বিতর্কিত একাদশ: পর্ব ৩

Representative Image

ফুটবল একনায়ক

‘ভিবেরে ও মোরিরে’— বিশ্বকাপকে প্রথম ক্ষমতার বার্তা দেওয়ার মঞ্চ বানিয়েছিলেন মুসোলিনি। অধুনা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তার একবিংশ শতাব্দীর সংস্করণ মনে হতে পারে কারও। তবে বর্তমান পৃথিবীতে, আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যম আরও শক্তিশালী হওয়া, কূটনীতির গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য, ট্রাম্প হয়তো সরাসরি এই পর্যায়ে আগ্রাসী হতে পারবেন না। আর-একটা কারণ এই যে, বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিলক্ষণ জানেন যে, সামরিক শক্তি আর অর্থনীতিতে, তাঁর দেশ যতই এগিয়ে থাকুক না কেন, ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার কথা তাঁর উগ্র-জাতীয়তাবাদী অন্ধ অনুগামীরাও দুঃস্বপ্নে ভাবতে পারবেন না। তাই, এখনও অবধি মনে হচ্ছে, ফুটবল বিশ্বকাপকে পশ্চিম এশিয়ায় তার সামরিক আগ্রাসনের পক্ষে, সমগ্র বিশ্বের কাছে প্রচারের জন্য, ও ইরান-ইরাক-জর্ডন-মরক্কো-মিশর— ইত্যাদি দলের সমর্থক থেকে প্রেসকে, নিজের দেশে ঢুকতে দেওয়ার ছাড়পত্র না দিয়ে, পেশিশক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করছে ট্রাম্প প্রশাসন। ২০২৬-এর ট্রাম্প, গত শতাব্দীর মুসোলিনির পর্যায়ে যেতে পারবেন কি না, তা জানার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে আর একমাস।

কাট টু ১৯৩৪, রোমা। রোমের ‘স্তাদিও নাৎসিওনালে দেল পিএনএফ’-এ (‘ন্যাশনাল স্টেডিয়াম অফ ফ্যাসিস্ট পার্টি’) কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হবে পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। মাইকে জোরে বাজছে, ফ্যাসিস্ট ইতালির জাতীয় সংগীত, ‘জিওভিনেজ্জা’। সরকারের উচ্চপদের সামরিক অফিসারদের নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, ইতালির রাষ্ট্রপতি— বেনিতো মুসোলিনি। উপস্থিত রয়েছেন, জার্মান নাৎসি প্রতিনিধিরাও। আর-একদিকে রয়েছেন, কমিউনিস্ট চেকোস্লোভাকিয়ার প্রতিনিধিরা। পুরষ্কার দেওয়া হবে, অলিম্পিক পোডিয়ামের কায়দায়; চ্যাম্পিয়ন, রানার-আপ ও তৃতীয়স্থান বিজয়ী দলকে। কিছুক্ষণ আগে বেজেছে, বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ বাঁশি। অতিরিক্ত সময়ে অ্যাঞ্জেলো স্কিয়াভিও-র জয়সূচক গোলে, চেক দলকে ২-১-এ হারিয়ে, প্রথম বিশ্বজয়ের স্বাদ পেয়েছে, আয়োজক দেশ ইতালি। যদিও গোল করেই জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন স্কিয়াভিও। কিছুক্ষণ সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়ে থাকার পর, তিনি স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেন। ইতালীয় ফরোয়ার্ড কি প্রবল চাপের মধ্যেে ছিলেন?

একটি লাথি-ই, বিশ্বকাপ ফুটবলে, ফ্রান্সের ভাগ্য বদলে দিয়েছিল!
পড়ুন: বিতর্কিত একাদশ পর্ব ২…

