কলকাতার কোনও এক ফ্লাইওভারের নিচে, মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে বাইকে বসে থাকা এক ডেলিভারি কর্মীর কথা ভাবুন। তাঁর চোখ স্মার্টফোনের স্ক্রিনে আটকে আছে। তিনি জানেন না, তাঁর পরবর্তী গন্তব্য কোথায়, তিনি জানেন না তাঁর কাজের নির্দেশ ঠিক কে দিচ্ছে। শুধু একটি যান্ত্রিক ‘বিপ’ শব্দ তাঁকে শহরের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটিয়ে নিয়ে বেড়ায়। তিনি এমন এক অদৃশ্য কর্তৃপক্ষের আদেশের দাস, যাকে তিনি কোনওদিন দেখেননি, এবং যাকে প্রশ্ন করার কোনও অধিকারও কী তার আছে!
এইরকম দৃশ্য আসলে আমাদের পৃথিবীতে নতুন নয়। ১৯৫৭ সালে লেখা হ্যারল্ড পিন্টারের ‘দ্য ডাম্ব ওয়েটার’ নাটকের বেসমেন্টে বসে থাকা দুই পেশাদার খুনি, বেন এবং গাসের দিকে তাকালেই আমরা এই আধুনিক শ্রমদাসত্বের নিখুঁত মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোটি যেন দেখতে পাই। বেন এবং গাস একটি বদ্ধ ঘরে বসে আছে, আর ওপর থেকে স্পিকিং টিউবের মাধ্যমে আসছে একের পর এক অদ্ভুত নির্দেশ। গাস ক্লান্ত, সে প্রশ্ন করতে চায় তার অদৃশ্য মনিবকে। কিন্তু বেন তাকে ধমক দেয়। এই দুই চরিত্র আজ আর কেবল কোল্ড-ওয়ারের গুপ্তঘাতক নয়; ২০২৬ সালের ভারতে দাঁড়িয়ে তারা কি গিগ-ইকোনমি এবং প্ল্যাটফর্ম লেবারের সেই অসংখ্য অসংগঠিত শ্রমিকের প্রোটোটাইপ পূর্বজ নয়; যারা অ্যালগরিদমিক ম্যানেজমেন্টের এক অদৃশ্য, অমানবিক ও প্রশ্নহীন শৃঙ্খলে আবদ্ধ। পিন্টার আমাদের শিখিয়েছেন, ক্ষমতা যখন অদৃশ্য হয়, তখন তা সবচেয়ে বেশি ভীতিজনক হয়ে ওঠে। এই কাঠামোগত ভীতিকেই যখন সৌমিত দেব-এর অনুবাদে ‘সিনেবাহিনী’ তাদের ‘বোকাবাক্স’ প্রযোজনায় মঞ্চস্থ করে, তখন স্পিকিং টিউবের সেই অজানা নির্দেশ যেন আজকের কর্পোরেট অ্যালগরিদমেরই এক দেশীয় রূপরেখা হয়ে দাঁড়ায়। যদিও নির্দেশক সেখানে সরাসরি গুলি চালানোর দৃশ্য যোগ করে পিন্টারের মূল অস্পষ্টতাকে কিছুটা ক্ষুণ্ণ করেছিলেন, তবু নির্দেশপালনের এই অন্ধত্ব বাঙালি দর্শকের স্নায়ুতে সরাসরি আঘাত করেছিল।

আরও পড়ুন: বাস্টার কিটন ও হলিউডের স্টুডিও! লিখছেন সোহিনী দাশগুপ্ত...
