যামিনী-সুরাবর্দি সম্বাদ

যামিনী রায় বাংলার নাম-করা আর্টিস্ট। তবে ওর নাম করতে একটু বেশি সময় লেগেছিল। হাত ওর প্রথম থেকেই ভালো, কিন্তু প্রথম দিকে প্রায় খেতে পেত না এমন অবস্থা। আমি একদিন ওদের বাড়িতে বেড়াতে গেছি, গিয়ে দেখলাম ওর বউ, ছেলেমেয়ে সবাই অভুক্ত; খুব গালাগাল দিলাম। ওকে বললাম, ‘তোমার লজ্জা করে না! এতগুলো ছেলেমেয়েকে না খাইয়ে রেখেছ? তুমি ছবি আঁকো, বিক্রির ব্যবস্থা আমি করে দিচ্ছি।’ তারপর নিজের খরচে আমি ওর ছবির একজিবিশন করলাম আর্ট স্কুলে। প্রচুর ছবি বিক্রি হল। নাম করে ফেলল এক ধাক্কায়।’

কলকাতায় সরকারি আর্ট স্কুলের প্রথম ভারতীয় অধ্যক্ষ শিল্পী মুকুলচন্দ্র দে তাঁর আত্মজীবনী ‘আমার কথা’-য় এভাবেই এঁকেছেন ১৯২৯-এর স্মৃতিচিত্র। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সে-বছর সেপ্টেম্বরের ৩০ তারিখ থেকে শিল্প-বিদ্যালয় ভবনেই তিনি আয়োজন করেন যামিনী রায়ের প্রথম প্রদর্শনীর। উদ্বোধন করতে আসেন ‘দ্য স্টেটসম্যান’-এর তদানীন্তন সম্পাদক অ্যালফ্রেড ওয়াটসন। এই সফল প্রদর্শনীর মাধ্যমে যামিনী রায়ের নাম কলকাতার শিল্পোৎসাহী মহলে ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুদ্র এক ক্রেতাগোষ্ঠীও তৈরি হয় তাঁর ছবির। যে-তীব্র আর্থিক অনটনের মধ্যে দীর্ঘকাল তাঁকে চলতে হয়েছে সপরিবারে, তারও সুরাহা হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। বাঁকুড়ার বেলেতোড় গ্রামের যামিনীরঞ্জন গুহরায় ক্রমে ‘যামিনী রায়’ নামে পরিচিতি পান শিল্পী-সাহিত্যিক মহলে।

আরও পড়ুন: পশ্চিমি শিল্পরীতি নয়, যামিনী রায় স্বদেশকে চিনতে বেছে নিয়েছিলেন গ্রামসমাজকেই!
লিখছেন দেবদত্ত গুপ্ত…

বড় ভাই কুমুদরঞ্জন গ্রাম থেকে আগেই এসেছিলেন ভাগ্যান্বেষণে। মেজ ভাই যামিনী, ছোট ভাই রজনীরঞ্জনের হাত ধরে কলকাতায় পা রাখেন ১৯০৩-এ, শিল্পশিক্ষায় প্রথাগত তালিম নেওয়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে। সেই থেকে উত্তর কলকাতার নানা অঞ্চলে যামিনীরঞ্জনকে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে যাযাবরের মতো। ভাড়া মেটাবার অপারগতাহেতু একের-পর-এক আবাস পরিবর্তন করতে হয়েছে বাধ্যত। বিশেষ করে ১৯০৮-এ আনন্দময়ীকে বিবাহ করার পর তো আরও কঠিন হয়ে ওঠে জীবনসংগ্রাম। অবশেষে মুকুল দে আয়োজিত প্রদর্শনীটির দু’বছর পর ১৯৩১-এ যামিনী রায় পাকাপাকিভাবে বাসা বাঁধলেন বাগবাজারে। প্রসিদ্ধ শিল্পোদ্যোগী আনন্দ চ্যাটার্জীর বংশধরদের কাছ থেকে ভাড়া নিলেন আনন্দবাবুরই নামাঙ্কিত গলির মোড়ে একটি কোনার বাড়ি— ‘পত্রিকা হাউস’ নামে পরিচিত ‘যুগান্তর’-‘অমৃতবাজার পত্রিকা’ কার্যালয়ের ঠিক বিপরীতে। ঠিকানা ১/২এ এবং ১/২বি আনন্দ চ্যাটার্জী লেন। এই আড়াইতলা বাড়িটিতেই সপরিবারে যামিনী রায়ের কেটে গেল একটানা আঠেরো বছর— যতদিন-না পর্যন্ত দক্ষিণ কলকাতার ডিহি শ্রীরামপুর লেনে তাঁর নিজস্ব বাসগৃহ তৈরি হয়। পরবর্তীকালে অবশ্য বন্ডেল রোড সংলগ্ন সেই রাস্তার নতুন নাম হয় বালিগঞ্জ প্লেস ইস্ট এবং আরও পরে যামিনী রায় সরণি।