৯২-বছর আগের একটি বিস্মৃতপ্রায় অধ্যায়। বর্তমান কোনও ইতালীয় যুবক-যুবতীকে জিজ্ঞেস করে দেখুন, ভিত্তোরিও পোজ্জো কে ছিলেন? ৯৫% বলতে পারবেন না। কাতারে আর্জেন্টিনার কাছে ফাইনাল টাইব্রেকারে হেরে, পরপর দু’বার বিশ্ব চ্যাীম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করেছিলেন, ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশঁ। ফুটবল ইতিহাসে কোচ হিসেবে এই বিরল কৃতিত্ব রয়েছে, একমাত্র ভিত্তোরিও পোজ্জোর। ইতালিকে তিনি দু’বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেছিলেন— ’৩৪-এ ঘরের মাঠে, ও ’৩৮-এ ফ্রান্সের মাটিতে। এই দুই সাফল্যের মাঝখানে, তার হাত ধরেই ’৩৬-এ বার্লিন অলিম্পিকে সোনাও জেতে ইতালি। কোচের ফুটবল-মস্তিষ্ক, দেশের ফুটবলকে দিয়েছিল নতুন দিশা। ফুটবল ইতিহাসবিদদের মতে, পোজ্জোই হলেন— ইতালির বিখ্যাত ক্যাাটানেচিও ঘরানার স্রষ্টা। সেই দুই ডিফেন্ডার-তিন হাফ ও পাঁচ ফরোয়ার্ড ভিত্তিক সিস্টেমের যুগেই, বর্তমান ৪-৩-৩ সিস্টেমের রূপরেখা তৈরি করেছিলেন তিনিই। এতকিছু সত্ত্বেও, পোজ্জো ইতিহাসে বিস্মৃতপ্রায়; কারণ মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী শাসনের সঙ্গে, সরাসরি জড়িয়ে পড়েছিল— এই কিংবদন্তি ফুটবল-কোচের নাম। তার অধীনে ’৩৪-এ ইতালির বিশ্বজয়-পর্বের প্রতিটা পাতায় রয়ে গিয়েছে বিতর্ক। রয়ে গিয়েছে একাধিক প্রশ্ন, যার আজও কোনও নির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি। ১৯৪৫-এ ফ্যাসিস্ট পার্টির সরকারের পতনের পর থেকেই, ‘ফিফা’ ও ইতালীয় ফুটবল ফেডারেশন, আগের জামানার যাবতীয় বিষয়কে ধামাচাপা দেয়। সেই জন্য তারা পোজ্জোর ওই দুটো বিশ্বকাপ জয়কে, খুব একটা কৃতিত্ব দিতে চায়নি। ‘দুটো জয়ই তো ফ্যাসিস্ট আমলের!’ ব্যাখ্যা করেন, ইতিহাসবিদ ও ‘ফুটবল অ্যান্ড ওয়ার’ সংস্থার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, ডঃ অ্যালেক্স অ্যালেক্সান্ড্রিউ।

বিতর্কের শুরু, আয়োজক দেশ হিসেবে সুইজারল্যান্ডকে টপকে, ইতালির দায়িত্ব পাওয়া থেকেই। মুসোলিনি ক্ষমতায় আসার পর, ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি করেন, ফ্যাসিস্ট সামরিক জেনারেল জিওর্জিও ভাক্কারোকে। ইতালি ’৩০-এর প্রথম বিশ্বকাপও আয়োজন করার দাবিদার ছিল। কিন্তু উরুগুয়ে তখন পরপর দু’বার অলিম্পিক চ্য্ম্পিয়ন হওয়ায়, তাদেরই দায়িত্ব দেয় ‘ফিফা’। ইতালিও আর টিম পাঠায়নি লাতিন আমেরিকায়। ইতালীয় ফেডারেশনের এক প্রতিনিধি, ‘ফিফা’কে এই শর্তে প্রভাবিত করেন যে, প্রতিযোগিতার ক্ষতির পরিমাণ ইতালির সরকার কমিয়ে দেখাবে। এই কারণে ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে, বিশ্বমন্দার আবহে, আয়োজনের দায়িত্ব পেয়ে গেল ফ্যাসিস্ট সরকার পরিচালিত ইতালি।

স্তাদিও নাৎসিওনালে দেল পিএনএফ

ইতালির এই জয়ের কৃতিত্বকে বিশেষজ্ঞদের কিছুটা খাটো করে দেখার দু’টি মূল কারণ হল— এই একবারই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দেশ খেতাব রক্ষা করতে আসেনি বিশ্বকাপে। প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে, ইতালিতে বিশ্বকাপ খেলতে অস্বীকার করে, কারণ তাদের দেশে ইতালি, জার্মানি-সহ ইউরোপের বহু দেশ খেলতে যায়নি। বিশ্বমন্দা ও দীর্ঘ জাহাজ যাত্রার কারণে— ফ্রান্স, বেলজিয়াম, রোমানিয়া ও যুগোস্লাভিয়া ছাড়া, উরুগুয়েতে আর কোনও ইউরোপীয় দেশকে দেখা যায়নি প্রথম বিশ্বকাপে। এর সঙ্গে ইতালি বিশ্বকাপে অনুপস্থিতের তালিকায় ছিল ইংল্যান্ডও। ইংলিশ দলটি তখন ইউরোপের ভারী দল হলেও, ‘ফিফা’ ও তাদের এক দেশ-এক ভোট নীতি নিয়ে প্রবল আপত্তি ছিল এফএ-র (ব্রিটিশ ফুটবল সংস্থা) সর্বময় কর্তা চার্লস আলফ্রেড সাটক্লিফের। সাটক্লিফের মতে, এই নীতি ফুটবল মানচিত্রের ক্ষুদ্র শক্তিগুলোকে বৃহৎ করে দেখাচ্ছিল! ইংল্যান্ড তাই সে-সময়ে ‘ফিফা’ পরিচালিত সব রকম প্রতিযোগিতা থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখত। বিশ্বকাপের থেকে তাদের কাছে বেশি গুরুত্ব পেত— স্কটল্যান্ড, ওয়েলস আর নর্থার্ন আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে হোম নেশনস কাপে অংশগ্রহণ করা। তিনের দশকে, তিনটে সাক্ষাতে একবারও ইংল্যান্ডকে হারাতে ব্যর্থ হয় পোজ্জোর দল; যেমন হারাতে পারেনি ১৯২৪ ও ২৮-এর অলিম্পিক সোনাজয়ী ও প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়েকেও। তাই, দুটো দুঁদে টিম না খেলায়, ইতালির কাপ জয় অনেকটাই সহজ হয়ে যায় বলেই মনে করেছিলেন বহু বিশেষজ্ঞ। উরুগুয়ে অবশ্য, ইতালির মতো, ’৩৮-এর ফ্রান্স-বিশ্বকাপেও খেলে নি, ‘ফিফা’ পরপর দু’বার কোনও ইউরোপীয় দেশকে আয়োজকের দায়িত্ব দেওয়ায়, পূর্ব নির্ধারিত নিয়ম অনুসারে একবার অন্তর করে, ইউরোপ বা দুই আমেরিকার কোনও দেশের বিশ্বকাপের দায়িত্ব পাওয়ার কথা। উরুগুয়ের প্রতিবাদকে সমর্থন করে, ফ্রান্স বিশ্বকাপে দল পাঠায়নি আর্জেন্টিনাও।

