এই বছর প্রজাতন্ত্র দিবসে একটি সরকারি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। মহারাষ্ট্রের নাসিকে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের পর, স্বাধীন ভারতের কারিগরদের একে-একে নাম নেওয়া হলেও, উহ্য থেকে গিয়েছিল বাবাসাহেব আম্বেদকরের নাম। সরকারি মন্ত্রী গিরিশ মহাজনকে তাই মাঝপথে থামিয়ে দেন ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের এক কর্মচারী (মাধবী যাদব)। প্রকাশ্যে এমন ভুল ধরিয়ে দেওয়ার জন্য শীঘ্রই মাধবীকে পুলিশি হেফাজতে আনা হয় (অল্প সময়ের জন্য)। কিন্তু তিনি দৃঢ়ভাবে জানান যে, এই উহ্য রাখার বিষয়টি বর্তমান ভারতে আম্বেদকরকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ছাড়া কিছুই নয়।
এই মন্তব্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক ভাষ্যকে যথাযথভাবে তুলে ধরে। ভারতীয় সংবিধানের প্রাণপুরুষ আম্বেদকর, যে সাম্যের স্বপ্ন দেখেছিলেন পরাধীন ভারতে, তার কতটা পূর্ণ করা গেছে গত কয়েক দশকে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অর্থনীতিবিদ সুখাদেও থোরাত বলছেন যে, বিগত কয়েক বছরে দলিত সমাজের ওপর যে লাঞ্ছনা নেমে এসেছে, তা প্রাচীন ভারতে জাতপাতের আকর, মনুসংহিতার বৈষম্যকেই আবার ফিরিয়ে আনার সুনিপুণ চেষ্টা। ২০১৪ সালের পর থেকে কীভাবে ধারাবাহিক-রূপে আম্বেদকরের দর্শন উপেক্ষিত হয়েছে— তার দলিল পেশ করেছেন জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক থোরাত।
১৯৪৯ সালের একটি ভাষণে আম্বেদকর বলেছিলেন: ‘সংবিধান যতই উৎকৃষ্ট হোক না কেন, তা সবসময় পরিণতি পায় না, কারণ যারা এটি কার্যকর করতে সচেষ্ট, তার ভাল লোক নাও হতে পারে।’ অর্থাৎ, একটি দেশের সংবিধানকে কার্যকর করবার জন্য যে সৎ উদ্দেশ্যের প্রয়োজন হয়, তার কোথাও ঘাটতি দেখা যাচ্ছে, এমন উপলব্ধি গোড়াতেই বাবাসাহেবের হয়েছিল। ১৯৫৬ সালে তিনি মারা যাওয়ার পরে মহারাষ্ট্রে দলিত রাজনীতিতে ভাঙন দেখা যায়। ১৯৫৬ থেকে ’৬৭ সাল অবধি, আম্বেদকরের মৃত্যুর একেবারে পরবর্তী সময়, তাকে নিয়ে সেভাবে কোনও কাজ হয়নি। বাবাসাহেবের তিরোধানের ১১ বছর পর তাঁর প্রাইভেট পেপার ও ব্যক্তিগত নথি প্রায় বিনষ্ট হতে যায়, এমন দৃষ্টান্তও রয়েছে। ড. সবিতা আম্বেদকরকে দিল্লির আলিপুর রোডের ভাড়া বাড়ি থেকে যখন উচ্ছেদ করা হচ্ছে, বাবাসাহেবের গুরুত্বপূর্ণ কাগজ, লেখাপত্র কীভাবে সংরক্ষিত হবে, সেই নিয়ে ছিল বিস্তর ধন্দ। ইতিমধ্যে যদিও আম্বেদকরের সহযোগী ভগবান দাস এবং এলআর বেলির কর্মদ্যোগে ‘ভীম’ পত্রিকা থেকে তাঁর নির্বাচিত ভাষণের কিয়দংশ প্রকাশ করা হয়। তারও প্রায় দশ বছর পর দলিত কর্মীদের লাগাতার চাপে অবশেষে ১৯৭৮-এ মহারাষ্ট্র সরকার একটি কমিটি গঠন করে। এরা আম্বেদকরের গুরুত্বপূর্ণ লেখা সংগ্রহ করে, বিভিন্ন সংখ্যায় তা প্রকাশ করতে উদ্যোগী হয়। ১৯৫৬ থেকে ’৭৮-এর মধ্যবর্তী সময়, প্রায় কুড়ি বছরের এই সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বলে নেওয়া খুব জরুরি, কারণ স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতে, অন্তত প্রথম কয়েক দশকে, আম্বেদকরের রাজনৈতিক দর্শন বা তাঁর লেখাপত্রকে যে খুব একটা মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, এমনটা কিন্তু নয়। মেনস্ট্রিম লেফট, সেন্টার কিংবা দক্ষিণপন্থী রাজনীতিবিদ, কোনও গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডেই আম্বেদকর কখনও মূল স্থান অধিকার করেননি।
আরও পড়ুন: রূপান্তরকামীদের অধিকার কেড়ে নিতেই কি নতুন আইন?