মুকুল দে

শিল্পবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মুকুল দে যামিনীকে বুঝিয়েছিলেন শিল্পকর্মের বিপণনে প্রদর্শনীর গুরুত্ব। সে-কথা মনে রেখে ১৯৩১ থেকে আনন্দ চ্যাটার্জী লেনের ভাড়াবাড়িতেই যামিনী রায় আয়োজন করতে থাকেন গৃহপ্রদর্শনীর। ছবির টানে সেই বাড়িতে একে-একে হাজির হন বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, ই. এম. ফর্স্টার, স্টেলা ক্র্যামরিশ-এর মতো কৃতবিদ্য মানুষজন। দিল্লি থেকে আসেন ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী। সর্বোপরি আগাম বার্তা না দিয়েই অকস্মাৎ একদিন এলেন রবীন্দ্রনাথ। ততদিনে বিষ্ণু দে এবং সুধীন্দ্রনাথ দত্তর সঙ্গে হৃদ্যতা গভীর হয়েছে যামিনী রায়ের— সুধীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত ‘পরিচয়’ পত্রিকার প্রচ্ছদ নির্মাণ করেছেন, ‘পরিচয়’-এর প্রসিদ্ধ আড্ডায় তাঁকে দেখা গেছে হামেশাই। বস্তুত সেই আড্ডায় যামিনী রায়কে খ্যাতনামা করে তোলেন ‘পরিচয়’সম্পাদক সুধীন্দ্রনাথ দত্ত এবং বিদেশ-প্রত্যাগত বহুভাষাবিদ শিল্পচিন্তক হাসান শাহিদ সুরাবর্দি। কলকাতা হাইকোর্টের স্বনামধন্য আইনবিদ জাহিদ সুরাবর্দির দুই পুত্রের মধ্যে বড়জন এই হাসান। জন্ম ১৮৯০-এর ২৪ অক্টোবর। জাহিদের কনিষ্ঠ পুত্র হুসেন শাহিদ সুরাবর্দির নাম আজও অমলিন ব্রিটিশ শাসনের অন্তিমপর্বে অবিভক্ত বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়ে। ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-এর অন্যতম কুশীলব হিসেবে অভিযুক্ত উচ্চাভিলাষী হুসেন সুরাবর্দি দাদার মতোই ছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষায় আলোকপ্রাপ্ত। সিয়াসৎ আর হুক্‌মরানির জটিল আবর্ত মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র হুসেনকে ১৯৫৬-য় বানায় পাকিস্তানের পঞ্চম ওয়াজির-এ-আজম। ততদিনে জ্যেষ্ঠভ্রাতা হাসান সুরাবর্দিও ভারত ছেড়ে হয়েছেন পাকিস্তানবাসী— তাঁর নতুন ঠিকানা হয়েছে করাচি।

