নভেম্বরের সন্ধ্যায় কিংস্টনের ইন্ডিপেন্ডেন্স পার্কে দ্বিতীয়ার্ধের শেষে ইনজুরি টাইমে যখন রেফারি ইভান বার্টন ভিএআর মনিটরের দিকে ছুটে গেলেন, তখন কুরাসাও বনাম জামাইকা ম্যাচের স্কোর ০-০। এই সিদ্ধান্তটা যে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, সেটা ২০২৬ বিশ্বকাপের কনকাকাফ কোয়ালিফায়িং পর্বের অন্তিম লগ্নের আগে কেউ কল্পনাও করেননি। কনকাকাফ কোয়ালিফায়িংয়ের তৃতীয় রাউন্ডে জামাইকা, ত্রিনিদাদ এবং টোবাগো আর বারমুডার সঙ্গে একই গ্রুপে যোগ দিয়েছিল কুরাসাও। তাদের যোগ্যতা অর্জন পর্বের প্রথম ধাপে তারা প্রত্যেকটা খেলা জিতেছিল ঠিকই, কিন্তু জামাইকা আর ত্রিনিদাদ এবং টোবাগোর মতো দলের বিরুদ্ধে তাদের সম্ভাবনা নিয়ে ওয়াকিবহাল মহলে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। আর গ্রুপের শুরুর দিকের খেলায় সেই সন্দেহ আরও জোরালো হয়। বারমুডাকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল জামাইকা। কুরাসাও ত্রিনিদাদের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করেছিল। জামাইকা তার পরের খেলায় ত্রিনিদাদকে সহজেই হারিয়েছিল ২-০ গোলে। কুরাসাও বারমুডার বিরুদ্ধে দুই গোলের লিড নিলেও, সেই লিড তাদের হাতছাড়া হয়। শেষতক ৭৫ মিনিটে নসলিনের গোলে তারা তিন পয়েন্ট সুনিশ্চিত করে। এরপর জামাইকা আর কুরাসাও মুখোমুখি হয়েছিল কুরাসাওয়ের রাজধানীতে। সেই ম্যাচটা সব হিসেব এলোমেলো করে দিয়ে এক আশ্চর্য স্বপ্নের দরজা হাট করে খুলে দেয়। কুরাসাও নামজাদা বিপক্ষকে আত্মবিশ্বাসী ঢংয়ে ২-০ গোলে হারিয়ে কোয়ালিফিকেশনের লড়াই জমিয়ে তুলেছিল। প্রথম গোলটা যিনি করেছিলেন, তাঁর নামটা মাসসাতেক পরে ফুটবল বিশ্বে ভীষণই পরিচিত হয়ে উঠবে— কোমেনেন্সিয়া।
এর পরের দুটো খেলায় কুরাসাও ত্রিনিদাদের সঙ্গে ফের ড্র করে, আর বারমুডার বিরুদ্ধে বড় ব্যবধানে জেতে। জামাইকাও একটা ড্র আর একটা জয় পকেটে পুরে ঘরের মাঠে কুরাসাওয়ের বিরুদ্ধে কোয়ালিফায়িং পর্বের শেষ ম্যাচটি খেলতে নেমেছিল। খাতায়-কলমে এগিয়ে থাকা জামাইকার বিরুদ্ধে হার এড়ালেই কুরাসাওয়ের বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত। কিন্তু হার এড়ানো বড় সহজ ছিল না। জামাইকা দ্বিতীয়ার্ধে কুরাসাওয়ের প্রাচীর ভাঙতে সর্বস্ব পণ করে হামলা চালিয়েছিল। তিন-তিনবার তাদের শট লেগেছিল পোস্টে। তা সত্ত্বেও ধীরে-ধীরে গোলশূন্য ম্যাচ ঢলে পড়ছিল শেষ বাঁশির দিকে। এমন সময়ে জামাইকা একটা পেনাল্টি পাওয়ায় কুরাসাওয়ের হাতের কাপ আর ঠোঁটের দূরত্ব হঠাৎই যেন হয়ে গেল যোজনবিদারী। অতলান্তিকের পশ্চিম প্রান্তের দুটো দ্বীপরাষ্ট্র নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছিল ভিএআর মনিটরে মগ্ন রেফারির চরম সিদ্ধান্তের। রেফারি মাঠে ফিরে জানালেন জামাইকা পেনাল্টি পাবে না। দেড় লাখ মানুষের ছোট্ট দেশ বিশ্বকাপের ত্রয়োবিংশতি সংস্করণে তাদের বিশ্বকাপ অভিষেক সুনিশ্চিত করে সারা পৃথিবীকে অবাক করে দিল।
আরও পড়ুন: বিশ্বকাপের টিকিটের দামের সঙ্গে জড়িয়ে ফিফার ক্রিপটো টোকেন?