লিখছেন দেবত্রী ঘোষ…

ঐতিহাসিক বদ্রীনারায়ণ বলছেন যে, ১৯৫৮ সালের পরে, আম্বেদকর-নির্মিত রিপাবলিকান পার্টিই তাঁর ইমেজকে জনপ্রিয় করে তুলতে সচেষ্ট হয়েছিল। বিআর আম্বেদকরের প্রসঙ্গ উঠলেই, ছোটবেলা থেকে, স্কুলে বা রাস্তায়, নীল জামা, প্যান্ট-পরিহিত, সুটেট-বুটেড এক মানুষ, হাতে শক্ত করে ধরে আছেন ভারতের সংবিধান, এই ছবিই আমাদের চোখে ভাসত। এমন ভাবমূর্তি, খুব সন্তর্পণে বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পোস্টার বা প্যামফ্লেটে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল সেই সময়। লক্ষ্য ছিল, যাতে কোনও দলিত পরিবারের যুবা এই বলিষ্ঠ চিত্র দেখে অনুপ্রাণিত হয়। দলিত মানেই সে হতদরিদ্র, অপুষ্ট বা অর্ধশিক্ষিত হবে, এমন মনোভাবের বিনির্মাণ ঘটাবে এই ছবি। ঐতিহাসিকরা পর্যালোচনা করেছেন যে, ‘বহুজন সমাজ পার্টি’-র উত্থান এবং ১৯৮০-র পর থেকে দলিত রাজনীতি আরও বেশি জোরদার হলে মহারাষ্ট্রের বাইরেও আম্বেদকরের নাম ঘরে-ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। ছোট-ছোট বইয়ের আকারে আম্বেদকরের জীবনী ছাপানো, সভা আয়োজন করে শিল্পী ও লেখকদের মধ্যে বাবাসাহেবকে নিয়ে আলোচনা, এই সবই উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায় আটের দশকের পর থেকে। ১৯৯০ সালে আম্বেদকরকে মৃত্যু-পরবর্তী ভারতরত্ন দেওয়া হয়। সমাজতত্ত্ববিদরা দেখাচ্ছেন যে, এই সম্মানের পর পপুলার সিনেমা, বই, এমনকী, আদালতের মামলা-মোকদ্দমাতেও আম্বেদকারকে উল্লেখ করা প্রভূত পরিমাণে বেড়ে যাচ্ছে। (একটি পরিসংখ্যানে দেখানো হচ্ছে, ১৯৯০-এ ভারতরত্ন পাওয়ার আগে মাত্র ৩০বার লিগ্যাল জাজমেন্টে বাবাসাহেবের নাম এসেছে; আর ১৯৯০-এর পরেই সেই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ২০৩বার, মাত্র কয়েক বছরেই ৮৬% বৃদ্ধি)।
এই সময় উচ্চবর্ণের মানুষদের বিরোধিতার ইতিহাসও উল্লেখ করা দরকার। অরুণ শৌরি নামক দক্ষিণপন্থী-র বই, ‘Worshiping False God’ আম্বেদকরকে ‘অ্যান্টি-ন্যাশনালিস্ট’ বলে চিহ্নিত করতে পিছপা হয়নি। একদিকে যেমন চলেছে দলিত হিরো, বাবসাহেব ও বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ; অপরদিকে সেগুলিকে ভাঙা, উচ্চজাতি-কর্তৃক দলিত আইকন আক্রমণও স্বাভাবিক রূপ নিয়েছে সারা দেশে। আম্বেদকরের মৃত্যু-পরবর্তী ৪০ বছরের ইতিহাস বলে নেওয়া খুব জরুরি, কারণ তাঁকে যে সহজেই জাতীয় মর্যাদার আসনে বসানো হয়েছে, অনায়াসেই তাঁর ছবি, বই, জীবনী বিকিয়েছে আমজনতার মধ্যে, এমনটা একেবারেই নয়। প্রথম থেকেই আমরা দেখতে পাই যে, আম্বেদকরের বই, লেখাপত্র, বিগ্রহ এবং তার সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এগিয়ে নিয়ে যেতে রিপাবলিকান পার্টি, বহুজন পার্টি বা দলিত প্যান্থারদের ভূমিকাই ছিল অগ্রগণ্য। এ-কথা স্পষ্ট হওয়া দরকার যে, ভারতের উচ্চবর্ণীয় রাজনীতিতে আম্বেদকরকে একপ্রকার ব্রাত্যই রাখা হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে তাঁর লেখাগুলি সংযোজন করে বই প্রকাশ করতেও লেগে যায় প্রায় ২০ বছর। এই অবজ্ঞা কোনও টেকনিক্যাল, লজিস্টিকস বা প্রযুক্তিগত কারণে নয়, বরং ভারতীয় রাজনীতিতে উচ্চবর্ণীয় হিন্দুদের আধিপত্যের ইতিহাস তুলে ধরে।


