খেলা শেষ। খেলা শেষ হতেই হয় একদিন, তাই না? আমাদের খেলাটা এত দ্রুত কেন ফুরিয়ে গেল, লুকা মদ্রিচ?
অবশ্য, দ্রুত তো নয়। আমাদের কত কিছুই তো ফুরিয়েছে। নটেগাছের মতো জীবন থেকে মুড়িয়ে গেছে বিকেল। পানাপুকুর থেকে একবার মাথা তুলে ফের ডুবে যাচ্ছে পুরনো বন্ধুরা। আমাদের ল্যান্ডফোন-আমাদের সাইকেল-আমাদের মাদ্রিদ-আমাদের বার্সা-আমাদের টোলগে-পেন-ওডাফা, আমাদের থমথমে মুখের একেকটা ক্লাসিকো-আমাদের নোনা জল তো একা শুকোয়নি, বুকের ভেতর যাবতীয় বিপন্নতার দিকে চেয়ে থাকা অসহায়তা নিয়ে সে ফুরিয়ে গেছে। কেড়ে নিয়ে চলে গেছে বিস্ময়বোধ। আজকাল আমরা তেমন একটা বিস্মিত হই না। আমাদের বুকে ঝড় ওঠে ক্কদাচিৎ।
টরন্টোর এই মাঠ ওই শেষবেলার রোদে আপনার প্রিয় বন্ধুকে জড়িয়ে ধরা— এসব মাঝে-মাঝে দেখলে মনে পড়ে ফেলে আসা ভাড়াবাড়ির কথা। যেসব নাম দেওয়ালে পেনসিলে লেখা হয়ে থেকে গেছে। মানুষ চলে গেছে। মুহূর্তদের স্মৃতি সাদাটে জলের দাগের মতো পড়ে আছে এখনও। তার ওপর দিয়ে সময়ের পিঁপড়েরা মুখে করে নিয়ে যাচ্ছে সংস্থান। বাবা-মা-দাদা-দিদির মতো বাধ্যতামূলক সম্পর্কের ভিড়ে আমাদের প্রথম নিজের পছন্দের সম্পর্ক আসলে, বন্ধু। এই সারসত্য আপনার চেয়ে আর কে ভাল বুঝবে লুকা মদ্রিচ?
আরও পড়ুন: কঙ্গো ইতিহাস তৈরি করল গ্যালারিতেও! লিখছেন অরিত্র মজুমদার…
আপনি জানেন, জ্যাগ্রেবে আসার আগে, ওই চোদ্দ-পনেরো বছর বয়সে আপনার গ্রামে, আপনি ফেলে এসেছিলেন আপনার কৈশোর। আপনার মা। আপনার বোন। আপনার দাদু, তার বুকে বিঁধে থাকা গুলি— থরথর করে কাঁপতে-কাঁপতে নিথর হয়ে যাওয়া দেহ— একটা ছোট্ট ছাগলশিশু— আপনার প্রথম বন্ধু— একটা নয়ের দশক, একটা ভেঙে যাওয়া যুগস্লোভিয়া। সার্বিয়ান সেনার বুটের শব্দে ঘুম ভাঙা ক্রোটদের তটস্থ চাউনি, সব ফেলে আপনি জ্যাগ্রেবে এলেন ফুটবলটাই খেলতে। আসলে কি ফুটবল? না কি বন্ধুতা? যে মানুষ ঘরছাড়া, যে মানুষের একাকিত্বের পাশে চিরকাল টিমটিম করে জ্বলে ফেলে আসা শৈশব, তার কাছে বন্ধু আসলে জাপটে ধরা খড়কুটো। ওই একটা দশক, মাদ্রিদ, আপনি, আপনার দুই হাত, টনি ক্রুজ, বেপরোয়া পতুর্গিজ মহাতারকা, আপনার কাছে যদিও তারকাটারকা নয়। বন্ধু। একযুগ আগের লিসবন। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল। মাঝমাঠে আপনি-খেদিরা আর আর্জেন্টাইন ডি-মারিয়া। সামনে সেই প্রিয় বন্ধু। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। কার্ল আন্সেলোত্তি-আপনাকে ব্যবহার করলেন, আর বুকে বেঁধে দিলেন দু’-দুটো সিলিন্ডার। ৯০+৪। সের্জিও র্যামোস। খেলা শেষের পর আপনার কান্না।
‘হলদে পাখির পালক’ আপনি পড়েননি নিশ্চিত। অথচ, আমাদের লীলা মজুমদার ততদিনে শিখিয়ে দিয়েছেন বুকের ভেতর শিকড় গেঁথে দিতে। ‘কিসের গাছ হয় আর কিসের হয় না তার তুমিই বা কি জানো বোগিদাদা? যারই বুকের মধ্যে শেকড়ের কলি আছে তারই গাছ হয়।’