যামিনী রায়
কলকাতায় যামিনী রায়ের প্রথম স্থায়ী আবাস

এই ঘটনার পঞ্চাশ বছর পর ২০০৬-এর করাচি বইমেলায় অংশগ্রহণকারী এক বঙ্গজ প্রকাশনকর্মীর হাতে আসে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, করাচি প্রকাশিত হাসান শাহিদ সুরাবর্দির লেখা ‘প্রিফেসেস: লেকচার্স অন আর্ট সাবজেক্টস’ বইটি। আজকের পোস্ট-ট্রুথ, পোস্ট-হিউম্যান পর্বে দ্রুতলয়ের হাইব্রিড প্রকাশনায় যে ডিজিট্যাল ডিসট্র্যাকশনের দাপট ক্রমে দুর্জয় হয়ে উঠেছে, আজ থেকে কুড়ি বছর আগে তার সম্ভাবনা ছিল সুদূরপরাহত। সারাদিন কাজের পরেও ‘মি-টাইম’ থাকত পর্যাপ্ত, বইমেলার জন্য নির্ধারিত সময়ের পর বাধা ছিল না বিলম্বিত লয়ের সান্ধ্য বিশ্রম্ভালাপে। এমনই এক দিনাবসানে ক্লিফটন বিচে নৈশআড্ডার এক কোণে বসে সুরাবর্দির শিল্প ও নন্দনতত্ত্ব-বিষয়ক আটটি রচনার ইংরেজি সংকলনে পঞ্চম লেখাটিতে এসে তার চোখ আটকে যায়— ‘দ্য আর্ট অফ যামিনী রায়’। সেই রাতেই তারিক রোডের হোটেলে ফিরে লেখাটি পড়ে উৎসাহ জাগে মনে। ঘটনাচক্রে পরের বছর বসন্তকালে লাহোরের বইমেলায় অংশ নিতে গিয়ে ভ্যানগার্ড বুকস-এর কর্ণধার নজম শেঠির নির্বন্ধাতিশয্যে জশন-এ-বাহারানের ছুটিতে প্রবাসী বইকর্মীটির ঘোরা হয়ে যায় লাহোর মিউজিয়মের সংগ্রহশালা। সেখানে বেঙ্গল স্কুলের বিবিধ শিল্পকর্মের পাশাপাশি চোখে পড়ে যামিনী রায়ের ছবিও। যামিনী-সুরাবর্দি সম্পর্কের ইতিহাস নিয়ে খোঁজখবর করার ইচ্ছে ক্রমেই দানা বাঁধতে থাকে মনে। অবশ্য তার জন্য অপেক্ষা করতে হয় আরও বছর কুড়ি। দিল্লির দীর্ঘ প্রবাসজীবন চুকিয়ে কলকাতায় ফিরে এসে তবেই হাত দেওয়া সম্ভব হয় যামিনী রায়ের কনিষ্ঠ পৌত্র শিবব্রত রায়ের সযত্ন সংগ্রহে রক্ষিত পুরনো দস্তাবেজের স্তূপে। ২০২৬-এর গোড়ায় জীর্ণ কাগজের জঞ্জাল থেকে যেন মন্ত্রবলে হাতে উঠে আসে একখানি সুমুদ্রিত পুস্তিকা— ১৯৩৭ সনে ইউ রায় অ্যান্ড সন্স-এর ছাপা। ‘আ শর্ট নোট অন দ্য আর্ট অফ যামিনী রায়’। লেখক হাসান শাহিদ সুরাবর্দি লেখাটি শুরু করেছেন এইভাবে:

‘Jamini Roy’s exhibition of his work under the auspices of the Indian Society of Oriental Art at the Samavaya Mansions is an event of first-rate importance in the world of modern Indian Art. His paintings have recently been shown in some of the exhibitions at Calcutta, but they were lost in the midst of a large number of mediocre pictures. Even for those, who admire his talent, it has been difficult to fully appreciate his work in those places, especially after they have been privileged to visit his modest house in Baghbazar and have seen his large panels in their proper setting, fulfilling almost an architectonic purpose.’

১৯৩৭ সালে আয়োজিত যামিনী রায়ের প্রদর্শনীর আমন্ত্রণপত্র

ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্ট-এর উদ্যোগে আয়োজিত যামিনী রায়ের ছবির যে-প্রদর্শনীটির উল্লেখ পাওয়া যায় হাসান সুরাবর্দির লেখায়, ১৯৩৭-এ কলকাতার সমবায় ম্যানসনে সেই প্রদর্শনীর দ্বারোদ্ঘাটন করেন অবিভক্ত বঙ্গের তৎকালীন ‘প্রধানমন্ত্রী’ জনাব ফজলুল হক। আর সেই প্রদর্শনী উপলক্ষ্যেই সুরাবর্দির ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রকাশিত হয় ‘আ শর্ট নোট অন দ্য আর্ট অফ যামিনী রায়’ শীর্ষক কৃশকায় মনোগ্রাফটি। পরের বছরই কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনালয় থেকে আত্মপ্রকাশ করে সুরাবর্দির পূর্বোল্লিখিত রচনাসংকলন ‘প্রিফেসেস: লেকচার্স অন আর্ট সাবজেক্টস’, পরবর্তীকালে পাকিস্তানে যে-বইটির পুনঃপ্রকাশ করেন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস। বস্তুত সেই সংকলনের অন্তর্ভুক্ত ‘দ্য আর্ট অফ যামিনী রায়’ ছিল পূর্ব-প্রকাশিত ‘আ শর্ট নোট…’-এরই পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত রূপ।