আজকের ভারত এবং বিশেষত বাংলার সমাজ, রাজনীতি ও নগরজীবনের দিকে তাকালে বারবার মনে হয়, আমরা যেন এক অতিকায় ‘পিন্টারেস্ক’ নাটকের ভেতরেই বসবাস করছি। পিন্টার কেবল ইউরোপীয় অ্যাবসার্ড থিয়েটারের একজন প্রবক্তা ছিলেন না। তিনি ছিলেন প্রাত্যহিক জীবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ক্ষমতা, ভীতি, আধিপত্য এবং অনিশ্চয়তার সবচেয়ে তীক্ষ্ণ ভাষ্যকার। তাই আজ যখন আমরা পিন্টারকে নতুন করে পড়ার বা অনুবাদ করার কথা ভাবি, তা কেবল বিশ্বসাহিত্য চর্চার খাতিরে নয়; তা আসলে আমাদের নিজেদেরই সমকালীন ক্ষতগুলোকে চিনে নেওয়ার তাগিদ।
পরিচয় এবং নাগরিকত্বের যে তীব্র সংকট আজ আমাদের তাড়া করে ফিরছে, তার এক অসামান্য রূপক লুকিয়ে আছে পিন্টারের ‘দ্য কেয়ারটেকার’ নাটকে। এই নাটকের অন্যতম চরিত্র ডেভিস এক ভবঘুরে, যে একটি ভাঙাচোরা ঘরে আশ্রয় পেয়েছে। কিন্তু তার কোনও বৈধ পরিচয়পত্র নেই। সে বারবার একটি কথাই বলে, “If only I could get down to Sidcup! I’ve been waiting for the weather to break. He’s got my papers… it’s got it all down there, I could prove everything.” সিডকাপে ফেলে আসা সেই কাগজপত্রের জন্য ডেভিসের হাহাকার আসলে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণের হাহাকার, যে হাহাকারের সিম্ফোনিতে মিশে যেতে থাকে ‘মোদের কুনো দ্যাশ নাই’।

আজকের পশ্চিমবঙ্গে বসে যখন আমরা এই সংলাপটি শুনি, তখন তা এক অদ্ভুত সমকালীন অনুরণন তৈরি করে। ২০২৬ সালে নির্বাচন কমিশনের ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) বা ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো প্রশাসনিক প্রক্রিয়াগুলো যখন প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছায়, তখন আইনি ও মনস্তাত্ত্বিক— উভয় ক্ষেত্রেই এক গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সুপ্রিম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশন বারবার স্পষ্ট করেছে যে, ভোটার তালিকা যাচাই করা এবং নাগরিকত্ব বাতিল করা এক বিষয় নয়। কিন্তু আইনের পাতা আর বাস্তবের মাটির মধ্যে দিস্তা যোজন ‘ইনটেন্ট’-এর ফারাক রয়েছে। দেশভাগের স্মৃতি ও উদ্বাস্তু অতীত বহন করা এই ব-দ্বীপের অসংখ্য মানুষের কাছে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়ে এসে আবার নতুন করে ‘কাগজ’ দেখানোর চাপ এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ভীতির জন্ম দেয়।
ডেভিসের মতোই আজকের অনেক প্রান্তিক ভারতীয় জানেন, ‘কাগজ’ না-থাকা মানে কেবল একটি সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়া নয়; এর অর্থ হল, রাষ্ট্র নামক সুরক্ষিত ঘর থেকে চিরতরে বিতাড়িত হওয়ার শঙ্কা। ‘অন্য থিয়েটার’-এর প্রযোজনায় অরিন্দম মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় যখন ‘কেয়ারটেকার’ মঞ্চস্থ হয়, অথবা সুপ্রিয় সমাজদারের নির্দেশনায় ‘বিভাবন’-এর প্রযোজনায় ‘চার দেয়ালের মধ্যে’ যখন এক উদ্বাস্তু মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে ফুটে ওঠে, তখন ডেভিসের এই হাহাকার আর ব্রিটিশ থাকে না, তা একান্তই বঙ্গীয় হয়ে ওঠে। পিন্টার দেখিয়েছেন, মানুষের আইডেন্টিটি যখন নিছক কাগজের ওপর নির্ভর করে, তখন সে আসলে এক ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’-এ বাস করে।