১৯৫৬ থেকে ১৯৮০ অবধি মূলস্রোতের রাজনৈতিক মঞ্চে আম্বেদকরকে নিয়ে এমন নিস্পৃহতা প্রমাণ করে যে, অস্পৃশ্যতা বা ‘caste atrocity’ এখানে কেবল পার্শ্ববর্তী, সাবসিডিয়ারি বা মাইনর বিষয় হিসেবে প্রতিপন্ন করা হয়েছে, আপামর জাতীয় স্তরে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি। এই পরিস্থিতিতে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে অবশ্যই ২০১৪-র পর। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে প্রকাশিত এক অতি-মূল্যবান গ্রন্থ: ‘Majoratarian State: How Hindu Nationalism is Changing India’-তে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি কীভাবে দলিত, আদিবাসী বা সংখ্যালঘুদের আরও কোণঠাসা করেছে বিগত দশকে, তার গবেষণামূলক প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। তনিকা সরকার, পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা বা ক্রিস্টোফার জ্যাফ্রেলটের মতো ব্যক্তিত্বরা এই আকর গ্রন্থ নির্মাণ করেছেন। সুখাদেও থোরাত এই বইতে আলোচনা করছেন যে, ২০১৪ সালে নতুন সরকার আম্বেদকরের নাম ব্যবহার করে ক্ষমতায় এলেও তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের প্রায় কিছুই কার্যকর করেনি। কথায় ও কাজে এমন অমিল স্বাভাবিক, কারণ হিন্দুত্ববাদী ভাষ্যের সঙ্গে দলিত রাজনীতি যে একেবারেই খাপ খায় না, সেটি আলাদা করে বিশ্লেষণের প্রয়োজন নেই। ২০১৪ থেকে ’১৮ সালের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকার ‘স্পেশ্যাল কম্পোনেন্ট প্ল্যান’ বা ‘SCP’-তে অর্থ বরাদ্দ ক্রমশ কমিয়েছে। SCP হল ইউনিয়ন বাজেটের সেই অংশ, যা শিডিউল কাস্টদের উন্নতিতে প্রতি বছর আলাদা করে টাকা বরাদ্দ করে। দলিত আর্থিক অধিকার আন্দোলনের সদস্যরা বলেছেন যে, প্রায় ১০% ঘাটতিতে চলে এই SCP, মানে প্রায় ২৭৫২ বিলিয়ন টাকা ডেফিসিট, যা তফশিলি জনজাতির জন্য বিবিধ প্রকল্প স্থগিত করে দিয়েছে। ১৯৪৫ সালে বিআর আম্বেদকর লাগু করেছিলেন ‘পোস্ট ম্যাট্রিকুলেশনস স্কলারশিপ ফর এসসি স্টুডেন্টস’। ২০১৪ সালের পর থেকে প্রায় পাঁচ মিলিয়ন তফশিলি ছাত্র এই প্রকল্পের টাকা সংগ্রহে সমস্যায় পড়েছে। সরকারি অনুদান বন্ধ করে দিয়ে দলিতদের শিক্ষাক্ষেত্রে আসা একপ্রকার অসম্ভব করে দেওয়ার মর্মান্তিক ফলাফল, ২০১৬-তে রোহিত ভেমুলা (হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়) ও ২০১৭-তে