হাসান শাহিদ সুরাবর্দি

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বর্তমান লেখাটি যখন পরিকল্পনার স্তরে, তখন কাকতালীয়ভাবে একদিন যোগাযোগ হয় পুরনো বইয়ের জহুরি আদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। ১৯৩৭-এ সুরাবর্দি-প্রণীত পুস্তিকাটি যে ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সংগ্রহভুক্ত হয়েছিল, সে-কথা তিনিই গোচরে আনেন। ইউ রায় অ্যান্ড সন্স-এর মুদ্রণালয়ে ঈষৎ ভিন্ন কাগজে ছাপা সেই একই পুস্তিকার আরও একটি মুদ্রণের সন্ধান পাওয়া গেল বন্দ্যোপাধ্যায়ের বদান্যতায়। পুস্তিকাটি দেখে যামিনী রায়ের মধ্যম পৌত্র সুব্রত রায় স্মৃতিচারণ করলেন:

‘বাগবাজার থেকে বালিগঞ্জের বাড়িতে উঠে আসার পর থেকে দাদুর সঙ্গে সুনীতিবাবুর চিঠিপত্র আদান-প্রদানের মাধ্যম ছিলাম আমিই। মনে পড়ে, একবার লম্বা সময়ের জন্য দক্ষিণ ভারত ভ্রমণে যান সুনীতিকুমার। একদিন দুপুরে দোতলার ঘর থেকে তাঁর গলার আওয়াজ পেলাম, ‘যামিনীবাবু, ও যামিনীবাবু, কোথায় গেলেন, এই দেখুন আমি এসেছি।’ এক দৌড়ে দোতলা থেকে একতলায় নেমে দেখি দাদু ততক্ষণে স্টুডিয়ো থেকে বেরিয়ে এসেছেন। ওঁদের পিছু-পিছু আমিও ঢুকলাম স্টুডিয়োতে। খানিকক্ষণ কথাবার্তার পর সুনীতিবাবু ফতুয়ার পকেট থেকে যেটি বের করলেন, সেটি দেখে দাদুর আর আমার, দুজনেরই চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার উপক্রম। হাতির দাঁতের তৈরি একটি ছোট্ট বাক্স, তার ওপর দাদুর আঁকা ‘ডান্সিং গোপিনী’-র অবিকল প্রতিরূপ। তামিলনাড়ু থেকে হাতির দাঁতটি সংগ্রহ করে স্থানীয় এক শিল্পীকে দিয়ে বাক্সটি নিজের জন্য বানিয়েছেন সুনীতিবাবু। দাদুর ছবিটি তাকে দিয়েই আঁকিয়ে নিয়েছেন বাক্সের ওপরের ডালায়। সব মিলিয়ে সে এক অনুপম শিল্পকর্ম হয়ে উঠেছে।’


