বিদায় বাউন্ডুলে

ঘুমোও বাউন্ডুলে। সুমনের গান। চৌকো ক্যাসেট। নাইন্টিফাইভ। কসমোপলিটান কলকাতার গায়ে একটু-একটু করে লাগছে গ্লোবালাইজেশনের রং। সুমনের দরাজ গলায় মধ্যবিত্ত বাড়িতে বাজছে—

‘থেমে যেতে যেতে একবার কোন মতে;
জোর করে যদি একবার হেঁটে যেতে;
বেঁচে নিতে যদি একবার বড় ভাল হত…’

আসলে বেঁচে নেওয়া হয় না সবার। হতে পারত। হতে চেয়েছিল। হয়নি। সময়ের একটা নিজস্ব গন্ধ থাকে। দশকের। শতাব্দীর। সেসব ইটারনাল গন্ধ মেখে এসে পড়ে অমলকান্তি। সে যে রোদ্দুর হতে চেয়েছিল— সেই চাওয়াটুকুই ভুলে যায় একদিন। একযুগের নায়ক এসে থতমত খায় অন্য যুগে। টাইম-ট্রাভেল। সবার বরাতে নেই। সিলভিয়া প্লাথ। লেখেন— দ্য ডিউ মেকস আ স্টার— শিশিরে-শিশিরে ঢেকে যায় তারকার মায়াবী কিশোর-মাঠ। তবু ক্ষীণ জ্বলে সে। মনের ভেতরে খেলে যায়। সারাদিন। সারারাত। একাকী। অস্তিত্বের জানান দেওয়া কেবল— মাঝেমধ্যে সাড়া দেয় নেইমার দ্য সিলভা স্যান্টোস।

আরও পড়ুন: ইরানের নিরন্তর যুদ্ধ ছিল মাঠের বাইরেও! লিখছেন রোদ্দুর মিত্র…

উচ্ছৃঙ্খল, বোহেমিয়ান, সাও পাওলো-ওয়ান্ডার কিড, ব্রাজিলের ফুটবল বদলে যাওয়ার পর প্রথম পোস্টার বয়। এসবের অনেক-অনেক আগে একটা ব্রাজিল ছিল। যেখানে নেইমার ছিল না। থাকতে পারত। কিন্তু অদ্ভুতভাবে ছিল না।কলকাতা শহরের পথে— পুরনো-নতুন মুখ ঘর-ইমারত হয়ে এসে পড়ে সে ব্রাজিল। আচমকা ঝলমলে হয়ে যায় ফ্যাকাশে রাস্তাঘাট। রোমারিও-বেবেতো-রোনাল্ডো। এসে পড়ে গাউচো। লম্বা চুল। ডিভাইন একটা হাসি। লাতিন আমেরিকান মিউজিক, কাকা-রিভাল্ডো, শোভাবাজারের মোড় থেকে শ্যামবাজার পাঁচমাথা অবধি সাপের মতো গলিতে ডাঁই বাসনপত্র, রোববারের মাংসের ঝোল আর লাক্স সাবানের গন্ধ পেরিয়ে ব্রাজিল এসে পড়ে। ঝড়ের মতো। বিধ্বংসী ব্রাজিল। ডিভাইন পনিটেল বাজ্জিওর কান্না— বেখাপ্পা একটা কড়কড়ে বাজের মতো ক্ষিপ্র জিনেদিন জিদান! অথচ তিনবার পরপর ফাইনালে সেই ব্রাজিল-ব্রাজিল-ব্রাজিল— হলদে-সবজে উপনিবেশে এসে যায় দু-দুটো বিশ্বকাপ। কাফুর হাতে সোনার প্রদীপ।

এই জয়ী ব্রাজিল, এই ‘সব পেয়েছির দেশ’, এই সেলেকাও, এই জোগো বোনিতোর প্রাইম একটা দশক স্ক্র‍্যাপবুকে থেকে যায়। পাতা উল্টোলে বদলে যায় চারপাশ। ব্রাজিলীয় সভ্যতার ধুলোজমা প্রাসাদের কাঠামোর ভেতর একা দাঁড়িয়ে থাকেন নেইমার। চারপাশ খালি। একদম খালি। তাঁর দু’পায়ে সময় যেন বেঁধে দিয়েছে ব্রাজিল সভ্যতার পূর্বদশকের মাটি। চিনাঘাস। ইনস্টেপ-ডান পায়ে নিয়ে বাঁ-পায়ের আউটস্টেপে ছিটকে দেওয়া মার্কিং ম্যান— ওই ঝিলিক! স্পার্ক! মেজকাকা সেদিনও বলেছিল। আজও বলে। ওসব ভাঁজ ফালতু। ওভাররেটেড খেলা। কিস্যু জেতেনি। আমাদের সময়ে হলে ব্রাজিলে কলকে পেত না।

