ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক

ফ্রিদা বলতে কী বুঝি আমরা? একজন আর্টিস্ট, যাঁর একই অঙ্গে কত রূপ— প্রতিবন্ধকতা উচ্চকিত মেক্সিকান-ইন্ডিজেনাস ফ্যাশন, পরকীয়া, উভকামিতা; ফোটোগ্রাফে যাকে দেখা যায় সিগারেট হাতে। এছাড়াও তিনি টেকিলা পান করতে পছন্দ করতেন। লাল লিপস্টিক আর শালিমারের মতো ফরাসি সুগন্ধ তাঁর নিত্য পরিধেয়। সব মিলিয়ে গসিপ আর মায়া-র মিশ্রণে গড়ে ওঠা এক মিথিকাল মানবী, যাঁর জীবনযাপন সিনেম্যাটিক, যিনি হতে পারেন পাশের বাড়ির মেয়ে, যাঁর মতো আমিও হতে চাই কিন্তু মনে মনে; অধরা ইচ্ছের মতো ব্র্যাকেটের আড়ালে। ব্যাকেটের বাইরে ঝুলে থাকে লাল গোলাপগুচ্ছ, কেয়ারি করা চুল, জোড়া ভুরু, তীক্ষ্ণ চোয়ালের রেখা-সহ আবেগহীন এক মুখচ্ছবি, না কি মুখোশ, না কি স্বয়ং ফ্যাশন আইকন ফ্রিদা-ই? 

‘আমি নিজেই আমার মিউজ।’ নিজের সম্পর্কে তাঁর সহজ স্বীকারোক্তি। অসুস্থতার কারণে অনেকটা সময়ই একা বিছানায় শুয়ে দিন কাটাতে হত তাঁকে। প্রথমে ইজেলের সামনে আর পরে সিলিং-এ আয়না বসিয়ে নিজেকে স্টাডি করতে করতে শুরু হয় তাঁর শিল্পী হিসেবে পথ চলা। ফ্রিদা নিজেই নিজের শিক্ষক। অচিরেই তিনি নিজেকে প্রথম, দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে দেখতে শেখেন, ক্যানভাসে বা ক্যানভাসের বাইরে, কখনও নিজের দৈনন্দিন বাস্তব অভিজ্ঞতা বা নিজের আকাঙ্ক্ষা অনুসারে। 

ফ্যামিলি পোর্ট্রেটের মাঝে থ্রি-পিস স্যুট পরা ফ্রিদা। ১৯২৪

আরও পড়ুন : মাঝবয়সি মেয়েদের বিলাসিতা— কাউকে জবাবদিহি না করা! লিখছেন সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়…

বিশ শতকের দ্বিতীয় দশক শুরু হয়েছে। ঘটে গেছে মেক্সিকান বিপ্লব। দ্রুত নগরোন্নয়ন এবং রাষ্ট্রের সমর্থনে সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের উত্থানের ফলে, মেক্সিকো শহর তখন  কসমোপলিট্যান। আর কসমোপলিট্যান মানেই মিশ্র সংস্কৃতি, এবং আধুনিক; আভঁগার্দ ফ্রিদা এই সময় অতি-সংক্ষিপ্ত বব হেয়ারস্টাইলে, পাশ্চাত্যের ফ্ল্যাপার পোষাকে একজন ‘চিকা মডার্না’ (আধুনিক নারী)। এবং, এর পরের পর্যায়টিতে তাঁকে দেখা যায় ‘মেস্তিৎজা’ (mestiza, স্ত্রীলিঙ্গ) হিসেবে, বাংলা ভাষায় যার মানে করলে দাঁড়ায় মেক্সিকান লোকসংস্কৃতি এবং ইউরোপীয় সংস্কৃতির সংমিশ্রণ (mestizaje)। এই সময়, ফ্রিদা যে ধরনের পোশাক পরতেন, যা ‘চায়না পবলানা’ বলে পরিচিত, তার শিকড় পৌঁছে যায় আনুমানিক সপ্তদশ শতাব্দীতে। 

