আফ্রিকার হৃদয়ে অবস্থিত কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র (ডিআর কঙ্গো) পৃথিবীর অন্যতম সম্পদশালী দেশ। মাটির নীচে রয়েছে বিপুল পরিমাণ সোনা, হীরা, কোবাল্ট, তামা এবং আরও বহু মূল্যবান খনিজ। কিন্তু ইতিহাসের এ কী নির্মম পরিহাস! যে-সম্পদ একটি দেশকে সমৃদ্ধ করার কথা, সেটাই বহুবার হয়ে উঠেছে তার দুর্ভাগ্যের কারণ।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে, বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ড কঙ্গোকে নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছিলেন। রাবার ও হাতির দাঁতের লোভে, লক্ষ-লক্ষ কঙ্গোলিজকে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, সে-সময়ে কোটি মানুষের জীবন হারিয়ে যায় বা ধ্বংস হয়ে যায়। আজও সেই অধ্যায় মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ঔপনিবেশিক শোষণের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

স্বাধীনতা এল ১৯৬০ সালে। কিন্তু শান্তি এল না। স্বাধীনতার পরপরই রাজনৈতিক সংকট, সেনা অভ্যুত্থান, বিদেশি হস্তক্ষেপ এবং দীর্ঘ একনায়কতন্ত্র দেশটিকে গ্রাস করে। তারপর নয়ের দশক থেকে শুরু হয় একের-পর-এক গৃহযুদ্ধ। এত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন যে, অনেকেই একে ‘আফ্রিকার বিশ্বযুদ্ধ’ বলে থাকেন। কোটি-কোটি মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম বড় হয়েছে অনিশ্চয়তার মধ্যে।
আরও পড়ুন: মেসির অবিশ্বাস্য খেলা কি একটা প্রকল্পের অংশ? লিখছেন অর্পণ গুপ্ত…
কিন্তু কঙ্গোর গল্প শুধু দুর্ভোগের নয়। এটা ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পও। যেখানে যুদ্ধ ছিল, সেখানে মানুষ গান গেয়েছে। যেখানে দারিদ্র্য ছিল, সেখানে মানুষ স্বপ্ন দেখেছে। আর যেখানে হতাশা ছিল, সেখানে ফুটবল হয়ে উঠেছে আশার ভাষা।
ধুলোভরা মাঠ, ছেঁড়া জুতো, কখনও কাগজ-ন্যাকড়া দিয়ে বানানো বল, এসবের মধ্যেই বড় হয়েছে কঙ্গোর অসংখ্য শিশু। তাদের কাছে ফুটবল শুধু খেলা নয়, বেঁচে থাকার আরেকটা নাম। সেই স্বপ্ন নিয়েই প্রথমবার বিশ্বকাপের মঞ্চে আসে কঙ্গো।
কিন্তু মাঠে নামার আগেই অপমানের মুখে পড়তে হয়। বিশ্বকাপ খেলতে এসে শুধুমাত্র গায়ের চামড়ার জন্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময়ে দলের কয়েকজন সদস্যকে ভিসা ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের নামে দীর্ঘ হয়রানির শিকার হতে হয়। অনেকের কাছেই ঘটনাটি শুধুই প্রশাসনিক ছিল না, এর মধ্যে বৈষম্যের তিক্ত স্মৃতিও ফিরে আসে।
তারপরও কঙ্গো থামেনি। প্রথম ম্যাচেই সামনে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর পর্তুগাল। ফুটবল ইতিহাস, পরিকাঠামো, অর্থনৈতিক শক্তি— সব দিক থেকেই বহু এগিয়ে থাকা এক প্রতিপক্ষ। অনেকেই ভেবেছিলেন, কঙ্গো শুধু অংশগ্রহণ করতেই এসেছে। কিন্তু ইতিহাস বলে, বারবার লড়াই করে বড় হওয়া মানুষকে কখনও হালকাভাবে নেওয়া যায় না। উইসার গোলে, অসাধারণ শৃঙ্খলা আর অদম্য লড়াইয়ে, কঙ্গো তুলে নিল বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম গোল, প্রথম পয়েন্ট। এরপর উজবেকিস্তানকে হারিয়ে এল প্রথম জয়। আর প্রথমবারের মতো পৌঁছে গেল নকআউট পর্বে। প্রথম বিশ্বকাপ। প্রথম গোল। প্রথম পয়েন্ট। প্রথম জয়। প্রথম নকআউট। একটি দেশের ফুটবল ইতিহাসে এর চেয়ে সুন্দর সূচনা খুব কমই হয়।
