ফুটবল বিশ্বকাপ, এই শব্দদুটো কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিতেই, মানুষ যেন পাড়ি দেয় এক জাদুর দুনিয়ায়। এই দুনিয়া আমাদের রোজকার হতাশার, যুদ্ধের, হানাহানির, তীব্র প্রতিবাদের দুনিয়া থেকে অনেকটাই আলাদা। এই দুনিয়ায় হরেক রঙের মিশেল। বিভিন্ন দেশের বিভিন্নরকম সমর্থক, তাদের সংস্কৃতি, অভ্যেস আর নানারকমের ফ্যাশনের বাহার নিয়ে ধরা দেয় চোখের সামনে। আয়োজক দেশের রাস্তা জুড়ে বিভিন্ন-রঙা সমর্থকদের ঢল নামে। যে-সব দেশ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করে না, সেইসব দেশের মানুষও নিজ-নিজ প্রিয় দলের জার্সি গায়ে বসে যায় টেলিভিশনের সামনে, বা বছরের পর বছর অর্থ সঞ্চয় করে পাড়ি দেয় বিদেশের মাটিতে, নিজের প্রিয় দলের খেলা সামনে থেকে দেখবে বলে। এই কয়েক মাস পৃথিবীটা খানিকটা বন্ধুত্বপূর্ণ মনে হয় যেন।
বিশ্বকাপ মানে আবেগের ছড়াছড়ি। এ’ক-দিন মানুষ তাদের যাবতীয় দৈনিক সমস্যা থেকে খানিক ছুটি নিয়ে খেলার মেজাজে মাতবে। নিজের দল জিতলে, খুশিতে আত্মহারা হবে, হারলে মন খারাপ। সেই সঙ্গে চলবে তর্কবিতর্ক বাকিদের সঙ্গে। তবে এবারের বিশ্বকাপের আয়োজক দেশগুলির মধ্যে প্রধান দেশ আমেরিকা। আর তাতেই বাঁধভাঙা খুশির মেজাজে খানিক বাধা আসছে কি? এর উত্তর দুর্ভাগ্যবশত, ‘হ্যাঁ’। কানাডা, মেক্সিকো এবং আমেরিকা— এই তিন আয়োজকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সমস্যা তৈরি করেছে বা করছে আমেরিকা।
ইরানের বিশ্বকাপ দলের মুখপাত্র মেহেদি তারেমি-র কথায়, যে বিশ্বকাপ মানে এক দেশের অন্য দেশের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ হাত বাড়িয়ে দেওয়া বোঝায়, সেটারই খামতি ঠেকছে। যদিও ইরানের খেলোয়াড়েরা তাদের ভিসা পেয়েছে যথাসময়ে, বেশ কিছু কর্মকর্তাদের ভিসা নাকচ হয়ে গিয়েছে শেষ মুহূর্তে। শুধু তাই নয়, খেলাগুলো আমেরিকায় হলেও, এই দল তাদের বেস ক্যাম্প সরিয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে মেক্সিকোয়। অর্থাৎ যে শহরে তাদের খেলা, সেই শহরেই রাত কাটানোর অনুমতি মেলেনি। খেলা শেষ করে প্রতিবার তাদের ফিরে আসতে হবে মেক্সিকোয়। যে খেলা বিভিন্ন দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে, সে খেলাতেই বিভেদের সৃষ্টি করছে, পৃথিবীর অন্যতম ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড কান্ট্রি! কিন্তু কেন? ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চলছে বলেই কি? কিন্তু তার প্রভাব কি আদৌ বিশ্বকাপে ছাপ ফেলার কথা?
আরও পড়ুন: কেপ ভার্দে বা কুরাসাও কি কেবলই রূপকথা?