সময়। সময় বড় অদ্ভুত জিনিস। একটা রেকর্ড ট্রান্সফার। সাও পাওলো। বার্সেলোনা। মেসি-জাভি-ইনিয়েস্তার সাজানো বার্সেলোনা। পেপ গুয়ার্দিওলার ফুটবলীয় যক্ষপুর। তিকি-তাকার ল্যাবরেটরি। নেইমার? এই পজেশনাল ফুটবলের প্রেশারকুকারে নেইমার? লিওনেল মেসি, ফলস নাইন, পেপ বলেছেন— ‘ডোন্ট ট্রাই টু ডেসক্রাইব হিম— জাস্ট ওয়াচ হিম-জাস্ট ওয়াচ হিম…’ সে অন্য জগৎ। অন্য জিনিস। তার সঙ্গে কি আর তুলনা চলে?

তবু, নেইমার এসে যায়। ‘কোন ক্ষ্যাপা শ্রাবণ ছুটে এল, আশ্বিনের এই আঙিনায়’— তারপর এলোমেলো করে দেয় সব৷ মেসির বুকে আছড়ে পড়ে গোল ক’রে। মাথায় ফেট্টি বেঁধে সুয়ারেজ-মেসির কাঁধে-কাঁধ রেখে দুনিয়াকে দেখায় একটা ব্র‍্যান্ড— ‘দেখো আমি, আমি নেইমার, আমি খেলছি, সারা শরীরে আমার ব্রাজিল, আমার পাশে আর্জেন্টিনা, আমার পাশে উরুগুয়ে, আমরাই লাতিন আমেরিকা! আমরাই নেপলসের উত্তপ্ত ভিসুভিয়াসের পাশে ফুটে থাকা শেষ ফুল…।’

নেইমার পারেন না। কয়েকটা বছর, সোনায় মোড়া ট্রেবল, গোলের ফুলঝুরি, বিস্ময়, ব্যালঁ নমিনেশন— ওইটুকুই। আবার একটা রেকর্ড ব্রেকিং ট্রান্সফার— না মেসি নয়, আমি, আমিই শ্রেষ্ঠ। মেসির চেয়ে কমপ্লিট প্লেয়ার আমি— ভুল তো কিছু বলেনি ব্রিটিশ মিডিয়া। প্রতিভায় তাঁর সমতুল্য যে তিনি নিজেই! দু’-পায়ে শট। লেফট ফরওয়ার্ড থেকে নাম্বার টেন— সব, সব কিছু, একাই! মারাদোনার একটা নেপলস ছিল। খিড়কি থেকে সিংহদুয়ারে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা, আমারও তো কিছু কম নেই। কাতালান ক্লাবের কোটি-কোটি সমর্থকের রোষ আছড়ে পড়ে। হাসিমুখে সেসব বিষপান করেও নেইমার খেলেন। একেকটা দিন, একেকটা ট্যাকেল, সিনবোনের পাশে জমাট রক্ত, এসিএল ছিঁড়ে হাসপাতালের বেড, কোমরের ওপর শিরদাঁড়া ভেঙে যায়, যন্ত্রণা, আমাদের বুকে বিঁধে থাকা বিচ্ছেদযন্ত্রণার ওপর বন্ধুর মতো নেইমারের মুখ। দু’হাতে ঢাকা-কান্না।

মেজকাকা কেবল বলে যেত, ‘যত্ত নাটক! খেলার চেয়ে নাটক বেশি…’— কে না বলেছে? সব্বাই। একটা পায়ের ছবি ভাইরাল হয়। হাঁটুর তলা থেকে শুধু সেলাই-এর দাগ। মানচিত্রের মতো আঁকাবাঁকা। সে ব্যথা, সে যন্ত্রণা ব্রাজিলের বুকে বিঁধে থাকে। সব ফুরিয়ে যাওয়ার আগে, ওই ক্ষীণ আলো, নেইমার একবার ফিরবে। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সেই লাইনটা— ‘আষাঢ়ের বৃষ্টি শেষ হয়ে গেলো শালের জঙ্গলে’; সেই শালের জঙ্গলই কি সময়ের গর্ভগৃহ? যেখানে বৃষ্টি-চোখের নোনাজল-যন্ত্রণা সবটুকুই ফুরিয়ে যায়? শেষ হয়ে যায় একেবারে?