চিনা পবলানা— এই শব্দগুচ্ছের উৎপত্তি কোনও পরিধেয়-সংক্রান্ত ফ্যাশন বা ট্রেন্ড-এ নয়, বরং ‘কাতেরিনা দে সান হুয়ান’-এর কাহিনিতে। কিংবদন্তি অনুযায়ী, কাতেরিনার জন্ম ভারতের একটি অভিজাত পরিবারে। তাঁর নাম ছিল মীরা। পর্তুগিজ জলদস্যুদের হাতে অপহৃত হয়ে ভারতের দক্ষিণের বন্দর শহর কোচিন (বর্তমান কোচি) পৌঁছে তিনি জাহাজ থেকে পালিয়ে একটি জেস্যুইট মিশনে আশ্রয় নেন। এখানে তিনি ধর্মান্তরিত হয়ে নাম নেন কাতেরিনা দে সান হুয়ান। এর পর, ক্রীতদাস হিসেবে, ফিলিপিন্স হয়ে, নিউ মেক্সিকোতে পৌঁছনোর পর পুয়েবলোর একজন ব্যক্তি তাঁকে ক্রয় করেন। জীবনের শেষের দিকে কাতেরিনা একটি কনভেন্টে যোগ দেন এবং মৃত্যুর পরে, কয়েক বছরের জন্য, একজন স্থানীয় সন্ত হিসেবে পরিচিত হন। কথিত আছে, কাতেরিনা কিছু সময় শাড়ি পরলেও, অনেক সময়ই তিনি লম্বা স্কার্ট ও ব্লাউজও পরতেন। এই নির্দিষ্ট পোশাকটিই পরে চায়না পবলানা হিসেবে পরিচিত হয়। প্রসঙ্গত, এই সময়, মেক্সিকোতে সমস্ত এশীয় ব্যক্তিকেই ‘চায়না’ আখ্যা দেওয়া হত। পরবর্তীকালে, স্প্যানিশ সংস্কৃতির প্রভাবে এই পোশাকের একটি নির্দিষ্ট রূপান্তর ঘটে। জ্যামিতিক নকশা করা ব্লাউজ, উজ্জ্বল ও, সাধারণত, লাল-সবুজ স্কার্ট, এবং ঐতিহ্যবাহী শাল বা রেবোজো— এই হল এই পোশাকের প্রধান তিনটি মৌলিক অঙ্গ। বিত্ত অনুযায়ী মহিলারা বেছে নিতেন কাপড়ের মান, এবং একইভাবে যোগ করতেন গয়না। ফ্রিদার মা ছিলেন মেস্তিৎজা, তাই নিজের মিশ্র শিকড়কে তুলে ধরতে ফ্রিদা পরিধেয় হিসেবে, সচেতনভাবেই, চায়না পবলানা বেছে নেন। এছাড়াও, পোলিও, ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনা, এবং অসংখ্য অস্ত্রোপচারের কারণে তাঁর যে শারীরিক বিকৃতি ও ক্ষত তৈরি হয়েছিল, তাকে ঢেকে রাখার এক নান্দনিক উপায় ছিল এই পোশাক। 

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, ফ্রিদার অনেক ছবিতেই তাঁর শারীরিক ব্যথা, বিকৃতি, ও অসুস্থতার ইঙ্গিত খুব সরাসরিভাবে দর্শক হিসেবে আমরা দেখতে পাই— সেখানে লুকোচুরির কোনও জায়গা নেই। অন্তত, ক্ষতস্থানকে পোশাক দিয়ে আড়াল করে রাখা ফ্রিদার ক্ষেত্রে কখনওই বাধ্যতামূলক ছিল না। বরং ছিল এক সচেতন মনোনয়ন। কারণ, ঐতিহ্য ও শৈল্পিক পরিবেশনার পাশাপাশি এই পরিধেয় ছিল আদতে এক রাজনৈতিক প্রতিবাদের প্রকাশ, সাম্রাজ্যবাদী ও ইউরোপীয় বুর্জোয়া ফ্যাশনকে নাকচ করার জন্য ফ্রিদার নিজস্ব হাতিয়ার। নিজেকেই নিজের ক্যানভাসে পরিণত করেছেন ফ্রিদা; ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছেন ফ্যাশন আইকনও। এক র‍্যাম্পওয়াক বলা যেতে পারে, চরৈবেতিও বলা যেতে পারে, অথবা দুটোই। তাঁকে ঠিক কীভাবে দেখা হবে, সেই স্বাধীনতা দর্শকেরই। 

