এক আনা। চার পয়সা, পুরনো নিয়মে। ঝকঝকে, নতুন। খেলতে-খেলতে সেটাই একদিন কুড়িয়ে পেল ছোট্ট রসো। খেলা মানে আঁজলাভরে ধুলো তুলে সেটাই ফেলে দেওয়া হাতের ফাঁক দিয়ে। দুই ভাই। কাশী আর শশী। বেদম গরিব। চাষের জমি যা আছে, তার ধান বড়জোর পাঁচ মাস। তারপর গায়ে-গতরে মজদুর খাটা। সে-কাজও জোটে না সব সময়ে। ছোট শশী খোঁড়া। বাড়ি-বাড়ি ভিক্ষে করে সে। চাল নেয়। কিন্তু সে-চাল নিয়ে আসে না বাড়িতে। কারণ সম্মানজ্ঞান টনটনে। ভিক্ষার কথা বাড়ির লোককে জানতে দেবে না। তাই সেই চাল বিক্রি করে টাকা নিয়ে আসে বাড়িতে। সেখানেও ওজনে মারে আড়তদারের লোক। শশী গজরায়। কিন্তু কিছু করতে পারে না।
গত শতকের প্রথম দিক। এমন হা-ঘরে সংসারে এক আনা অনেক। কী করা হবে সেটা দিয়ে? এমন ঘরে এক আনায় একদিনের রসদ জুটে যায়। কিন্তু তারপরেও বাড়ির মেয়েদের কারও বক্তব্য, কুড়ানো পয়সায় হরির লুট দিতে হয়। কেউ বলে বামুনকে দিলে পুণ্য হবে। কারও ইচ্ছে মুড়ি-বাতাসা কিনে ছোটরা মিলে ভাগ করে খাক। ছোট ভাই শশীর ইচ্ছে একটা নতুন হুঁকো কেনে। এমন হঠাৎ পাওয়া পয়সায় বেশ অনেকদিন ব্যবহার করা যাবে এমন একটা পাকাপোক্ত জিনিস কেনা চাই।
কাড়াকাড়ি পড়ে যায় ওই এক আনা নিয়ে। প্রত্যেকেরই মনে হয়, বাকিরা যেন তাকে ঠকিয়ে ওই পয়সা নিয়ে নিতে চাইছে।শেষ অবধি বড় ভাই কাশী পয়সাটাটা ঠুকে-ঠুকে অকেজো করে ফেলে। তারপর ছুড়ে দেয় বাইরে। গল্পের নাম ‘চার পয়সার এক আনা’। লেখক জগদীশ গুপ্ত।

এমন গল্পকে মার্ক্সের চোখ দিয়ে দেখাই দস্তুর। এমন গল্পকে অর্থনীতির চোখ দিয়েও দেখা যেত। কিন্তু আমরা যদি এই এক আনাটাকে একটা ডিসরাপশান— ব্যাঘাত হিসেবে দেখি? কাশী-শশীর দরিদ্র পরিবারের আপাত স্থিতাবস্থার ভেতর হঠাৎ একটা অপ্রত্যাশিত ফাটল। আর সেই ডিসরাপশানই যেন প্রতিটা চরিত্রকে চোখে আঙুল দিয়ে আলাদা করে দিচ্ছে। জিনিস হিসেবে, অর্থনৈতিক দিক থেকেও— এক আনা খুবই মামুলি। এমনকী কাশী-শশীর মতো বেদম গরিব পরিবারেও। কিন্তু বাড়ির প্রতিটা লোকই সেটাকে দেখল আলাদা-আলাদা চোখ দিয়ে। ভিন্ন-ভিন্ন অর্থ আরোপ করল তার ওপর।
অর্থনীতিতে সম্পদের অভাব প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করে। ফ্রয়েডীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে অভাব সৃষ্টি করেপার্থক্য। এই পার্থক্য আসলে একই জিনিসের আলাদা-আলাদা মানে খুঁজে নেওয়ার ভেতর। মানুষের ইচ্ছে তার প্রয়োজন মেনে হয় না।