নিরালা বারান্দায় উড়ে এসেছিল শুকনো কত পাতা! বহুদিন পরে, সেই ঝরাপাতায় পা রেখে-রেখে খানিক পায়চারি করলেন আপনি। সামান্য দূরে, শিরীষ গাছে বসেছিল কাঠঠোকরা। পেল্লায় আকারের একটা মরা ডালে ঠোক্কর দিচ্ছে। সঙ্গে হাওয়া বইছে। শনশন। কিছু পরেই, বৃষ্টি। তবু আপনার কানের আরাম হল না। নিদারুণ রিল্যাক্সেশনের জন্য ইউটিউবে খুঁজলেন, ‘ASMR Sounds’। তৎক্ষণাৎ হাজারে-হাজারে রিল। তৎক্ষণাৎ একটা হেডফোন আপনাকে পৃথিবীতে আরও একা, আরও যন্ত্রবৎ করে দিল। আপনি স্ক্রোল করছেন। কেউ হরেক রকম সবজি কাটছে আর অবিরাম খটখট শব্দ। সেই সমস্ত সবজি, গরম তেলে ভেজে রাখার শব্দ। ছোট একটি পাথরের বাটিতে কেউ গুঁড়ো করছে অসংখ্য মশলা, তার তীক্ষ্ণ খসখসে শব্দ। কখনও-বা চুল কাটার মসৃণ শব্দ। প্যাকেট-প্যাকেট চিপস্ খাওয়ার মুচমুচে শব্দ। তারপর, চুলে বিলি কেটে দেওয়ার শব্দ ভেসে এল। ঘুমিয়ে পড়লেন।
‘ASMR’ শব্দবন্ধ আদতে কী? অটোনমাস সেনসরি মেরিডিয়ান রেসপন্স। এটি, মানবদেহের এক ধরনের সংবেদন-শিহরণের মতো। শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যায় যেভাবে। গায়ে কাঁটা দেয় যেমন। তেমনই। এ-সংবেদন সমগ্র মস্তিষ্ক জুড়েই অনুভূত হতে পারে। ঘাড় বেয়ে নামে কখনও। দুই কাঁধ হয়ে শিরদাঁড়া পর্যন্ত। পাশাপাশি, নানাবিধ অঙ্গপ্রত্যঙ্গে। অর্থাৎ, স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে। এবং সবশেষে, অদ্ভুত প্রশান্তি। ফুরফুরে শরীর। যাবতীয় স্ট্রেস ভ্যানিশ। দিলখুশ!
আরও পড়ুন: মানসিক অবসাদ-ই কি রাগের মূল উৎস?
২০১০ সাল। এহেন সংবেদনের অভিজ্ঞতা, ইন্টারনেটে বিস্তারিত লিখলেন জেনিফার অ্যালেন। একজন আমেরিকান সাইবারসিকিউরিটি কর্মী। সেই প্রথম তৈরি হল একটি শব্দবন্ধ: ‘ASMR’। জেনিফারের আগে, এহেন ধ্বনিসমূহকে ব্যাখ্যা করে কেউ-কেউ বলেছিলেন— এ-জাতীয় ধ্বনি আসলে ‘ফিসফিস’ অথবা ‘whispering Sounds’। এই প্রসঙ্গে, অস্ট্রিয়ান লেখক এবং অনুবাদক, ক্লেমেন্স জে. সেট্জ আশ্চর্য এক উদাহরণ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ভার্জিনিয়া উল্ফের উপন্যাসের কথা। ‘মিসেস ডালওয়ে’। সেই উপন্যাসের চরিত্র, একজন নার্স, কণ্ঠটি যেন ঘাসফড়িঙের মতো। মৃদু। রিনরিনে। অথচ গভীর। সে যখন পুরুষ রোগীটির সঙ্গে কথা বলে, মনে হয়— ঢেউয়ের মতো শব্দ উথালপাথাল করছে। মাথায়। ‘ASMR’ শব্দসমূহের সঙ্গে কী ভীষণ মিল!
কেউ আবার জুড়ে দিয়েছিলেন যৌনতাও। কিন্তু জেনিফার একটি সাক্ষাৎকারে জানাচ্ছেন, এই ক্ষেত্রে অর্গাজম নয়। মেরিডিয়ান শব্দটিই সর্বাধিক যুক্তিযুক্ত অর্থ হয়, এমন এক অনায়াস সংবেদন, যা তুঙ্গে পৌঁছেছে। কিন্তু রেসপন্স? কীসের ভিত্তিতে? নির্দিষ্ট কোনও শব্দ হতে পারে। হতে পারে কোনও ভিজ্যুয়াল। অথবা মৃদু স্পর্শ। যেগুলো ক্রমাগত উদ্দীপিত করে আমাদের সংবেদন। তাই ঘুম আসে। স্নায়ু শিথিল হয়ে থাকে খানিকক্ষণ। আমি দেখি, ভীষণ পুরনো আর নোংরা এক কার্পেট ধুচ্ছে একটি ছেলে। আমারই কোনও সহনাগরিক, সেই ভিডিও হাঁ-মুখ করে গিলছেন। চোখেমুখে অনন্ত স্বস্তির ছাপ। প্রতিবার স্ক্রোল করছেন আর একটা করে কার্পেট। অথবা এক থালা ডিমসেদ্ধ সাজিয়ে বসেছে কেউ। কেন দেখছেন তিনি? শুধু ভাল লাগছে। আরাম হচ্ছে। মনে হচ্ছে, পৃথিবীটা দশ মিনিট স্লো। তাহলে তো মানুষ শান্ত হয়? ঘৃণাভাষণের বদলে দু’পাতা বই পড়ে নির্জনে? মনোযোগ দৃঢ় হয়?
