছেন আর কার্ল মার্ক্স দুই হাত বাড়িয়ে তাঁকে ঘিরে রেখেছেন। ফ্রিদা ফিল্মে কমিউনিজম তাঁর জীবনব্যাপী বিশ্বাস ও চর্চার বিষয় নয়, তা বরং দিয়েগো আর ত্রৎস্কির সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের রোমান্টিক পশ্চাৎপট মাত্র। ত্রৎস্কি এবং দিয়েগোই এই ফিল্মে সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী, ফ্রিদা শুধুই দিয়েগোর সহযোগী— মাঝেমধ্যে প্যামফ্লেট ছেপে আনেন আর মিছিলে গিয়ে দাঁড়ান। ফ্রিদা অনেক বেশি মন দেন তাঁর অসুস্থতা, এবং অস্থির বৈবাহিক ও রোমান্টিক সম্পর্কের ওপর। জীবনে ও শিল্পে, প্রথাবিরোধী হিসেবে দর্শকের মনে ফ্রিদাকে প্রতিষ্ঠা করলেও, তাঁর চরিত্র, ব্যক্তিত্ব ও জীবনের জটিলতাকে অতি-সরলীকরণের দায়িত্ব হয়তো, সামান্য হলেও, এই ফিল্মের উপরেই বর্তায়। প্রসঙ্গত, এই চলচ্চিত্রের সূত্র ছিল হেয়ডেন হেরেরার লেখা জীবনীটি এবং ২০০২ সালের একটি সংস্করণের প্রচ্ছদে, আসল ফ্রিদার বদলে সলমা হায়েকের মুখের ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল।  

এই ফিল্মটি অসংখ্য পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন ও দর্শক আর সমালোচক মহলে সমান জনপ্রিয়তা পাওয়ার মাত্র তিন বছর পর, ২০০৫ সালে, ভেনেজুয়েলার এন্টারপ্রিনিউর কার্লোস দোরাদো ফ্রিদা-র বোন, ক্রিস্টিনার মেয়ে, ইসোল্দা পিনেদো কাহলো-র কাছ থেকে ফ্রিদার নাম ও চেহারা নিয়ে ব্যবসা করার অধিকার পান। শুরু হয় ‘ফ্রিদা কাহলো কর্পোরেশন’। তারপর থেকে জুতো, জামাকাপড়, সুগন্ধ থেকে শুরু করে টেকিলা পর্যন্ত অসংখ্য পণ্যদ্রব্যে ফ্রিদার নাম ও মুখের ছবি ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে চলেছে এই কর্পোরেট সংস্থা। ২০১৮ সালের মার্চ মাসে, এই কর্পোরেশনের অনুমতি নিয়েই বাজারে ছাড়া হয় বার্বির ‘ইনস্পায়ারিং উইমেন সিরিজ’-এর ফ্রিদা পুতুল। উল্লেখযোগ্য, ফ্রিদার সযত্নলালিত জোড়া ভ্রু, আর হালকা গোঁফের রেখা, সৌন্দর্যের পাশ্চাত্য আদর্শের বিরুদ্ধে তাঁর নিজস্ব এক বয়ান তৈরি করেছিল এবং এগুলিকে তিনি নিজের প্রতিকৃতি আঁকার সময় সচেতনভাবে অতিরঞ্জিত করতেন। ফ্রিদা বার্বির মুখে সেই জোড়া ভ্রু অনেক পোষ মানানো আর গোঁফের তো কোনও অস্তিত্বই নেই।   