মুথুকৃষ্ণন জিভানানথামের (JNU) প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা ভোলার নয়। ১৯২৭ সালে মহদ সত্যাগ্রহের অংশ হিসেবে মনুস্মৃতি পুড়িয়েছিলেন বাবাসাহেব আম্বেদকর। যে মনুস্মৃতিতে বলা হয় ভারতের উচ্চবর্ণের পুরোপুরি অধিকার রয়েছে নিচু বর্ণের মানুষদের ভয়াবহ শাস্তি দেওয়ার। শূদ্রদের অস্পৃশ্য করে রাখা, সামাজিক বয়কট, মুণ্ডন, শারীরিক প্রহার, অঙ্গ কেটে নেওয়া এবং আরও ভয়াবহ সব শাস্তির নিদান রয়েছে মনুস্মৃতি-সহ বাকি হিন্দু ধর্মশাস্ত্রে। ২০১৪ সালের পর থেকে গুজরাত, উত্তরাখণ্ড বা আরও নানা জায়গায় গো-রক্ষা বাহিনীর লম্ফঝম্ফ মনুস্মৃতির দিন অকপটে ফিরিয়ে এনেছে। ২০১৪ সালের আগেও হিংসাত্মক ঘটনা সংঘটিত হত, কিন্তু সেখানে অন্তত সরকারি ইন্ধন জুটত না। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে হিন্দুত্ববাদী নেতাদের ভাষণে প্রাচীন বর্ণব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার ইঙ্গিত ভয়ের কারণ বাড়িয়েছে।

১৯৮৯ সালে রাজস্থান হাইকোর্ট চত্বরে মনুর একটি মূর্তি তৈরি করা হয় ভারতীয় আইনের প্রতিভূ হিসেবে। এরপর দলিতদের পক্ষ থেকে নানা প্রতিবাদ এসেছে; ধরনা মঞ্চ আয়োজন বা মনুর মূর্তি ভাঙার চেষ্টা জাতপাতভিত্তিক বৈষম্যকে নস্যাৎ করে দিতে চেয়েছে। ইতিমধ্যে, ২০২৩ সালের সুপ্রিম কোর্টের রায় আমাদের কিঞ্চিৎ বিস্মিত করে। সুপ্রিম কোর্ট এই মূর্তি সরানোকে কেন্দ্র করে আর কোনও ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন’ নিতে অস্বীকার করে। এই পদক্ষেপ আধুনিক ভারতে জাতপাতকে পুনর্বহাল করার এক প্রতীকি চেষ্টা। খুব সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে আম্বেদকরের সাত ফুট মূর্তি উন্মোচিত হয়েছে, তিনি মারা যাওয়ার প্রায় ৬৫ বছর পর। উল্টোদিকে ১১ ফুট মনুর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে প্রায় কোনও কাঠখড় পোড়াতে হয়নি হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীদের। যে-দেশের আইনি পরিভাষায় আম্বেদকরের আগে মনুকে উচ্চস্থান দেওয়া হয়, সংবিধানের প্রাণপুরুষের মূর্তি উন্মোচনের বহু বছর আগেই মিথিক্যাল হিন্দু মূর্তি সেজে ওঠে, সেই ভারত যে বাবসাহেবের দর্শন থেকে অনেকদিন আগেই বিচ্যুত হয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
আম্বেদকর বলেছিলেন, ‘অস্পৃশ্যদের বাকস্বাধীনতা ও উন্নতিসাধনের অন্যতম পদক্ষেপ হল সংখ্যাগরিষ্ঠের অত্যাচারে (tyranny of the majority) রাশ টানা।’ ভারতের সংবিধান কীভাবে এই পথ প্রশস্ত করতে পারে, সেই প্রসঙ্গে তাঁর মতামত:
‘সংবিধানে আইনি ধারা লেখা থাকে, ওটা কেবল অস্থিমজ্জা, কিন্তু সংবিধানের প্রাণ খুঁজে পেতে হলে আমাদের তাকাতে হবে constitutional morality-র (সাংবিধানিক নৈতিকতার) দিকে। এই নৈতিকতা অটুট রাখার উপায় হল সংখ্যাগরিষ্ঠ-কর্তৃক সংখ্যালঘুর প্রতি সর্বপ্রকার পীড়ন (tyranny) বন্ধ করা। হয়তো সংখ্যাগরিষ্ঠর প্রতিনিধি থাকবে সরকারে, কিন্তু তাতে যেন সংখ্যালঘুরা কখনওই অসহায় বোধ না করে।’