ফ্রয়েড-পরবর্তী মনস্তাত্ত্বিক চিন্তা দেখায়,প্রতিটা মানুষের এই আলাদা মানে খুঁজে নেওয়া আসলে তার ব্যক্তিগত অভাববোধ থেকে তৈরি হচ্ছে। কাশী-শশীর পরিবারেও, কেউ তাই সামাজিক-ধার্মিক রীতি মেনে হরিরলুঠ দিতে চাইছে। কেউ চাইছে ব্রাহ্মণকে দিয়ে ধার্মিক পুণ্য অর্জন করতে। যেন বোঝাতে চাইছে সে গরিব হতে পারে, কিন্তু সমাজ বা ধর্মের নিয়মে ছোট নয় মোটেই। শশীর বউ চাইছে, সেটা দিয়ে মুড়ি-বাতাসা কিনে, আনাটাকে উদযাপনের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করতে। আবার শশী চাইছে, এই আনাটা পাওয়ার আনন্দটাকে পাকাপাকি করে দিতে; সেটা দিয়ে আপাতভাবে জরুরি নয়, এমন বিলাসের সামগ্রী— একটা হুঁকো কিনে নিতে। এমন একটা জিনিস, যা তার দারিদ্র্যের জন্য সে কিনতে পারে না।
হতদরিদ্র পরিবারের হঠাৎ এক আনা খুঁজে পাওয়া। এই গল্প যেন ‘পঞ্চতন্ত্র’ বা ‘ঈশপের গল্প’-এর মতো একটা প্যারাবেল হয়ে উঠতে পারত। অথচ জগদীশ গুপ্ত যেন ইচ্ছে করেই ঠিক উলটোটা করলেন। প্যারাবেলে একটা খুব সহজ গল্প থাকে। তার শেষে থাকেএকটা নীতিকথা। এই গল্প ঠিক যেন তার উলটোটা হয়ে দাঁড়াল; যেখানে এই মামুলি আনাটা হয়ে উঠল একটা মতবিরোধের উৎস। সেখান থেকে পারিবারিক সম্পর্কগুলোর ভেতরে ফাটলগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল। আর এই গল্পের শেষে—সেই আনাটা, তার ওপর আরোপিত অসংখ্য অর্থের সঙ্গে-সঙ্গেই ধ্বংস হয়ে গেল।
এখানেই অ্যাবজেকশন (abjection)-এর কথা আসে। বাংলায় আমরা বলতে পারি বর্জনযোগ্য। প্রতিটা মানুষ বা সমাজ তার ভেতরে থাকা কিছু জিনিসকেই ঘৃণা বা অপছন্দ করে। সেগুলো তাকে অস্বস্তিতে ফেলে। যেমন তার নিজের শরীরের মলমূত্র, তার অবচেতনে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার, হিংসা কিংবা সমাজবিরুদ্ধ কামনা-বাসনা। আশ্চর্যভাবে, সমাজ কিংবা ব্যক্তি তার নিজের সংজ্ঞা তৈরি করে এই জিনিসগুলো থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেই। সেইগুলোকে বর্জন করে। কিন্তু এই বর্জনযোগ্য জিনিসগুলো সব সময়েই সমাজের প্রান্তে লুকিয়ে থাকে। এবং বারংবার ফিরে-ফিরে আসে। তাই তাকে কখনওই পুরোপুরি বর্জন করা যায় না। আবার আমরা তাকে খুব কাছ থেকে চিনতেও পারি, কারণ সেগুলো আমাদের ভেতরেরই জিনিস। তাই আমরা না পারি তাদের গিলতে, না পারি ওগরাতে।
কাশী-শশীর পরিবারে তৈরি হওয়া উত্তেজনা, পারস্পরিক অবিশ্বাস, ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার বিরোধ, শেষ অবধি কারও হার স্বীকার করতে না-চাওয়া আসলে সামাজিক মূল্যবোধের ভেঙে পড়া নয়। দূর থেকে দেখা কোনও কমেডি নয়। এমনকী ট্র্যাজেডিও নয়। বরং নিতান্তই মানবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু তারপরেও সেগুলো আমরা মেনে নিতে পারি না। কারণ মানুষ হিসেবে আমরা যে আসলে ঠিক এমনই— সেটা স্বীকার করি নাআমরা নিজেরাই। আমাদের মূল্যবোধ থেকে আমরা যেগুলোকে ঠেলে সরিয়ে দিতে চাই, সেইগুলোই যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় জগদীশ গুপ্তর গল্প। মানুষের নৈতিকতার পতন নয়, বরং আমাদের তৈরি করা নৈতিকতার ভেতরের ফাটলগুলো।
