আজকের দিনে দাঁড়িয়ে কোনও তথ্যের প্রয়োজন হলে আমরা কী করি? পকেট থেকে স্মার্টফোন বের করে সার্চবারে দুটো শব্দ টাইপ করি। স্ক্রিনে মুহূর্তের মধ্যে ভেসে ওঠে লাখ-লাখ ফলাফল, যার নীচে বন্ধনীতে লেখা থাকে ০.২৩ সেকেন্ড। তথ্যের এই অতিপ্রাকৃত গতিতে আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু আজ থেকে প্রায় দেড়শো বছর আগে, যখন ইন্টারনেট ছিল না, উইকিপিডিয়া ছিল না, এমনকী, সাধারণ মানুষের ঘরে ইলেকট্রিকের আলো পর্যন্ত পৌঁছয়নি, তখন এই বাংলায় বসে একজন মানুষ একাকী এক সার্চ ইঞ্জিন বানানোর খেলায় মেতেছিলেন।
গুগল বা চ্যাটজিপিটির নেপথ্যে কাজ করে কোটি-কোটি টাকার সার্ভার, জটিল গাণিতিক কোড আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যালগরিদম; আর নগেন্দ্রনাথ বসুর ব্যাক-এন্ডে কাজ করেছিল স্রেফ একটা জিনিস— এক আদিম, অনমনীয় স্পৃহা। এই স্পৃহার বীজটি লুকিয়ে ছিল উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের পরিমণ্ডলে। রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যে আধুনিক গদ্য ও মননের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন, নগেন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরি। তবে নবজাগরণের আলো যখন মূলত উচ্চবিত্ত শ্রেণির মধ্যে বা কলকাতার নাগরিক সমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল, ঠিক তখনই নগেন্দ্রনাথ অনুধাবন করেছিলেন যে, প্রকৃত জাগরণের জন্য দরকার একটি জাতির সামগ্রিক আত্মপরিচয় সংগ্রহ। তিনি দেখালেন, নবজাগরণ কেবল ইউরোপীয় ভাবাদর্শের অনুকরণ নয়; বরং নিজের শিকড়কে চেনার এক নিরবচ্ছিন্ন বৌদ্ধিক প্রক্রিয়া।
১৮৬৬ সালের ৬ জুলাই হুগলি জেলার এক সাধারণ পরিবারে নগেন্দ্রনাথ বসুর জন্ম হয়েছিল। প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন আর পাঁচজন ভাবুক যুবকের মতোই রোমান্টিক। সাহিত্যের প্রতি প্রবল আকর্ষণে ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন, শেক্সপিয়রের হ্যামলেট বা ম্যাকবেথ অনুবাদে থাকতেন মগ্ন। তাঁর মধ্যে একজন খাঁটি শিল্পীর সত্তা ছিল। কিন্তু এই ব্যক্তিগত রোমান্টিকতার আরামদায়ক জগৎ থেকে এক চরম নৈর্ব্যক্তিক ও কঠোর জ্ঞানসাধনার দিকে তাঁর যে উত্তরণ ঘটেছিল, সেটাই ছিল তাঁর জীবনের প্রধান বিস্ময়। একটা সময়ে এসে তিনি এক গভীর দার্শনিক উপলব্ধির মুখোমুখি হন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, স্রেফ কবিতা বা নাটকের ক্ষণস্থায়ী ভাবাবেগে একটা পরাধীন, ঔপনিবেশিক শাসনাধীন জাতির মেরুদণ্ড সোজা হতে পারে না। একটা জাতির যদি নিজস্ব তথ্যের দলিল বা নিজস্ব জ্ঞানভাণ্ডার না থাকে, তবে তার শিল্প-সংস্কৃতিও বেশিদিন টিকবে না। কবিতা বা নাটক লেখার মধ্যে একজন লেখকের ব্যক্তিগত ‘আমি’ কাজ করে; কিন্তু বিশ্বকোষ রচনার ক্ষেত্রে সেই ‘আমি’-কে বদলে ফেলতে হয় একটি গোটা জাতির সমষ্টিগত সত্তায়। নিজের সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য, ঘুম, বিশ্রাম এবং কবিখ্যাতিকে বিসর্জন দিয়ে তিনি নিজের ভেতরের রোম্যান্টিক কবিসত্তাকে রূপান্তরিত করলেন এক নিষ্ঠাবান গবেষকে। ব্যক্তি নগেন্দ্রনাথ হয়ে উঠলেন এক আস্ত প্রতিষ্ঠান। এই রূপান্তরের ভেতরেই লুকিয়ে আছে তাঁর কাজের গভীর সামাজিক-ঐতিহাসিক গুরুত্ব। তিনি শুধু শব্দ বা তথ্যের শুষ্ক অভিধান তৈরি করেননি, বরং বাংলার বিভিন্ন জাতি, উপজাতি, বর্ণ এবং সামাজিক বিন্যাসকে নথিবদ্ধ করেছিলেন। এটি ছিল সমাজকে ওপর থেকে নয়, বরং একেবারে মাটি থেকে দেখার এক ঐতিহাসিক প্রয়াস। তাঁর সংগৃহীত পুঁথি, তাম্রশাসন, শিলালিপি ও প্রাচীন মুদ্রা কেবল কোনও রাজবংশের বংশলতিকা নয়, ছিল বাংলার সামাজিক ইতিহাসের বিবর্তনের জীবন্ত দলিল। ঘরের বন্ধ দরজা পেরিয়ে অজানার উদ্দেশে পাড়ি দেওয়ার সেই অন্তহীন ব্যাকুলতাই তাঁর কাজকে এক গভীর রোমান্টিক মাত্রা দিয়েছিল।