ফিরে যেতে হয় ১৯০৮-এ। সে-বছর এলাহাবাদে ইন্ডিয়ান প্রেসের চাকুরি নিয়ে যামিনী রায় গেছেন চিন্তামণি ঘোষের আশ্রয়ে জার্মান মুদ্রণ-বিশেষজ্ঞ হের সমার-এর অধীনে ক্রোম লিথোগ্রাফির কাজে শিক্ষানবিশি করতে; আর সেখানেই যামিনী প্রথমবার দেখা পাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথের। এবং সে-বছরই ‘দ্য সোর্সেস অফ মুসলিম ল’ শীর্ষক গবেষণা-সন্দর্ভের জন্য কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁদের প্রথম পিএইচডি অর্পণ করেছেন হাসান শাহিদ সুরাবর্দির ঘনিষ্ঠ আত্মীয় আবদুল্লা আল-মামুন সুরাবর্দিকে। আবার ওই একই বছরে দেখা যায়, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি শিক্ষার পাঠ সমাপ্ত করে বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন হাসান শাহিদ সুরাবর্দি। ১৯০৯-এ স্কলারশিপ নিয়ে সুরাবর্দি গেলেন অক্সফোর্ডে উচ্চশিক্ষার অভিলাষে— সেখানে তাঁর অধ্যয়নের বিষয় ছিল ইতিহাস ও আইন। ১৯১৩-য় তিনি যখন অক্সফোর্ডের ছাত্র, সেই সময়ে সুইডিশ অ্যাকাডেমি কর্তৃপক্ষ এশিয়ার প্রথম নোবেল প্রাপক হিসেবে ঘোষণা করেন রবীন্দ্রনাথের নাম। ১৯৪১-এর সেপ্টেম্বরে সেই স্মৃতি নিয়ে ‘দ্য ক্যালকাটা মিউনিসিপাল গেজেট’-এ লেখা সুরাবর্দির ‘টেগোর অ্যাট অক্সফোর্ড’ শীর্ষক রচনাটি প্রসঙ্গত প্রণিধানযোগ্য। ইংল্যান্ড-প্রবাসেই সুরাবর্দির পরিচয় ঘটে জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে— যা প্রগাঢ় বন্ধুত্বে পরিণত হতে সময় লাগেনি।

১৯৩৭ সনে ইউ রায় অ্যান্ড সন্স-এর ছাপা পুস্তিকা

১৯১৪-য় অক্সফোর্ডের পাঠ সাঙ্গ করে সুরাবর্দি গেলেন রাশিয়া, স্লাভিক ভাষা নিয়ে অধ্যয়নের তাগিদে। সেখানে তিনি সেন্ট পিটার্সবার্গের ইম্পিরিয়্যাল ইউনিভার্সিটি এবং মস্কোর উইমেনস ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি পড়ানোর সুযোগ পান। ১৯১৮-য় সুরাবর্দির উদ্যোগে মস্কো আর্ট থিয়েটারে মঞ্চস্থ হয় রবীন্দ্রনাট্য ‘রাজা’। এরপর রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে মস্কো ছেড়ে সুরাবর্দি যান বার্লিন, এবং সেখান থেকে ১৯২০-তে প্যারিস। প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি লিগ অফ নেশনস-এর অধীনে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ইন্টেলেকচুয়াল কোঅপারেশন-এ শিল্পবিভাগের নাট্যবিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। এরপর স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে ১৯৩১-এ সুরাবর্দি যোগ দেন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিডার পদে। এবং ১৯৩২-এ হন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানশিয়েন্ট ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার বিভাগে ভারতীয় চারুকলার বাগেশ্বরী অধ্যাপক। ওই বছরই রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণে বিশ্বভারতীতে ইরানি শিল্পকলা বিষয়ে গবেষণার সুযোগ পান তিনি। আশ্চর্য নয়, কলকাতার সারস্বত সমাজের তারকাখচিত সমাবেশে সুরাবর্দির উপস্থিতি ক্রমেই অনিবার্য হয়ে ওঠে।

১৯৪০ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত সুরাবর্দি ছিলেন ‘দ্য স্টেটসম্যান’-এর কলা-সমালোচক। ইতিমধ্যে ১৯৪৩-এ তিনি অবিভক্ত বাংলার পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য নির্বাচিত হন, এবং দেশভাগের পরেও সেই পদেই বহাল থাকেন করাচিতে ১৯৫৪ অবধি। পরবর্তীকালে কলম্বিয়া বিশ্বদ্যিালয়ে ওরিয়েন্টাল আর্ট-এর অধ্যাপক মনোনীত হলেও বহুভাষাবিদ সুরাবর্দি ততদিনে তাঁর প্রতিভার উজ্জ্বলতর স্বাক্ষর রেখেছেন পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রকে। মাতৃভাষা বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি, গ্রিক, রাশিয়ান, ফ্রেঞ্চ, ইতালিয়ান, স্প্যানিশ ও জার্মান ভাষায় তাঁর ব্যুৎপত্তি ছিল অবিসংবাদী। ১৯৫৯ পর্যন্ত পাকিস্তানি সিফারৎকার বা ডিপ্লোম্যাট হিসেবে স্পেন, মরক্কো, তিউনিশিয়া, ইত্যাদি দেশে কর্মরত হাসান শাহিদ সুরাবর্দি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন করাচিতে ১৯৬৫-র তেসরা মার্চ।