এই নিরাপত্তাহীনতা কেবল বাস্তুহারাদের নয়, শহুরে মধ্যবিত্তরও। পিন্টারের প্রথম নাটক ‘দ্য রুম’-এর রোজ চরিত্রটি একটি বদ্ধ ঘরে নিজেকে সুরক্ষিত মনে করে। বাইরের শীত, অন্ধকার এবং অচেনা জগৎ তার কাছে প্রবল ভয়ের। সে বারবার বলে, “It’s very cold out, I can tell you. It is a murder.” এই ঘর বা ‘রুম’ আসলে কলকাতার বুকে গজিয়ে ওঠা আজকের ‘গেটেড কমিউনিটি’-গুলোর নিখুঁত অবয়ব। আমরা উঁচুতলার ফ্ল্যাটে বসে, একাধিক নিরাপত্তারক্ষী দিয়ে বাইরের দরিদ্র, পরিযায়ী এবং ‘অচেনা’ মানুষকে আটকে রাখতে চাই। আমরা আমাদের দ্বার বন্ধ করে দিয়ে ভ্রম, মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ধুপকাঠি আর ডালের বড়ি বিক্রেতা সেলসম্যান প্রভৃতি-কে রুখি! ‘সত্য’ বলে আমি তখন ব্রেকিং নিউজ হয়ে ঢুকি! ‘বাইরের ফিজিক্যাল পৃথিবী’ আমাদের কাছে এক অদৃশ্য ‘মেনাস’ বা ভীতি।
কিন্তু এই সুরক্ষিত পরিসরের ভেতরে বসে আমরা কী করি? ‘পার্টি টাইম’ নাটকে পিন্টার দেখিয়েছেন, একটি অত্যন্ত অভিজাত ক্লাবে গ্ল্যামারাস পার্টি চলছে। টেরি, গ্যাভিন বা ডাস্টিরা শ্যাম্পেন হাতে গল্প করছে। অথচ তারা জানে, ঠিক সেই মুহূর্তেই রাস্তায় চলছে চরম রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, কার্ফু এবং দমনপীড়ন। ডাস্টি যখন তার নিখোঁজ ভাইয়ের কথা জানতে চায়, টেরি তাকে নির্মমভাবে চুপ করিয়ে দিয়ে বলে, “We could suffocate every single one of you at a given signal…” ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হল, সুবিধাভোগী মধ্যবিত্তের ‘স্বেচ্ছা অন্ধত্ব’। আজকের দিনে যখন ভারতের আনাচকানাচে অসাম্য, কর্মহীনতা বা প্রাতিষ্ঠানিক রূঢ়তা চলে, তখন আমাদের নাগরিক সমাজের একাংশ ঠিক এই ‘পার্টি টাইম’-এর চরিত্রগুলোর মতোই নিজেদের ড্রয়িংরুমে বসে এক ধরনের ফ্যান্টাসি তৈরি করে, রিলস আর ‘সপ্তাহান্তে বেড়িয়ে আসার সেরা পাঁচটি ডেসটিনেশন’-এর ভ্লগ হাতড়ে ভাল থাকে। পিন্টার আমাদের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেখান যে, রাজনৈতিক উদাসীনতা আসলে একধরনের প্রচ্ছন্ন হিংসা। মধ্যবিত্তের এই সৌজন্যের আড়ালে থাকা নিষ্ঠুরতা আমরা দেখেছি ‘আ স্লাইট এক’ (A Slight Ache) নাটকেও, যেখানে এডওয়ার্ড একটি নিরীহ বোলতাকে ফুটন্ত জলে পুড়িয়ে মারে কেবল নিজের নিয়ন্ত্রণ জাহির করার জন্য।
‘দি অ্যাপ্লিক্যান্ট’ নাটকে পিন্টার দেখিয়েছেন প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা কীভাবে একজন মানুষকে ভেতর থেকে শূন্য করে দেয়। চাকরির ইন্টারভিউয়ের নামে কর্পোরেট নিয়োগকর্তারা কীভাবে একজন প্রার্থীর মনস্তাত্ত্বিক অবমাননা করে, তা আজকের প্রবল প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারের এক ভয়াবহ ছবি। বাংলাদেশের নাট্যদল ‘স্পর্ধা’ যখন শানাজ পারভীন জোনাকীর নির্দেশনায় এর বাংলা রূপান্তর ‘চাকরীপ্রার্থী’ মঞ্চস্থ করে, তখন ল্যাম্ব নামের যুবকটির শরীরে ইলেক্ট্রোড লাগিয়ে যন্ত্রণা দেওয়ার দৃশ্যটি আজকের এআই-চালিত এবং কর্পোরেট শৃঙ্খলায় আবদ্ধ বেকার যুবকদের চরম অসহায়তার কথা মনে করিয়ে দেয়। কর্মসংস্থানের এই অভাব এবং মানুষের যান্ত্রিকীকরণ যেন পিন্টারের কলমে আগে থেকেই লেখা ছিল।