‘আদি কথার একটি’ এমনই এক গল্প। বেণী একদিন গভীর রাতে শুনতে পেল, তার ঘরের বেড়ার ওপাশ থেকে পুরুষকণ্ঠে কে যেন তার স্ত্রীর নাম ধরে চাপা স্বরে ডাকছে। বেণী চুপি-চুপি উঠে গেল। দরজা খুলতেই,হুড়মুড়িয়ে পালিয়ে গেলকেউ। বেণী ঘরে এসে রাম-দা দিয়ে স্ত্রীর মাথাটা কেটে ফেলল। তারপর ধরা দিল পুলিশে। আসলে রগচটা বেণীকে গ্রামের কোনও লোক পছন্দ করত না। তাই ইচ্ছে করেই তাকে তাতাতে তার বউয়ের নাম ধরে ডেকেছিল কেউ। বেণী তাদের ফাঁদে পা দিয়েছিল। বেণী কিন্তু তার বউ সত্যিই দোষী কিনা বুঝতে চায়নি। সে ধরেই নিয়েছে, কেউ ডেকেছে মানে তার বউই দোষী। সমাজে নারীত্বের ওপর আরোপ করা শুচিতার সংজ্ঞা এমনই।
বেণীর এই কাহিনি‘আদি কথার একটি’-র মূল আখ্যান নয়। বরং তার সূচনা। এই গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে বিধবা কাঞ্চন। আর তার গ্রামের তেইশ-চব্বিশ বছরের জোয়ান সুবল দাস। কাঞ্চনের ওপরেই লোভ ছিল সুবলের। তাই সে কাঞ্চনের পাঁচ বছরের মেয়ে খুশিকে বিয়ে করেছিল। খুশি বোঝেনি স্বামী কী। শিশুর সরলতায় সে সুবলকে নাম ধরেই ডাকত। কখনও ঘাড়ে উঠত, কখনও-বা মেলা থেকে এক পয়সার বাতাসা কিনে আনার বায়না করে। আর সুবলও তার সব বায়না মেনে নেয়। একদিন কোমরে চোট পাওয়ার অভিনয় করল সুবল। তারপর কাঞ্চন তার শুশ্রুষা করতে এলে স্পর্শ করতে চাইল তাকে। মুহূর্তে সরে গেল কাঞ্চন। পালিয়ে গেল সুবলও। কিন্তু সুবলের কামনা গেল না। কাঞ্চন যত তাকে সরাতে চেষ্টা করে, সুবল তত তার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে।
কাঞ্চন বুঝতে পারে সুবলকে। তার বাসনাকে। কিন্তু সুবলের চাহিদার কাছে নতিস্বীকার করতে চায় না। শেষ অবধি একদিন সে তাড়িয়েই দিল সুবলকে। শিশুর সারল্যে, খুশি বুঝলও না কী হয়েছে। সুবল আসে না আর। কিন্তু তার বাড়িতে রান্নার ধোঁয়া উঠছে কিনা দেখে কাঞ্চন। শেষে একদিন সেই ধোঁয়া না দেখে গেলও সে খুশিকে নিয়ে। সুবলের ঘরের অবস্থা দেখে, তার প্রতি মায়াই হল তার। কিন্তু শেষ অবধি সুবল তার সুযোগ নিল। কাঞ্চনের ইচ্ছের বিরুদ্ধেই। এক সময়ে গ্রামে জানাজানিও হয়ে গেল। দায় গিয়ে পড়ল কাঞ্চনের ওপরেই। তাকেই মার খেতে হল। কারণ মেয়েমানুষ নাকি আশকারা না দিলে পুরুষ এগোতে পারে না।