১৯৩১-এ সুরাবর্দি কলকাতায় ফিরে আসার বছরখানেকের মধ্যে ইংরেজি পত্রিকা ‘দ্য রিভিউ অফ রিভিউজ’-এর আদলে ‘পরিচয়’ পত্রিকার জন্ম হয় সুধীন্দ্রনাথ দত্তের সম্পাদনায়। অচিরেই বাংলার ‘দ্য ক্রাইটেরিয়ন’ নামে প্রসিদ্ধি পাওয়া এই পত্রিকাটিকে কেন্দ্র করে উত্তর কলকাতায় সুধীন্দ্রনাথ দত্তের বাড়িতে মাসে তিনদিন ও দক্ষিণ কলকাতায় প্রবোধচন্দ্র বাগচির বাড়িতে মাসে একদিন সমবেত হতেন তৎকালীন যুগের বরেণ্য চিন্তাবিদরা— শুধু বাংলা থেকেই নয়, ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকেও। অবশ্য কেবল ভারতীয়ই নয়, পাশ্চাত্যের লেখক-সাংবাদিক-সমালোচকদেরও প্রবেশদ্বার ছিল সেখানে অবারিত। এই আড্ডার প্রথম বছরদশেকের যে-স্মৃতিচিত্র ধরা আছে শ্যামলকৃষ্ণ ঘোষের লেখা ‘পরিচয়ের আড্ডা’ বইটিতে, সেখানে ১৯৩৬-এর শুরু থেকেই হাসান শাহিদ সুরাবর্দিকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায় বুধমণ্ডলীতে। মনে রাখতে হবে, যামিনী রায় তখনও সে-আড্ডার সক্রিয় সদস্য নন, যদিও তাঁর অনুপস্থিতিতেই উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতার আড্ডায় তাঁকে নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চলেছে দিনের পর দিন— প্রধানত সুধীন্দ্রনাথ ও সুরাবর্দির আগ্রহেই। তীক্ষ্ণ মেধাসম্পন্ন বাগ্মী হাসান শাহিদ সুরাবর্দি; কথাবার্তায় এবং তর্ক-বিতর্কে তাঁর বৈদগ্ধ্যের বিচ্ছুরণ চোখ এড়িয়ে যাওয়ার উপায় ছিল না।

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সংগ্রহে থাকা সুরাবর্দি রচিত ১৯৩৭ সালের পুস্তিকা

১৯৩৭-এর ডিসেম্বরে ‘পরিচয়’-এর সুধী-সমাগমে এলেন সরোজিনী নাইডু। আড্ডাধারীদের সম্পর্কে মন্তব্য করলেন: ‘শুনেছি ‘পরিচয়’-গোষ্ঠী নাকি ভীষণভাবে উন্নাসিক!’ স্নবারির অভিযোগ মুহূর্তে খণ্ডন করলেন হাজির-জবাব সুরাবর্দি। সকৌতুকে বললেন, ‘ঠিক তার উলটো; আসল নাক-উঁচু-করা হচ্ছে সুনীতি চ্যাটার্জি আর কালিদাস নাগ।’ শিল্প, নন্দনতত্ত্ব, সংগীত, রাজনীতি, ইতিহাস— যা নিয়েই কথা বলুন সপ্রতিভ সুরাবর্দি, যাঁরই সঙ্গে বলুন— হামফ্রে হাউস বা মুলকরাজ আনন্দ— তাঁর কথায় একইসঙ্গে থাকে আন্তরিকতা আর গভীর চিন্তার ছাপ। মনোরম বাক্‌ভঙ্গিতে ভুরু ঈষৎ উঁচু করে বলা আটপৌরে ‘স্মল টক’-গুলিও চিত্তাকর্ষক হয়ে ওঠে শ্রোতাদের কাছে। যেমন সমারসেট মম প্রসঙ্গে একদিন বললেন, সুরাবর্দির সঙ্গে মম-এর সাক্ষাৎ পরিচয় কখনও না ঘটলেও তিনি শুনেছেন, একদা এক ইংরেজ মহিলা মম-কে যামিনী রায়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতে চাইলে সুধীন্দ্রনাথ নাকি তাঁকে একখানি চিঠি লেখেন— এরপর কী ঘটেছে তা অবশ্য সুরাবর্দির ঠিক জানা নেই। ১৯৩৮-এর ফেব্রুয়ারিতে একদিন ‘পরিচয়’এর আড্ডায় যামিনী রায় প্রসঙ্গে সুরাবর্দিকে বলতে শোনা যায়:

