যুগান্তরের বার্তা
প্রায় বছরখানেক চলেছিল ওই কাঠ বেকার দশা। ঘুরে বেড়াতাম, এদিক-সেদিক। টুকটাক লেখালিখি করে উপার্জন। মনে পড়ে, শ্রীরামপুরের অগ্রজ কবি প্রণবদা, প্রণব বসুরায় তাঁর এলাহাবাদ ব্যাঙ্কের স্যুভেনিরের প্রচ্ছদ আঁকার জন্য দিয়েছিলেন দেড়শো টাকা। সেসময়ে ঢের টাকা, ঢেরশোও বলা যায়। চম্বলে ভলিবল খেলতে দেখেছি গ্রামবাসী তরুণদের, সেই মাতামাতিতে দু’-চারজন বাগি দলের সদস্যও থাকতে পারেন। মান সিংয়ের ছেলে তহশিলদার সিংকে দেখেছি, তখন প্রৌঢ়, একলাফে উটের পিঠে উঠে বসলেন। ৬০ দশকের বাগি দলের নেতা পান সিং তোমর তো সেনাবাহিনীতে থাকার সময় দৌড়ের অ্যাথলিট হিসেবে টোকিও অলিম্পিকে গিয়েছিলেন ভারতীয় ক্রীড়বিদদের দলে, ব্রোঞ্জ পদকজয়ী। লিখে ফেললাম একটি খেলার লেখা— প্রশিক্ষণ পেলে চম্বল দস্যুরা হতেন অলিম্পিকে পদক জেতার ক্রীড়াবিদ। ‘আজকাল’ পত্রিকার অফিসে গিয়ে আমার বন্ধু দেবুকে ( দেবাশিস মুখোপাধ্যায়, দে মু) বলতেই সে নিয়ে গেল অশোক দাশগুপ্তর কাছে, তিনি তখন ‘আজকাল’-এর স্পোর্টস এডিটর। ‘আজকাল’-এর রবিবারের সাময়িকীতে খেলার পাতাটিতে বেরিয়ে গেল আমার ওই লেখা। সঙ্গে ছবি উটের পিঠে তহশিলদার, বেহড়ে ভলি খেলা। আড়াইশো টাকা পেলাম। সেই আমলে ওই টাকায় পুরুলিয়া গিয়ে তিন-চারদিন থেকে ফিরেও হাতে দু-দশটা টাকা থেকে যায়।
ওইরকম একদিন, দুপর তখন নামব-নামব করছে, চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছি। একটা রিকশায় এসে টলমলভাবে নেমে সুনীলদা, সুনীল মিত্র, আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে রঙিন মানুষটি— বললেন, তিনদিন ধরে সত্যবাবু তোমাকে গরুখোঁজা খুজছে! থাকো কোথায়! চল এখন সত্যবাবুর কাছে। ওই রিকশায় আমাকে জাপটে ধরে সুনীল মিত্র নিয়ে চললেন শ্রীরামপুর কোর্টে সত্যবাবুর দপ্তরে।
পুলিশ অফিসার সবিস্ময়ে শুধোলেন, সাইকেলে প্রেস! পড়ুন ‘সংবাদ মূলত কাব্য’ পর্ব ৩৭…
কে সত্যবাবু, তা বলা দরকার। সেই ১৯৬৮ সালে যখন সোমনাথদা, মুকুলদা, গৌতম মজুমদার, সুহাস মুখোপাধ্যায়, প্রণব বসুরায়রা ‘শীর্ষবিন্দু’ পত্রিকাটি বের করেন, তাঁদের বন্ধু সত্যরঞ্জন বিশ্বাস কলকাতা থেকে বের করতেন ‘কণ্ঠস্বর’ নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন, অনেকে মিলে; এবং বেশ পরিচিত ছিল পত্রিকাটি। মাঝে মাঝে সত্যদা শ্রীরামপুরে আমাদের কাছে আসতেন, তাঁর পত্রিকাতেও কয়েকবার আমার কবিতা বের