অফিসের এই ক্ষমতা-কাঠামো থেকে পালিয়ে মানুষ যখন নিজের পরিবারে ফেরে, সেখানেও তাকে এক নতুন রাজনীতির মুখোমুখি হতে হয়। ‘দ্য হোমকামিং’ নাটকে পিন্টার পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটির ভেতরের সমস্ত ভণ্ডামিকে নগ্ন করে দিয়েছেন। ম্যাক্স, লেনি এবং টেডির পুরুষতান্ত্রিক, নারীবিদ্বেষী সংসারে টেডির স্ত্রী রুথ প্রবেশ করে। প্রথমে মনে হয় পুরুষরা তাকে শোষণ করবে। কিন্তু রুথ তার নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা ও যৌনতাকে ব্যবহার করে পুরো পরিবারের রাশ নিজের হাতে তুলে নেয়। এক গ্লাস জল নিয়ে লেনি যখন তার ওপর পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য ফলাতে চায়, রুথ শান্ত গলায় বলে, “If you take the glass… I’ll take you.” একটি সাধারণ সংলাপ কীভাবে ক্ষমতার ভরকেন্দ্র পালটে দিতে পারে, এটি তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। ‘সংলাপ কলকাতা’-র প্রযোজনায় ড. কুন্তল মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় যখন নাটকটি ‘ঘরে ফেরা’ নামে মঞ্চস্থ হয়, তখন কলকাতার দর্শক কি এক অদ্ভুত অস্বস্তির সম্মুখীন হননি? আজকের ভারতীয় মধ্যবিত্ত পরিবারের ভেতরেও সম্পত্তি, লিঙ্গ এবং অর্থনৈতিক নির্ভরতাকে কেন্দ্র করে যে নীরব স্নায়ুযুদ্ধ চলে, ‘দ্য হোমকামিং’ তারই এক অস্বস্তিকর ব্যবচ্ছেদ।
পিন্টারকে আজকের বাংলায় নতুন করে পড়ার আরও একটি বড় কারণ হল ‘স্মৃতি’ এবং ‘সত্য’-এর ব্যবহার। ‘ওল্ড টাইমস’ এবং ‘বিট্রেয়াল’-এর মতো নাটকে পিন্টার দেখিয়েছেন অতীত কোনও স্থির সত্য নয়। স্মৃতি এখানে আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার। ‘মুখোমুখি’ নাট্যদলের প্রযোজনায় এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অসামান্য অনুবাদে যখন ‘প্রতারণা’ মঞ্চস্থ হয়, তখন বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের এই জটিল মনস্তত্ত্ব বাঙালি নাগরিক জীবনের এক গভীর শূন্যতাকে তুলে ধরেছিল। মঞ্চে আয়নার ব্যবহার, যেখানে কোনও প্রতিবিম্ব দেখা যায় না, তা আসলে আত্মপরিচয় হারানোরই এক সূক্ষ্ম রূপক। আজকের ‘উত্তর-সত্য যুগে’ যখন রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য ইতিহাসকে প্রতিনিয়ত বিকৃত বা পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে, তখন পিন্টারের এই ‘মেমরি গেম’ আমাদের রাজনৈতিক ন্যারেটিভগুলোকে ডিকনস্ট্রাক্ট করতে সাহায্য করে। মনে পড়ে আনা-র সেই বিখ্যাত সংলাপ— ‘There are some things one remembers even though they may never have happened.’
২০০৫ সালে নোবেল ভাষণে (‘Art, Truth and Politics’) পিন্টার শিল্পের সত্য এবং রাজনৈতিক সত্যের মধ্যেকার পার্থক্যকে স্পষ্ট করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “Political language, as used by politicians, does not venture into any of this territory since the majority of politicians… are interested not in truth but in power and in the maintenance of that power.” ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য অজ্ঞতার যে মিথ্যার চাদর বোনা হয়, আজকের সমাজ তার থেকে মুক্ত নয়। ‘মাউন্টেন ল্যাঙ্গুয়েজ’ নাটকে যখন রাষ্ট্র এক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাষাকে নিষিদ্ধ করে, তখন তা আসলে তাদের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করার নামান্তর। আজকের ভারতে যখন ভাষিক বা সাংস্কৃতিক সংখ্যালঘুদের পরিচয় নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে প্রশ্ন ওঠে, তখন পিন্টারের এই নাটক একটি চরম রাজনৈতিক সত্যের মুখোমুখি আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয়।
