অলিগলির কালীঘাট : পর্ব ১২

লাইনেই ছিলাম বাবা

কালীঘাট আমাকে লাইন শিখিয়েছে। ছেলেবেলায় প্রথম লাইনে দাঁড়িয়েছি রেশন দোকানে। ওখানে বচ্ছরভর পালা-পার্বণ আসত লাইন দিয়ে, পর পর মাস, ঋতু, ব্রত। গ্রীষ্মের পরে বর্ষা। খোদ শহরে থাকি অথচ বর্ষারও টের পেতাম দারুণভাবে। তার আগে গ্রীষ্ম।

ছোটবেলায় তেমন গরম পড়ত না— এটাই আমার দীর্ঘদিনের অলীক বিশ্বাস। গরম পড়লেই দেখতাম, আমার বন্ধুদের গায়ে ঘামাচি বেরিয়েছে, আমার নয়। ফোঁড়া উঠেছে, আমার নয়। আমি সেই বিরল টাইপের মানুষ, যার গরমকালটা মন্দ লাগে না। বরং শীতকালটা বড্ড খারাপ লাগে, খুব ঠোঁট ফাটে। মা-দিদিরা ধরে এনে গায়ে সরষের তেল মাখিয়ে দেয়। বাবা মডেল থেকে তেল আনত। মডেল তেলের ঘানি। সামনে পিষে তেল দিত। একদম পটুয়াপাড়ার উলটো দিকে। সেই মডেলের ঘানির তেল মেখে, চান করেও আরাম নেই। আমাদের সব বাড়িতে-বাড়িতে ছিল চৌবাচ্চা। আর একটা করে গঙ্গাজলের কল। তখন গিজার ছিল না। গঙ্গাজলে এত দুর্গন্ধও ছিল না। তবে কয়লা-কাঠের দাম ছিল। তবু মা জল গরম করে দিত। চানের সময় ঠান্ডাকে জব্দ করা যেত না বলেই কষ্ট পেতাম। এছাড়াও  তখন সবসময়ই একপেট খিদে, সবসময়ই খাই-খাই করছি। শীতকালে ভাল খাবার পাওয়া যায়, গরমকালে নয়, এমন বোধই ছিল না। তাই ভাল শাকসবজির জন্য আমার কাছে শীতকালের আলাদা কোনও মাহাত্ম্য ছিল না। বরং শীতকাল হলেই মনে হত বড্ড মানুষ মরছে।

কালীঘাট রোড ধরে শ্মশানযাত্রীদের অবিরাম যাওয়া আসা ছিল। স্কুলে যাচ্ছি— শবদেহ যাচ্ছে। খেলতে যাচ্ছি—শবযাত্রীরা ফিরছে। এখন মাধ্যমিক দিয়ে দিগ্গজ পড়ুয়ারা যেভাবে বই ছিঁড়ে উৎসব করে, তেমনই কাগজ-কুচির মতো খই সারা রাস্তায়। কখনও কখনও নয়া পয়সা, ফুটো পয়সাও থাকত। কেউ কেউ ফুটো পয়সা কুড়িয়ে নিয়ে যেত, বাচ্চার কোমরে ঘুনসি করবে। হয়তো তখন দিকে-দিকে এত শ্মশান ছিল না। থাকলেও মৃত মানুষের শেষ ইচ্ছে থাকত— ক্যাওড়াতলা মহাশ্মশানে তাঁর দাহ হোক।  ইলেকট্রিক চুল্লি ছিল না। কাঠই ভরসা। একটা শবদেহ পুড়তে-পুড়তে তিন-চার-পাঁচ ঘণ্টাও লেগে যেত। আর তখন মানুষ মারা গেলে পাড়া-প্রতিবেশী শুধু নয়, রাজ্যের লোককে জানানো হত।

আগে দেবদেবীর যৌথ পরিবার ছিল, এখন তারা নিউক্লিয়ার! জয়ন্ত দে-র কলমে পড়ুন ‘অলিগলির কালীঘাট’ পর্ব ১২…