হয়েছে। সেসময় ‘শীর্ষবিন্দু’ ও ‘কণ্ঠস্বর’ দু’টি পত্রিকাকেই আমরা আমাদের কাগজ মনে করতাম। সত্যদা ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রশাসনিক অফিসার। একসময় তিনি কৃষি বিভাগে ছিলেন। সেই সূত্রে তখন ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’-য় চাষবাস সংক্রান্ত যে ‘ভূমিলক্ষ্মী’ বিভাগটি বের হত, তাতে সত্যদা লিখতেন, ‘যুগান্তর’-এও চাষবাসের পাতায় লিখতেন (এখন সংবাদপত্রগুলি হয়তো কৃষকদের কথা ভাবে না)। যখন সত্যদা আমাকে খুঁজছিলেন, তখন তিনি ছিলেন শ্রীরামপুর কোর্টে কোনও প্রশাসনিক পদে কর্মরত, তাঁর সরকারি আবাসনটি ছিল শ্রীরামপুরের মাহেশে। তা, সুনীল মিত্র আমাকে নিয়ে যখন সত্যরঞ্জন বিশ্বাসের শ্রীরামপুর কোর্টে তাঁর দপ্তরে গেলেন, সত্যদা আমাকে দেখেই বললেন, কোথায় ছিলে! তিনদিন ধরে তোমাকে খুঁজছি! বলতে বলতেই কাকে যেন ফোন করলেন, ফোনে বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, মৃদুলকে পাওয়া গেছে। আচ্ছা, আচ্ছা,এখনই রওনা হচ্ছি। এরপর আমাকে সত্যদা বললেন, চলো, চলো, এখনই যেতে হবে, অমিতদা তোমাকে নিয়ে যেতে বলছেন।
তখন দুপুর দেড়টা, চান করিনি, খাইনি। সত্যদা বললেন, ছাড়ো তো..। বাগবাজারে ‘যুগান্তর’ অফিসে যেতে হবে, অমিতাভ চৌধুরী তোমাকে নিয়ে যেতে বলেছেন। সুনীলদা বললেন, আমি তোমার বাড়িতে বলে দেব। সুনীলদার ইএসআই হাসপাতালের কোয়ার্টার যেতে আমাদের বাড়ি হয়েই যেতে হবে।

সত্যদা গাড়িতে আমাকে নিয়ে চললেন বাগবাজার। ‘যুগান্তর’-এ স্কুলে সেভেন-এইটে পড়ার সময় ছোটদের পাততাড়ি-তে ছড়া লিখেছি। এরপর ইদানীং ‘যুগান্তর’-এর প্রথম পাতার নিচে বাঁদিকের কোণে ‘রোজনামতা’-য়ও কয়েকটা ছড়া লিখেছি। আমার বন্ধু চন্দননগরের সনৎ মান্নাও চমৎকার ছড়া লিখত। তারও ছড়া বেরিয়েছিল ‘রোজনামতা’-য়। শুনেছিলাম, রোজনামতা-র দেখভাল করতেন অমিতাভ চৌধুরী, অমল, অমল চক্রবর্তী কার্টুন আঁকতেন।
১৯৭৮-এর বন্যার সময় সনৎ একটি ছড়া লিখে ‘রোজনামতা’-য় অমিতাভ চৌধুরীকে পাঠিয়ে দেয়— অমিতাভ চৌ-কে/ আর তাঁর বৌকে/ বন্যায় দেখা গেল/ভাসছেন নৌকে।