— আমাদের স্কুল পেরনো-আমাদের কলেজে প্রথম পা-আমাদের সদ্য গোঁফের রেখার ওপর যে চিকচিকে জল আর অল্প কাঁচামাটি, তাতে সেদিনই সেই শেকড়ের কলি গাঁথলেন আপনি। আপনার প্রিয় বন্ধু— ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। তার আগে অবশ্য সে মহাতারকা-তার বাহারি ঝুলিতে একটা ওল্ড-ট্র্যাফোর্ড রূপকথা ভরা আছে। কিন্তু বন্ধুত্বের ওই একটা উদযাপন, ওই একটা আছাড়ি-পিছাড়ি করে মাঠকে ভালবেসে ফেলা, এই সাদা জার্সি, ওই ব্লাড, ওই প্রবাদের মতো হয়ে যাওয়া কথাটা, ‘The Real Madrid shirt is white. It can be stained by sweat, mud or even blood, but never with shame’— আপনাদের বন্ধুতার ঘামে আরও গোটা-গোটা হরফে গেঁথে গেল একটা প্রজন্মের বুকে।
পেপ গুয়ার্দিওলার বার্সা-তিকিতাকা সাম্রাজ্য ক্ষয়ে আসা জলসাঘরের মতো যে সময়টায়, সেসময়ে আপনি একটা রেনেসাঁর পিছনে পুতুল খেলার সুতো ধরে রইলেন। রিয়াল মাদ্রিদের ওই কাল্ট হয়ে যাওয়া মাঝমাঠ, ক্রুজ-মদ্রিচ-ক্যাসেমিরোর সামনে উত্তাল ক্রিশ্চিয়ানো— সেসব দিন, সেসব নব্বই বা একুশ শতকের গোড়ার দিককার কলেজজীবন, সেসব মুহূর্ত, যেখানে আমাদের ভেঙে যাওয়া প্রেম আর ইচ্ছের ওপর দিয়ে, সমস্ত জাগতিক ডিফেন্স পেরিয়ে আপনার আউটস্টেপের এক-একটা ট্রিভেলা পাস খুঁজে নিচ্ছে প্রিয় বন্ধুকে, সেইসব রংচঙে স্বপ্নের দিন একদিন ঠিকই চলে যেত। গানওয়ালার মতো গান শোনানো শেষ হয়ে গিয়েছিল তাদের। আপনি এতকাল টেনে টেনে তাকে বাড়ালেন।
ক্রিশ্চিয়ানোর প্রাইম-মেসির প্রাইম-একডজনের বেশি ব্যালঁ দ্যা ওর— সবকিছুর পরেও আপনি প্রতিযোগিতা নয়, বিশ্বাস রেখেছেন বন্ধুতায়। লোকে বলে, অমুক দেশের ফুটবল ইতিহাস তমুককে ছাড়া লেখা যাবে না। আমরা জানি, ক্রোয়েশিয়ার ফুটবল-ইতিহাসটাই খোদ লিখেছেন আপনি। দাভের সুকেরের স্বপ্নের বাস্তবায়নের তুলি আপনারই হাতে, আজন্ম। আপনার ফুটবলে আসার আগে বন্ধুহীন সেই গ্রাম, যেখানে দু’-বেলা কেবলই গোলার আঘাতে খুন হত নিরীহ মানুষ, সেই গ্রামে নিশ্চিত আপনার ম্যুরাল পেন্টিং-এর সামনে আজ বসে থাকে কেউ।
আপনি এবং আপনার প্রিয় বন্ধু বুড়িয়ে গেছেন। সময়ের নিয়মে ফুরিয়ে যাচ্ছেন। আপনারা চলে যাবেন। মাঠ ছেড়ে। আজ আপনি। কয়েকদিন পর আপনার বন্ধুও। সুনীল গাঙ্গুলির বিষাদ আমাদের অসহায় করে দিচ্ছে—
‘সাঁকোটির কথা মনে আছে, আনোয়ার?
এত কিছু গেল, সাঁকোটি এখনো আছে
এপার ওপার স্মৃতিময় একাকার
সাঁকোটা দুলছে, এই আমি তোর কাছে।’
একটা জাপটে ধরা আমাদের বুক উথালপাথাল করে দেয় লুকা মদ্রিচ। আপনারা জানেন না। আপনি না। আপনার বন্ধুও না। আপনাদের বন্ধুত্বের রং আমাদের ঘুমের গায়ে আঁচড় কাটে সারারাত। ঘুমোতে দেয় না। কেবলই স্বপ্নের ভেতর জেগে ওঠে আপনার কথাটা— ‘Giving up is not an option…’
বিশ্বকাপ যেন শেষ হয়ে আসছে এবার। খেলা ঢলে পড়ছে ফলাফলের দিকে। আমাদের অনেক তুলো-তুলো স্মৃতি নিয়ে ঝরে যাচ্ছে একেকটা পাতা। লুকা মদ্রিচ, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো— আপনারা যদি লীলা মজুমদার পড়তেন, জানতেন আমাদের অসহায়তা— ‘…বুকের মধ্যে খানিকটা জায়গা ফাঁকা হয়ে যায়, ফোঁপরা হয়ে যায়, দুনিয়াতে হরেক রকমের ভালো জিনিস আছে, কিন্তু কিচ্ছু দিয়েই আর সে ফাঁকা ভরানো যায় না, বোগিদাদা; ঘর ছেড়ে, ঘরের মানুষ ছেড়ে তাই বেরিয়ে পড়তে হয়।’
আমরাও বেরিয়ে পড়েছি। আমাদের স্মৃতির ঘর ছেড়ে। চিরকালের মতো…