এখন শবদেহ-বাহী গাড়ি আসে, শবদেহ নিয়ে হুস করে চলে যায়। আর তখন ‘বল হরি হরি বোল’ দিয়ে শবযাত্রা শুরু। অনেক সময় কালীঘাট রোডের ওপর দেখেছি শ্মশানযাত্রীরা শবদেহ নিয়ে নৃত্য করতে করতে চলেছে। সঙ্গে খোল-করতাল ধ্বনি দেওয়ার দল। কাঁধে ফুলসজ্জিত শব, নামাবলি ঝুলছে। মড়া যাচ্ছে। লোকে হাত তুলে নমস্কার করছে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে মড়া দর্শন করলে শুভ। পরীক্ষা ভাল হত। তাই পরীক্ষার সময় পা টিপে-টিপে হাঁটতাম। রাস্তায় যদি কোনও শবযাত্রা নজর পড়ে—। সামনে ধূপ, হাতে কেউ। কেউ জল ছড়াচ্ছে, কেউ খই-পয়সা। তারা সবাই হেঁটেই যেত। মড়া শববাহকদের কাঁধে। বাঁশ-দড়ির খাট হলে একরকম, অনেক মড়া যেত বোম্বাই খাটে। বড় সে খাট। তাকে সাপোর্ট দিতেও বাঁশ বাঁধা থাকত। ওজন মুখের কথা নয়। কাঁধ পাল্টে-পাল্টে যাত্রা।

হেঁটে যাওয়ার দরুন অনেকক্ষণ ধরেই তাদের হরিধ্বনি বাতাসে আওয়াজ ভেসে থাকত। শীতকালের রাতে মাঝে-মাঝেই— বল হরি, হরি বোল আর হরিধ্বনি থাকত না; প্রবল আতঙ্কের চিৎকার হয়ে রাতের ঘুমের ভেতরও ঢুকে পড়ত।

আমাদের এক বন্ধু ছিল কালী লেনের দিকেই কোথাও থাকত। ওর কাছে শুনেছি— কাল রাতে একদম ঘুম হয়নি ভাই, গাদার মড়া পুড়িয়েছে। কী গন্ধ!

গাদার মড়া মানে বেওয়ারিশ লাশ। সেসব নাকি মধ্যরাতে পোড়ানো হয়। আমরাও কোনও-কোনও শীতের রাতে উৎকট গন্ধ পেতাম। হয়তো গাদার মড়া পোড়ানোর গন্ধ। এ-ও আমার ছোটবেলার রূপকথা! তার শাখাপ্রশাখা অনেক।

খুব কম হলেও আমাদের একটা আড্ডা ছিল শ্মশানের দিকে। এখন যেখানে ইলেকট্রিক চুল্লি, ওদিকে গঙ্গার ধার বরাবর সাধুদের আড্ডা ছিল। ঠিক মহীশূর গার্ডেনের পিছনদিকে। সেই সব সাধুরা ছিলেন তান্ত্রিক। আমাদের এক বন্ধু কাম কালীঘাট রোডের ফলবিক্রেতার ছেলে আপেল কিছুদিন ডোম গিরি করেছিল। ওর কাছে শুনেছি, তেমন-তেমন লাশ নাকি বিক্রিও হয়।

—কেমন লাশ?

—সধবার লাশ।

—কারা কেনে?

—ওই তান্ত্রিকসাধুগুলো।

আপেল একবার আমাদের খবর দিল শ্মশানের দিকে গঙ্গার ধারে এক তান্ত্রিক সাধু এসেছে, তার তাঁবুতে নাকি মাটি চাপা দেওয়া একটা বডি আছে। চিন্টু, বাপন, রাজু, মুক্তা বেশ কয়েকজন দল বেঁধে দেখতেও গিয়েছিল, আমি যাইনি। কারণ, কেননা আমাকে মুক্তা বলেছিল— তুই যাস না, তোর জ্বর এসে যাবে। তুই হালকা রাশির।

মুক্তা মায়ের কাছ থেকে কোনওদিন শুনেছিল নিশ্চয়।

ওই যে যাঁরা গঙ্গার ধারে কুষ্ঠী করে তেনারা বলে দিয়েছেন, আমার হালকা রাশি। কঠিন জিনিস সইতে পারব না। তখন যদি সেই লাশ স্বচক্ষে দেখে আসতাম, তাহলে এখন চাড্ডি গল্প লিখতে পারতাম। রাশি আমার বাড়া ভাতে নুন দিয়েছে। জ্বর আসার ভয়ে আমার আর যাওয়া হয়নি। ওই শ্মশানে ওদের ছিল সিগারেট খাওয়ার জায়গা। আমি খুব কম যেতাম। শ্মশান মশান আমার ঠিক ভাল লাগত না। কান্নাকাটি, ফুল-অগরুর বিচ্ছিরি গন্ধ, ঘুমের সময় ভয়ের স্বপ্ন— সব মিলিয়ে শ্মশান মানে বিভিন্ন উৎকট গল্পের জন্মস্থান। আপেল একবার বলেছিল— চিতায় আগুন দিতেই একটা মড়া নাকি ঠেলে উঠে পড়ছিল?