ব্রাজিল বিশ্বকাপে নামার আগে ফুরিয়ে যাওয়া-বুড়িয়ে যাওয়া নেইমারের নাম যখন আন্সেলোত্তি নিলেন, তামাম দুনিয়ায় ঝড়! একটা হেরো, একটা ফেইলড ফুটবলারের নামটুকু ব্রাজিল সমর্থকরা আঁকড়ে ধরছেন— সাফল্যের আশায় নয়, শেষবার ওই বুটে লেগে থাকা ব্রাজিলের ঘ্রাণ-ফুরিয়ে যাবার আগে-একবার যদি… ‘থেমে যেতে যেতে’, একবার যদি…

নেইমার খেললেন। সামান্য। একটা দশ-বিশ মিনিটের খেলা। যেন, বহুদিনের পড়ে থাকা আতসবাজি। তবু যার বুকে এককালে ছিল তাজা বারুদ। মুখে আগুন দিলে একটু ডানা ঝাপটায় সে এখনও। নাইল্যান্ড পেনাল্টি সেভ করে, একটার পর একটা অব্যর্থ গোল বাঁচিয়ে ফুঁসছেন। ব্রাজিলের পেনাল্টি। বিশ্বকাপে নেইমারের শেষ টাচ। বলে। নেইমার দাঁড়ালেন। নাইল্যান্ড জানেন না কী করছেন তিনি, কাকে ছুড়ে দিচ্ছেন অবজ্ঞা! কাকে দাঁড় করাচ্ছেন সময়ের আয়নার সামনে? নেইমার? নেইমার চুপ। শান্ত। সেই চেনা দুটো পা— একটু শরীরে কাঁপুনি, একটা পজ। নাইল্যান্ডের ফড়িঙের ডানার মতো ঝাপটাতে থাকা পা দুটো নড়তে পারল না। কেবল ছটফট করে গেল। বল জালে।

ওই শেষ! তুবড়ির একটা আলোর কুচি খসে পড়ল যেন। বুকে আঙুল দিয়ে শেষবার, ‘দেখ, এটাই আমি, আমার বুকে এখনও কোপাকাবানার কুসুম-কুসুম উষ্ণতা। আমার পায়ে, শুধু আমার পায়েই বাঁধা ব্রাজিলীয় ফুটবলের শেষ মাটি। আমি এখনও পারি ইউরোপের ঔদ্ধত্য চুপ করিয়ে দিতে, বেলজিয়ামের থিবো কুর্তোয়া জানে, কার্যত পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে আমি শুইয়ে দিতে পারি ইউরোপের তাবড় ডিফেন্স…’

না। আর পারে না। নেইমারের বুকের আগুন নিভে যায় শেষমেশ। অমলকান্তি ভুলে যায়, সে একদিন রোদ্দুর হতে চেয়েছিল। ভুলে যায়, একদিন তাঁরই দু’-পায়ে কোটি-কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে রাজি ছিল ইউরোপ। সে কেবল এটুকুই সাড়া দিতে চেয়েছিল— ‘আমি আছি…’— ওই একটা স্পটকিক, আলতো টাচ, নাইল্যান্ডকে জবাব, ব্যস! ফুটবলের সর্বোচ্চ সম্ভাবনার নিষ্ঠুর পরিসমাপ্তির অস্থিঘটে পড়ে যায় শেষ ফুল। নেইমার ফুরিয়ে যান। ছিঁড়ে যায় ব্রাজিলের ফুটবলের একটা সুতো। যে জোগো বোনিতোর সুগন্ধে জুড়ে দিতে চেয়েছিল দুটো প্রজন্মকে। শেষ অবধি কিছুই পারেনি।

নয়ের দশক, ব্রাজিল, কসমোপলিটান কলকাতা ভেঙে যায়। থেকে যায় ওই গানটুকু—

‘থেমে যেতে যেতে একবার জোর করে
নিতে যদি তুমি নিঃশ্বাস প্রাণভরে,
বেঁচে নিতে যদি একবার বড় ভালো হত।’

ঘুমোও বাউন্ডুলে। অনেক যন্ত্রণার পর ব্রাজিলের রঙিন জীবন হাতছানি দিক ফের। তবু, একবার। যদি একবার… এটুকু আফশোসই সময়ের কাছে ব্রাজিলের সেই বোহেমিয়ান প্রজন্মটার শেষ ঋণ!