‘উয়েফা’, ‘কনমেবল’, ‘কনকাকাফ’-এর তখন অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু ’৩৪-বিশ্বকাপ থেকেই মূল পর্বের আগে, যোগ্যতা-অর্জনকারী পর্বের খেলা শুরু হয়, মোট ৩৬টি দেশকে নিয়ে। ওই আসর একমাত্র বিশ্বকাপ, যেখানে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা খেতাব রক্ষা করতে আসেনি, তেমনই একমাত্র প্রতিযোগিতা, যেখানে আয়োজক দেশ ইতালিকেও বাছাই পর্ব খেলে, মূল পর্বে যোগ্যতা অর্জন করতে হয়েছে। বাছাই পর্বে গ্রিসকে ঘরের মাঠে, ৪-০ গোলে হারিয়েছিলেন স্কিয়াভিওরা, কিন্তু গ্রিস ‘ফিফা’র কাছে ইতালির বিরুদ্ধে গুরুতর নালিশ জানিয়ে, আর ফিরতি ম্যাচ খেলতে চায়নি। গ্রিসের অভিযোগ ছিল, ইতালি অন্যায্যভাবে লুই মন্তি, এনরিকো গুইটা ও ব্রাজিলের প্রাক্তনী অ্যানফিলোজিনো গুয়ারেসিকে খেলিয়েছে। এরা তিনজনই ইতালীয় বংশোদ্ভূত হলেও, সেই সময়কার ‘ফিফা’ আইন অনুসারে, একজন ফুটবলারকে অন্য কোনও দেশের হয়ে খেলতে হলে, অন্তত তিন বছর সেই সংশ্লিষ্ট দেশে বসবাস করা বাধ্যতামূলক ছিল। তিনজনের একজনেরও সেই অনুসারে যোগ্য ছিলেন না। তবু ‘ফিফা’ একই অভিযোগে অভিযুক্ত রোমানিয়ার ওপর খড়্গহস্ত হলেও, ইতালিকে সম্পূর্ণ ছাড় দিয়ে দেয়! যদিও এক সূত্রের খবর, অর্থাভাবে ভুগতে থাকা গ্রিস ফুটবল সংস্থাকে, একটি দোতলা বাড়ি দিয়ে ফিরতি ম্যাচটি কিনেছিল ইতালি। ইউরোপের বারোটি, দুই আমেরিকা মিলিয়ে তিনটি ও আফ্রিকার একমাত্র প্রতিনিধি মিশরকে নিয়ে, বিশ্বকাপের মূল পর্ব শুরু হয়। এশিয়ার প্যালেস্টাইনকে হারিয়ে, প্রথম আফ্রিকার দল হিসেবে বিশ্বকাপের মূল পর্বের ছাড়পত্র পায় মিশর। উরুগুয়ের পর্বের মতো একটি শহরের (মন্টেভিডিও) বিশ্বকাপের বদলে মোট আটটি শহরের কেন্দ্রে ফুটবলকে ছড়িয়ে দেওয়া হয় ইতালি ’৩৪-এ।

সেই মতো বিরাট স্টেডিয়াম ও যানবাহনের ব্যবস্থাকে উন্নত করে মুসোলিনি সরকার। তিন লক্ষ বিশ্বকাপ লোগো-সহ পোস্টার আর স্ট্যাম্প প্রকাশ করে, প্রতিযোগিতার বিজ্ঞাপনে ইতালির প্রতিটা অঞ্চলকে ঢেকে দেওয়া হয়। বিশ্বকাপের নামে একটি সিগারেট ব্র্যান্ডও বাজারে আনা হয়েছিল কয়েকদিনের জন্য। তুরিনের স্টেডিয়ামকে মুসোলিনির নামাঙ্কিত করা হয়, কারণ এই শহরেই লি ডুচের (আমাদের নেতা) ফুটবল-প্রেমের সূত্রপাত। এছাড়া, নেপল্স শহরের স্টেডিয়ামকেও পুননির্মাণ করা হয়।