সর্বনাশ! তারপর?

তারপর আর কী? মার বাঁশ, মার বাঁশ। মেরে তাকে শুইয়ে দেওয়া হল।

আমরা এসব রোমহর্ষক গল্প শুনতাম শ্মশানচারীদের কাছ থেকে। তখন অত রাইগর মর্টিস জানতাম না। অবাক হয়েছিলাম— তাহলে জ্যান্ত মানুষটাকে মড়া বানিয়ে দিল! এসব শুনে-টুনে আমার রাতের ঘুম চলে যেত।

এর থেকে বরং পটুয়াপাড়া আমার অনেক অনেক বেশি ভাল লাগত। বিশেষত দুর্গা পুজোর আগে। কোনও কোনও গোলায় আমার সরু শরীর নিয়েও চলাফেরারও জায়গা থাকত না। অথচ, আমাদের অনেক আত্মীয়স্বজন এসে বলত— একবার মহাশ্মশান দর্শন করতে যাবে। কেউ বলত না, পটুয়াপাড়া দেখতে যাবে। এখন হলে অবশ্য সবাই পটুয়াপাড়াতেই যেত— কারণ, ওখানে গেলে অনেক রিলস করা সুযোগ আছে। অসুরকে চুমু খেয়ে, সিংহের ইয়েতে হাত দিয়ে— যেমন দুর্গাপুজো এলেই কুমোরটুলিতে হয়। শ্মশানে-মশানে রিলস করলে ট্রোলড হবে।

গ্রীষ্মকাল এলেই গরমের ছুটির সঙ্গে আর-একটা জিনিস দারুণ আনন্দ দিত, তা হল বরফ। আমাদের সারা পাড়ার দু-চারটে বাড়িতে ফ্রিজ ছিল। সেখানে ঠান্ডা জল থাকত। যা আমি কোনওদিন একফোঁটা খাইনি। আমার কাছে ঠান্ডা মানেই বরফ। ফি রোববার দুপুরে বাবা ঘাড় নাড়লেই পাঁচটা পয়সা আর একটা চটের ব্যাগ নিয়ে দৌড়াতাম জোড়াবাড়ির গলিতে। ওখানে একটা কয়লা-কাঠের দোকান ছিল। তার একদিকে থাকত বরফ। কাঠের গুঁড়োয় ঢাকা। একটা লোক বসে থাকত। পাঁচ পয়সা হাতে দিলেই সে একটা লোহার ধারালো শিক দিয়ে বরফ ভেঙে দিত। বাড়িতে আনলে দই দিয়ে…।

বিকেলের দিকে কালীঘাট রোডের ওপর বরফের গাড়ি ঘুরত। সেখানে বরফ থাকত লাল শালুতে মোড়া। সামনে কাঠ ঘষার রেঁদা। সেখানে বরফ ঘষলে ঝুরো ঝুরো হত, সেগুলো ছোট একটা গ্লাসের ভেতর ঢুকিয়ে লাল-সবুজ মিষ্টি সিরাপ দিয়ে একটা কাঠি গুঁজে দিত। খেতাম মাঝেসাঝে। কালীঘাট রোডের ওপর রকমারি খাবার জিনিস ঘুরত, যেমন সব তীর্থক্ষেত্রে ঘোরে। আর গঙ্গাসাগর সময় এলে সারা ভারত উজাড় হয়ে পড়ত এখানে। এদের আমরা বলতাম গঙ্গাসাগরযাত্রী। বাসের দরজা খুললেই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ঝপাঝপ নেমে এসেই বসে বা দাঁড়িয়ে পড়ত মূত্রত্যাগ করতে। এরা সারা কালীঘাটকে নরককুণ্ড বানিয়ে যেত।  

গঙ্গাসাগরের সময় যেমন সাধু, তেমন ভণ্ড। যেমন ভিখিরি, তেমন ঠকবাজের মেলা। সেই সঙ্গে বাঁদর খেলা, ভালুক খেলা দেখানোর লোক। ওই সময়টা সাপুড়েরা আসত না, শীতকাল। সাপ শীতঘুমে। কালীঘাট দুধওয়ালা পার্কে ছোটখাট মেলা বসে যেত। আর নির্মল হৃদয়ের সামনে বড় বড় বাস। বাসের জানলায় রোদ আটকাতে গামছা।   

ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে হালখাতা করতে গিয়ে বিজলি গ্রিলের আইসক্রিম সোডা খেতাম। যার কোনও তুলনা হবে না। আর বছরে দু-একবার কি জুটত, মনে হয় না।

ছোটবেলায় তেমন গরম পড়ত না— এই ধারণার মতোই আমি ছোটবেলায় ভাবতাম, আসলে সোডার বোতলগুলো তৈরি হয় মস্তানদের জন্য। বোম ছুড়লে আগুন জ্বলবে, মানুষ মরবে তার থেকে সোডার বোতল ছোড়াছুড়ি করো। নাহলে একটু কিছু হলেই শুনি সোডার বোতল চার্জ করেছে। আর কিছু ছোড়ার জিনিস পায় না!

যে-কোনও কিছু নিয়েই মারপিট হতে পারে। হতেই পারে। তবে দোলের দিন মারপিট হবে না— এমন কোনও বছর নেই। দোল মিটলেই হয় দুপুরে, নয় সন্ধে, নয় রাতে— সোডার বোতল ছোড়াছুড়ি হবেই হবে। আর যদি মারপিট না, তাহলে সেটা দোলই নয়।

দোলের দিন কালীঘাট বাজারের ভেতর ব্রহ্মাপুজো হয়। আর কোথাও এমনভাবে মোচ্ছব করে ব্রহ্মাপুজো হয় কি না, জানি না। এই ব্রহ্মাপুজো উপলক্ষ করে কালীঘাট বাজারে চার-পাঁচদিন রাতে যাত্রাপালা হতো। কলকাতার নামীদামি দল আসত। আমি এখানে লোকনাট্য অপেরার ‘বর্ণপরিচয়’ দেখেছি। ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পঙ্গপাল’ দেখেছি। ‘সোনাইদিঘি’-র ভাবনা গাজিকে দেখে হিম হয়ে থেকেছি।  এমনকী, সেই সময় ‘শোলে’ যাত্রাপালা হয়েছিল, নাম ছিল ‘আগুন’। সেই জয়-বীরু-গব্বর সিং। আমি দাদাদের কল্যাণে প্রায় স্টেজের পাশেই বাজনদারদের পিছনেই বসতাম। যাত্রা শেষ হলে— দাদারা কাউকে সঙ্গে দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিত।

বিকেলের দিকে কালীঘাট রোডের ওপর বরফের গাড়ি ঘুরত। সেখানে বরফ থাকত লাল শালুতে মোড়া। সামনে কাঠ ঘষার রেঁদা। সেখানে বরফ ঘষলে ঝুরো ঝুরো হত, সেগুলো ছোট একটা গ্লাসের ভেতর ঢুকিয়ে লাল-সবুজ মিষ্টি সিরাপ দিয়ে একটা কাঠি গুঁজে দিত। খেতাম মাঝেসাঝে। কালীঘাট রোডের ওপর রকমারি খাবার জিনিস ঘুরত, যেমন সব তীর্থক্ষেত্রে ঘোরে। 

এমনই এক রাতে যাত্রা দেখে ফেরার সময় দেখেছিলাম— আমাদের পাড়ার উল্টোদিকের নেপালি গলি থেকে দশ-বারোজন মানুষকে কলার ধরে ধরে ভ্যানে তোলা হচ্ছে। তাদের কারও পরনে আন্ডারওয়ার, কারও শুধু প্যান্ট, কাঁধে জামা। তখন গলির মুখে পুলিশের ভ্যান দাঁড়ালেই দক্ষযজ্ঞ বেঁধে যেত। এদিক দিয়ে ওদিক দিয়ে আরশোলার মতো মানুষ ফরফর উড়ে-উড়ে পালাচ্ছে। সকালে গরিব বাজারিদের ধরতে পুলিশ এলে তাকে বলে— হল্লা। হল্লা গাড়ি। আর রাতে এলে— রেইড। এটা ছোটবেলায় শুনেছি।

এখন হল্লা গাড়ি, হল্লা পুলিশ নেই। বরং কালীঘাট রোডের গলির মুখেই গাদাখানেক পুলিশ ভ্যান দাঁড়িয়ে থাকে মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ি সামলানোর গুরুদায়িত্ব নিয়ে।