কিন্তু কঙ্গোর গল্প শুধু মাঠের নয়। গ্যালারিতেও ইতিহাস লেখা হচ্ছিল। লাল স্যুট, লাল টাই পরে এক ব্যক্তি হাত তুলে নব্বই মিনিট স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। ম্যাচের শেষে তিনি মুখ চেপে ধরেন, তারপর আঙুল দিয়ে বন্দুকের ভঙ্গি করেন নিজের মাথার দিকে। কোনো শব্দ নেই। কোনো স্লোগান নেই। তবু সেই নীরবতা হাজার বক্তৃতার চেয়েও শক্তিশালী। ‘ফিফা’র ক্যামেরা দ্রুত অন্যদিকে ঘুরে গেল। কিন্তু ততক্ষণে পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ প্রশ্ন করতে শুরু করেছে— কে এই মানুষটি?
তিনি মিশেল কুকা এমবোলাডিঙ্গা। যাকে সবাই চেনে ‘লুমুম্বা ভিয়া’, অর্থাৎ “লুমুম্বা বেঁচে আছেন” নামে। তিনি শ্রদ্ধা জানান কঙ্গোর প্রথম প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুমুম্বাকে।
১৯৬০ সালের ৩০ জুন। কঙ্গো স্বাধীন হল। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বেলজিয়ামের রাজা বোদুয়াঁ। অনুষ্ঠানে সবাই ভেবেছিলেন, নতুন রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী হয়তো প্রথাগত ধন্যবাদ জানাবেন। কিন্তু লুমুম্বা ইতিহাস লিখলেন। তিনি সবার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘এই স্বাধীনতা কোনো উপহার নয়। এটা এসেছে রক্ত দিয়ে। অপমান সহ্য করে। শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করে।’ তিনি প্রকাশ্যে বেলজিয়ামের ঔপনিবেশিক শাসনের নৃশংসতার কথা বলেছিলেন। সেই বক্তৃতা শুধু কঙ্গোর নয়, পুরো আফ্রিকার স্বাধীনতার ইতিহাসে এক অমর দলিল হয়ে আছে।
কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। শীতল যুদ্ধের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে তিনি গ্রেপ্তার, নির্যাতিত এবং নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় বিদেশি শক্তির ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মধ্যে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। তাঁর দেহও গোপনে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছিল। তাই লুমুম্বা শুধু একজন নেতা নন। তিনি কঙ্গোর অসমাপ্ত স্বপ্নের প্রতীক।
কিন্তু লুমুম্বা ইতিহাস লিখলেন। তিনি সবার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘এই স্বাধীনতা কোনো উপহার নয়। এটা এসেছে রক্ত দিয়ে। অপমান সহ্য করে। শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করে।’ তিনি প্রকাশ্যে বেলজিয়ামের ঔপনিবেশিক শাসনের নৃশংসতার কথা বলেছিলেন। সেই বক্তৃতা শুধু কঙ্গোর নয়, পুরো আফ্রিকার স্বাধীনতার ইতিহাসে এক অমর দলিল হয়ে আছে।