ঠিক একইভাবে, পোশাকের সাপেক্ষেও, মেস্তিজাজে থেকে তেহুয়ানার পোষাক বেছে নেওয়ার যাত্রাকে কেউ দেখেন বিদ্রোহ, কেউ দেখেন চুমুর দিব্যি হিসেবে। কেননা, এর মধ্যেই ফ্রিদার দেখা হয়েছে মেক্সিকান চিত্রশিল্পী দিয়েগো রিভেরার সঙ্গে, বিপ্লব, প্রেম ও বিবাহের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন এই দুই মানুষ। অনেকের মতে, দিয়েগোর পছন্দ অনুযায়ীই মেস্তিৎজাজে বা চায়না পবলানা পোশাক ছেড়ে, ফ্রিদা পরিধেয় হিসেবে বেছে নেন তেহুয়ানা পোষাক। মেক্সিকোর তেহুয়ান্তেপেক উপত্যকার জাপোটেক নারীদের পোষাক ছিল তেহুয়ানা, যা কিনা একাধারে স্বাধীনচেতা, মাতৃতান্ত্রিক সমাজ, এবং মেক্সিকোর জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এমন এক প্রতীক, যা দেশজ লোকসংস্কৃতিকে সর্বাগ্রে জায়গা দেয়।  

দ্য টু ফ্রিদাজ। ১৯৩৯

‘দ্য টু ফ্রিদাজ’ (১৯৩৯) ছবিতে, এই দুই ধরনের পোশাক পরিহিত ফ্রিদাকে দেখি আমরা। ইতিমধ্যেই, নিউ ইয়র্ক আর প্যারিসে দু’টি একক প্রদর্শনী হয়ে গেছে ফ্রিদার; দিয়েগো রিভেরার স্ত্রী হিসেবে ধার করা খ্যাতি ও পরিচিতির গণ্ডির বাইরে গিয়ে তিনিও তখন একজন প্রতিষ্ঠিত ও বিক্রয়যোগ্য শিল্পী। কিন্তু, এই সাফল্যের পাশাপাশি, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে আসে এক চরম আঘাত। একক প্রদর্শনীর কাজে ফ্রিদা যখন বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন, সেই সময় দিয়েগো আর ক্রিস্টিনা, ফ্রিদার ছোট বোন— ফ্রিদার দুই ভীষণ কাছের মানুষ— জড়িয়ে পড়েন একটি ক্ষণস্থায়ী বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কে। ফলস্বরূপ, বিচ্ছেদ হয় ফ্রিদা আর দিয়েগোর। ‘দ্য টু ফ্রিদাজ’ এই ঘটনারই একটি প্রতিক্রিয়া। এটি ফ্রিদার আঁকা সবচেয়ে বড় ছবি (১.৭৩ মি X ১.৭৩ মি)। একই ভঙ্গিমায়, পরস্পরের হাত ধরে, বসে আছেন দুই ফ্রিদা। চোখের দৃষ্টি স্থির, দৃঢ় ও ঋজু ও আবেগহীন। বাঁ-দিকের ফ্রিদার পরনে উঁচু কলারের ইউরোপীয় ধরনের বিয়ের গাউনে, ডানদিকের ফ্রিদা তেহুয়ানা পোষাকে। 