মনোবিশেষজ্ঞদের মতে, ডিপ্রেশান কিংবা অ্যাংজাইটির মাত্রা খানিক কমিয়ে আনার ক্ষমতা রাখে বিবিধ ‘ASMR’ শব্দসমূহ এবং দৃশ্য। কিন্তু চিকিৎসাবিদ্যা এই মতকে কোনওরকম শিলমোহর দেয়নি। অপরদিকে, আরও একটি সত্য বর্তমান। একটি ভিডিওতে দেখছি, মাইক্রোফোনে আলতো টোকা দিচ্ছে একজন মেয়ে। সেই টোকা দেওয়ার শব্দে কেউ যেমন ‘প্লেজার’ পেয়েছেন, কেউ বেজায় চটেছেন। তেমনই, চুইংগাম চিবোনোর শব্দে, বইয়ের পাতা উল্টোনোর শব্দে, পাকা তেঁতুলমাখা খেয়ে মুখে যে চটাক শব্দ হয়— গা ঘিনঘিনিয়ে উঠতে পারে কোনও মানুষের। রেগে যেতে পারেন দুর্দান্ত। মনোবিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ হল ‘মিসোফোনিয়া’।
আসলে ঠিক কোন শব্দ যে আমাদের ঠিক কোন অনুভূতিগুলো ছুঁয়ে যাবে, তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না কেউই। কিন্তু নিত্যদিনের এই শ্লথতার অনুশীলন আসলে ভোঁতা করে দিচ্ছে মস্তিষ্ক, মন— যাবতীয় ইমোশন। ভার্চুয়ালি, সর্বক্ষণ যে ‘ASMR’ শব্দসমূহের মধ্যে বেঁচে থাকছি, ক্রমে-ক্রমে পরিণত হয়েছে অভ্যেসে। যে-কারণে শুকনো পাতার মর্মরধ্বনি, কাঠঠোকরার ড্রামিং অথবা বৃষ্টির ঝিরিঝিরি শব্দের বদলে আপনি তাই বেছে নিয়েছিলেন ডিজিটাল ডিলাইট। কৃত্রিম সুখ। আদতে যা ‘ক্লান্ত, ক্লান্ত করে’।
তথ্য বলছে, মনোযোগের সময়সীমা তিরিশ সেকেন্ডে ঠেকেছে। জলের কাছে চুপ করে বসে থাকার চেয়ে, জলের ভার্চুয়াল টুপটুপ শব্দ বেশি রোমাঞ্চিত করছে। মনে হচ্ছে, ঘুমের পেছনে কেউ টোকা মেরে যাক আজীবন। সুড়সুড়ি দিক। নইলে ঘুমোতে ভুলে যাব। আসলে এক পৃথিবী অসাড়তা গায়ে মেখে নিচ্ছি। ট্রেনে। বাসে। মেট্রোয়। একটি সমীক্ষা বলছে, যে-মানুষ সর্বক্ষণ ‘ASMR’ শব্দসমূহের সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে, বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে সেই মস্তিষ্ক তুলনায় কম সংযোগ করতে পারে। এবং, নির্দিষ্ট এক বা একাধিক শব্দের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব সে মানুষের অনুভূতি। সংবেদন। এবং, চিন্তা।
সৈয়দ শামসুল হক একটি কবিতায় লিখছেন:
‘কেমন তাজ্জব সব পাল্টায়া যায় আমি তাই
দেইখাছি চিরকাল। পরানের ভিতরে সুরাখ-
সেখানে কেবল এক ফরফর শব্দ শোনা যায়…’
কেমন সেই ফরফর শব্দ? ভুলে যাচ্ছি আমরা। ইউটিউবে সার্চ করছি। নট ফাউন্ড। সবজি কাটার খটখট শব্দ সয়ে যাচ্ছে। যেন প্লেজার নেই আর। অথবা আছে, ঠাহর করতে অপারগ। ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে। কয়েক বছর পরে, ‘ASMR’ শব্দসমূহের লিস্টে কি প্রবেশ করবে ব্যালিস্টিক মিসাইল আর স্টেনগানের শব্দ? সর্বহারাদের আর্ত চিৎকার? আর ভিস্যুয়ালের তালিকায় রইবে, ভোটাধিকার হারিয়ে ফেলা হাজার-হাজার নিস্পন্দ মুখ। এ-লেখা শুকনো পাতা আর কাঠঠোকরার শব্দে পাক খেতে-খেতে কোথায় যে চলে গেল! পরবর্তী ইন্সটাগ্রাম রিল অবশ্য রিল্যাক্স করে দেবে আপনাকে। আবারও চক গুঁড়ো করবে কেউ, ডিমসেদ্ধ গিলবে, মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে…