লিখছেন অর্পণ গুপ্ত…
২০২৬ বিশ্বকাপে অভিষেক ঘটল অতলান্তিকের পূর্ব প্রান্তেরও একটি দ্বীপরাষ্ট্রের। আফ্রিকার ফুটবলে গত দেড় দশকে তারা বেশ খানিকটা সাড়া জাগিয়েছে। ২০২৩-এর আফ্রিকা কাপ অফ নেশনসে মিশর ও ঘানার মতো দুই কন্টিনেন্টাল সুপার-পাওয়ারের বিরুদ্ধে লড়াই করে তারা গ্রুপে প্রথম স্থান অর্জন করেছিল। সেই টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার-ফাইনালে টাইব্রেকারে হারলেও ফুটবল-সমাজে বিরাট সম্ভ্রম আদায় করে নিয়েছিল কেপ ভার্দে। ২০২৫ সালের আফ্রিকা কাপ অফ নেশন্সে যোগ্যতালাভে ব্যর্থতা আর বিশ্বকাপের কোয়ালিফায়িং গ্রুপে ক্যামেরুনের মতো দুঁদে প্রতিপক্ষ থাকা সত্ত্বেও কেপ ভার্দে আশাবাদী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন সফল করা কতখানি কঠিন, সেটাই গ্রুপ পর্বের তৃতীয় ম্যাচে ক্যামেরুনের বিরুদ্ধে ৪-১ ব্যবধানে পরাজয় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। কিন্তু কেপ ভার্দে গুটিয়ে যায়নি। পরের দুটো ম্যাচ তারা জেতে। আর ক্যামেরুন পরপর দুটো ড্র করে। দুই দলই তার পরের দুটো ম্যাচ জিতে ফের পরস্পরের মুখোমুখি হয় গ্রুপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলায়। কুরাসাওয়ের মতোই, ঘরের মাঠে কেপ ভার্দে ধারেভারে এগিয়ে থাকা প্রতিপক্ষকে ১-০ মাত দিয়ে স্বপ্নপূরণের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছিল। এসওয়াতিনির বিরুদ্ধে গ্রুপের শেষ ম্যাচে ৩-০ ব্যবধানের প্রাণোচ্ছ্বল জয়ের মাধ্যমে কোয়ালিফায়িং গ্রুপে কেপ ভার্দে চার পয়েন্টের ব্যবধান রেখে প্রথম স্থান অধিকার করে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করে।

পৃথিবীর প্রায় সমস্ত দক্ষিণপন্থী ক্ষমতাতন্ত্র যখন অভিবাসনের প্রশ্নটাকে নিজেদের রাজনীতির কেন্দ্রীয় সূত্র হিসেবে ব্যবহার করছে, অভিবাসী মানুষের অস্তিত্বের অধিকার নিয়ে যখন পৃথিবীর নানা প্রান্তে উঠছে তর্কবিতর্কের ঝড়, ঠিক তখনই কুরাসাও আর কেপ ভার্দের মতো দলের এই সাফল্য হয়ে উঠছে আরও গুরুত্বমণ্ডিত। ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডে সিনিয়র ক্লাব কেরিয়ার শুরু করা তাহিত চং বাদে কুরাসাও স্কোয়াডের সব খেলোয়াড়েরই জন্ম নেদারল্যান্ডসে। তাহিত চং-সহ স্কোয়াডের সিংহভাগ নেদারল্যান্ডসের অনূর্ধ্ব-১৫ থেকে শুরু করে অনূর্ধ্ব-২১ জাতীয় দলের হয়ে ফুটবল খেলেছেন। নেদারল্যান্ডসের টপ-ফ্লাইটের নানা ক্লাবে এই স্কোয়াডের বেশিরভাগ খেলোয়াড় খেলেন। ডাচ টোটাল ফুটবলের প্রবাদপ্রতিম প্রবর্তক রাইনাস মাইকেলসের সহকারী হিসেবে ১৯৮৪ সালে সিরিয়াস কোচিং কেরিয়ার শুরু করেছিলেন ডিক অ্যাডভোকাট। ১৯৯৪ আর ২০০২ বিশ্বকাপে তিনিই ছিলেন নেদারল্যান্ডসের ম্যানেজার। কুরাসাওয়ের সফল কোয়ালিফিকেশন ক্যাম্পেনের অন্যতম কান্ডারি অ্যাডভোকাট এখন বিশ্বকাপ ইতিহাসের বয়োজ্যেষ্ঠতম ম্যানেজার।
