হিয়া টুপটাপ, জিয়া নস্টাল: পর্ব ৪৭

রাশিতত্ত্বের ভাস্করবাবু

ভাস্করবাবুকে আমরা সক্কলে এক ডাকে ভয় পেতাম। ভাস্কর বসু, যাদবপুর বিদ্যাপীঠের নামজাদা, ডাকাবুকো শিক্ষক। মূলত ইলেভন আর টুয়েল্‌ভ-এ স্ট্যাটিস্টিক্স বা রাশিতত্ত্ব পড়ানোর জন্যই তিনি সুবিদিত ছিলেন, এছাড়া ছোটদের ক্লাসে অঙ্কও শেখাতেন বটে। গোড়াতেই যে ভয়ের কথাটা বললাম, তাতে ঠিক বোঝানো যাবে না ভাস্করবাবুকে ঘিরে আমাদের অনুভূতি। সেই ভয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল সম্ভ্রম, সমীহ আর শ্রদ্ধা। সেইসঙ্গে এই বিস্ময়ও যে, এইরকম জ্ঞানী ও গুণী একজন শিক্ষক কীভাবে হাইস্কুলের গণ্ডিতে নিজেকে আটকে রেখে দিলেন। পরে অবশ্য বুঝেছি, উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে লড়াইয়ে কেউ-কেউ ভালবাসাকেও জিতিয়ে দিতে পারেন। ভাস্করবাবু ছিলেন সেইরকম বিরল একজন মানুষ।

আমাদের স্কুলে তিনি পড়াতেন বটে, কিন্তু তাঁর খ্যাতি ছিল বাংলাজোড়া। ভাস্কর বসু’র নাম শোনেনি, এরকম কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা ছাত্রী-ছাত্র সে-আমলে ছিল না প্রায়। এবং যাদবপুর বিদ্যাপীঠকে যে-কয়েকটি কারণে বাকি স্কুলগুলো ঈর্ষার চোখে দেখত, তার প্রথম সারিতে ছিলেন ভাস্করবাবু। ওইরকম একজন অসামান্য শিক্ষক যে-কোনও স্কুলের সম্পদ বৈকি। আমাদেরও তেমনটাই ছিল।

আরও পড়ুন: ঢাকের আওয়াজ আসলে হেমন্তকালের ডাক, যাকে এড়িয়ে চলা যায় না কিছুতেই!
লিখছেন শ্রীজাত…

ইলেভন-এ উঠে কী খেয়াল চাপল আমার মাথায়, দুম করে স্ট্যাটিস্টিক্স নিয়ে বসলাম। সঙ্গে ভূগোল আর অর্থনীতি। জীবনে লক্ষ্য বলতে তো কিছু নেই, তাই যখন যেমন মনে হত, করে বসতাম। বাড়ি থেকেও তেমন বাধা আসেনি কখনও। তাই যখন মনে হল, ভাস্কর স্যারের ক্লাস না করে এই স্কুল থেকে বেরিয়ে যাওয়াটা অন্যায় হবে, তখন স্ট্যাটিস্টিক্স নিতেই হল। যদিও জানতাম, আমার দ্বারা ও-জিনিস বেশিদিন হবে না।

এখানে বলি, ভাস্করবাবুর সঙ্গে না হলেও, ওঁর পরিবারের সঙ্গে আমাদের একটা আলতো যোগাযোগ ছিল। গড়িয়া মিতালি সঙ্ঘের মাঠের পাশের গলি দিয়ে ঢুকে বেশ কিছুটা এগিয়ে ওঁদের ঝকঝকে তিনতলা বাড়ি। ভাস্করবাবুর বাবা তখন নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন থেকে সদ্য অবসর নিয়েছেন। দীর্ঘাঙ্গী, সুপুরুষ, স্বল্পভাষী এবং প্রবাদপ্রতিম সেই শিক্ষকমশাইকে দু’বেলা পাড়ায় টহল দিতে দেখা যেত। যাতায়াতের পথে কখনও-সখনও দেখেছি বাবাকে ওঁর সঙ্গে কুশল-বিনিময় করতে। ভাস্করবাবুর দিদি, মায়ের কাছে গান শিখেছেন দীর্ঘদিন। তিনিও ছিলেন শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। গানের ক্লাস শেষ হবার পর মায়ের সঙ্গে জমিয়ে গপ্পো করতেন যখন, তখন আমি মুগ্ধ শ্রোতা। আমাদের বাড়ি যেমন গানবাজনা দিয়ে তৈরি, ওঁদের বাড়ি তেমনই পড়াশোনা দিয়ে তৈরি, সেসব গল্প হত অনেক। বেশ কিছু বছর পর, ভাস্কর স্যারের অর্ধাঙ্গিনীও মায়ের কাছে গান শেখা শুরু করেন। আশ্চর্য সমাপতনে, তিনি ভূগোলের শিক্ষকতা করতেন। কিন্তু এইসব ঘরোয়া যোগাযোগ একদিকে, আর ক্লাসে ঢোকামাত্র পিন ড্রপ সাইলেন্স ছড়িয়ে দেওয়া ভাস্কর স্যার আরেকদিকে। সেই গল্পই আজ কিছুটা বলবার।