প্রথমবার সুযোগ নেওয়ার পর কিন্তু কাঞ্চন তাড়িয়ে দেয়নি সুবলকে। এড়িয়ে গিয়েছিল। সেই সময়ে সুবলের সঙ্গে কাঞ্চনের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হয়ে উঠেছিল খুশি। সে-ই কাঞ্চনের কথা বলে দিত সুবলকে। ভাত খেতে বসে কাঞ্চনকে খুঁজেছিল সুবল। কাঞ্চন আসেনি দেখে অভিমান করে উঠে গিয়েছিল। আর সুবলের না খাওয়া সেই ভাত দেখে খারাপ লেগেছিল কাঞ্চনের। ঠিক চেনা গৃহস্থালির ছবি। সুবল আর কাঞ্চন যেন এক দম্পতি। রাগারাগি, কথা বন্ধের পর পরস্পরের কথোপকথনের, যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ঘরের শিশুটি। খুশিই যেন কাঞ্চন আর সুবলের সম্পর্ককে ‘স্বাভাবিক’ করে তোলে।অথচ কাঞ্চন আর সুবলের মধ্যে নারী-পুরুষের সম্পর্ক সামাজিকভাবে অবৈধ। আর এখানেই অস্বস্তি হয় পাঠকের। অবৈধতা নয়। অবৈধতার স্বাভাবিক হয়ে ওঠাই যেন সেই অস্বস্তির মূল কারণ।
কাশী-শশীর পরিবারে তৈরি হওয়া উত্তেজনা, পারস্পরিক অবিশ্বাস, ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার বিরোধ, শেষ অবধি কারও হার স্বীকার করতে না-চাওয়া আসলে সামাজিক মূল্যবোধের ভেঙে পড়া নয়। দূর থেকে দেখা কোনও কমেডি নয়। এমনকী ট্র্যাজেডিও নয়। বরং নিতান্তই মানবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু তারপরেও সেগুলো আমরা মেনে নিতে পারি না। কারণ মানুষ হিসেবে আমরা যে আসলে ঠিক এমনই— সেটা স্বীকার করি না আমরা নিজেরাই।
আসলে যেটাকে ‘স্বাভাবিক’ বলছি— সেটা স্বাভাবিক নয় মোটেই। সেটা নির্মাণ করা। সুবল আর কাঞ্চনের সম্পর্কের মাঝে চলে আসে এক তরফা কামনা। ক্ষমতার অসম সমীকরণ। মাঝখানে পাঁচ বছরের খুশির উপস্থিতি যেন সেখানে এক বৈধতার মরীচিকা তৈরি করে। সুবলকে স্বাভাবিক করে দেখায়। তার সুযোগ নেওয়ার পরিসর তৈরি করে। ক্ষমতা এমনই। সে শুধুই বে-লাগাম জোর খাটিয়ে নিজেকে জাহির করে না। বরং চেনা, খুব স্বাভাবিক, প্রতিদিনের বেঁচে থাকার ভেতর দিয়ে নিঃশব্দে অনুপ্রবেশ করে। তারপর কখন যে নিজেকে জাহির করে, বোঝাই যায় না।
সুবল যেমন। প্রথমেই জোর খাটায় না। একটু-একটু করে ঢোকে। পরিচিত হয়ে ওঠে। খুশির প্রতি তার যত্ন, মমতার ভেতর দিয়ে। গার্হস্থ্যজীবনের চেনা ছন্দের ভেতর দিয়ে। তারপর যখন তার উপস্থিতি খুব চেনা লাগে, স্বাভাবিক লাগে, তখন নিজেকে জানান দেয়। ততদিনে ন্যায় আর অন্যায়ের মাঝের দেওয়ালগুলো ঝাপসা হতে শুরু করেছে। কোনটা মমতা আর কোনটা কামনা, গুলিয়ে গিয়েছে। যেটাকে স্বাভাবিক দাম্পত্য বলে ভ্রম হচ্ছে, তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকছে একটা অস্বস্তি। সুবল আর কাঞ্চনের দৈনন্দিনতা আমাদের চেনা কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা ক্ষমতাতন্ত্র আমাদের অচেনা।