ওদিকে কেপ ভার্দের বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই তাদের ডায়াস্পোরা পপুলেশনের অংশ, অধিকাংশেরই জন্ম ইউরোপে। আয়ারল্যান্ডের শ্যামরক রোভার্স ক্লাবের পিকো লোপেজ যেমন। কেপ ভার্দে জাতীয় দলে খেলার জন্য তাঁকে পর্তুগিজ ভাষায় মেসেজ পাঠানো হয়েছিল তাঁর লিংকডইন প্রোফাইলে। এদিকে পর্তুগিজ না-জানায় পিকো লোপেজ সেই মেসেজটাকে ‘স্প্যাম’ ভেবেছিলেন। বেশ কিছুদিন বাদে ইংরেজিতে ফের তাঁর সঙ্গে লিংকডইনে যোগাযোগ করার চেষ্টার পর অবশেষে তিনি কেপ ভার্দের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলার সিদ্ধান্ত নেন।
কুরাসাওয়ের স্কোয়াডে যেমন ডাচ যোগাযোগ নিবিড়, কেপ ভার্দের তেমনই পর্তুগালের সঙ্গে যোগ। মাত্র একান্ন বছর আগেও দেশটা পর্তুগিজ উপনিবেশ ছিল। কুরাসাও আজও সার্বভৌম রাষ্ট্র নয়। স্বতন্ত্র দেশ হিসেবে ২০১১ সালে আত্মপ্রকাশ করলেও তাদের বিদেশনীতি নেদারল্যান্ডসের অধীন। এই দুই দেশের বিশ্বকাপ খেলার গল্পে তাই উপনিবেশবাদের একটা বড় ভূমিকা থেকেই যায়। তথাকথিত উপনিবেশোত্তর যুগেও বৈশ্বিক মঞ্চে নিজেদের তুলে ধরতে কুরাসাও বা কেপ ভার্দের মতো দেশগুলোকে কোনও না কোনওভাবে এককালীন ঔপনিবেশিক প্রভুদের মুখাপেক্ষীই হতে হয়। এতসব নাটকীয় মালমশলা থাকলেও তাই কেপ ভার্দে আর কুরাসাওয়ের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ অসম্ভবকে সম্ভব করার রূপকথা নয়, বরং উপনিবেশবাদ আর অভিবাসনের ইতিহাসে তৈরি সুযোগের কৌশলী সদ্ব্যবহারের কাহিনি।
তাই বলে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম সপ্তাহে যথাক্রমে জার্মানি এবং স্পেনের বিরুদ্ধে কুরাসাও আর কেপ ভার্দের বিশ্বকাপের প্রথম খেলাদুটোর মহিমা অনুজ্জ্বল হয় না। কুরাসাও ৭-১ গোলে হারার গ্লানি মাখলেও, ২১ মিনিটের মাথায় কোমেনেন্সিয়ার সমতা ফেরানোর গোল এই বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত। বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশিবার ফাইনাল খেলা জার্মানির অহংয়ে কুরাসাও বড়সড় ঘা দিলেও প্রথমার্ধের শেষদিক থেকে জার্মানি খেলায় একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম করেছিল। তবুও, প্রত্যাশিত গোলের পরিসংখ্যান দেখলে এটা স্পষ্ট যে, স্কোরলাইন কুরাসাওয়ের প্রদর্শনের প্রতি অবিচারই করেছে। কেপ ভার্দে নিজেদের প্রথম ম্যাচে গোল না করতে পারলেও বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটনগুলোর মধ্যে একটা ঘটিয়ে ফেলল ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন এবং অন্যতম ফেভারিট স্পেনকে সফলভাবে আটকে রেখে। চল্লিশ পার করে ফেলা কিপার ভোজিনহার দর্শনীয় পারফর্মেন্স আর অক্লান্ত ও বুদ্ধিদীপ্ত ডিফেন্ডিং তারকা-খচিত স্প্যানিশ দলের ধার ভোঁতা করে রেখেছিল আস্ত ম্যাচজুড়ে।
স্রেফ ফলাফল দিয়ে অবশ্য বিশ্বকাপের খেলার বিচার হয় না। তুলনামূলকভাবে অনামা দুটো দেশের সারা পৃথিবীজুড়ে এত হেডলাইন সৃষ্টি করাটাই তো বিশ্বকাপের ম্যাজিক।