যাত্রা দেখার রাতে জানলার ধারে এসে মাকে ডাকলেই মা দরজা খুলে দিত। আমরা বেশ কয়েকজন বন্ধু যেতাম। সবাইকে বাড়ি থেকে ছাড়ত না। চিন্টুর জাঠতুতো দাদা বলত— যাত্রা দেখে ফাতরা লোকে। আমার তো দাদারা আছে।

আমার এক দাদা ছিল সোম— সে-ই বেশিরভাগ সময় এই দায়িত্বটা নিত। বিনিময়ে সারা বছর তাকে আমার গল্পের বইয়ের জোগান দিতে হত। আমার এক বন্ধু ছিল, তার বাড়িতে দেদার গল্পের বই। আমি বই নিয়ে এলেই সোমদাও পড়ে ফেলত। তখন একটা গল্পের বই কীভাবে যে সময় ভাগাভাগি করে পড়তাম ভাবাই যায় না।

যাত্রা দেখে আমি ফাতরা লোক হয়েছিলাম। কিন্তু আমার একবার বড় লোক মানে বড় মানুষ হওয়ার সুযোগ এসেছিল। আমার হিল্লে হয়েও যেতে পারত। সে এক গঙ্গাসাগরের সময়কার ঘটনা—

একদিন শেষ বিকেলে কালীঘাট রোডের ওপর আমি আনচান করছি। আসলে আমি দেখছি— বাজারের ওপরের বারান্দায় মিলি এসে বসেছে নাকি? আসলে সেসময়টা শীতকাল। বিকেলে ফুটবল খেলতাম না। দিনে ছিল ক্রিকেট। বিকেল যার যার নিজের খেলা!

এমন সময় উল্টোদিক থেকে বেশ দলবল, শাঁখ বাজিয়ে, ফুল ছড়িয়ে এক সাধু আসছেন। হঠাৎ কালীবাবুর বিড়ির দোকানের সামনে সেই সাধুবাবা আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। সাধুবাবা আমার  সামনে এসে বললেন— বেটা আমার চোখের দিকে তাকা। এবার কাকে দেখতে চাস— মনে মনে বল। যার কথা ভাববি— তাকেই দেখতে পাবি।

কাকে দেখতে চাই? কার কথা মনে মনে ভাবব?

পাশ থেকে আমার বন্ধুদল ফিসফিস করে পরামর্শ দিচ্ছে—নেতাজি, নেতাজি।— পেলে।— গাভাসকর। বারান্দায় মিলি এসে দাঁড়িয়েছে। নাহলে মিলিকেই দেখতে চাইতাম। যাই হোক, সাধুবাবার কথামতো আমি ভাবলাম এবং যাকে ভাবলাম সত্যি-সত্যি সাধুবাবার চোখের ভেতর তাকেই দেখতে পেলাম। স্পষ্ট। এই কথায় একফোঁটা গুল নেই। সে এক দারুণ ব্যাপার। রোমাঞ্চকর! সারাজীবনে ভুলতে পারব না।

সাধুবাবা বললেন— মিলছে?

আমি ঘাড় নাড়লাম। মিলেছে। সাধুবাবু বললেন— শুধু তুই আর আমি জানি, কিসিকো বাতাবি না।

সঙ্গে সঙ্গে আমার গায়ে সাধুবাবার দল বল ফুল ছুড়ল, মাথায় গঙ্গাজল দিল, শাঁখ বাজল, মুখে একটা সন্দেশ ঢুকে গেল। আর সাধুবাবার পাশের একজন একটা ছোট্ট কাগজ বের করে আমার হাতে দিলেন। তিনিই বললেন— বাবা এখন আমাদের বাড়িতে আছেন। এই ঠিকানা দিলাম— তুমি তোমার বাবা-মাকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসবে। সামনের রোববারই এসো। দেরি করো না। বাবা গঙ্গাসাগর চলে যাবেন। তোমাকে বাবা অনেক কিছু দেবেন। কেউ এমন সুযোগ পায় না। তোমার হিল্লে হয়ে গেল। তুমি মস্ত বড় মানুষ হবে।

সাধুবাবা চলে গেলেন। আমার সব বন্ধুরা সেই কাগজের ওপর ঝুঁকে পড়ল। একজনের নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর টাইপ করা। আমি শান্ত, স্থির— মুখের ভেতর সন্দেশ! আমার একটা হিল্লে হয়ে গেল!