সেই অ্যাবজেকশন। যা বর্জনযোগ্য, সেটাই যেন ফিরে আসেছে। এবং ফিরে আসছে চেনা পরিসরে। দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে। যখন সেটাকে খুব স্বাভাবিক, খুব চেনা বলে গুলিয়ে যাচ্ছে।পাঠকের অস্বস্তি হচ্ছে। তবে সেটা অবৈধ কিছু হচ্ছে বলে নয়। অন্যায় হচ্ছে বলে নয়। বরং বৈধ আর অবৈধ, ন্যায় আর অন্যায়ের ফারাক ঘুচে যাচ্ছে বলে। সেগুলোকে খুব চেনা, দৈনন্দিন প্রাত্যহিকতার পরিসরে সঙ্গত বলে ভ্রম হচ্ছে বলে। কাঞ্চনের ওপর সমাজ সব দায় চাপিয়ে দিচ্ছে। কেন দিচ্ছে? কারণ যেটা হচ্ছে, সেটাকে সে সঙ্গত বলে ভাবতে পারছে না। তাই নারী, ক্ষমতাহীন কাঞ্চনকে সে ব্যবহার করছে তার অস্বস্তির‘ডাম্পিং গ্রাউন্ড’ হিসেবে। কাঞ্চনের ওপর হিংসা সমাজের প্রতিক্রিয়া নয়। বরং তার সামাজিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া।
‘পয়োমুখম’ গল্প হিসেবে একটু আলাদা। কৃষ্ণকান্ত কবিরাজ। ভূতনাথ তার বড় ছেলে। লেখাপড়ায় খারাপ ভূতনাথের আর কিছু হবে না দেখে কৃষ্ণকান্ত তাকে কবিরাজির তালিম দেওয়া শুরু করে। কিন্তু ভূতনাথের সেখানেও মন নেই। কবিরাজি তার কাছে শেকড়-বাকড়, জড়িবুটি। তাতে সংস্কৃত ব্যাকরণের শিক্ষা কেন লাগবে, সে বোঝে না। কৃষ্ণকান্ত ছেলের কার্যকারণ সম্বন্ধের অজ্ঞানতা নিয়ে খোঁটা দেন।
সাতশো টাকা পণ নিয়ে ভূতনাথের বিয়ে দিল কৃষ্ণকান্ত। কনের বয়স নয়বছর। প্রাক্-কিশোরী সরল ভূতনাথের বউকে ভাল লেগে গেল বাড়ির সবার। একদিন তার জ্বর হল। তারপর বমি করতে-করতে মারা গেল সে। কিছুদিন পর ভূতনাথের আবার বিয়ে দিল কৃষ্ণকান্ত। দোজবরে বলে এবার পণ একটু কম। সাড়ে পাঁচশো। নতুন বউ অপূর্ব রূপসী। আগেরজনের মতো সরলতা নেই তার। বরং একটু যেন অহংকারী। এই বইয়েরও জ্বর হল একদিন। বমি করতে-করতে মারা গেল সেও। তৃতীয়বার বিয়েতে আপত্তি ছিল ভূতনাথের। কিন্তু শেষ অবধি আবার বিয়ে হল তার। পাত্রী কালো। তাই এবার পণ আটশো টাকা।
ভূতনাথ এতদিনে শেকড়-বাকড়, জড়িবুটির উপকারিতা কিছুটা শিখে ফেলেছে। আগের মতো সরল নেই আর। একদিন কৃষ্ণকান্তের অনুপস্থিতিতে শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবার নামে পাঠানো মানিঅর্ডার পেল সে। কৃষ্ণকান্ত এড়াতে চাইল। কিন্তু ভূতনাথ বুঝল, এটা তার শ্বশুরের থেকে মেয়ের কালো রঙের জন্য নেওয়া জরিমানা। ভূতনাথের আপত্তিতে এই ব্যবস্থা বন্ধ হল। কৃষ্ণকান্ত অখুশি হল। কিন্তু ভূতনাথ শুনতে রাজি নয়। তৃতীয় বউয়েরও জ্বর হল একদিন। পরিবারের সবার দুশ্চিন্তা শুরু হল। ভূতনাথ আবিষ্কার করল, তার বাবা তার জ্বরগ্রস্ত পুত্রবধূর জন্য ওষুধ রেখে এসেছেন। মুহূর্তে ওষুধটা সরিয়ে কৃষ্ণকান্তের কাছে নিয়ে এল ভূতনাথ। এটা ওষুধ নয়। বিষ। টাকার লোভে তৃতীয় পুত্রবধূকেও খুন করতে গিয়েছিল কৃষ্ণকান্ত।