উত্তর ইতালিতে ফ্যাসিস্ট পার্টির মূল গণভিত্তি হলেও, তখন দক্ষিণ ইতালিতেও তাদের প্রভাব উত্তরোত্তর বেড়েছিল। যদিও সিসিলি ও ক্যারলাব্রিয়া অঞ্চলের গরিবদের দিকে বিশেষ ফিরেও তাকাননি মুসোলিনি। প্রথমবারের জন্য ইউরোপের ১২ টি দেশে রেডিওতে ধারাবিবরণীর ব্যবস্থাও করা হয়। মুসোলিনিকে রাষ্ট্রনায়কের ‘কাল্ট চরিত্র’ যিনি নির্মাণ করেছিলেন, সেই আচিল্লে স্টেরাসকে করা হয় প্রতিযোগিতার মুখ। স্টেরাস ছিলেন, লি’ডুচের অত্যিন্ত ঘনিষ্ঠ ও ফ্যাসিবাদী প্রোপাগান্ডা-যন্ত্রের মূল কাণ্ডারি। ফ্যাসিস্ট রোমান স্যালুটের তিনিই প্রচলন করেন। স্টেরাস সবকটি স্টেডিয়ামে ও তার আশপাশকে ফ্যাসিস্ট স্থাপত্যেের নানা নিদর্শনে ভরিয়ে দেন।

আসলে মুসোলিনি-সরকার এই বিশ্বকাপের মাধ্যমে ঘরে-বাইরে দু’রকম বার্তা দিতে চেয়েছিল। ফ্যাসিস্ট সরকার চাইছিল যে, ইউরোপের বাকি অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সমর্থকরা খেলা দেখতে এসে, এক শহর থেকে আরেক শহরে ঘুরে দেখুন যে— তাদের সুশাসনে ইতালির জনতা কতটা ভাল রয়েছে। যার মাধ্যমে এই মূল বার্তাটা প্রচার করা যাবে যে— এই ফ্যাসিবাদই হচ্ছে ইউরোপের ভবিষ্যৎ। আবার দেশের মানুষের কাছে ফ্যাসিস্ট সরকার এই বিশ্বকাপকে তাদের শাসনের পক্ষে জাতীয় সংহতি মঞ্চ গড়ে তোলার হাতিয়ার করেছিল। জাতীয় দল ও ফুটবলারদের ‘জাতীয় গর্ব’ হিসেবে দেখিয়ে, এই বার্তা দিতে চাইছিল যে, তাদের শাসনে দেশ শ্রেষ্ঠত্বের পথে এগিয়ে চলেছে। রোমে উদ্বোধনী ম্যাচের আগে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কেটে, মাঠে ঢুকতে দেখা যায় স্বয়ং মুসোলিনিকে! পুরো প্রতিযোগিতাটার নকশাই নকআউট ফরম্যাটে করা হয়। প্রথম পর্বের আটটি খেলা আটটি শহরে, একইসঙ্গে শুরু করে, ইতালি বোঝাতে চায় তাদের সাংগঠনিক নিয়মানুবর্তিতা।

ক্ষমতায় আসার পর থেকেই, জাতীয় খেলা ফুটবলকে তাদের জনসংযোগের মাধ্যম বানাতে চেয়েছিল ফ্যাসিস্ট পার্টি। দেশে একানায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার পরই, ভাক্কারোকে ফুটবল সংস্থার সভাপতি করে, ফুটবলে মোটা টাকা বিনিয়োগ করেন মুসোলিনি। ১৯২৯ থেকে ঢেলে সাজানো হয় ঘরোয়া সিরি-আ লিগের পরিকাঠামো। যদিও শিল্প ক্ষেত্রে ইতালি ছিল ইউরোপের পিছিয়ে পড়া দেশের অন্যতম। ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরোধিতা করার জন্যে তখন— বহু বুদ্ধিজীবী ও কয়েক হাজার যুবক দেশছাড়া। জাতীয় দল গড়া ও নির্বাচনের ব্যাপারে পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয় পোজ্জোকে। কিন্তু তার জন্য, ঘরের মাঠে বিশ্বকাপের আগে কোচের কাছে যায় শীর্ষ নেতার বার্তা, ‘পূর্ণ দায়িত্ব যখন তোমার, তখন হয় সফল হও, না হলে ঈশ্বর তোমাকে রক্ষা করুন।’ লি ডুচের এই বার্তা কোচ থেকে ফুটবলারদের মধ্যে সংক্রামকের মতো ছড়িয়ে পড়ে। প্রচণ্ড চাপে পড়ে যায় পুরো দল। ফ্যাসিস্ট পার্টির সদস্য না হলে, জাতীয় দলে সুযোগ দেওয়া হত না; ইতালির জার্সি পাওয়ার জন্য, বহু ফুটবলার তাই শাসক দলের সদস্য হন।