মোটামুটি লম্বাই ছিলেন ভাস্কর স্যার, সুন্দর গড়ন, মাথায় ফিকে হয়ে আসা চুল আর সরু একখানা গোঁফ। এই ছিল তাঁর চেহারা। কিন্তু আমার মতে, ওঁর সিগনেচার ছিল দু’খানা জিনিস। এক, সারাক্ষণ চকের গুঁড়োয় সাদা হয়ে থাকা ডান হাতের পাতা; দুই, ছবি বিশ্বাস ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায় মেশানো একখানা কণ্ঠস্বর, যা শুনলে আমাদের প্রাণ শুকিয়ে আসত। পড়া ধরা তো পরের ব্যাপার, ওই গলায় নিজের নামটা উচ্চারিত হলেই কেঁপে উঠতাম। তারপর যখন শুনতাম, ‘কী হে, আজকেও বই আনতে ভুলে গেছ নাকি?’ বা ‘কাল সারাদিন কী করছিলে? কবিতা লিখছিলে? চ্যাপ্টারটা পড়ে আসার আর সময় পাওনি, তাই তো?’ তখন মাটিতে মিশে যেতে হত। আমার কবিতা লেখার খবর যে কোন শত্রু ভাস্করবাবুর কানে তুলেছিল, তাকে আমি আজও খুঁজছি।

ঠিক হল, সবাই মিলে ভাস্করবাবুকে প্রণাম করতে যাওয়া হবে। তখন এটাই চল ছিল। পরীক্ষার ফল বেরোলে স্যার আর দিদিদের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে প্রণাম করে আসা। আমিও লজ্জার মাথা খেয়ে এক সকালবেলা সেই দলে ভিড়ে গেলাম। ভাস্করবাবুর বাড়িতে সেদিন ঝাঁকে-ঝাঁকে পড়ুয়াদের আনাগোনা, তাদের মুখ আর হাঁটাচলার ভঙ্গি দেখলেই বোঝা যাচ্ছে, তারা কেউ আমার মতো ভাস্কর বসুর নাম ডুবিয়ে আসেনি।

অবশ্য আমার মতো কয়েকজন ফাঁকিবাজ ছাত্রী-ছাত্র ছাড়া, বাকিরা ভাস্করবাবুর পড়ানো দিব্য বুঝতে পারত; পড়া ধরলে দারুণ পড়া বলত আর হোমটাস্কও করে নিয়ে আসত। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, সেইসব সুশীল পড়ুয়াদের ছেড়ে তিনি আমার মতো ছেলেমেয়েদেরই ধরতেন আগে। এইখানে বলি, তখনও স্কুলে মারধর বা নিল ডাউন জাতীয় শাস্তি একেবারে জলভাত। কিন্তু ভাস্কর স্যার ও-পথে কখনও যাননি। তাঁর মোক্ষম অস্ত্র ছিল একটিই। শ্লেষ। পড়া না পারলে, ভুলভাল উত্তর দিলে, বা হোমটাস্ক না করে এলে বকুনি বা মারধর, কোনওটাই তাঁর ধরন ছিল না। বরং এমন একখানি বাক্যবাণ ছুড়ে দিতেন, শুনে মনে হত এর চেয়ে নিল ডাউন করিয়ে রাখলে ভাল হত। আর যখন বোর্ডে লিখে-লিখে কোনও একটি বিষয় পড়াতেন, তখন আমার মতো আকাটও মুগ্ধ হয়ে শুনত এবং এই ভ্রমে বিশ্বাস করত যে, সে রাশিতত্ত্ব বুঝে ফেলেছে। ওইরকম অসামান্য ক্লাস নিতে আমি খুব কম শিক্ষককেই দেখেছি। একটা বিষয় কতখানি করায়ত্ত হলে এবং কতখানি ভালবাসা থাকলে ওইভাবে পড়ানো যায়, তা কল্পনা করা কঠিন। রাশিতত্ত্বের প্রতি আমার কিছু প্রেম যে এখনও টিকে আছে, তা ওই ভাস্করবাবুর জাদুতেই।