লিখছেন অপলক…
ইরাক বিশ্বকাপ দলের স্ট্রাইকার আমেন হুসেইনকেও অনেক ঝঞ্ঝাট পেরিয়ে তবেই এই দেশে ঢোকার অনুমতি পেতে হয়েছে। চিকাগো’র ও’হারে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর প্রায় সাতঘণ্টা আটক রেখে জেরা করার পর তবেই তাঁকে আমেরিকায় প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়। টিমের চিত্রগ্রাহকের অবশ্য এটুকু প্রাপ্তিও হয়নি। বিমানবন্দর থেকেই দেশে ফিরে যেতে হয় তাঁকে।
কিন্তু ঠিক কী কারণে এই দুর্দশার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাঁদের? কেবলমাত্র কোন দেশের বাসিন্দা, সেই অনুযায়ীই আচরণ কি ফুটবল খেলোয়াড় থেকে প্রেমী মানুষদের আয়োজক দেশের থেকে প্রাপ্য? বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করছে এমন দেশ— ইরান, হাইতি, সেনেগাল এবং আইভরি কোস্টের ফুটবলপ্রেমী দর্শকদের সরাসরি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখার জন্য এই দেশে ঢোকার অনুমতি নেই তাদের।
প্রসঙ্গত, সোমালিয়ার বিখ্যাত ফুটবল রেফারি ওমার আরটানকেও আয়োজক দেশে ঢুকতে দেওয়া হয়নি এ-বছর। সোমালিয়া থেকে প্রথম রেফারি হিসেবে বিশ্বের অন্যতম ৫২ রেফারির মধ্যে নির্বাচিত হয়েছিলেন আরটান। বিশ্বের চোখে যা হতে পারত এক ঐতিহাসিক মাইলফলক, তা কয়েক ঘণ্টায় নস্যাৎ হয়ে গিয়েছে মিয়ামি-র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পাঁচদিন আগেই বিমানবন্দরে পা রেখেছিলেন আরটান। সেখানেই একটি ঘুপচি ঘরে প্রায় ১১ ঘণ্টা জেরা করার পর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ‘যাচাই-সংক্রান্ত’ কারণে তারা আরটানকে তাদের দেশে ঢোকার অনুমতি দিতে পারেনি। সঠিক কাগজ এবং ভিসা থাকা সত্ত্বেও ফিরে যেতে হয়েছে তাঁকে। এমনকী, কোনও বিশেষ কারণও দর্শানো হয়নি তাঁকে। সুইস স্ট্রাইকার ব্রিল এম্বোলো তাঁর দলের বাকিদের সঙ্গে আমেরিকার উদ্দেশ্যে রওনা দিতে পারেননি ‘ভিসা ভেইভার’ সঙ্গে না থাকায়। তবে কিছুদিন পরেই অবশ্য নিজের দলের হয়ে খেলতে ক্লিয়ারেন্স ভিসা সংগ্রহ করে তিনি পাড়ি দ্যান আমেরিকায়।
এছাড়াও এই দেশের কড়া ভিসা ও অভিবাসন প্রক্রিয়া বিভিন্নরকমের বাধার সৃষ্টি করে চলেছে অনবরত। খেলোয়াড় থেকে টিমের কর্তৃপক্ষ বা অন্য দেশ থেকে আসা দর্শক— কেউ-ই এর হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। দক্ষিণ আমেরিকার জাতীয় টিম আয়োজক দেশে নির্ধারিত দিনের অনেক পরে এসে পৌঁছেছে, কারণ তাঁদের প্রতিনিধি দল যথাসময়ে ভিসা পায়নি। উজবেকিস্তানের জাতীয় দলকে বিমানবন্দরে আটক করে বেশ কিছুক্ষণ বোমা শনাক্তকারী কুকুরদের দিয়ে অনুসন্ধান করানো হয়েছে, যার ফুটেজ সোশ্যাল মিডিয়ায় রীতিমতো বিতর্কের ঝড় তুলেছে।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অবশ্য এই বিষয়ে নির্বিকারই ঠেকছে। তাঁর মতে, ‘কেবল সঠিক মানুষরাই যাতে আমাদের দেশে প্রবেশ করতে পারে, তার জন্য আমরা কড়া নজড়দারি রেখেছি।’ কিন্তু ঠিক মানুষ কারা, আর মানুষ হিসেবে কারাই বা ভুল, কী দেখে সেটার বিচার হবে— তা ঠিক করার অধিকার আমেরিকাকে কে দিল, সেটাই কারও জানা নেই। তাই আয়োজক কম এবং মরাল পুলিশ হয়েই আপাতত বিশ্বের চোখে ধরা দিচ্ছে আমেরিকা। নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির কথায়, বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে এই দেশের যা আচরণ হওয়া উচিত, তার ঠিক উল্টোটাই হচ্ছে এখন।
এছাড়া আকাশছোঁয়া টিকিটের দাম তো রয়েছেই। গতবারের বিশ্বকাপের টিকিটের দামের তুলনায় এবারের টিকিটের দাম অনেকটাই বেশি। যাঁরা খেলা দেখতে যাওয়ার জন্য সঞ্চয় করেন তাঁরা বাদ দিয়েও, রীতিমতো উচ্চবিত্ত মানুষজনের কাছেও খেলার টিকিট এ-বছর দুর্মূল্য। এর ফলে নিউ জার্সি ও নিউ ইয়র্ক ‘ফিফা’-র বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে। অ্যাটর্নি জেনারেল জেনিফার ড্যাভেনপোরটের কথায়, উচ্চমূল্যের সঙ্গে সঙ্গে টিকিটের কৃত্রিম সংকটের সম্ভাবনা ইচ্ছাকৃত ভাবে তৈরি করেছে তারা। এর ফলে ক্রেতাদের মধ্যে নানারকমের সংশয় তৈরি হয়েছে। ফিফার প্রেসিডেন্ট জিয়ানি ইনফান্তিনো অবশ্য এইসব জল্পনার কথা উড়িয়ে দিচ্ছেন। তাঁর মতে, যে-হারে সবকিছুর দাম বাড়ছে, খেলার টিকিটের দামও যে বাড়বে, তাতে আশ্চর্যের কী?