এবং বলাই বাহুল্য, ফ্রিদাকে নিয়ে বৈধভাবে চলা ব্যবসার পাশাপাশি, ভোগবাদের নিয়ম অনুযায়ী, গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য ছোট, বড় ও মাঝারি ব্র্যান্ড, যেগুলি, হয়তো বা বিনা অনুমতিতেই, ফ্রিদার মুখ বা তাঁর আকা ছবিকে নানা মাধ্যমে ছেপে, বিক্রি করে চলেছে। এই কারণেই, বিশ্ব জুড়ে ফ্রিদা একাই হয়ে উঠেছেন এক বিশাল লাভজনক বাজার। ডায়েরির মলাট, ব্যাগ, গয়না, চাবির রিং, ফ্যাশন শোয়ের ক্যাটওয়াক— সর্বত্র ফ্রিদার চেনা কয়েকটি মুখ আর হাতে গোনা গুটিকতক ছবিই ঘুরেফিরে ব্যবহৃত হয়ে চলে, ফ্রিদার একটি নির্দিষ্ট সংস্করণ কিউরেটেড হতে থাকে। ঠিক যেমনভাবে ভোগবাদী, ক্ষয়িষ্ণু আমেরিকাতে ফ্রিদা তাঁর সঠিক জায়গা খুঁজে পান না, তেমনই ফ্রিদা-কেন্দ্রিক এই বিশাল বাজারে ‘মাই ড্রেস হ্যাংস দেয়ার’-এর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বয়ানও কোনও ডায়রির মলাটে জায়গা পায় না। আর এর ফলে, তেহুয়ানা পোষাক আর জমকালো গয়না পরা এক্সোটিক পরিচয়ের বাইরে যা প্রায় বিস্মৃত থেকে যায়, তা হল, বাইরেশিয়াল, বাইসেক্সুয়াল, প্রতিবন্ধী ও আজীবন আদ্যন্ত রাজনৈতিক একজন শিল্পীর পরিচয়। 

এখন প্রশ্ন হল, কেন? 

কয়েক বছর আগে ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক মাধ্যমে ফরাসি গায়িকা জেইনের মাকেবা গানটি ‘ট্রেন্ড’ হতে শুরু করে। রান্না থেকে শুরু করে মেক-আপ, ট্রাভেল, আদুরে কুকুরের রিল সব কিছুর পিছনেই গানের কোনও না কোনও অংশ বাজানো শুরু হয়। এর ফলে যা হয়, দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হওয়া, আজীবন নির্বাসিত গায়িকা মাকেবাকে লোকে ভুলে যেতে থাকে। ঠিক যেমন টি-শার্টের ওপর চে গ্যেভারার মুখের ছাপ এত চেনা হয়ে দাঁড়ায় যে, বুকে গুলি খাওয়া চে-র মৃতদেহের ফোটো আর সেই দেহের ওপর হওয়া অকথ্য অত্যাচারের কাহিনি মানুষ ভুলে যায়। ঠিক যেমন, ভ্যান গখের ‘স্টারি নাইট’ পেন্সিলের বাক্স, ডায়রির মলাটে ছাপা হতে-হতে সারা জীবনে একটামাত্র ছবি বিক্রির হতাশা, মানসিক ভারসাম্য হারানো আর জীবনের শেষে কাক ওড়া ভুট্টাক্ষেত এঁকে, নিজের মাথায় বন্দুক রেখে গুলি চালানোর গল্প রোমান্টিসাইজড হয়ে গভীরতর প্রশ্নকে ভুলিয়ে দেয়। মাকেবা, চে, ভ্যান গখ ও ফ্রিদা— চার জমানার চারজন মানুষ একটি সাধারণ একমাত্রিক পরিচয়ে এসে মিলে যান। কারণ, প্রতিবাদকে, বিপ্লবকে, উল্লঙ্ঘনকে ছেঁটেকেটে, ছেপে দিলে, সে আর প্রতিবাদ থাকে না; রাশ টানা প্রাত্যহিক হয়ে যায়। 

ফ্রিদার এই কাহিনি শেষ করা যাক একটি ছবি দিয়ে। গুয়াতেমালার মিলিটারি ক্যু-এর প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নিয়েছেন হুইলচেয়ারে বসা ফ্রিদা। মৃত্যুর মাত্র এগারো দিন আগে তোলা তাঁর এই ছবির বর্ণনা দেওয়ার হয়তো আর প্রয়োজন নেই।