আমি তক্ষুণি তক্ষুণি বাড়ি চলে গেলাম। মাকে এসে সব বললাম। মা কাগজটা নিয়ে প্রণাম করে, যত্ন করে আলমারিতে রাখল।

বলল— তুই কাকে দেখতে চেয়েছিলি? মাকে বললাম—সাধুবাবা বলতে মানা করেছে।

মা চুপ করে গেল। কিন্তু তার আগের কথাগুলো ঘুরিয়েফিরিয়ে বার বার শুনল। বিস্তারিতভাবেই শুনেই চলল। এর পর দিদিরাও শুনল বেশ কয়েকবার। তারপর চেপে ধরল— আমি কাকে দেখতে চেয়েছি? আমি বললাম— সাধুবাবা বলেছে— কিসিকো বাতাবে না। ওরা এটা-ওটা খাওয়াবে বলে অনেক তোষামোদ করল। আমি বললাম, না। সাধুবাবার বারণ। বললে নির্ঘাত ফল খারাপ হয়ে যাবে। আমার সামনে মস্ত সুযোগ। বড় মানুষ হব।

রাতে বাবা এল— মা বাবার হাতে কাগজটা দিল। তারপর সবটা বলল। আমিও বাবাকে সবটা বললাম। বাবা বলল— কাকে দেখতে চেয়েছিলে?

আমি বললাম— সাধুবাবা নামটা বলতে বারণ করেছে।

বাবা বলল, বলতে হবে না। লেখো। এই কাগজটার পিছনেই নামটা লেখো।

বাবা সাধুবাবার ঠিকানা লেখা কাগজটা এগিয়ে দিল। এবার কী করি? সাধুবাবা অনেক কিছু দেবে বলেছেন, একটা হিল্লে হয়ে যাবে। আমি নামটা বলব?

বাবা বলল, তুমি মুখে বলছ না, লিখছ। লেখো, কাকে দেখতে চেয়েছিলে?

সর্বনাশ! যাকে দেখতে চেয়েছি, তার নাম বলব? বললে তো আর দেখতে হবে না। কী করি? ঠিক আছে। কিছুটা তো বলি? মিথ্যে নয়, আমি লাইনেই থাকি। না বললে বাবা আমাকে নির্ঘাত নিয়ে যাবে না।

লিখলাম— উত্তমকুমার।

হেলেন

বাবা কাগজটা হাতে নিয়ে দেখল। তারপর কেমন করুণ চোখে আমার দিকে তাকাল। বলল, ঠিক আছে যাও। বাবা হয়তো অন্য কিছু ভেবেছিল। যাই হোক, মা ভেবেছিল— রোববার বাবা আমাকে নিয়ে যাবে। নিয়ে যায়নি। মা অনেকবার বলেছিল— ওকে নিয়ে যাও। মা বুঝেছিল— ওখানে গেলে আমার দারুণ কিছু একটা হবে। বাবা নিজে নিয়ে যায়নি, ঠিকানাটাও নাকি কোথায় ফেলে দিয়েছে। আর খুঁজে পেল না।

তাই আমার আর তেমন কিছু বড় মানুষ হওয়া হল না। সুযোগ হাতছাড়া। নাহলে দারুণ একটা কিছু হত। হিল্লে হয়ে যেত। হয়তো আমার লেখা— উত্তমকুমার দেখে বাবা আমাকে নিয়ে যাওয়ার উৎসাহ হারিয়েছিল। তাও তো আমি সত্যিটা লিখিনি। সত্যিটার লাইনে গিয়েছি। ঠিক নামটা বলিনি।

এখনও আমার দৃঢ় বিশ্বাস ওই সাধুবাবা অরিজিনাল ছিলেন। তাই জন্যই নামটা কাউকে বলতে বারণ করেছিলেন। —নেতাজি, পেলে, গাভাসকর হলে তিনি নির্ঘাত বারণ করতেন না। আসলে, আমি তো দেখতে চেয়েছিলাম হেলেনকে।

হ্যাঁ, হেলেন!

এই নামটা যদি বাবা দেখত তাহলে হয়তো কাগজটার সঙ্গে আমাকেও ফেলে দিত। কাগজটার মতোই আর কেউ আমাকে খুঁজে পেত না। তবে বাবাকে সবটা মিথ্যে বলিনি। আমি সিনেমার লাইনেই ছিলাম।

ও হো মনে পড়ে গেল— শিক্ষিত মানুষজনরা গলির মেয়েদের ‘লাইনের মেয়ে’ বলত।