এই মতবাদ আর এখনকার রাজনৈতিক ভাষ্য যে একে-অপরের পরিপন্থী— তার হাজার উদাহরণ দেওয়া যায়। ফরেস্ট রাইটস অ্যাক্ট (FRA)-কে যতটা সম্ভব কার্যকর করতে না দেওয়া; আদিবাসীদের জমি, জঙ্গল নির্বিচারে কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়া, PESA আইনকে (যার দ্বারা আদিবাসীরা নিজেদের অঞ্চলের রিসোর্স বা অন্যান্য জিনিসের প্রতি অধিকার হারায় না) গুরুত্ব না দেওয়া, এমন বহু নজির গত কয়েক বছরে পাওয়া গেছে। হিন্দুত্ববাদী দলগুলি ‘আদিবাসী’ শব্দটিও ব্যবহার করেন না, তারা বলেন ‘বনবাসী’; এই শব্দ বদলের পিছনে যে কুৎসিত রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে আছে, তা বোঝা কঠিন নয়। অরিজিনাল হোমল্যান্ড বা আদিবাসীরাই ভারতের জল, জঙ্গল ও বিস্তীর্ণ অঞ্চলে যুগ-যুগ ধরে বসবাস করে আসছে, এই ঐতিহাসিক ধারাকে উপেক্ষা করে শুধু ‘বনবাসী’ তকমা দেওয়া মানে তাদের নিজেদের জমি, নদী বা সমতলের ওপর থাকা ট্র্যাডিশনাল রাইটসকে (ঐতিহ্যগত অধিকার) অস্বীকার করা। শুধু আদিবাসী নয়, ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের কী অবস্থা, তা নিয়ে বিস্তর চর্চা তো হচ্ছেই। এই সবের মধ্যে যদিও কিছু ‘tokenism’ বা লোকদেখানো কর্মপদ্ধতির ধারা অটুট রয়েছে। ‘Forest rights act’ বকলমে কেড়ে নেওয়া হলেও আদিবাসী সম্প্রদায়ের কিছু মানুষকে উচ্চপদে আসীন রাখা হয়, যাতে তৃণমূল স্তরে নেমে কিছু খতিয়ে দেখতে না হয়। ঠিক যেমন রোহিত ভেমুলার মৃত্যুর সাত বছর পর ভারতে জোরকদমে সংবিধান দিবস পালিত হয় আম্বেদকরের মূর্তি উন্মোচন করে (সুপ্রিম কোর্টে)। তবে এমনভাবে চলতে থাকলে খুব বেশিদিন এই প্রতীকি কাজগুলিরও দরকার পড়বে না। হিন্দুত্ববাদ, ফ্যাসিজম ও পুঁজিবাদের যে অভাবনীয় মিলমিশ গত ১২ বছরে দেখা গেছে, সেখানে আম্বেদকরের দর্শন ক্রমশ ফিকে পড়ছে।
আজ ১৪ এপ্রিল, বাবাসাহেবের ১৩৫তম জন্মদিন। এই সুযোগে ভেবে দেখা উচিত কী উপায় তাঁর লেখা, বক্তৃতা বা কর্মকাণ্ডের নজির আরও বেশি করে যুবাদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। আজকের গেরুয়া-ধর্মান্ধ গোষ্ঠীদের মৌলবাদী আদর্শের বিপরীতে আম্বেদকরের সাংবিধানিক নৈতিকতা ঢাল হয়ে দাঁড়াতে পারে। কীভাবে আর কী কী কৌশলে তা করা যায়, তা অনুধাবন করার দায়িত্ব শুধুমাত্র দলিত গোষ্ঠীদের ওপর ন্যস্ত নয়। হিন্দুত্ববাদ-বিরোধী প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল— বাম, অতি-বাম, মধ্যপন্থী বা নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকেও যদি উদ্যোগ আসে আগামীতে, তাহলে হয়তো বিকল্প স্বর জোরালো হবে।