দ্বিতীয় বড় বিতর্কটি ছিল— প্রতিযোগিতার রেফারিং নিয়ে। প্রথম ম্যাচে আমেরিকাকে ৭-১ গোলে পর্যুদস্ত করে, কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে ইতালি। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ স্পেন। ‘ফিফা’ র‍্যাঙ্কিং অনুযায়ী— বাছাই প্রথম আটটি দলের মধ্যে না থাকলেও স্পেন ছিল ফাইনালে ওঠার পথে পোজ্জোদের সবথেকে বড় কাঁটা। রিপ্লেতে শেষ পর্যন্ত ইতালি জয়ী হলেও, স্পেন অধিনায়ক রিকার্ডো জামোরা পরে বলেন যে— ইতালি-স্পেন ফাইনালে দেখা হওয়া উচিৎ ছিল। ফ্লোরেন্সে স্পেনের সঙ্গে প্রথমদিনের অত্যন্ত চড়া মেজাজের খেলা ১-১ ড্র হল। বারবার স্ট্রেচারে করে আহত ফুটবলারদের মাঠের বাইরে আনার দৃশ্য দেখা যায়। ইতালির গোল-শোধের সময়ে স্পেনের সুপারস্টার গোলরক্ষক ও অধিনায়ক জামোরা বড় চোট পেয়ে প্রতিযোগিতা থেকেই ছিটকে যান। অপরদিকে ইতালির মারিও পিজ্জেরোরও পা ভেঙে যায়। আর কোনওদিন আজ্জুরিদের হয়ে মাঠে নামতে পারেননি তিনি। দেশ থেকে দ্বিতীয় গোলকিপার নিয়ে এসে, রিপ্লেতে শেষরক্ষা করতে পারল না স্পেন। একইরকম চড়া মেজাজের খেলায় ইতালি জিতে গেল, ১-০ গোলে। তবে এই খেলার সুইস রেফারি রেনে মার্সেটের কিছু সিদ্ধান্ত এতটাই একপেশে ছিল যে, দেশে ফেরার পর সুইস ফুটবল ফেডারেশন তাকে সাসপেন্ড করে। এরপরই খবর ছড়িয়ে পড়ে যে— স্বয়ং মুসোলিনি নাকি ম্যাচের আগেরদিন রাতে রেফারির সঙ্গে দেখা করেছিলেন!

সেমিফাইনালে মিলানের সান সিরোয় অস্ট্রিয়ার বিরূদ্ধেও একই ব্যবধানে উতরে গেল আজ্জুরি। সমস্যা হল অন্য সেমিফাইনালে; যে-ম্যাচে শক্তিশালী জার্মানির প্রতিপক্ষ ছিল, চেকোস্লোভাকিয়া। ম্যাচের ভিলেন বনে গেলেন, ইতালীয় রেফারি রিনালদো বার্লাসেনা। ইতালি ফাইনালে চাইছিল, ধারে-ভারে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা চেকদের। আর অভিজ্ঞ ইতালীয় রেফারি জানতেন যে, ফাইনালে বাঁশি হাতে কোনও স্বদেশের রেফারি ম্যাচ পরিচালনা করবেন না। তাই এই ম্যাচের ফেভারিট জার্মানদের হারানোর বন্দোবস্ত করে ফেলেন তিনি।

ফাইনাল ম্যাচের আগের রাতে, সুইডেনের রেফারি ইভান একলিন্ডের সঙ্গে নিভৃতে নৈশভোজে দেখা করলেন মুসোলিনি। ফাইনালে একলিন্ড যখন অতিরিক্ত সময়ের শেষ বাঁশি বাজালেন, তখন মুসোলিনি-সহ ফ্যাসিস্ট পার্টির সামরিক কর্তাদের মুখে দেখা গেল চওড়া হাসি। পরদিন ‘লা গাজেটা’, ‘দেলো স্পোর্ট’-এর মতো স্থানীয় সংবাদপত্রের শিরোনাম ছিল, ‘আজ্জুরি বিশ্বকাপ দখল করল মুসোলিনির উপস্থিতিতে!’ অন্যান্য সংবাদপত্রগুলোও লিখল একই সুরে। ‘লি ডুচ ও জাতীয় নেতৃত্বের সামনে আজ্জুরিদের কাপ জয়’, লিখল ‘লা স্পোর্তো’। জয়কে দেখানো হল, শাসক ও শাসন ব্যবস্থার জয় হিসেবে। চ্যাম্পিয়ন দলের অধিনায়ক জানপিয়েরো কম্বির হাতে, জুলে রিমে ট্রফির সঙ্গে তুলে দেওয়া হল— তার থেকে আকারে থেকে ছ’গুণ বড়, বেনিতো মুসোলিনি ট্রফি! প্রতিযোগিতার ইতিহাসে ওই একবারই ওই ট্রফি দেওয়া হয়।

কিন্তু ফাইনাল-সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে, নানা প্রচেষ্টা করেও মাঠে সে-রকম দর্শক টানতে পারলেন না সংগঠকরা। যদিও বেতারে ধারাবিবরণীর সময়ে সর্বত্রই বলা হয়েছিল যে— স্টেডিয়াম কানায়-কানায় পূর্ণ, তবুও অধিকাংশ ম্যােচেই সে-রকম দর্শক সমাগম হয়নি। রোম, নেপল্সে‌র মতো দক্ষিণ ইতালির শহরগুলোয়, স্টেডিয়াম বহু অংশে খালি দেখা যায়। বিশেষ করে ফাইনালে, ইতালির চ্যাইম্পিয়নশিপ লড়াই দেখতে, রোমে ৫৫ হাজার দর্শক সমাগম হয়। যেখানে মন্টেভিডিওতে প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখেছিলেন ৯৩ হাজার দর্শক, ম্যাচ ঘিরে তৈরি হয়েছিল তুমুল উত্তেজনা। সেদিন রোমে গ্যালারির ফাঁকা অংশগুলো দেখে, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ফ্যাসিস্ট পার্টির ক্ষয়িষ্ণু প্রভাবের ইঙ্গিত পেয়েছিলেন অনেকে।