কিন্তু টিকিটের দামের সঙ্গে সঙ্গে শহরগুলির হোটেল, রেস্তোরাঁয় খাবারের দাম— এইসবও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যা সাধারণ মানুষের কাছে গলায় কাঁটা হয়ে ফুটছে।
অনেকের মতেই, পুরোদমে খেলা শুরু হয়ে গেলে শুরুর দিকের টানাপোড়েন অনেকেই ভুলে যায়। তাই বিশ্বকাপে মজে গিয়ে খেলোয়াড় থেকে ফ্যানেরা এইসব চাপানউতোর হয়তো অত মনে রাখবেন না। এমনকী আয়োজক দেশ হিসেবে আমেরিকা হয়তো শেষমেশ ‘ফ্লাইং কালারস’ নিয়েই পাশ করে যাবে।
২০২৬-এর ফুটবল বিশ্বকাপে কিছু বদলও এসেছে এবারে। প্রায় ৪০ দিন ধরে মোট ৪৮টি দল অংশগ্রহণ করছে এই খেলায়। ১২টি গ্রুপে (প্রত্যেকটি গ্রুপ’এ চারটি টিম) তৈরি হওয়ার ফলে, এবারে মোট ম্যাচের সংখ্যাও বেড়ে হয়েছে ১০৪। যেখানে বৈশ্বিক প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে এই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে ‘ফিফা’ সেখানে তাদেরই এক আয়োজক রাজনৈতিক চাপানউতোরকে খেলার থেকে গুরুত্ব দিচ্ছে অনেক বেশি। এই যে তিনটি দেশের মধ্যে বিশ্বকাপের আয়োজন ভাগ করে দেওয়া হয়েছে, সেটাও কম সমস্যার নয়। বিশেষ করে আমেরিকা ও মেক্সিকো-র যেখানে কোনও সুসম্পর্কই নেই। দুই দেশের মাঝখানে রয়েছে সামরিকীকৃত সীমান্ত। এমনকী, ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ কয়েকবার মেক্সিকো আক্রমণের হুমকি দিয়েছে, যা একেবারেই স্পোর্টসম্যান-সুলভ আচরণ নয়। এমন নয়, যে, বিশ্বকাপে রাজনীতির ছাপ কোনওদিনই পড়ে না। এর আগেও কাতার এবং রাশিয়ায় বিশ্বকাপের শুরুতে মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে বিস্তর ঝামেলা হয়েছিল, তবে খেলা শুরু হয়ে যাওয়ার পর সেই নিয়ে বিশেষ সমস্যা হয়নি। তবে এবারে, পরপর ভিসা নাকচ ও আটকের চক্করে টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই আনন্দে ভাটা পড়ছে বিস্তর। মনে হচ্ছে, গোটা টুর্নামেন্টটাই যেন আমেরিকার সীমানা’র ইশারায় দাঁড়িয়ে।
অনেকের মতেই, পুরোদমে খেলা শুরু হয়ে গেলে শুরুর দিকের টানাপোড়েন অনেকেই ভুলে যায়। তাই বিশ্বকাপে মজে গিয়ে খেলোয়াড় থেকে ফ্যানেরা এইসব চাপানউতোর হয়তো অত মনে রাখবেন না। এমনকী আয়োজক দেশ হিসেবে আমেরিকা হয়তো শেষমেশ ‘ফ্লাইং কালারস’ নিয়েই পাশ করে যাবে। তবে সেসব এখন সময়ের অপেক্ষা। আগামী দু’মাসে ঠিক কতটা উদ্বেগহীন প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশের জাতীয় দল খেলতে পারবে, যাঁরা অন্য দেশ থেকে খেলা দেখতে যাচ্ছেন, তাঁরা কতটা সুরক্ষিত থাকবেন, এই সবকিছুর ওপর নির্ভর করবে আমেরিকার আয়োজক হিসেবে স্কোরকার্ড।