‘এই একজন সত্যিকারের শিল্পী যিনি নিজের আঁকা ছবির আজেবাজে, উৎকট নাম দিয়ে থাকেন। মনে হয় তিনি কী করছেন সে-সম্বন্ধে তাঁর সুস্পষ্ট কোনও ধারণা নেই— অথচ তাঁর শিক্ষায় কোনও ফাঁকি নেই। … যামিনী রায় একবার সরাসরি অবনীন্দ্রনাথের কাছে গিয়ে প্রশ্ন করেন, ‘কী করছেন আপনি— রং নিয়ে এ-খেলায় লাভ কী, আমি তো এর মধ্যে প্রাণ দেখি না।’ অবনীন্দ্রনাথ তাঁকে ও. সি. গাঙ্গুলির কাছে পাঠান। অর্ধেন্দুবাবু হ্যাভেল-এর বই পড়তে উপদেশ দিয়ে খালাস। যামিনীদার পরম সৌভাগ্য, ইনি হচ্ছেন বাঁকুড়ার লোক। দেশে যান, আর সেখানে গিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসাধারণ শিল্পপ্রতিভা দেখতে পান। ওই শিল্পীদের খুঁজে বার করে তাদের সৃষ্টিশৈলীর উৎস জেনে নেবার চেষ্টা করেন।’

ফেব্রুয়ারির ২৫ তারিখে দক্ষিণ কলকাতার সেই আড্ডায় মজিদ রহিম যখন যামিনী রায়ের শিল্পসৃষ্টির প্রতি ঈষৎ অবজ্ঞা প্রকাশ করে বলেন, লাইন টেনে গোরু আঁকার মধ্যে কোনও মহৎ শিল্প লুকিয়ে থাকতে পারে বলে তাঁর কখনো মনে হয়নি, তখন সুরাবর্দি তাঁর দিকে বাঁকা চোখে অগ্নিবাণ হেনে বলেন, ‘কোনও-কোনও বিরল মুহূর্তে শিল্পী কয়েকটি রেখার টানে তাঁর সমস্ত সত্তাকে প্রকাশ করতে পারে, একটানে একটা বৃত্ত পরিসরের সবদিকটা ফুটিয়ে তুলতে পারে।’ বলাই বাহুল্য সেদিনের আড্ডায় যামিনী রায় ছিলেন না— ‘পরিচয়’-গোষ্ঠীর আসরে যামিনী রায়ের প্রথম আগমন ঘটে ১৯৩৮-এর মে মাসে; এবং উপস্থিতির দ্বিতীয় দিনেই কোনও রাখঢাক না করে বলেন, ‘নন্দলাল ও অবনীন্দ্রনাথ মহৎ শিল্পী হতে পারেননি, তার কারণ মনের পরিণতি ও প্রস্তুতি সত্ত্বেও তাঁরা ভুল টেকনিক অনুসরণ করেন।’ তারপর কথাটির ব্যাখ্যা দেন— জানান, সত্য ও কল্পনার মিশ্রণ ঘটাতে গিয়ে তাঁদের টেকনিকের বিফলতা অনেক সময়ে হাস্যকর হয়ে উঠেছে। প্রসঙ্গত নন্দলালের আঁকা ‘মহাদেব’ ছবিটির উদাহরণ টানলেন তিনি: ‘শিল্পী ভূমির উপর যে শিলাখণ্ড আঁকলেন সেটা হচ্ছে বাস্তব, কিন্তু যে দেবতা তাঁর তুলির অগ্রে বার হলেন তিনি হলেন একেবারেই কল্পনায় গড়া অবাস্তব। ছবিতে দেখেন কানের কুণ্ডল অতি সযত্নে সঠিক আঁকা অথচ অঙ্গবস্ত্রে কোনও ভাঁজ বা ছায়া নেই।’ সেদিনের আড্ডায় যামিনী রায় আরও জানালেন যে, অবনীন্দ্রনাথের কাছে তাঁর প্রশ্ন ছিল— ছবি থেকে দেশ ও কাল যদি নির্বাসিত হয়, তবে নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যসামগ্রীকে ‘কেমন করে ধর্তব্যের মধ্যে নেওয়া যায়’? মে মাসের ২০ তারিখে যামিনী রায় যখন বৈঠকে বসে এসব আলোচনা করছেন, সুরাবর্দি তখন সেখানে অনুপস্থিত থাকলেও যামিনীর কৌতূহল নিবৃত্তি না করেই যে অবনবাবু তাঁকে ও. সি. গাঙ্গুলির কাছে পাঠিয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হতে চেয়েছিলেন, তা সুরাবর্দির কথা থেকে আড্ডাধারীরা আগেই জেনেছেন।