সেমিফাইনালে মিলানের সান সিরোয় অস্ট্রিয়ার বিরূদ্ধেও একই ব্যবধানে উতরে গেল আজ্জুরি। সমস্যা হল অন্য সেমিফাইনালে; যে-ম্যাচে শক্তিশালী জার্মানির প্রতিপক্ষ ছিল, চেকোস্লোভাকিয়া। ম্যাচের ভিলেন বনে গেলেন, ইতালীয় রেফারি রিনালদো বার্লাসেনা। ইতালি ফাইনালে চাইছিল, ধারে-ভারে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা চেকদের। আর অভিজ্ঞ ইতালীয় রেফারি জানতেন যে, ফাইনালে বাঁশি হাতে কোনও স্বদেশের রেফারি ম্যাচ পরিচালনা করবেন না। তাই এই ম্যাচের ফেভারিট জার্মানদের হারানোর বন্দোবস্ত করে ফেলেন তিনি।

পোজ্জোর মতো লুই মন্তিকেও এখন আর মনে রাখেন না কেউ। কিন্তু বিস্মৃত মন্তিই একমাত্র ফুটবলার, যিনি পরপর দুটো বিশ্বকাপ ফাইনালে দু’টি ভিন্ন দেশের জার্সি গায়ে খেলেছিলেন। ১৯৩০-এ প্রথম বিশ্বকাপে তিনি ছিলেন, রানার্স আর্জেন্টিনা দলে, আর ৩৪-এ জাতীয় দলকে শক্তিশালী করতে, ইতালীয় বংশোদ্ভুত এই সেন্টার-হাফকে দলে নেন পোজ্জো। তার ক্যােটানেচিও সিস্টেমে সেন্টার হাফের বিশেষ রক্ষণাত্মক ও বল ডিস্ট্রিবিউশনের ভূমিকা ছিল। মন্তি সেই ভূমিকায় দারুণ মানিয়ে নিয়েছিলেন। সঙ্গে এনরিকে গুইটা আর রাইমুন্ডো ওর্সি। এই দু’জন ইতালীয় বংশোদ্ভূত হলেও, জন্ম ও বেড়ে ওঠা আর্জেন্টিনায়। গায়ে চাপিয়েছিলেন আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সিও। ওর্সি উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপেও দলে ছিলেন। আবার ওর্সিই আজ্জুরিদের হয়ে ৮১ মিনিটে গোল করে সমতা ফিরিয়েছিলেন ’৩৪-এর ফাইনালে। এর আন্তোনিন পুক ৭১ মিনিটের গোল করে, চেকদের এগিয়ে দিয়েছিলেন, আর ইতালি দল-সহ সমগ্র স্তেদিও ন্যাজিওনালকে প্রবল চাপে ফেলে দিয়েছিলেন। ফ্যাসিস্ট শাসনের পতনের পর, মন্তি কিছু গোপন কথা ফাঁস করেন। মুসোলিনি নাকি হাফ টাইমে, ইতালির ড্রেসিং রুমে যান ও মন্তিকে বকাবকি করেন এই বলে যে— ‘ওহে, বেশি ফাউল কোরো না, একলিন্ড (সুইডিশ রেফারি) আমাদের পক্ষেই আছে। এমন কিছু কোরো না, যাতে ও বাধ্য হয় অন্য কিছু করতে!’ অর্থাৎ মন্তির কথায় এটা প্রমাণ হল যে— লি-ডুচে, ম্যাচের আগে, রেফারির সঙ্গে কোনও সমঝোতা করেছিলেন ও হাফটাইমে ড্রেসিংরুমে গিয়েছিলেন, ফুটবলারদের সঙ্গে কথা বলতে। চেকদের ওপর সে-দিন মুসোলিনি একটি বিশেষ কারণে রেগে ছিলেন।

চেকোস্লোভাকিয়া ফাইনালের দিন সকালেই সরকার ঘোষণা হয় যে, তারা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে জোট করবে। মুসোলিনি এই কমিউনিস্ট জোটকে তার ফ্যাসিস্ট সরকার বিরোধী শক্তি হিসেবেই ধরে নেন। মুসোলিনি-সহ বহু রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞের মতে এটা ছিল, দুটো সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী রাজনৈতিক মতবাদের সংঘাতের আগাম ইঙ্গিত। ইতালিতেও ফ্যাসিবাদী শাসনের জাঁতকলে, বহু কমিউনিস্ট কর্মী-সমর্থক আক্রান্ত ছিলেন। অনেকেই এই ফাইনালে, মাঠে দু’দলের দুই ভিন্ন ঘরানার লড়াইয়ের মধ্যে দেখতে পেলেন— এই দুই রাজনৈতিক শক্তির সংঘাতের প্রতিফলন। স্লাভ ঘরানার শৈল্পিক সৌন্দর্যে এগিয়ে থাকলেও, জয়ী হল ক্যাকটানেচিও। রোমের এই ফাইনালের চারদিন পর অ্যাডল্ফ হিটলারের সঙ্গে প্রথম একান্তে মিটিং করেন মুসোলিনি। সেইদিন থেকেই অক্ষশক্তি তৈরি হওয়ার নীল নকশা শুরু হয়ে যায়।