নকআউটে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে, আরেকটি বিতর্ক সামনে আসে। দলের ‘লাকি চার্ম’ বলে পরিচিত সেই লুমুম্বা ভিয়ার, ভিসা বাতিল হয়ে যায়। সরকারি ব্যাখ্যায় প্রশাসনিক কারণের কথা বলা হলেও, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন প্রশাসনের উদ্দেশ্য অজানা নয়।
এরপর মাঠে নামল কঙ্গো। একদিকে শত বছরের ফুটবল ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ ইংল্যান্ড। অন্যদিকে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে আসা কঙ্গো। কাগজে-কলমে ফল যেন আগেই লেখা ছিল। কিন্তু ফুটবল কাগজের হিসাব মানে না।
শুরুর দিকেই ব্রায়ান চিপেঙ্গার গোলে এগিয়ে গেল কঙ্গো। তারপর দীর্ঘ সময় ধরে ইংল্যান্ডের একের পর এক আক্রমণ, কর্নার, হেড, শট – সবকিছুর সামনে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন গোলরক্ষক এমপাসি। তাঁর সঙ্গে বুক চিতিয়ে লড়েছেন ডিফেন্ডাররা। মনে হচ্ছিল, তারা শুধু তিন কাঠি নয়, নিজেদের দেশের ইতিহাস পাহারা দিচ্ছেন।

শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ড জিতেছে। স্কোরবোর্ড তাই বলবে। কিন্তু ইতিহাসের সব জয় কি স্কোরবোর্ডে লেখা থাকে?
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন –‘বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা,/ বিপদে আমি না যেন করি ভয়।” মনে হচ্ছিল, কঙ্গো যেন সেই প্রার্থনাই মাঠে নেমে খেলছে। সে-দিন তাঁদের প্রত্যেককে দেখে মনে হচ্ছিল, তাঁরা যেন প্যাট্রিস লুমুম্বার অসমাপ্ত স্বপ্নের উত্তরাধিকার বহন করছে। এ-কারণেই কঙ্গোর ফুটবলকে শুধু ট্যাকটিক্স দিয়ে মাপা যায় না। এটা মানুষের স্থিতিস্থাপকতার গল্প। এটা আত্মমর্যাদার গল্প। এটা ভেঙে পড়েও আবার উঠে দাঁড়ানোর গল্প।
বিশ্বকাপের এই কয়েকটা সপ্তাহে কঙ্গো নিজের নতুন পরিচয় লিখে দিয়েছে। এখন পৃথিবী যখন ‘কঙ্গো’ নামটা শুনবে, তখন শুধু যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ বা খনিজ সম্পদের রক্তাক্ত ইতিহাস নয়, মনে পড়বে উইসার গোল, এমপাসির অদম্য লড়াই, আর বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এগারোজন মানুষের কথা। মনে পড়বে সেই সব মায়ের কথা, যাঁরা যুদ্ধের মধ্যেও সন্তানকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। মনে পড়বে সেই শিশুদের কথা, যারা ভাঙা কাঠ দিয়ে গোলপোস্ট বানিয়ে, কাগজ-ন্যাকড়ার বল নিয়ে একদিন বিশ্বমঞ্চে খেলার স্বপ্ন দেখেছিল।
হয়তো কঙ্গো বিশ্বকাপ জেতেনি। কিন্তু সব ট্রফিতেই একদিন ধুলো পড়ে। সব পদকই একদিন কাচের বাক্সে বন্দি হয়ে যায়। কিন্তু কিছু গল্প থাকে, যেগুলো সময়ের সঙ্গে আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কঙ্গোর এই বিশ্বকাপ সেই গল্পগুলোর একটি।
কঙ্গো ফুটবল দল আমাদের মনে করিয়ে দিল ইতিহাস শুধু সম্রাটরা লেখেন না। ইতিহাস লেখেন সেই মানুষগুলোও, যাঁরা শতবার ভেঙে পড়েও প্রতিবার উঠে দাঁড়ান। কঙ্গো তাই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে, কিন্তু পরাজিত হয়নি। কারণ কখনও-কখনও একটি ট্রফির চেয়েও বড় হয়ে ওঠে, একটি জাতির আত্মমর্যাদা। আর কখনও-কখনও একটি পরাজয়ের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর বিজয়।




