উল্টো দূরবিন: পর্ব ৯

শ্রেণিচেতনার শুরু

এই গ্যালিফ স্ট্রিট-এর ওপর পরপর কয়েকটি কারখানা ছিল। গ্যালিফ স্ট্রিট ট্রাম ডিপো-র পর একটা সুরকির কারখানা। পুরনো ইট মেশিনে গুঁড়ো করা হত। তুমুল শব্দ। তারপর দুটো নোঙরের কারখানা। নৌকো, জাহাজ— এসবকে আটকে রাখার জন্য নোঙরের ব্যবহার হত। গনগনে কয়লার মধ্যে লোহার রড ঢুকিয়ে দেওয়া হত, তারপর লালরঙা উত্তপ্ত লোহা বড়-বড় হাঁতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে বাঁকানো হত। নোঙরের কারখানার পর তিন-চারটে লেদ মেশিন। এখানেই আমার প্রথম শ্রমিক দেখা। যখন স্কুলের উঁচু ক্লাসে, শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের কথা জেনেছি, কলেজে ঢোকার আগেই কার্ল মার্ক্স। তখন মালিক শ্রেণি বলতে ভাবছি, আমার পিসেমশাইয়ের মতো মানুষকে। লেদ কারখানার মালিক রমেনবাবু, সুরকি মিলের মালিক হরিপদবাবুদের। রমেনবাবুর নিজস্ব মোটর গাড়িও ছিল না। একটা ইঞ্জিন ফিট করা সাইকেল ছিল। আর পিসেমশাইয়ের মতো বিরাট মাপের ভাল মানুষের কথা তো বলেইছি। কিন্তু আমার সে-সময়ের চোখে ওরা মালিক।

বিশ্বকর্মা পুজো হত সেই অঞ্চলের সব কারখানাতেই। কোনও এক বিশ্বকর্মা পুজোয় কোন মালিক, শ্রমিকদের ভোজ খাওয়াচ্ছে, তাই নিয়ে প্রথম গল্প লিখি ‘বাঁধানো দাঁত’। ‘অমৃত’ পত্রিকায়, যাকে বলে শ্রেণি সচেতন গল্প। এ-প্রসঙ্গে পরে আসব।

বাবা গ্যালিফ স্ট্রিট-এর বাড়িটা ছেড়ে বিরাট-তে চলে আসেন, ১৯৬৬ নাগাদ। আমার ছোটকাকার ততদিনে বিয়ে হয়ে গেছে। কাকা-কাকিমা এ-বাড়িতেই রয়ে যায়। আমার ঠাকুর্মাও। আমি তখন কাশিমবাজার ছেড়ে হেয়ার স্কুলে। আমিও এই বাড়িতেই থাকি। আর আমার মেজপিসেমশাই এর আগেই  ১৯৬০/৬১ নাগাদ এই বাড়িটা ছেড়ে দুর্গাচরণ মুখার্জি স্ট্রিট-এ একটা নতুন বাড়ি করে চলে যান। ওদের লাল সিমেন্টের ঘর এবং আমাদের সাবেক ঘর কাকা-কাকিমা, ঠাকুর্মা, আমি এবং আত্মীয়-স্বজন মিলে ব্যবহার করতাম।

ইঃ আহ্লাদ! ওদের গান? ওটা রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ সব্বার! পড়ুন: উল্টো দূরবিন পর্ব: ৯

জাহ্নবীজীবন চক্রবর্তী  

উনি আমার মেজ পিসেমশাই। এর আগে বারবার তাঁর কথা বলেছি। এক আশ্চর্য মানুষ! বিরাট প্রতিভাবান নন, উচ্চশিক্ষিত নন, খুব ধনী নন, কিন্তু মানবিকতার ধনে ধনী। একা-একা আনন্দ হয় না, সবাইকে নিয়েই আনন্দ। এটাই ছিল তাঁর জীবনদর্শন।

আমার বাবার থেকে বছর চারেকের বড় বোধ হয়। দেশভাগের আগে থেকেই ব্যাবসা করতেন। পিসেমশাইয়ের বাবার নাম উদয়চন্দ্র। বেলেঘাটা অঞ্চলে কোথাও বাসা-বাড়ি ভাড়া নিয়ে কালির ব্যাবসা করতেন। পিসেমশাই পরবর্তীকালে গ্যালিফ স্ট্রিট-এর এই গোটা বাড়িটা ভাড়া নিয়ে কারখানা গড়ে তোলেন।  আমার বাবা অবিভক্ত ভারতে সরকারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। দেশভাগ হলে, অপশন দিয়ে ভারতে আসেন। পিসেমশাই  এই বাড়িতে আমাদের পুরো পরিবারকে আশ্রয় দেন। এসব  কথা তো আগেই বলেছি।