নগেন্দ্রনাথ যেন কেবল তথ্য সংগ্রহ করছিলেন না; তিনি অজানার দিকে মানুষের চিরন্তন অভিযাত্রারই এক সাধক। নগেন্দ্রনাথ সন্ধান করছিলেন, ইতিহাসের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া পুঁথি, বিস্মৃত জনপদ, লোকস্মৃতি এবং জ্ঞানের অনাবিষ্কৃত অঞ্চল। গুগলের নিজস্ব ‘ক্রলার’ আছে, যা ইন্টারনেটের অলিগলিতে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করে। নগেন্দ্রনাথের ক্রলার ছিল তাঁর নিজের পা দুটো। এই ডেটা সংগ্রহের জন্য তিনি ভারতের এক প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশে ছুটে বেরিয়েছেন। গ্রামের ভাঙা সিন্দুক, গোয়ালঘরের মাচা বা মন্দিরের অন্ধকার কোণ থেকে তিনি উদ্ধার করেছেন তাম্রশাসন, শিলালিপি আর জরাজীর্ণ পুঁথি। আজ আমরা যাকে ‘সার্চ কোয়েরি’ বলি, তখন তার নাম ছিল চিঠিপত্র আর পায়ে হাঁটা ক্লান্তিহীন পথ।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ যেদিন প্রথম খোলা হয়েছিল, তার মূল ভিত্তিই ছিল নগেন্দ্রনাথের সংগৃহীত এই ব্যক্তিগত পুঁথিশালা।আধুনিক ঐতিহাসিকদের বিশ্লেষণে নগেন্দ্রনাথ বসুর এই নিরলস গবেষণার প্রকৃত গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দীনেশচন্দ্র সেন-সহ পরবর্তী সময়ের বহু গবেষক একবাক্যে স্বীকার করেছেন যে, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস রচনার প্রাথমিক উপাদান জোগানোর ক্ষেত্রে নগেন্দ্রনাথ ছিলেন অদ্বিতীয়। তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব, ইতিহাসচর্চাকে তিনি কেবল রাজা-বাদশার যুদ্ধবিগ্রহ বা রাজপ্রাসাদের চার দেয়াল থেকে মুক্ত করে সাধারণ মানুষের লোকায়ত ঐতিহ্যের আঙিনায় নিয়ে এসেছিলেন। তিনি কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের পেশাদার ইতিহাসবিদ ছিলেন না ঠিকই, কিন্তু তথ্য যাচাই, উৎস-সমালোচনা এবং প্রমাণনির্ভর গবেষণার প্রতি তাঁর নিষ্ঠা সমকালীন বহু পণ্ডিতের শ্রদ্ধা কুড়িয়েছিল।এই সাধনার সবচেয়ে বড় ফসল ছিল তাঁর সম্পাদিত ‘বিশ্বকোষ’। প্রায় সাতাশ বছরের অক্লান্ত শ্রমে বাইশ খণ্ডে বিস্তৃত এই গ্রন্থ কেবল একটি রেফারেন্স বই নয়, এটি ছিল বাঙালির আত্মপরিচয়ের এক বিশাল মানচিত্র। ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে ইউরোপীয় জ্ঞানব্যবস্থা এবং ‘এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা’-র মতো বিশ্বকোষগুলোর প্রভাব এমন ছিল যে উপনিবেশের মানুষদের অনেক সময়ই বোঝানো হতো, সুসংগঠিত জ্ঞানচর্চা কেবল পাশ্চাত্যের একচেটিয়া সম্পদ।

ভারতীয়রা নাকি ইতিহাসের চেয়ে পুরাণে, যুক্তির চেয়ে কল্পনায় বেশি স্বচ্ছন্দ। নগেন্দ্রনাথ বসুর বিশ্বকোষ রচনা সেই ধারণার বিরুদ্ধে এক নীরব কিন্তু গভীর প্রতিবাদ।বিশ্বকোষের পাতায়-পাতায় বাঙালি প্রথম জানতে পারে, তাদের নিজস্ব বিজ্ঞান, গণিত, শিল্প, পুরাণ এবং ইতিহাসে সে কতখানি সুসংবদ্ধ এবং সমৃদ্ধ। বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য, ভূগোল, শিল্পকলা, সমাজজীবন, জীবনী— সবকিছুই তিনি সুসংবদ্ধভাবে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। বিশ্বকোষ রচনার পাশাপাশি তিনি ‘রসমঞ্জরী’, ‘চৈতন্যমঙ্গল’-সহ একাধিক দুর্লভ পুঁথি সম্পাদনা করেছিলেন, যা বাংলা সাহিত্য ও ইতিহাসচর্চাকে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দিয়েছিল। বাঙালির ঘরের আলমারিতে বাইশ খণ্ডের এই বিশ্বকোষ স্রেফ কিছু বইয়ের সমষ্টি ছিল না; তা ছিল ইউরোপীয় উপনিবেশের বিরুদ্ধে এক নীরব মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধজয়।