’৩৮-এ ফ্রান্সের বিরুদ্ধে কালো জার্সিতে ইতালি

কিন্তু তাই বলে, ‘ভিবেরে ও মোরিরে’ (জেতো, নয় মরো)? খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্য করে, মুসোলিনির এই বক্তব্যের কোনও প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এক মহলের মতে, মুসোলিনির এই হুমকির কথা, স্রেফ একটি শহুরে মিথ, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম গল্পের আকারে চলে আসছে! তবে মন্তি বলেছিলেন, একবার একটি নৈশভোজ অনুষ্ঠানে, নিজের গলার ওপর আঙুল চালিয়ে, টিমকে মৃত্যু-হুমকিই দিয়েছিলেন ইতালির একনায়ক, ‘হয় জয় কর, নয়…’

ইতালির এই বিতর্কিত বিশ্বজয় ও ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রবল আত্মগরিমা প্রচারের জন্য, পোজ্জোরা ফ্রান্সে ’৩৮-এর বিশ্বকাপ খেলতে গিয়ে— তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েন। মার্সেইতে নরওয়ের সঙ্গে প্রথম রাউন্ডের ম্যাচের আগে, ফ্যাসিস্ট কায়দায় দু’বার রোমান সেলুট করতে গিয়ে দর্শকদের তীব্র বিদ্রুপের মুখে পড়ে আজ্জুরি দল। কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের সঙ্গে ৩-১ জয় সত্ত্বেও, ইতালি দলের একটি সিদ্ধান্তে এই বিদ্রুপ আরও বাড়ল। দু’দলের জার্সি নীল হওয়াতে, লটারিতে ঠিক হয়— ইতালি জার্সি বদলাবে। কিন্তু দলের দ্বিতীয় জার্সি ছিল সাদা, কিন্তু ইতালির সদর-দপ্তর থেকে আসা মুসোলিনির নির্দেশ অনুসারে, ইতালি খেলল, কালো জার্সি পরে! এমনিতে, ’৩৪ থেকেই ইতালির জার্সির বুকের বাঁদিকে থাকত, ‘ফাসিও লিত্তোরিও’ বা ফ্যাসিস্ট এমব্লেম। যা আদতে একগোছা লাঠি ও একটি কুঠারের চিত্র। ফুটবলাররা হাতায় ফ্যাসিস্ট আর্মব্যান্ড পরে, মাঠে নামতেন। ক্রীড়াক্ষেত্রে এই ফ্যাসিবাদী বার্তা ভাল ভাবে নেয়নি ফ্রান্সের দর্শকরা, যার মধ্যে ছিলেন, দেশ ছেড়ে ফরাসী দেশে আশ্রয় নেওয়া, বহু ইতালীয় মানুষও। বিশ্বকাপের ঠিক এক বছর আগে, এমনই এক দেশছাড়া, অত্যন্ত আকর্ষক ইতালীয় বুদ্ধিজীবী, কার্লো রসেলি ও তার ভাই নেরো, নরম্যান্ডিতে, ফ্রান্সের ছুরিকাঘাতে খুন হন।

ইতালীয় সংবাদমাধ্যম খুনের পেছনে কমিউনিস্ট ও নৈরাজ্যবাদীদের হাত দেখলেও, অচিরেই তথ্য প্রমাণ এক অতি দক্ষিণপন্থী ফরাসি সংগঠনের দিকে আঙুল তোলে। এ-ছাড়া খবরে প্রকাশ হয় যে, ইতালির গুপ্তপুলিশ রসেলি যে-হোটেলে ছিলেন, তার ওপর নজর রাখা ছিল। রসেলি এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে, প্যারিসে তার শেষকৃত্যে দু’লক্ষ লোকের জমায়েত হয়েছিল। এর জেরে পদত্যাগ করেতে বাধ্য হন, অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট গণফ্রন্টের রাষ্ট্রপতি লিও ব্লাঁ। রসেলি খুনের প্রতিক্রিয়ায়, ক্ষোভের আগুন ইতালিকে ফাইনাল অবধি তাড়া করে ফ্রান্সের মাটিতে। সেমিফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে, হাঙ্গেরির সঙ্গে ফাইনালে মুখোমুখি হয় আজ্জুরি। ম্যাচ যখন ১-১, দর্শকরা তীব্র কটাক্ষ আর গালি বর্ষণ করছে পোজ্জোর দলকে, তখন ক্যাটানেচিওতে ভর করে মিনিট কুড়ি স্বপ্নের ফুটবল খেলতে দেখা যায় তাদের। ক্যাটানেচিও সিসটেম প্রচলন করে, মাঝমাঠের গুরুত্ব বাড়িয়েছিলেন পোজ্জো, আর ডিফেন্সকে করেছিলেন নিশ্ছিদ্র। তারই প্রভাবে, প্রথমার্ধেই ৩-১-এ এগিয়ে যায় তারা; খেলা শেষ হল যখন, তখন স্কোরলাইন ৪-২-এ। জোড়া গোল করে, জয়ে বড় ভূমিকা নেন সিলভিও পিওলা। ভাল খেলেন জিসেপ্পি মিজ্জা। আবার বিশ্বকাপ উঠল আজ্জুরিদের হাতে। এবার বিদেশের মাঠে। আবার শোনা যেতে লাগল— ফাইনালের আগে, রোম থেকে নাকি পোজ্জোর কাছে এসেছিল টেলিগ্রাম-বার্তা— ‘ভিবেরে ও মোরিরে’!