মেক্সিকোতে, অলৌকিক কোনও ঘটনার পর, কিংবা কোনও ব্রত বা প্রার্থনা পূরণের জন্য যিশু, মেরি বা কোনও সন্তকে ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য, সাধারণত, টিনের পাতের ওপর আঁকা ছোট ও উজ্জ্বল রঙের ছবি উৎসর্গ করার প্রচলন আছে। এই শৈলীর ছবিতে ‘রিয়েলিজম’ বা পার্সপেক্টিভের ভূমিকা গৌণ। একটি ফ্রেমকে বিভিন্ন দৃশ্যে ভাগ করা হত, এবং ফ্রেমের নিচে একটি শিরোলিপি বা টেক্সট বক্স-এ ঘটনার স্থান, কাল, বর্ণনা ও প্রধান চরিত্রের পরিচয় লেখা থাকত। রেতাবলোতে অনেক সময়ই ভয়াবহ কোনও দুর্ঘটনাকে বা শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ সরাসরি চিত্রিত হত। বলিদান বা উৎসর্গের প্রতীক হিসেবে রক্তের অতিরঞ্জিত ব্যবহারও রেতাবলো-র আরেকটি দিক। ধর্মীয় তাৎপর্য ছাড়াও, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, প্রাত্যহিক জীবন, মেক্সিকান বিপ্লব ইত্যাদি বিষয়ের চিত্রায়ণের মাধ্যমে, স্বশিক্ষিত শিল্পীদের হাতে আঁকা এই ছবিগুলি, মেক্সিকোর সামাজিক ও ব্যক্তিগত ইতিহাসের ‘ভিজ্যুয়াল ডায়েরি’ বা দৃশ্যদলিল হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রিদার সংগ্রহে ৪০০-র বেশি এই ধরনের রেতাবলো ছিল। 

মেক্সিকান রেতাবলোতে সন্ত মিগুয়েলের কাহিনি

ফ্রিদার অন্য অনেক ছবির মতোই, ‘দ্য টু ফ্রিদাজ’-ও তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাসের খতিয়ান, এবং, রেতাবলো-র মতোই, এই ছবি তাঁর ব্যক্তিগত ইতিহাস ও বিচ্ছেদের বেদনার সঙ্গে লড়াইয়ের খতিয়ান। ছবিতে তেহুয়ানা পোশাক-পরিহিত ফ্রিদার হৃদয় অটুট, হাতে দিয়েগোর ক্ষুদ্র একটি প্রতিকৃতি। অন্য ফ্রিদার হৃদয় সম্পূর্ণ উন্মোচিত ও রক্তাক্ত। দিয়েগোর উপস্থিতিহীন এই ফ্রিদার হাতে একটি ফরসেপ, যার সাহায্যে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টায় অসফল তিনি। একটিমাত্র ধমনি এই দুইজনকে জুড়ে রেখেছে। ভিন্ন হয়েও, দুই ফ্রিদা আসলে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। অনেকেই এই দুই ফ্রিদাকে ব্যাখ্যা করেছেন দিয়েগোর পছন্দের ও অপছন্দের ফ্রিদা হিসেবে। নিঃসন্দেহে, এই ছবির বিষয় হৃদয়ভঙ্গ, বিশ্বাসভঙ্গ। কিন্তু, আমরা ধরে নিতে পারি যে, ফ্রিদার দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তোলাই এই ছবির মূল উদ্দেশ্য। ফ্রিদা ও দিয়েগো, দু’জনেই বারবার বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। প্রতিবারই কি ফ্রিদা তাঁর আহত মনের অবস্থা তুলে ধরেছেন জগতের সামনে? তবে, এক্ষেত্রে কেন? এক্ষেত্রে, ফ্রিদার আঘাত দ্বিস্তরীয়— বৈবাহিক ও পারিবারিক।