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ যেদিন প্রথম খোলা হয়েছিল, তার মূল ভিত্তিই ছিল নগেন্দ্রনাথের সংগৃহীত এই ব্যক্তিগত পুঁথিশালা।আধুনিক ঐতিহাসিকদের বিশ্লেষণে নগেন্দ্রনাথ বসুর এই নিরলস গবেষণার প্রকৃত গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আজকের প্রজন্ম সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ইনফিনিট স্ক্রোল’ করতে-করতে ডোপামিন খোঁজে। নগেন্দ্রনাথের জীবনেও একটা অন্তহীন যাত্রা ছিল, তবে তা কাগজের পাতায়। ‘অ’ থেকে শুরু করে ‘ক্ষ’ পর্যন্ত বাংলা ভাষার যাবতীয় জ্ঞানকে বাইশটি খণ্ডে বন্দি করার এই দীর্ঘ যাত্রাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা যায় ‘হাইপারফোকাস’। পার্থক্য হল, এই একাগ্রতা নগেন্দ্রনাথের কোনও ক্ষণস্থায়ী নেশা ছিল না; ছিল আজীবনের ব্রত। মনে রাখবেন, গুগল নিজে কোনও বিষয়বস্তু লেখে না; সে শুধু অন্যের তথ্যের লিংক দেয়। কিন্তু নগেন্দ্রনাথের ট্র্যাজেডি আর কৃতিত্ব এখানেই— তিনি একাধারে সার্চ ইঞ্জিন, আবার একাধারে বিষয়বস্তু নির্মাতা। তথ্য জোগাড় করা, সত্যতা যাচাই করা, সম্পাদনা করা এবং ছাপার অক্ষরে সাজানো— এই পুরো প্রক্রিয়াটা তিনি একা হাতে করেছেন। কোনও ডিজিটাল ডেটাবেস বা মেমরি চিপ ছাড়াই তিনি মনে রাখতেন কোনও পুঁথির পর কোনও তাম্রশাসনের রেফারেন্স বসবে। এই অবিশ্বাস্য অবদানের জন্যই তাঁকে ‘প্রাচ্যবিদ্যা মহার্ণব’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
১৯৩৮ সালের ১১ অক্টোবর এই নিষ্ঠাবান জ্ঞানসাধকের জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু সময় যত এগিয়েছে, তাঁর কাজের গুরুত্ব যেন আমাদের কাছে ততই বেড়েছে। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে তথ্যের অভাব নেই; বরং তথ্যের অতিভারই আমাদের প্রধান সমস্যা। মুহূর্তে হাজারো তথ্য পাওয়া যায়, অথচ গভীর মনোযোগ ক্রমশ দুর্লভ হয়ে উঠছে। আজ আমরা যখন সোশ্যাল মিডিয়ার স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে মনোযোগের খণ্ডতায় ভুগছি, তখন একজন মানুষের একটানা সাতাশ বছর ধরে একই বিন্দুতে মনোনিবেশ করার এই অলৌকিক একাগ্রতা আমাদের থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে। এই কারণেই উত্তর কলকাতায় তাঁর বসতভিটার একটি গলির নাম হয়েছে ‘বিশ্বকোষ লেন’।
কিন্তু আজ আমাদের মানসিক মানচিত্রে সেই লেনের হদিশ কতটুকু আছে? হয়তো খুব বেশি নয়। অথচ সেই ছোট্ট গলির সামনে দাঁড়ালে মনে পড়ে যায়, একটি সভ্যতার শক্তি কেবল তার প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না; সে বেঁচে থাকে তার স্মৃতি, মনন এবং দীর্ঘ সাধনার মধ্যে। প্রযুক্তি তথ্যকে দ্রুত পৌঁছে দিতে পারে, কিন্তু জ্ঞানের সৃষ্টি আজও মানুষের শ্রম, একাগ্রতা এবং অবিচল নিষ্ঠার ফল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, মানুষের ভেতরের খাঁটি জেদ আর রক্ত জল করা সাধনার কোনও বিকল্প এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। তথ্যের এই তাৎক্ষণিক যুগেও নগেন্দ্রনাথ বসুর সেই নিঃসঙ্গ সাধনা আসলে গভীর ও মগ্ন মননের এক নীরব, চিরন্তন প্রতিবাদ।