প্রায় গোয়েন্দা গল্পের মতো ‘পয়োমুখম’, সমাজের উপান্তে বাস করা গরিবগুর্বোদের নিয়ে নয়। বরং তার কেন্দ্রস্থলে মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত এক কবিরাজ পরিবার। কোনও হঠাৎ-ঘটে-যাওয়া ডিসরাপশানও নেই এই গল্পে। বদলে নিয়ম আছে। পণ নিয়ে বিয়ে, স্ত্রীর জ্বর, তারপর বমি, এবং শেষে মৃত্যু। ভূতনাথের স্ত্রীদের অপমৃত্যু নিয়ম মেনেই।তার কার্যকারণ সম্বন্ধ আছে। স্ত্রী সেখানে কোনও মানুষ নয়। টাকা রোজগার করার একটা যন্ত্রমাত্র। লেনদেনের উপায়। আর সেই যন্ত্র কাজ না করলে, টাকা না জোটালে, তাকে খুব সহজেই বদলে ফেলা যায়। মনুষ্যজীবনের মূল্য হয়ে ওঠে শুধুমাত্র টাকা। রীতিমতো হিসেব করে, যুক্তির কাঠামো মেনেই এই কাজ করে কৃষ্ণকান্ত। কিন্তু যুক্তির ফাংশন সেখানে অদ্ভুতভাবে বদলে যায়। এই যুক্তি নীতি-নৈতিকতার বোধ তৈরি করে না। মানবিক চেতনা দেয় না। নৈতিকতাকে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলে। হয়ে ওঠে হিংসার কারণ।
কৃষ্ণকান্তর শিক্ষা আছে, বাবা হিসেবে সংসারে কর্তৃত্ব আছে। আর সেটাই হয়ে উঠছে তার ক্ষমতাতন্ত্রের কাঠামো। চিকিৎসাশাস্ত্র— যা মানুষকে সুস্থ করে, সেটাই বদলে যাচ্ছে খুনের অস্ত্র হিসেবে।সমাজ এবং ব্যক্তিমানুষ, তার নীতিবোধ থেকে যা-কিছু অন্ধকার, খারাপ, ঘেন্নার যোগ্য, তাকে সরিয়ে রাখতে যায়। বর্জন করে। কিন্তু সেইগুলো সমাজের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে। ফিরে-ফিরে আসে। কিন্তু এই গল্পে, কৃষ্ণকান্তের যুক্তিবোধ তাকে নৈতিক করে তোলে না। উলটে সেটাই তার কাছে নৈতিকতাকে পরিত্যাজ্য করে তোলে। যুক্তি এখানে নৈতিকতার পরিপূরক নয়, বরং তার বিকল্প। যেখানে মানুষের জীবন, সম্পর্ক, এমনকী মৃত্যুও হিসেবের কাঠামোর ভেতর ঢুকে পড়ে। ফলে যা বর্জনযোগ্য, সেটা আর বাইরে ঠেলে দেওয়া হয় না।যুক্তির কাঠামোর ভেতরেই তাকে ঢুকিয়ে ফেলা হয়।
গত শতকের শুরুর দিকের গল্পকার জগদীশ গুপ্ত। তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘বিনোদিনী’ প্রকাশিত হচ্ছে ১৯২৭ সালে। শেষ গল্পগ্রন্থ ‘স্বনির্বাচিত গল্প’-র প্রকাশকাল ১৯৫৯। ততদিনে বাংলা ছোটগল্পে জাঁকিয়ে বসেছেন রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র ও প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়। অথচ এঁদের দেখানো পথে হাঁটেননি তিনি। জগদীশ গুপ্তের গল্পে মানুষ মোটেও শুধু পরিস্থিতির দাস নয়। তাঁর গল্প নীতিকথা তৈরি করে না। বরং খুঁড়ে-খুঁড়ে বার করে আনে মানুষের ভেতর লুকিয়ে থাকা অন্ধকার। তিনি ডিসরাপ্ট করেন। সেই ডিসরাপশান ভেঙে দেয় মানুষের আরোপ করা অর্থ, অস্পষ্ট করে দেয় নৈতিক-অনৈতিকের সীমানা। প্রশ্ন করে আমাদের যুক্তিবোধকেই। তৈরি করে নিজের আয়নায় নিজেকে চেনার অস্বস্তি।