১৯৩৯-এর জুলাই মাসে ‘পরিচয়’-এর দক্ষিণ কলকাতার আড্ডায় অতিথিবৎসল সুরাবর্দি সরোজিনী নাইডুর ভাই হরীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের আগমন-সংবাদ ঘোষণা করেন। কলকাতায় হরীন্দ্রর জন্য একটি থাকার জায়গার ব্যবস্থা করে দিতেও সুধীন্দ্রনাথকে আন্তরিক অনুরোধ করেন সুরাবর্দি। সুধীন্দ্র নিজের অপারগতা জ্ঞাপন করলে সুরাবর্দি সরোষে বলে ওঠেন, ‘তুমি যত রাজ্যের স্কাউন্ড্রেল, বা তথাকথিত প্রগতিবাদীদের নিজের বাড়িতে তুলতে পারো, আর একজন প্রকৃত উঁচুদরের সাহিত্যিক …।’ কথার মাঝখানেই সুরাবর্দিকে থামিয়ে দিয়ে সুধীন্দ্রনাথ বলেন, ‘হরীন্দ্রকে বড়জোড় মিস্টিক বলা যায়, সে সাহিত্যিক নয়।’ অথচ এর পরের সপ্তাহেই উত্তর কলকাতায় হাতিবাগানের আড্ডায় এসে হরীন্দ্র উপস্থিত সকলকে কেমন করে হতচকিত করলেন, তারও বিবরণ আছে শ্যামলকৃষ্ণ ঘোষের লেখায়। যামিনী রায়ের উপস্থিতিতে সেদিন শ্যামলকৃষ্ণ হরীন্দ্রকে আবৃত্তি শোনাবার অনুরোধ করেছিলেন।

‘তিনি কোনো ইতস্তত না করে দাঁড়িয়ে উঠলেন। পরপর কতকগুলি স্বরচিত কবিতা শোনাবার পরে কোনো বিরতি না দিয়ে মার্গসঙ্গীত, ভজন, নিগ্রো স্পিরিচুয়াল, রুশ ও ভারতীয় লোকসঙ্গীত এবং ভারতীয় প্রগতিবাদীদের আনুষ্ঠানিক গান গেয়ে গেলেন উদাত্ত কণ্ঠে। … পরিশেষে একটি ভজন দিয়ে কণ্ঠ ও ভাবাবেগের আশ্চর্য জাদুকরি বিন্যাসের পরিচয় দিয়ে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়লেন।’

গোটা আসর মন্ত্রমুগ্ধ। যামিনী রায় স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে বললেন যে, হরীন্দ্রকে সে-যুগের কলকাতার প্রসিদ্ধ নাট্যকার এবং অভিনেতাদের সঙ্গে তিনি পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন। এই ঘটনার পর হয়তো বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হরীন্দ্রনাথের জন্য কলকাতায় বাসস্থান অন্বেষণে আর বিশেষ কোনও সমস্যা থাকত না হাসান শাহিদ সুরাবর্দির, কিন্তু জানা গেল অস্থায়ী আস্তানা থেকে সরিয়ে নিয়ে উদারহৃদয় গুণগ্রাহী মুকুলচন্দ্র দে ততদিনে নিজের উদ্যোগেই তাঁকে সাদর আতিথ্য দিয়েছেন।

ছবি সৌজন্যে: লেখক