ইতালির ফাইনাল জয়ের উচ্ছ্বাস

ফিরে আসি পোজ্জোতে। পরপর দু’বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন কোচ, ক্যাটানেচিওর স্রষ্টা ভিত্তোরিও পোজ্জো কি ফ্যাসিস্ট মনের ছিলেন? তথ্য বলছে, তিনি কোনওদিন পার্টির সদস্য ছিলেন না। তিনি ফ্যাসিস্ট পার্টি ক্ষমতা দখল করার এক দশক আগে, ১৯১২ থেকে ইতালির কোচ। তবে তার অনুশীলন চলত, সামরিক অনুশাসন মেনে। প্রস্তুতি শিবিরের মধ্যেম, সামরিক শিবিরের ছায়া দেখেছিলেন, তদানিন্তন অনেক সাংবাদিক। ফুটবলারদের ফ্যাসিস্ট স্যালুট করানো, সিরি-আতে প্রতিদ্বন্দ্বী দলে খেলা ফুটবলারদের একাত্মিভূত করতে, প্রবল ইগো সমস্যা থাকা দুই ফুটবলারকে তিনি একঘরে থাকতে বাধ্যা করতেন। এটাও সত্যি, সামরিক কায়দায় পোজ্জো জঙ্গলে ফুটবলারদের ট্রেনিং করাতেন। ফুটবলারদের জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ করতে, তাদের প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নিহত সৈনিকদের স্মৃতিসৌধতে নিয়ে যেতেন। তবুও ক্রীড়া ইতিহাসবিদ অধ্যাপক জিন উইলিয়ামস বলেন, ‘বিষয়টা আসলে, সে-সময়ে যদি কেউ দেশ ছেড়ে না চলে যেত, তাহলে তার পক্ষে এটা এড়ানো সম্ভব ছিল না। পোজ্জো ফুটবলকে ভালবাসতেন, ফুটবল প্রশিক্ষণে থাকতে চাইতেন, তাই ফ্যাসিস্ট শাসনের প্রভাব তাকে মানতে হয়েছিল।’ এই যুক্তি অনেকটাই অকাট্য। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের জন্য, ১৯৪২ আর ’৪৬-এ বিশ্বকাপ হয়নি। তাই পোজ্জোর আর বিশ্বকাপে ফেরা হয়নি। ১৯৪৫-এ ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর, ’৪৮-এ পোজ্জোকে সরিয়ে দেওয়া হয় কোচের পদ থেকে। ‘লা স্টাম্পা’ কাগজের ক্রীড়া-প্রতিবেদক হয়ে তিনি কাটান বহুদিন। ১৯৬৮-তে প্রয়াত হন পোজ্জো।

সামরিক থেকে নির্বাচিত সরকার, মুসোলিনির পথ ধরে পরবর্তীতে, বিশ্বকাপকে নিজ ক্ষমতার বিজ্ঞাপন আর কোনও শাসক যে করেনি তা নয়। ১৯৬৬ বা ’৭৮-এর প্রসঙ্গ উঠতে পারে এই প্রেক্ষিতে; তবে এক্ষেত্রে মুসোলিনির উদাহরণ ইতিহাসে সবার ওপরে থাকবে।

রোমের সেই স্তাদিও নাৎসিওনালে স্টেডিয়াম ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, ১৯৫৩-র পর। নেপল্‌সের ওই স্টেডিয়ামও মহাযুদ্ধের সময়ে মিত্রশক্তির বোমাবর্ষণে ধ্বংস হয়ে যায়। নতুন শাসক ক্ষমতায় এসে, ’৩৪-এর বিশ্বকাপ বিতর্কের কোনও তদন্ত করেনি; শুধু ফ্যাসিস্ট প্রভাবমুক্ত করার জন্য, মুছে দিতে চেয়েছে ওই সময়ের বহু স্মৃতি! কিন্তু, স্কিয়াভিও-মন্তিদের ‘ভিবেরে ও মোরিরে’ কি বলেছিলেন মুসোলিনি? তা আজও রহস্যই রয়ে গেল!