তাই দ্বন্দ্ব এই দুই সময়ের ফ্রিদার মধ্যে। প্রতারণাও এক্ষেত্রে দ্বিস্তরীয়। কারণ, একজন মানুষ শুধু অন্য একজন মানুষ থেকেই প্রতারিত হন না। প্রতারিত হন, যখন তাঁর নিজের অনুমান, চাহিদা এবং প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তব মেলে না। এই ছবিতে তাই ক্রিস্টিনার সরাসরি উপস্থিত না থাকলেও, তাঁর দায়ভার লাঘব হয় না। ‘দ্য টু ফ্রিদাজ’ ছবিতে ফ্রিদার বিয়ের গাউনটি যেমন তাঁর ইউরোপীয় উত্তরাধিকারকে মনে করায়, ঠিক তেমনভাবেই মনে করায় ১৯৫০ সালে ফ্রিদার আঁকা (অসম্পূর্ণ) ফ্যামিলি পোর্ট্রেট-এর কথা। এই ছবিতে ফ্রিদার মা তাঁর নিজের বিয়ের গাউনটি পরে আছেন বলে দেখা যায়। ‘মা’ বলতে আমরা বুঝি এমন এক আশ্রয়, যাকে আমরা ধরেই নিই রয়ে যাবে, বাকি জীবনে যা-ই ঘটে যাক না কেন। ফ্রিদা আর ক্রিস্টিনা ছিলেন অভিন্নহৃদয়। তাই এক্ষেত্রে কি আমরা ধরে নিতে পারি যে, একাধারে অপরিচিত পরিধেয়র অস্বাচ্ছন্দ্য ও এক ফেলে আসা জীবনের প্রতীক এই ইউরোপীয় বিয়ের গাউন পরা ফ্রিদার মধ্যে, না থেকেও রয়ে গেছেন ক্রিস্টিনা? এই বহু-বহুস্তরীয় দ্বন্দ্বে নাটকীয়তা আনে ছবির একমাত্রিক পশ্চাৎপটের (যা আবারও রেতাবলো-র পার্সপেক্টিভের ব্যবহারহীন একমাত্রিক পশ্চাৎপটের ব্যবহারকে মনে করায়) ঘন কালো, বিস্তৃত আকাশ, যা ইঙ্গিত করে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের। 

অসম্পূর্ণ সেই ফ্যামিলি পোর্ট্রেট

দুই ফ্রিদা এখানে শুধুই দিয়েগোর পছন্দ-অপছন্দের ফ্রিদা নয়, বরং তাঁর ব্যক্তিজীবনের ইতিহাস। সেই দিক থেকে বিচার করলে, ‘সেলফ-পোর্ট্রেট উইথ ক্রপড হেয়ার’ ছবিটিও একইরকম প্রাসঙ্গিক। এই ছবিতে, তাঁর পরনে চিরাচরিত তেহুয়ানা পোষাকের বদলে ঢোলা, পুরুষালি স্যুট। তিনি তাঁর লম্বা বেণী কেটে ফেলেছেন। একহাতে সেই কাটা বেণীর অংশ, অন্য হাতে কাঁচি আর পায়ের নিচে পড়ে আছে গুচ্ছ-গুচ্ছ চুল— রক্তের বদলে তাঁর এই কাটা চুলই যেন বলিদানের প্রতীক হয়ে উঠেছে এই ছবিতে। এই কাজটি তাঁর তাৎক্ষণিক ভাবনা বা অনুভবেরই যে প্রতিফলন, ছবির ওপরের লিখিত অংশটি থেকে তা বোঝা যায়, ‘দেখো, আমি যদি তোমাকে ভালবেসে থাকি, তবে শুধুই তোমার চুলের জন্য। এখন, যখন তোমার মাথায় চুল নেই, আমি আর তোমাকে ভালবাসি না।’ ছোট চুল আর পুরুষালি পোশাক সত্ত্বেও, তাঁর কানের গয়না আর উঁচু গোড়ালির জুতোয় ‘ফেমিনিনিটি’-র কিছু চিহ্ন থেকেই যায়। ‘দ্য টু ফ্রিদাজ’ ছবিটির মতোই, এখানেও দেখা যায় তাঁর দুই সত্তার মধ্যে সহাবস্থান ও সংগ্রাম।      

ফ্রিদা যেমন ছিলেন আর যেমন হয়ে উঠেছিলেন, তা শুধুই দিয়েগোর অনুপ্রেরণায় বা দিয়েগোর পছন্দসই হয়ে ওঠার জন্য নয়। তার পিছনে ছিল এক গভীর রাজনৈতিক বোধ এবং সেই জন্যই নিজের বাহ্যিক রূপকে ভেবেচিন্তে তৈরি করেছিলেন তিনি। আশানুরূপ বা অপ্রত্যাশিত, যা-ই ঘটুক না কেন, ব্যক্তিগত সর্বদাই রাজনৈতিক। ফ্রিদার বেছে নেওয়া সাজসজ্জা, আঁকা ছবি— এককথায় তাঁর সমস্ত জীবনই তার প্রমাণ।