— এ-ছড়া অমিতাভ চৌধুরী ছাপেননি। সত্যদা আমাকে নিয়ে অমিতাভ চৌধুরীর ঘরে তাঁর মুখোমুখি বসাতেই আমি বলতে শুরু করলাম, রোজনামতায় মাঝে মাঝেই আমি ছড়া লিখি, ছোটবেলায় পাততাড়িতে অনেক ছড়া লিখেছি…। অমিতাভ চৌধুরী বললেন, সেসবে কিচ্ছুটি হবে না। এরপরই অমিতাভ চৌধুরী কাকে যেন ডাকলেন, নরহরি, নরহরি। নরহরি আসতেই তাকে বললেন, যাও ইউএনআই, পিটিআইয়ের কিছু ক্রিড ছিঁড়ে আনো। নরহরি দু’হাতে দু’টি কাগজের ছোট-ছোট রোল এনে দিল। তখনই জানলাম সংবাদ সংস্থা টেলিপ্রিন্টারে যেসব খবর পাঠায়, সেগুলি মেশিনের কাগজের রোলে যে প্রিন্ট পাঠায়, তাকে ক্রিড বলে। ওই ক্রিড দ্রুত একটা স্কেল দিয়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে সাজিয়ে অমিতাভ চৌধুরী আমাকে একটি খবরের দু’টি স্লিপ আলপিন এঁটে আমাকে দিয়ে বললেন, যাও বাইরে যেখানে সাব-এডিটররা বসে, সেখানে বসে খবর লিখে আনো। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করবে না, অসুবিধা হলে আমার কাছে এসে বলবে। আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম। সত্যদা অমিতাভ চৌধুরীর সঙ্গে গল্প করতে লাগলেন। বাইরে যাঁর পাশের চেয়ারটি ফাঁকা দেখে বসতে গেলাম তিনি বললেন, উঁহু, তুমি আমার এপাশে বসো, ও চেয়ারে অতীন বসে। তিনি মৃত্যুঞ্জয় মাইতি, গল্প লিখতেন, সেসময় একটি উপন্যাসও বের হয়েছিল তাঁর। যাদবপুরে বাড়ি করে নাম দিয়েছিলেন ‘নালন্দা’।
সন্ধে নেমে আসছিল। আর তখন যেন একে-একে তারা ফুটে উঠছিল ‘যুগান্তর’-এর বার্তাবিভাগের ওই হলঘরে। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় এসে বসলেন আমাদের পালের চেয়ারে। বরেন গঙ্গোপাধ্যায় এলেন। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় এসে সামনে ঘোরাঘুরি শুরু করলেন। আগে থেকেই ছিলেন গৌরাঙ্গ ভৌমিক, কৃষ্ণ ধর। শ্যামলদাকে চিনতাম, ‘অমৃত’ পত্রিকায় আমার ছবি-সহ কবিতা ছেপেছিলেন। কৃষ্ণ ধর, গৌরাঙ্গ ভৌমিকের সঙ্গেও আগে থেকে পরিচয় ছিল। আমি সেই ঝলমলে তারকাপুঞ্জের দিকে না-তাকিয়ে মনোনিবেশ করলাম পিটিআইয়ের স্লিপদু’টিতে, আমাকে যে খবরটি দিয়েছিলেন অমিতাভ চৌধুরী, তাতে। আমার অসুবিধে হল না। হিমাচলে ধস নেমে ৩২ জন মারা গিয়েছিলেন। আধঘণ্টার মধ্যে সেই খবরটি লিখে অমিতাভ চৌধুরীকে দিলাম। অমিতাভ চৌধুরী বললেন, তোমার লেখা এই খবর যদি কাল ‘যুগান্তর’-এ বের হয়, তবেই আসবে, কাল ঠিক এই সময়ে, ঠিক তিনটেয়। তারপর নিউজ এডিটর দেবব্রত মুখোপাধ্যায়কে ডেকে তাঁর হাতে খবরটি দিয়ে দিলেন। সত্যদা সেসময় ঘুরে ঘুরে এর-তার সঙ্গে কথা বলছিলেন। এরপর তাঁর সঙ্গে শ্রীরামপুর ফিরে এলাম।

‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ ছেড়ে অমিতাভ চৌধুরী এর বছরকয়েক আগে যুগান্তরে এসেছিলেন, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে। যুগান্তরের খোলনলচের বদল ঘটিয়ে দিয়েছিলেন অমিতাভ চৌধুরী। প্রথম পাতায় পত্রিকার যে-নাম থাকে, তাকে বলে মাস্টহেড, সেটি ডানদিক বা বাঁদিকে সরিয়ে ফাঁকা অংশে দিয়ে লিড নিউজের সমান গুরুত্বপূর্ণ খবর হিসেবে বক্স নিউজ করে দেওয়া, এসব তিনি মাঝেমধ্যেই করতেন। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় তো ‘অমৃত’ পত্রিকার দায়িত্বে এসে বিপ্লব সাধন করে দিয়েছিলেন, আমার সমসাময়িক লেখকরা তা নিশ্চয়ই মানবেন।
পরদিন সাতসকালে দেখলাম আমার লেখা খবরটি ‘যুগান্তর’-এ ওইরকম মাস্টহেড একপাশে ঠেলে ফাঁকা অংশে ছাপা হয়েছে। ওইরকম বক্স করে। বেশ উৎফুল্ল বোধ করলাম। দুপুরে খাওয়াদাওয়া করে ঠিক তিনটের সময় হাজির হলাম বাগবাজারে যুগান্তর-অমৃতবাজার পত্রিকা অফিসে। রোজ বেলা তিনটেয় বাগবাজার যুগান্তর অফিসে আমার যাতায়াত চলল। খবরের কাগজ রবিবারও খোলা, যতদূর মনে পড়ে , আমার ছুটির দিনটি ছিল সোমবার। সেটা ছিল ১৯৮৩ সালের পুজোর আগের সময়। তখন পুজোর ক’দিন সংবাদপত্রে থাকত পুজোর ছুটি। সেই পুজোর ছুটি পড়ার আগে অমিতদা বললেন, ছুটি কাটাও। এরপর চিঠি পেলে যুগান্তরে যোগ দেবে।
সেই চিঠি আর আসে না। বড় চিন্তায় পড়ে গেলাম। কালীপুজো এসে গেল প্রায়! আমার সঙ্গে চিন্তিত হল সারা বাড়ি। মা-বাবা, আমার দু’ভাই ও বোন। হঠাৎ মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়ল। মুখ দিয়ে রক্ত বের হওয়ায় চিকিৎসা চলল যক্ষ্মার। ওইরকম একদিন, যুগান্তর-অমৃতবাজার পত্রিকার ছাপানো খামে ত্রিদিব পাঠকের চিঠি এল— এই চিঠি পাওয়ামাত্র যুগান্তর দপ্তরে বার্তা সম্পাদক দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করুন। ত্রিদিব আমার সমবয়সি বা একটু বড় ছিল। পরে সাব-এডিটর হয়েছিল। তখন অফিসিয়াল চিঠিপত্র লিখত। ওই চিঠি আসায় আমার শয্যাশায়ী মা বড় আনন্দিত হয়েছিল। ‘যুগান্তর’-এ শিক্ষানবিশ সাংবাদিক হিসেবে যোগ দিলাম।
দু’মাস কেটে গেল। মাইনে আর পাই না। একটু কিন্তু-কিন্তু মনোভাবে গৌরাঙ্গদাকে গিয়ে বললাম। গৌরাঙ্গদা বললেন, সে কী অ্যাকাউন্টসে ৫ তারিখ যাওনি? যাও যাও মিনুবাবুর কাছে। অ্যাকাউন্টসে মিনুদা বললেন, কোথায় ছিলে! একযোগে দু’মাসের মাইনে পেলাম। বিস্তর টাকা! বিস্তর! সঙ্গে হলুদ কাগজে হিসেবপত্রের স্লিপ। দেখে গৌরাঙ্গ ভৌমিক বললেন, নীল স্লিপ পাবে পার্মানেন্ট হয়ে গেলে। মনে হলুদ-নীলের ঢেউ খেলে গেল যেন।