ঠিক এই কারণেই বাংলা থিয়েটারে পিন্টারকে অনুবাদ করা এবং মঞ্চস্থ করা আজ একটি গভীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দায়িত্ব। ঐতিহাসিকভাবে, ২০০৫ সালের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার আগে পর্যন্ত কলকাতায় পিন্টার চর্চা ছিল অত্যন্ত সীমিত, মূলত কিছু অ্যাকাডেমিক বৃত্তে আবদ্ধ। কিন্তু নোবেল ভাষণের পর তাঁর সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী অবস্থান বাংলার নাট্যকর্মীদের প্রবলভাবে আকৃষ্ট করে। তবে পিন্টারকে বাংলায় অনুবাদ করা এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। বাঙালি স্বভাবগতভাবেই বাঙ্ময় ও আবেগপ্রবণ। আমাদের নাটক, আমাদের প্রাত্যহিক আড্ডা— সবকিছুতেই শব্দের ছড়াছড়ি। কিন্তু পিন্টারের নাটকের মূল শক্তি তাঁর শব্দে নয়, তাঁর ‘ভরাট পজ’ এবং ‘প্রসূতি নীরবতায়’ নিহিত।
সত্তর দশকে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় যখন ‘দ্য বার্থডে পার্টি’ অবলম্বনে ‘৩৩তম জন্মদিন’ মঞ্চস্থ করেছিলেন, তখন স্ট্যানলির চরিত্রটি নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার এক দিশেহারা যুবকের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সেই প্রযোজনাতেও ছিল এক উচ্চকিত আবেগ, যা পিন্টারের পরিমিতির সাথে পুরোপুরি মেলে না। পিন্টার বলেছেন, ‘When true silence falls, we are still left with echo but are nearer nakedness.’ আজকের নজরদারির যুগে আমরা কী বলছি, তার চেয়ে অনেক বেশি ভীতিজনক হল আমরা ‘কী বলছি না’। বাংলা অনুবাদে পিন্টারের সেই অব্যক্ত ভীতি, মধ্যবিত্তের মেকি ভদ্রতার আড়ালে থাকা প্রচ্ছন্ন হিংসা (‘আ স্লাইট এক’-এর মতো) এবং ভাষার অন্তর্নিহিত শূন্যতাকে ফুটিয়ে তোলা এক বড় চ্যালেঞ্জ। নির্দেশক যখন দর্শকের অস্বস্তি কাটানোর জন্য পিন্টারের নীরবতার মাঝে আবহসংগীত জুড়ে দেন, তখন তিনি আসলে পিন্টারীয় দর্শনকেই অস্বীকার করেন। পিন্টার চান দর্শক অস্বস্তিতে ভুগুক, কারণ আমাদের চারপাশের বাস্তবতা অস্বস্তিকর।
তাহলে আজ, এই ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে হ্যারল্ড পিন্টারকে আমরা কেন পড়ব?
আমরা পড়ব কারণ, পিন্টার আমাদের বুঝতে শেখান যে, ক্ষমতা কেবল পুলিশের লাঠিতে বা সরকারি ফাইলে থাকে না; ক্ষমতা লুকিয়ে থাকে আমাদের ড্রয়িংরুমের সোফার খাঁজে যেখানে হারিয়ে গেছে ছোটবেলার প্রিয় খেলনাটি, কর্পোরেট অফিসের কেবিনে যেখানে ‘মনে’ নয় ‘মেনে’ নিতে হয় এবং থাকে দু’টি শব্দের মাঝখানের দীর্ঘ নীরবতায়। আমরা তাঁকে অনুবাদ করব কারণ, যে সমাজ কথা বলতে ভয় পায়, সেই সমাজের নীরবতার ব্যাকরণটি পিন্টারের চেয়ে ভাল কেউ জানেন না। আজ যখন কোনও ডেলিভারি কর্মী অচেনা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন, যখন কোনও বৃদ্ধ তাঁর নাগরিকত্বের প্রমাণ খুঁজতে পুরনো ট্রাঙ্ক হাতড়ান, যখন কোনও কর্পোরেট অফিসে বস হাসিমুখে কর্মীকে ছাঁটাই করেন, অথবা যখন কোনও পরিবারের ভেতরে লিঙ্গ ও ক্ষমতার নীরব লড়াই চলে— তখন বুঝতে হবে, পিন্টারের নাটক কোনও বিমূর্ত মঞ্চের গল্প নয়। আমাদের ঘনিষ্ঠ বর্তমান। পিন্টার আমাদের সেই চক্ষুদান শিল্পী, যার তুলির ছোঁয়া পেয়ে ‘শিক্ষিত চোখটি’ চেনা ঘরের চেনা মানুষটাকেও এক অচেনা আততায়ী হিসেবে জেনে নিতে শেখে। যতক্ষণ ক্ষমতা আছে, যতক্ষণ সেই ক্ষমতার নিচে পিষ্ট হওয়া প্রান্তিক মানুষ আছে, এবং যতক্ষণ সেই নিপীড়ন ঢাকার জন্য ভাষার কারচুপি আছে, ততক্ষণ হ্যারল্ড পিন্টার আমাদের সমকাল হয়েই থাকবেন।