খুব ছোটবেলার কথা মনে পড়ল। পিসেমশাই দুপুরে খেতে বসেছেন। আমাকেও পাশে বসিয়েছেন।  একটা ছোট্ট প্লেটে আমায় তুলে দিচ্ছেন আলুভাজা, খাইয়েও দিচ্ছেন। প্রায় প্রত্যেক রবিবার-ই পিসেমশাইদের মাংস হত। আমার ‘নেমন্ত’ থাকত। মাংসের আলুটাকে আমার মস্ত বড় মনে হত। হাতের তালুটা ভরে যেত। পিসেমশাইয়ের বাটিতে মেটের টুকরো পড়লে আমাকে খাইয়ে দিতেন।

পিসেমশাই সিগারেট খেতেন। ক্যাপ্সটান। ক্যাপ্সটান সিগারেটের সোল টিন ছিল। প্রথমদিকে টিন-ই দেখতাম। পরে প্যাকেট। ক্যাপ্সটন  সে-সময়ে বেশ দামি সিগারেট ছিল। কারণ যখন চিপ্পুস খেলতাম, তখন ক্যাপ্সটানের প্যাকেট দিয়ে যে টাকা বানাতাম, তার বেশ দাম ছিল। তখন সস্তা সিগারেট ছিল, চারমিনার পাসিং শো, কাঁচি ছিল মাঝামাঝি দামের।

যখন সাদা রঙের সিগারেট লজেন্স মুখে পুরতাম, পিসেমশাইয়ের কায়দায় দুই আঙুল রাখতাম লজেন্সের গায়ে।

কতগুলো ঘটনার কথা মনে পড়ে।

খুব ছোটবেলার কথা মনে পড়ল। পিসেমশাই দুপুরে খেতে বসেছেন। আমাকেও পাশে বসিয়েছেন।  একটা ছোট্ট প্লেটে আমায় তুলে দিচ্ছেন আলুভাজা, খাইয়েও দিচ্ছেন। প্রায় প্রত্যেক রবিবার-ই পিসেমশাইদের মাংস হত। আমার ‘নেমন্ত’ থাকত। মাংসের আলুটাকে আমার মস্ত বড় মনে হত। হাতের তালুটা ভরে যেত।

একবার রেঙ্গুন থেকে দু’জন এল, ওদের কলকাতা দেখাতে নিয়ে যাওয়া হবে। কেন কে জানে, আমাকেও নিয়ে গেলেন। তখনও পিসেমশাইয়ের গাড়ি ছিল না। কোনওভাবে একটা গাড়ি জোগাড় করেছিলেন, কিম্বা ভাড়া নিয়েছিলেন। আমার ভাল জামা ছিল না। একটা নতুন জামা নিয়ে এল পিসিমা। সেই প্রথম দেখলাম, তের তলা বাড়ি। তখন কলকাতার সবচেয়ে উঁচু বাড়ি।  আর নিয়ে গিয়েছিলেন ভিক্টরিয়া। সেই সাদা ধবধবে বাড়িটা মনে পড়ে, প্রথম দেখাটা। তারপর একটা জায়গায় ঢুকলাম। কাচের দরজা ঠেলে। গোল-গোল টেবিল, সাদা চাদরে ঢাকা। রেস্টুরেন্ট শব্দটা শুনেছি আরও অনেকদিন পরে। ওদের বড় প্লেটে লম্বা, চ্যাপ্টা মতো কিছু দিয়ে গেল সাদা জামায় লাল বেল্ট পরানো লোক। কাটলেট শব্দটা শুনেছি আরও অনেকদিন পরে। ওরা এক হাতে ছুঁরি দিয়ে কাটছিল, আর অন্য হাতে কাঁটা বসানো কী একটা দিয়ে গেঁথে মুখে পুরছিল। আর আমাকে দিল একটা প্লেটে হালকা হলুদ রঙের কী যেন। প্লেটের উপর ওই জিনিসটা থরথর করে কাঁপছিল। চামচ দিয়ে কেটে মুখে পুরলাম। কী নরম, কী ভাল। অনেক পরে পুডিং শব্দটা শুনেছিলাম।  বড় হয়ে মনে হয়েছে কী দরকার ছিল পিসেমশাইয়ের ওদের সঙ্গে আমাকেও নিয়ে যাওয়ার।

ওই গ্যালিফ স্ট্রিট-এর বাড়িতে অনেকগুলো ছেলেমেয়ে একসঙ্গে বড় হচ্ছিলাম। আমরা ভাইবোনেরা, আমার ছোট পিসিমার ছেলেমেয়েরা, সবাই প্রায় সমবয়সি, আমিই একটু বড়। তাছাড়া এ-বাড়িতে প্রায়ই আসত পিসেমশাইয়ের বোনের ছেলেমেয়েরা। তার উপর প্রায় বছর দু’য়েক ছিল একটা ছেলে, অসীম। আমার বাবার কীরকম যেন বোনের ছেলে। আমাদের বাড়িতে থেকে পড়ত, কর্পোরেশন স্কুলে ভরতি হয়েছিল। কেন এ-বাড়িতে ছিল মনে করতে পারছি না। ওরা পূর্ব পাকিস্তান থেকে এসে কোনও শরণার্থী শিবিরে ছিল।