কেবল ক্লাসে নয়, খাতাতেও তাঁর অব্যর্থ শ্লেষের পরিচয় পাওয়া যেত। মনে আছে, ক্লাস টেস্ট-এ একবার স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশন-এর একখানা সমীকরণ কষতে গিয়ে মাঝখানে একটু গোঁজামিল দিয়েছিলাম। বোধহয় ১০ নম্বর ছিল প্রশ্নটায়। খাতা যখন পেলাম, দেখলাম দশে শূন্য দিয়ে লাল কালিতে বড়-বড় হরফে লিখে রেখেছেন, ‘এইভাবে আর কতদিন চলবে?’ এ-জিনিসের তুলনা নেই। সে-খাতা আজও সযত্নে আমার কাছে রাখা আছে। এটাও অবশ্য বলা দরকার, কারও কাজ ভাল লাগলে মন খুলে প্রশংসা করাতেও ভাস্করবাবুর জুড়ি ছিল না। আমার মনে আছে, এরকমই একখানা ক্লাস টেস্টের পর আমার খাতা খুলে আমার আঁকা একখানা পাই চার্ট ক্লাসকে দেখিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার এত বছরের শিক্ষকতায় এরকম পাই চার্ট আমি খুব কম দেখেছি। পাই চার্ট কীভাবে আঁকতে হয় সেটা শ্রীজাতর কাছ থেকে শেখা উচিত।’ আমি সেদিন আকাশ থেকে নামতে পারিনি আর। শাহরুখ খান আর টম ক্রুজ মেশালে যে-ব্যাপারটা হয়, সেরকম হয়ে গেছিলাম। রাশিতত্ত্বের নিরিখে আমি বরাবর নেহাত ব্যর্থই থেকেছি, তারও মধ্যে একটু ভাল খুঁজে নিয়ে সমক্ষে স্বীকার বা প্রচার করার এই যে ঔদার্য, এ-ই বা কতজন শিক্ষকের থাকে? ভাস্কর স্যারের সেটা ছিল।

বাবার সুপারিশে নিজের বাড়ির কোচিং ক্লাসে আমাকে ভর্তি নয়েছিলেন ভাস্কর স্যার। তাঁর বাড়ির পড়ানোর ব্যাচে প্রত্যেকে যার-যার স্কুলে এক থেকে দশের মধ্যে আছে, একমাত্র আমি ছাড়া। ওই কাকভোরে তাঁর বাড়ির ছাদের ঘরে গিয়ে বসতাম যখন, নিজেকে খুব বেমানান মনে হত। কত সব মেধাবী ছাত্রী-ছাত্র, কত-কত দূর থেকে আসছে, তাদের ঝলমলে নম্বর আর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। তারই মধ্যে, পাশের পাড়া থেকে টুকটুক করে হেঁটে আসা আমি এতটাই ম্লান যে, ক্লাসে নিজেকে অনুপস্থিত বলেই মনে হত। কিন্তু মেধায় খামতি থাকলেও তার প্রতি নজরে কোনও খামতি থাকত না ভাস্করবাবুর। আমাকেও একইরকম যত্ন ও আবেগ দিয়ে পড়াতেন। এর কিছু হবে না জেনেও শ্রম দিতেন অকাতরে। সেই শ্রম আর যত্নের মান আমি রাখতে পারিনি।

একটা ঘটনা বলে শেষ করি। হায়ার সেকেন্ডারির রেজাল্ট বেরিয়েছে। আমাদের স্কুলের যেসব ছাত্রী-ছাত্র ভাস্কর স্যারের কাছে ব্যক্তিগতভাবেও পড়ত, তারা সকলে ২০০-তে ১৯০ থেকে ১৯৮-এর মধ্যে নম্বর পেয়েছে। সেটাই স্বাভাবিক। আমি পেয়েছি কুড়িয়েবাড়িয়ে ১০৫। সেটা আরও স্বাভাবিক। ঠিক হল, সবাই মিলে ভাস্করবাবুকে প্রণাম করতে যাওয়া হবে। তখন এটাই চল ছিল। পরীক্ষার ফল বেরোলে স্যার আর দিদিদের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে প্রণাম করে আসা। আমিও লজ্জার মাথা খেয়ে এক সকালবেলা সেই দলে ভিড়ে গেলাম। ভাস্করবাবুর বাড়িতে সেদিন ঝাঁকে-ঝাঁকে পড়ুয়াদের আনাগোনা, তাদের মুখ আর হাঁটাচলার ভঙ্গি দেখলেই বোঝা যাচ্ছে, তারা কেউ আমার মতো ভাস্কর বসুর নাম ডুবিয়ে আসেনি। সে যাই হোক, সকলের মার্কশিটে চোখ বুলিয়ে ভাস্কর স্যার এক হাঁড়ি রসগোল্লা আনালেন। তারপর বললেন, ‘তোমরা সকলেই খাও, কিন্তু এই হাঁড়িটা শ্রীজাতর জন্য।’ আমি রসগোল্লার দিকে হাত বাড়িয়েও থমকে গেলাম। বাকিরাও অবাক। ভাস্কর স্যার বললেন, ‘তোমরা যে সব এইরকমই নম্বর পাবে সেটা তো জানতাম, কিন্তু শ্রীজাত যে এত কম পড়াশোনা করেও ১০৫ পাবে, এ আমি ভাবতেই পারিনি।’ এই কৌতুকে গোটা ঘর আবার ঝলমল করে উঠল।

রাশিতত্ত্বে আমার প্রিয়তম চ্যাপ্টার ছিল প্রব্যাবিলিটি। বাংলায় যাকে বলে সম্ভাবনা। সেখানে বিরলতম কিছু সম্ভাবনার হদিশও দেওয়া থাকত। আজ বুঝি, আমার মতো ছাত্র হয়েও ভাস্কর স্যারকে শিক্ষক হিসেবে পাবার যে-প্রব্যাবিলিটি, তা আঁক কষে বার করা যাবে না। আর ভবিষ্যতে এমন শিক্ষক তৈরি হবার সম্ভাবনা? সে বোধহয় আগেরটার থেকেও কম।